বুদ্ধিবৃত্তিক চৌর্যবৃত্তি : কুম্ভিলক কোপারনিকাস

১৯৫৭ সাল। অটো নইগিবাউয়ার—একজন উঁচুমানের জার্মান-বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক, কোপারনিকাস-এর গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে কাজ করছিলেন। খুব ঘাঁটাঘাঁটির পর তিনি আবিষ্কার করেন ইবনুশ শাতির-এর একটি পুস্তিকা, যা আগাগোড়া জ্যোতির্বিদ্যার তাত্ত্বিক সব আলোচনায় ভরপুর। অদ্ভুত হলেও তিনি ইবনুশ শাতিরের চন্দ্র মডেলের সঙ্গে কোপারনিকাসের চন্দ্র মডেলের হুবুহু মিল দেখতে পান, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মিল বলা চলে। মিলের বাহুল্য বোঝার জন্য বলতে হয়, নইগিবাউয়ার আরবি ভাষা পারতেন না। কিন্তু দুটি মডেলের মধ্যে মিল এত বেশি ছিল যে, আরবি না পারলেও তা বুঝতে তাকে বেগ পোহাতে হয়নি।


তার বন্ধু, এডওয়ার্ড কেনেডি-ও অপ্রত্যাশিতভাবেই একইরকম একটি টেক্সটের সন্ধান পেয়েছিলেন বিখ্যাত বোডলেইন লাইব্রেরিতে। দুজনের মধ্যে এ ব্যাপারে বিস্তর আলোচনা হয়। ফলে অস্তিত্বে আসে প্রথম রিসার্চ পেপার ‘The Solar and Lunar Theory of ibn al-Shatir: A pre-Copernican Copernican model’। এটি লিখেছিলেন কেনেডির ছাত্র—ভিক্টর রবার্ট্‌স। এরপর কি হয়েছে আন্দাজ করুন! বিজ্ঞানের ইতিহাস অ্যাকাডেমিয়ায় একের পর এক বোম ফাটতে শুরু করে।


একজন ইসলামিক সায়েন্টিস্টের সঙ্গে কোপারনিকাসের কাজ হুবুহু মিলে যাওয়া খুবই অস্বাভাবিক। কোন চাইনিজ বা ভারতীয় সায়েন্টিস্টের সঙ্গে মিললে হয়তো কেউ তেমন একটা পাত্তা দিত না। কিন্তু ইসলামিক অ্যাস্ট্রনমি তো তখন সমগ্র ইউরোপে স্টাডি করা হতো, বিশেষ করে ক্রাকো ইউনিভার্সিটিতে (যেখানে কোপারনিকাস পড়েছেন) সেটা ছিল বাধ্যতামূলক! তাই নইগিবাউয়ার আরও মিল আবিষ্কার করতে আত্মনিয়োগ করেন। আর অন্যদিকে ১৯৭৩ সালে উইলি হার্টনার এক অবিশ্বাস্য মিল খুঁজে পেলেন কোপারনিকাস আর নাসিরউদ্দিন তুসি-এর গবেষণার মাঝে।


নাসিরউদ্দিন তুসির এক বিখ্যাত উপপাদ্য আছে, Tusi Couple—যা ব্যবহার করে বৃত্তীয় গতি থেকে সরলরৈখিক গতি পাওয়া যায়। এটি কোপারনিকাস তার De Revolitionibus বইয়ে ব্যবহার করেছিলেন। যা সাব্যস্ত করতে তিনি নাসিরউদ্দিন তুসির মতোই প্রমাণ দিয়েছিলেন। যাই হোক, শক হচ্ছে—যেখানে নাসিরউদ্দিন তুসির কোনো বিন্দুর নামকরণ আরবি ا (আলিফ) প্রতিবর্ণে করেছেন, সেখানে আলিফের সমমানের ল্যাটিন অক্ষর ‘A’ ব্যবহার হয়েছে কোপারনিকাসের প্রমাণে। যেখানে আরবি ب (বা) প্রতিবর্ণে করেছেন, সেখানে ল্যাটিন ‘B’ ব্যবহার হয়েছে। এমনিভাবে যেখানে د (দাল) সেখানে ‘D’ এবং অন্যান্য সবক্ষেত্রেও প্রতিবর্ণায়নে আরবি বর্ণের জায়গায় সমমানের ল্যাটিন বর্ণ ব্যবহৃত হয়েছে!


নাসিরউদ্দিন তুসি আর কোপারনিকাসের বিন্দুর নামকরণে শুধু একটি পার্থক্য আছে অবশ্য। তা হচ্ছে, তুসি যেখানে ز (যা) ব্যবহার করেছেন, কোপারনিকাসের ডায়াগ্রামে সেখানে আছে F। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অ্যাওয়ার্ড উইনিং বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদ জর্জ স্যালিবা বিষয়টি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন—এই অনস্বীকার্য সাদৃশ্য কোপারনিকাস যে তুসির রচনা ও গবেষণা থেকে সাহায্য নিয়েছেন, সেটা আরও ভালোভাবে প্রমাণ করে। কীভাবে? এ থেকে সাধারণভাবেই বোঝা যায় যে, কোপারনিকাস বা তিনি যার গবেষণা থেকে সাহায্য নিয়েছিলেন, সে আরবি ভাষা বেশি পারদর্শী ছিল না এবং ز কে সে ف মনে করেছিল। । পারদর্শী নয়—এমন কারও পক্ষে ‘যা’ কে ‘ফা’ পড়া স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।


এবার আমরা মুআইয়াদউদ্দিন আল-উরদি-এর আলোচনায় আসি। তার উপপাদ্য Urdi’s Lemma নামে পরিচিত। এটি ইবনুশ শাতির তার মডেলে ব্যবহার করেছিলেন। কোপারনিকাসও এটি তার মডেলে ব্যবহার করেন। কিন্তু এটার জন্য কোপারনিকাস কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি। পরবর্তীতে কেপলার এটার প্রমাণ না পেয়ে হতবুদ্ধি হন এবং তার শিক্ষক মেস্টলিনকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে পত্র পাঠান। প্রতিউত্তরে মেস্টলিন এটার প্রমাণ প্রতিপাদন করেন। সেটা অবশ্য শুধু সে মডেলে যা প্রয়োজন ছিল, ততটুকু প্রমাণ। পুরো উর্দির লেমার প্রমাণ না। যাই হোক, এখান থেকে কি বোঝা যাচ্ছে? কোপারনিকাস, ইবনুশ শাতিরের মডেল পর্যবেক্ষণ করে সেখান থেকে হুবুহু নকল করেছেন। আর এ গবেষণার আদ্যোপান্ত প্রায় ‘না জেনে’ উর্দির লেমা-ও নকল করেছেন।


অ্যাস্ট্রোনমির হিস্ট্রির বড় নাম—নোয়েল সোয়ার্ডলো অভিমত দিয়েছেন যে, কোপারনিকাস তার মডেলের সঙ্গে বুধ গ্রহের (Mercury) আপাত গতির সম্পর্ক জানতেন না। এক্ষেত্রে কোপারনিকাস ইবনুশ শাতির থেকে না বুঝেই নকল করেছেন। তিনি নিজেও জানতেন না যে, তিনি কি লিখছেন! শুধু পার্থক্য হচ্ছে ইবনুশ শাতির নিজ মডেলে হিলিওসেন্ট্রিক বৈশিষ্ট্য অ্যাপ্লাই করেননি। এটাই কোপারনিকাস আর ইবনুশ শাতিরের লুনার মডেলের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য যে, মুসলিমদের পৃথিবী মহাকাশে স্থির আর কোপারনিকাস এর পৃথিবী সূর্যকে আবর্তন করছে। তা ছাড়া লুনার মডেলের বাকি অংশ কিন্তু হুবুহু একই।


বর্তমান বিজ্ঞানের ইতিহাস অ্যাকাডেমিয়ায় কোপারনিকাসের একাধিক মুসলিম বিজ্ঞানীদের থেকে নকল করার বিষয়টা সুসাব্যস্ত এবং এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহও নেই। স্যালিবা, নইগিবাউয়ার, সোয়ার্ডলো, হার্টনার, বার্কার আর অ্যারিউ, হুগোনার্ড-রশ, ওয়েস্টম্যান, কোহেন, চিচেস্টার এবং অন্যান্য সকল জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসবিদ (কিছু ইনট্রানসিজেন্ট মানুষ বাদে) একমত যে, কোপারনিকাস মুসলিম বিজ্ঞানীদের থেকে নকল করেছেন, আর মুসলিমদের থেকে নকল করা ছাড়া তার নিজের পক্ষে হিলিওসেন্ট্রিক মডেল উপস্থাপন করা একেবারেই অসম্ভব ছিল। These are probably coincidences বলার কোনোরকম সুযোগ এখানে নেই।


কোপারনিকাসের নকলের বিষয়টা সুসাব্যস্ত হওয়ার পর আর এভাবে প্রশ্ন করার অবকাশ নেই যে—‘যদি কোপারনিকাস নকল করে থাকেন’ বরং এখন প্রশ্ন হবে, ‘কোপারনিকাস কখন নকল করেছেন’ এবং ‘কীভাবে করেছেন’। এখন আমরা শেষোক্ত দুটি প্রশ্নের উত্তর নিয়েই কিছু আলোচনা করব। কারণ এটা একটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, ট্র্যান্সমিশন রুট ছাড়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে কাজ চলে না।


কোপারনিকাস গ্রিক আর ল্যাটিন পারতেন, কিন্তু তিনি আরবি পারতেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুতরাং তিনি সরাসরি আরবি থেকেই সে গবেষণাগুলো আহরণ করেছেন, এমন ধারণাও অগ্রহণযোগ্য। এক্ষেত্রে আমাদের কাছে কেবল কিছু সম্ভাবনাই আছে। ইতিহাসের প্রথম ওরিয়েন্টালিস্ট হচ্ছে, গুইয়াউম পোস্টেল। যিনি কোপারনিকাসের সময়কার, নাসিরউদ্দিন তুসির কাপলের প্রমাণসহ অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু কোপারনিকাসের সংস্পর্শে এসেছিলেন কিনা তার কোনো প্রমাণ নেই। রোমের ভ্যাটিকান লাইব্রেরিতে নাসিরউদ্দিন তুসির উপপাদ্য পাওয়া যেত। কতিপয় বিজ্ঞানের ঐতিহাসিকের মতে, কোপারনিকাসের সেখানে যাওয়া সম্ভব এবং হয়তোবা তেমনই ঘটেছে। আবার আন্দ্রেয়াস আল্পাগাস (আন্দ্রেয়া আল্পাগো) ১৫ বছর ধরে (অন্য মতে ৩০ বছর) সিরিয়ায় কাটিয়েছেন আরবি সায়েন্টিফিক টেক্সট অনুবাদ করার উদ্দেশ্যে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তার ইবনুশ শাতিরের ব্যাপারে জানার কথা। কারণ তাদের মধ্যে কেবল এক শতাব্দীরই দূরত্ব ছিল। তা ছাড়া এরও যথেষ্ট প্রমাণ আছে যে, কোপারনিকাসের সময় অসংখ্য আরব ইউরোপের বিভিন্ন শহরে উপস্থিত ছিলেন। ইতালিতেই নাসিরউদ্দিন তুসির কাপলের অসংখ্য পাণ্ডুলিপি সংগৃহিত আছে আর খুব স্বাভাবিকভাবেই সেগুলোর যেকোনো একটি কোপারনিকাস পেয়ে থাকতে পারেন। আবার তিনি পাদুয়ায় গিয়েছিলেন পড়ালেখা করতে, যেখানে ১৬শ শতকে অনেক অটোমান মুসলিম পড়ালেখা করত । যদিও কোপারনিকাসের গমনের সময়কালের সঙ্গে সে সময়কাল মিলে কিনা—তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তারপরও যদি দেখা হয়ে থাকে, তাদের কাছ থেকে জানতে পারাটাও স্বাভাবিক। এবং তাদের সাহায্যেই কোপারনিকাস সে গবেণষাগুলো অনুবাদ করিয়ে নিতে পারেন। এরচেয়েও বড় প্রমাণ যেটা পাওয়া যায়, কোপারনিকাস যখন ক্রাকো ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষারত ছিলেন, তখন অ্যালবার্ট ব্রাযিউস্কি সেখানে লেকচারার ছিলেন। ব্রাযিউস্কি নাসিরউদ্দিন তুসি আর ইবনুশ শাতিরের গাণিতিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করেছিলেন—যা পরবর্তীতে কোপারনিকাসের ব্যবহার করা প্রক্রিয়ার সাথে মিলে। হতে পারে, কোপারনিকাসের অধ্যয়নকালে ক্রাকো ইউনিভার্সিটিতে নাসিরউদ্দিন তুসি আর ইবনুশ শাতিরের কাজ পাওয়া যেত। আর ইবনুশ শাতিরের কাজ পাওয়ার সরল অর্থ হচ্ছে, আল-উর্দির কাজও পেয়ে যাওয়া। এমন হলে হিসাব-নিকাশ একেবারেই ক্লিয়ার। তবে এখানে আমরা দ্বিধাহীন যে স্বীকারোক্তি দিতে হয়, এ দুটি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আমাদের গবেষণা খুবই নিম্নমানের। এজন্যই তথ্য-উপাত্তের সংকটে ভুগছি আমরা। কিন্তু জর্জ স্যালিবা একদম নিশ্চিত যে, ভবিষ্যতের তিনি এর গবেষণা ট্র্যান্সমিশন রুট বের করে ছাড়বেন।


এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোপারনিকাসকে কি সরাসরি ‘নকলবাজ’ বলা উচিত? তিনি কি কষ্ট করেননি? তিনি কি গভির চিন্তাভাবনায় সময় ব্যয় করেননি? তিনি কি তখনকার সময়ে সেরা কাজ করেননি? তার মতো একজন মানুষকে কি ‘নকলবাজ’ বলে সরাসরি আক্রমণ করা উচিত? আমিও কোপারনিকাসের অনুরক্ত ছিলাম। ছোটবেলা যেমন জেনেছিলাম, নিজের জীবন বাজি রেখে কোপারনিকাস সত্য উদ্ঘাটন করেন, ‘ধর্মের অন্ধবিশ্বাস হেরে যায় বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের কাছে’। এই ধারণাই আমাদের নবম-দশম শ্রেণির ফিজিক্স পাঠ্যবইয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এখন আর কি করতে পারি, কোপারনিকাসের ক্ষেত্রে ‘কুম্ভিলক’ থেকে ভালো কোন শব্দ আমার জানা নেই। কোপারনিকাসের নকলের বিষয়টা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তারপরও কোপারনিকাস তার কাজে অনেক মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম নিয়েছেন, বিশেষ করে আল-বাত্তানির উপর নির্ভর করেছেন তিনি বেশি। সাথে দিয়ে আছেন সাবিত ইবনে কুররা, আজ-জারকালি, মাকরেজি, ইবনে রুশদ। এরা হচ্ছেন সেসব বিজ্ঞানী, যাদের জ্যোতির্বিদ্যা ইউরোপ জুড়ে পড়ানো হত। সুতরাং তাদের নাম লুকোনোর কিছু নেই। লুকোলে সহজেই ধরা খেতেন কোপারনিকাস। কারণ তাদের ব্যবহার করা ছাড়া অ্যাস্ট্রনমি করা সম্ভব ছিল না। সবাই এমনিতেই বুঝে যেত। কিন্তু মূল জায়গায়, যা কোপারনিকাস কে একজন স্মরণীয় বিজ্ঞানী করে রাখে। সে হিলিওসেন্ট্রিক মডেল—যার জন্য অনেক ঐতিহাসিক কোপারনিকাসকে আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার জনক, এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানের জনক পর্যন্ত বলেছেন, সে জায়গায় তিনি মুসলিম বিজ্ঞানীদের নামই নেননি। তো একে চৌর্যবৃত্তি না বলে আর উপায় আছে! আগে মুসলিমদের নাম নিয়েছেন, এতে সবাই মনে করছেন কোপারনিকাস সৎ। কিন্তু মূল জায়গায় গিয়ে দেখা গিয়েছে, পুরো গবেষণাটা নিজের বলেন চালিয়ে দিয়েছেন। মুসলিম বিজ্ঞানীদের নামই নেননি। বেচারা হয়তো কল্পনাও করেননি যে, ৪০০ বছর পরও এসব নিয়ে গবেষণা হবে! এমনকি প্রশংসা পাওয়ার লোভ, নিজের কাজকে অরজিনাল দেখানোর লোভ এত বেশি ছিল যে, তিনি স্বজাতির বিজ্ঞানীর নামও মুছে দিলেন।


পূর্বেকার সময়ের মাত্র দুজন বিজ্ঞানীর নাম জানা যায়, যারা হিলিওসেন্ট্রিক মডেলকে থিওরি হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। যারা হলেন সূত্রপাতকারী সামোস-এর অ্যারিস্টার্কাস আর তার অনুসরণকারী সিলিউসাস । কোপারনিকাস, অ্যারিস্টার্কাসের নাম তিনবার নিয়েছেন তার ডে রেভোলুশোনিবাস-এ, কিন্তু একবারও এটা উল্লেখ করেননি যে, অ্যারিস্টার্কাস অনেক আগে হিলিওসেন্ট্রিক মডেলে বিশ্বাসী ছিলেন। এখানে আগের মতো চালাক চৌর্যবৃত্তি। তিনি তার বইয়ে এমন কিছু গ্রিক ফিলোসফারের নাম নিয়েছেন—যারা হিলিওসেন্ট্রিক চিন্তা করেছিলেন। অনেকে বলেছে, এটা নাকি কোপারনিকাসের সত্যতা প্রমাণ করে! অথচ কোপারনিকাস তো যে হিলিওসেন্ট্রিক মডেলকে থিওরি আকারে উপস্থাপন করেছিলেন, সেখানে তার নামই মুছে দিয়েছেন, এখন শুধু সৎ হওয়ার ভান করে চোখে ধুলো দেওয়ার প্রচেষ্টা। তার পাণ্ডুলিপিতে উল্লেখিত ছিল অ্যারিস্টার্কাস এর হিলিওসেন্ট্রিক ধারণার কথা, কিন্তু যখন বই পাবলিশ হয়, তখন সেটা কোপারনিকাস মুছে দেন। আবার তার আগে কেন অ্যারিস্টার্কাস হিলিওসেন্ট্রিসিটির ধারণা করতে পারলেন, সেজন্য কোপারনিকাস অ্যারিস্টার্কাসের উপর বিরক্ত ছিলেন। বিখ্যাত লেখক ও ঐতিহাসিক জন ফ্রিলি তো সরাসরি বলেই বসেছেন যে, কোপারনিকাস এটি লুকিয়েছেন। যাতে তার নিজের কাজের ‘গুরুত্ব কমে না যায়’। এ থেকেই সহজের তার চৌর্যবৃত্তির মনোভাব উপলব্ধি করা যায়। যে ব্যক্তি ক্রেডিটের লোভে পড়ে স্বজাতির বিজ্ঞানীর নাম পর্যন্ত মুছে দেয়, সে একই ব্যক্তি যে অন্য জাতির বিজ্ঞানীর নাম রাখবে না—এটাও দিবালোকের মতো স্পষ্ট! তারপরও বেশিরভাগ (এ পর্যন্ত আমার দেখা সব) বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক কোপারনিকাসকে রেভোল্যুশোনারি সায়েন্টিস্ট বলে উল্লেখ করে থাকেন। এমনকি আমি যার বিশেষ অনুরক্ত, সে-ই জর্জ স্যালিবাও। সালাহউদ্দিন জাজাইরি-এর মতো মুসলিম বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা এমন অভিমত দিয়েছেন। তার মত ছিল কিছুটা এমন যে, ‘হ্যাঁ, কোপারনিকাসের সেরা কাজ মুসলিম বিজ্ঞানীদের জ্যোতির্বিদ্যার উপর ভিত্তি করা। কিন্তু তারা তো জিওসেন্ট্রিক মডেলের গীতই গাইছিলেন নাকি? সেসব প্রমাণ নিয়ে এসে হিলিওসেন্ট্রিক মডেলের মতো এত বড় একটা ডিসিশনে আসা তো বিশাল পদক্ষেপ’।


তাদের মতে, এই Gestalt switch একটা নতুনত্ব। কিন্তু লক্ষ্য করুন, হিলিওসেন্ট্রিক মডেল অ্যারিস্টার্কাসের কাজে ছিল, শুধু তার কাছে প্রমাণ ছিল না। প্রমাণ ইবনুশ শাতিরদের কাছে ছিল, কিন্তু তারা জিওসেন্ট্রিক মডেল ছাড়তে প্রস্তুত ছিলেন না। কোপারনিকাস জাস্ট দুটো জিনিস মিলিয়েছেন। অবশ্য এ দুটো মেলাতে গেলেও অনেক খাটতে হয় আর জ্যোতির্বিদ্যায় ভালো দক্ষতা থাকা লাগে। এখানে কোপারনিকাসের কৃতিত্ব হল, এ পুনঃচিন্তা যে হিলিওসেন্ট্রিক মডেলই আসলে ঠিক।


তবে প্রশংসা করতে হয় কোপারনিকাসের তথ্য বের করার প্রচেষ্টার আর তার সাহসের। মুসলিমদের কাজ এমন উৎস থেকে বের করেছেন, যা বর্তমানের বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা খুঁজে বের করতে পারছেন না। আর চার্চের ভয়ংকর মূর্তির সামনে সত্য উদ্ঘাটন করেছেন। এ কাজের জন্য তাকে ‘সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষদের একজন’ বলা যেতে পারে, কিন্তু ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন’ বলা—আমার মনে হয় না ঠিক। তার অন্যান্য কাজ থাকতে পারে, কিন্তু যে কাজের জন্য তার ভূয়সী প্রশংসা, যার জন্য তাকে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক পর্যন্ত বলা হয়, সে কাজ বড় কিছু না। তার রেজাল্ট অবশ্যই বিশাল, কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় কোপারনিকাস সেটা করেছেন, সেটা এত বড় কিছু নয়। হ্যাঁ, এটা করতে জ্যোতির্বিদ্যায় চরম দক্ষতা লাগে, কিন্তু সেটা তো অন্য সাধারণ অ্যাস্ট্রনমারও করতে পারতেন নাকি?


কোপারনিকাস তার কাজে পূর্বের অসংখ্য বিজ্ঞানী থেকে সাহায্য নিয়েছেন। যেমন, উপরে বলা মুসলিম বিজ্ঞানীরা, রেজিওমন্ট্যানাস, পিউরব্যাক, টলেমি ইত্যাদি। আর এটা একেবারেই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানের নিয়মই এটা। পূর্বের বিজ্ঞানীদের গবেষণার অনুসরণেই মূলত নতুন কিছুর আবির্ভাব হয়। কোনোকিছু আকাশ থেকে পড়ে না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেখানে, যেখানে কোপারনিকাস মুসলিমদের নাম নেননি, সেই মূল জায়গায়। সমস্যা সেখানে, যেখানে কোপারনিকাস, অ্যারিস্টার্কাস এর নাম মুছে দিয়েছেন। এটাই চৌর্যবৃত্তি। এবং এটাই ভয়ানকভাবে কোপারনিকাসকে কলঙ্কিত করেছে। কোপারনিকাস সিরিয়াস ট্যালেন্টেড মানুষ ছিলেন। আইনে ডক্টরেট করেছেন, প্র্যাক্টিস করতেন মেডিসিন আর বোম ফাটিয়েছেন অ্যাস্ট্রনমিতে! কোপারনিকাস একজন জিনিয়াস ছিলেন, তার কাজে বিভিন্নক্ষেত্রে অরিজিনালিটি অবশ্যই আছে, আছে গভীর চিন্তার ছাপ। কিন্তু তাকে (বিজ্ঞানী হিসেবে) যেভাবে উপরে তোলা হয়, তা আমার মতে কোনোভাবেই ঠিক নয়। তাকে সূর্যে পাঠানোর দরকার নেই, পৃথিবীর মাটিতে রাখাই বরং ভালো।


বর্তমান সময়ের বেশিরভাগ বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা কোপারনিকাসকে রেনেসাঁর প্রথম বিজ্ঞানী না, বরং মারাগা অ্যাস্ট্রোনমিকাল ট্র্যাডিশন এর অন্তিম বিজ্ঞানী বলে থাকেন। নাসিরউদ্দিন তুসি যে ধারা শুরু করেছিলেন, তার পরিসমাপ্তি ঘটান কোপারনিকাস। কোপারনিকাস মারাগা স্কুলের শেষ বিজ্ঞানী আর গ্যালিলেও বরং আধুনিক পিরিয়ডের প্রথম বিজ্ঞানী।


পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের ধারণা কোপারনিকাস এক মহাবিশাল কাজ করেছেন। চিত্রকর ইয়ান মাটেইকো তো ‘Copernicus’s Conversations with God’ নামে এক চিত্রই একে ফেলেছেন, এ ভেবে যে ঈশ্বরের সঙ্গে আলাপ ছাড়া এ গভীর তত্ত্ব বের করা অসম্ভব! যদি চিত্রকর সাহেব জানতে পারতেন যে মুসলিম বিজ্ঞানীদের থেকে নকল করে কোপারনিকাস তত্ত্বটি সাজিয়েছিলেন, তবে ইসলাম গ্রহণ করতেন নাকি?




......................


References:


১. Seyyed Hossain Nasr, Science and Civilization in Islam (ABC International Group, Inc. 2001)

২. George Saliba, Islamic Science and the Making of European Renaissance (The MIT Press, 2007) p. 196

৩. Salim T. S. al-Hassani (edt), 1001 Inventions: The Enduring Legacy of Muslim Civiliazation (4th Edition, ebook, 2017)

৪. George Saliba, Islamic Science op. cit. p. 199

৫. George Saliba, Islamic Science op. cit. 200; George Saliba. “Embedding Scientific Ideas as a Mode of Science Transmission” Muslim Heritage.

৬. George Saliba, Islamic Science op. cit. p. 205

৭. George Saliba, Islamic Science op. cit. p. 209

৮. Salim T. S. al-Hassani (edt), 1001 Inventions op. cit. loc. 4788

৯. Noel Swerdlow, "Astronomy in the Renaissance," in Christopher Walker (edt) Astronomy before the Telescope, (St. Martin's Press, 1996) pp. 187-230, p. 202.

১০. George Saliba, Islamic Science op. cit. p. 214

১১. George Saliba, Islamic Science op. cit. p. 217

১২. Howard R. Turner, Science in Medieval Islam: An Illustrated Introduction (University of Texas Press, 2006) p. 69

১৩. George Saliba, Islamic Science op. cit. p. 221

১৪. Jim al-Khalili, Pathfinders (Allen Lane, 2010) loc. 4297

১৫. Ekmeleddin Ihsanoglu. “The History of Scientific Interaction” muslimheritage.com

১৬. John Freely, Light from the East: How the Science of Medieval Islam Helped to Shape the Western World (I. B. Tauris, 2011) p. 172

১৭. John Freely, Before Galileo: The Birth of Modern Science in Medieval Europe (Overlook Duckworth, 2013) loc. 3022

১৮. George Saliba, Islamic Science op. cit. p. 220

১৯. Jim al-Khalili, Pathfinders op. cit. loc. 4089।

২০. John Freely, Light from the East op. cit. p. 178

২১. Jim al-Khalili, Pathfinders op. cit. loc. 4306

২২. John Freely, Light from the East op. cit. p. 179

২৩. S. E al-Djazairi, The Hidden Debt to Islamic Civilization (MSBN Books, 2018)

২৪. Jim al-Khalili, Pathfinders op. cit. loc. 4348


৩৩৬ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

আরমান ফিরমান। বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের ইতিহাস নিয়ে স্টাডি করেন। গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখতে ভালোবাসেন। মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিয়ে লেখা প্রথম বই গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হবে।

মন্তব্য

৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
বদরোদ্দজা শোয়াইব

বদরোদ্দজা শোয়াইব

০৩ অক্টোবর, ২০২০ - ০০:৩৬ পূর্বাহ্ন

অসাধারণ প্রবন্ধ। অমুসলিম দার্শনিকদের চৌর্যবৃত্তির ইতিহাস বলা চলে। তবে লেখকের উচিত ছিল, বিষয়গুলো আরও সহজ ও ব্যাখ্যা করে লেখা।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ali

ali

০৪ অক্টোবর, ২০২০ - ১৪:৪৩ অপরাহ্ন

brilliant!

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ফাহাদ আব্দুল্লাহ

ফাহাদ আব্দুল্লাহ

০৬ অক্টোবর, ২০২০ - ২০:৩৮ অপরাহ্ন

জাস্ট ওয়াও!

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...