করোনা ভাইরাস : বিপদ থেকেও যখন শেখা যায়

সবধরনের প্রশংসা জীবন ও মৃত্যুর মালিক—আল্লাহর জন্য। যিনি গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একচ্ছত্র অধিপতি। যার ক্ষমতার উপরে কারো ক্ষমতা নেই। যিনি সর্বদ্রষ্টা, মহাজ্ঞানী। সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ ও সালাম... যিনি ছিলেন জগতের সবকিছুর জন্য রহমত।


পুরো পৃথিবীজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আলোচনা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে করোনা ভাইরাস। আজকের আলোচনায় আমরা মূলত এ করোনা-সঙ্কট থেকে শিখতে পারি এমন ৭টি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। কারণ ঈমানদারদের দায়িত্ব ও করণীয় হচ্ছে, চারপাশের ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং সে শিক্ষার আলোকে সতর্ক হয়ে নিজেদের জীবনকে পরিচালনা করা।


প্রথম শিক্ষা

চলমান এ সঙ্কট থেকে আমরা সর্বপ্রথম বিনয় ও নম্রতার শিক্ষা পাই। এই মহামারি যেন পুরো পৃথিবীকে আরেকবার জানিয়ে দিচ্ছে—আমরা অক্ষম, কোনো শক্তিই আমাদের নেই। সবধরনের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর জন্য। কোনো মানুষের হাতেই বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই। পৃথিবীর সাতশ কোটি মানুষের এমন একজেনও নেই, যে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রতিটি মানুষই মহাক্ষমতার অধিকারী সত্তার নিয়ন্ত্রণাধীন।

করোনা ভাইরাসের প্রভাব নিয়ে একটু ভাবুন। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনবহুল দেশ চীন এবং মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাবান রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সকল উন্নত ও অনুন্নত দেশ এই ভাইরাসের আক্রমণে এখন দিশেহারা। এত ক্ষমতা, এত বিত্ত আর এত প্রাচুর্য থাকার পরও এই দেশগুলো যে ভাইরাসের ভয়ে কাবু হয়ে আছে সেই ভাইরাসটি কিন্তু আয়তনে খুবই ক্ষুদ্র। এতটাই ক্ষুদ্র যে, বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাসটিকে দেখে বুঝতেই পারেন না, আদৌ এটি জীবিত নাকি জীবন্মৃত। আর ভাইরাসটির আয়তন অন্য যেকোনো সৃষ্টির তুলনায় অনেক বেশি ছোট। ভাইরাসটির দৈর্ঘ্য ২০ থেকে ৩০ ন্যানোমিটার। খালি চোখে দেখা তো দূরের কথা, সাধারণ মানের মাইক্রোস্কোপ দিয়েও এ ভাইরাসটি দেখা যায় না। এই ভাইরাসটি ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের বিকল্প কিছু দিয়ে দেখাও যায় না।


এ ভাইরাসটিকে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে দেখতে হলেও এর আকৃতিকে কমপক্ষে এক লক্ষ গুণ বাড়িয়ে নিয়ে তারপর দেখতে হয়। একটি চালের দানাকে যদি আমরা এভাবে লাখ গুণ বাড়িয়ে চিন্তা করি তাহলে তা রীতিমতো চার-পাঁচটি ফুটবল খেলার মাঠের আকৃতি দখল করবে। তাহলে বুঝুন, ভাইরাসটির আকৃতিকে কতটা বাড়ানোর পর তা মানুষের দর্শন ক্ষমতার আওতায় আসে। রীতিমতো অবিশ্বাস্য। অথচ এই অবিশ্বাস্য রকমের ক্ষুদ্র ভাইরাসটির আতঙ্কে গোটা বিশ্ব আতঙ্কিত। আর মানুষের এই অসহায়ত্ব প্রমাণ করে যে, একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। একজন রব আছেন। যিনি সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করছেন। আবারও প্রমাণ হলো, বিজ্ঞানের এত এত অগ্রগতি, প্রযুক্তির এত রকমের উৎকর্ষ সাধনের পরও অন্য কারো জীবন নিয়ন্ত্রণ করা তো অনেক দূরের কথা, আমরা নিজের জীবনের গতিপথকেই নিয়ন্ত্রণে অক্ষম। তাই করোনা ভাইরাস আমাদেরকে বার্তা দিচ্ছে, এই বিশ্বজগতের অসীম ক্ষমতার মালিক মহান প্রভুর কাছেই নত হতে হবে; সবাইকেই।


দ্বিতীয় শিক্ষা

জীবন যেমন সত্য, মৃত্যুও ঠিক তেমনিভাবেই সত্য—দ্বিতীয় ধাপে করোনাভাইরাস থেকে আমরা এটাই শিক্ষা নিতে পারি। কারণ, দুনিয়াবি ব্যস্ততায় আমরা যেন মৃত্যুকে বেমালুম ভুলে বসে থাকি। আমরা এমনভাবে জীবনকে উপভোগ করি, এমনভাবে পরিকল্পনা করি যেন মৃত্যু কখনোই আমাদেরকে স্পর্শ করবে না। অথচ এই করোনা ভাইরাস আমাদেরকে জানাচ্ছে, কোনো মানুষকেই অমরত্ব দান করা হয়নি। প্রতিটি প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ পেতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমরা মৃত্যু সমন্ধে না ভাবলেই মৃত্যু আমাদের কাছে আসবে না, এমনটা মনে করাটাও হাস্যকর। আল্লাহ আমাদেরকে জীবন দিয়েছেন এবং তিনিই আমাদেরকে মৃত্যু দান করবেন।


চারপাশে যখন করোনার মতো মহামারি আসে, পত্রপত্রিকা টিভি খুললেই যখন আমরা মৃত্যুর খবর পাই, তখন আমাদের আবার যেন মনে পড়ে যে, মৃত্যু থেকে পালিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হতে হতে যাদের অন্তর শক্ত হয়ে গেছে সেই অন্তরগুলো এই জাতীয় মহামারি দেখলে আবার কোমল হয়ে উঠতে পারে। আমাদের যাদের মন সব সময় দুনিয়া নিয়েই মশগুল থাকে, এই মহামারি সেই মনগুলোতে আখেরাতের চিন্তা প্রবেশ করিয়ে দেবে। আর যদি এই জাতীয় মহামারিতে আমাদের হৃদয় ও অন্তর আখেরাতমুখী হয়, তাহলে করোনা আমাদের জন্য গজব হবে না, বরং নেয়ামত হিসেবে গন্য হবে। আমার তখন আবার বুঝবো, দুনিয়া খুবই ক্ষনস্থায়ী, মৃত্যুই হলো চূড়ান্ত বাস্তবতা। আর আমরা কেউই জানি না, কখন কোন মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য মৃত্যুর ক্ষণকে নির্ধারণ করে রেখেছেন। এজন্যই হজরত আবু বকর রাদি. বলতেন, ‘প্রতিদিন সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙে আমি বুঝতে পারি, আমি মৃত্যুর আরো কাছে চলে গেলাম।’


তৃতীয় শিক্ষা

তৃতীয় যে শিক্ষা আমরা করোনা ভাইরাস সঙ্কট থেকে পাই তা হলো, কিছু মানুষ অন্য সবার থেকে আলাদা—এই প্রচলিত ধারণার আসলে কোনো ভিত্তি নেই। কারণ বাস্তবতা হচ্ছে, এই ভাইরাস প্রতিটি মানুষকেই সমানভাবে আক্রমণ করছে। জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, মানুষে মানুষে ভেদাভেদের মত যত ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে আমরা পড়ে আছি। করোনা সেই ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। অমুক দেশ সেরা, তমুক দেশ সবচেয়ে বেশি উন্নত- এই ধারনাকে করোনা ইতোমধ্যেই গুড়িয়ে দিয়েছে। ধনী গরিব, শাসক, শাসিত, সাদা, কালো—নির্বিচারে সকলেই একইভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক দেশের প্রধানমন্ত্রী, এমপি, মন্ত্রী, বড় বড় ব্যবসায়ী এরই মধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। ডিগ্রি, উন্নত পাসপোর্ট বা সমৃদ্ধ ব্যাংক ব্যালেন্স কাউকেই ভাইরাসের আক্রমন থেকে রক্ষা করতে পারছে না।

আমরা সবাই এক আদমের সন্তান। আল্লাহ সব মানুষকে একই রক্তকণিকা দিয়ে, মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। কাউকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে আলাদা রাখার আর কাউকে গরিব দেশের বলে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। করোনা ভাইরাস সবাইকেই এক কাতারে নিয়ে এসেছে। সবাইকেই একই উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় ফেলে দিয়েছে। মানুষের যে সর্বজনীনতা, এক পিতার সন্তান হিসেবে মানুষকে আল্লাহ যেভাবে সৃষ্টি করেছেন এই ভাইরাস যেন তা আবার প্রমাণ করছে। জ্ঞানপাপী আর মিথ্যা অহংকারীদের চোখে আঙুল দিয়ে করোনা ভাইরাস যেন সত্যকে নতুন করে প্রমাণ করে দিয়েছে। ইসলাম সর্বদাই বলে— দুনিয়ায় মানুষ যতই অহেতুক ভেদাভেদে লিপ্ত থাকুক না কেন আল্লাহর কাছে সবাই সমান। আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি তাকওয়া। তাকওয়ার ভিত্তিতেই তিনি মানুষের মান বিচার করেন। এর বাইরে দুনিয়াবি অন্য কোনো যোগ্যতার কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই।


একটি গল্প বলি। ইতিহাসের বইতে এই গল্পটি পাওয়া যায়, যদিও গল্পটির সত্যতা কতটুকু তা জানা নেই।

একবার এক জালেম শাসক জনৈক আলেমকে নির্যাতন করার জন্য তার দরবারে নিয়ে আসলো। জালেম শাসকটি আলেমকে বাজেভাবে অপমান করে যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় একটি মাছি বার বার ঐ শাসকের সামনে দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। ফলে সে প্রচন্ড বিরক্তিবোধ করছিলো। তখন সেই শাসক আলেমকে প্রশ্ন করলো, তুমি তো অনেক কিছু জানো। বলোতো, আল্লাহ কেন মাছির মতো এই বিরক্তিকর প্রাণীটিকে সৃষ্টি করলো? তখন আলেম ব্যক্তি উত্তর দিলেন, তোমার মতো অহংকারী ও ঔদ্ধত শাসকও একটি ছোট্ট মাছির কাছে কতটা অসহায়, তা প্রমাণ করার জন্যই আল্লাহ মাছির মতো ছোট ছোট কীটপতঙ্গ সৃষ্টি করেছেন।


চতুর্থ শিক্ষা

এই মহামারি থেকে লাভ করা চতুর্থ শিক্ষা—এই দুনিয়া, এর যাবতীয় সম্পদ, প্রাচুর্য ও ক্ষমতা; এসবের কোনোটাই সফলতার মানদন্ড নয়। কেননা, এমনও হতে পারে, নেককার ভালো মানুষগুলো করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন। আবার পাপিষ্ঠও এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বেঁচে যেতে পারে। আর এতেই প্রমাণ হয় যে, এই দুনিয়া সব কিছুর চূড়ান্ত ফয়সালা নয়। এর বাইরেও হিসেব-নিকেশের জায়গা আছে। নিষ্পাপ শিশু যেমন এই রোগে মারা যেতে পারে, তেমনি জালেম ব্যক্তিও বেঁচে যেতে পারেন। তাই, আল্লাহ কাউকে দুনিয়া থেকে বঞ্চিত করলেই আল্লাহ তার ওপর নাখোশ হয়ে আছেন, এমনটা বলা যাবে না। আবার কেউ যদি দুনিয়াবী নিয়ামাত লাভ করে, তার ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট... তাও ধরে নেওয়া যাবে না।

আল্লাহ তার প্রিয় কিংবা অপ্রিয়—যেকোনো মানুষকেই দুনিয়ায় স্বস্তি দিতে পারেন। আবার অনেক নেককার বা পাপী বান্দার কাছ থেকেও দুনিয়াকে কেড়ে নিতে পারেন। তাই দুনিয়াতে কে কী পেলো বা পেলো না, তা সফলতার মাপকাঠি নয়। চূড়ান্ত সফলতা নির্ধারিত হবে আখেরাতে। আল্লাহ বলেন,

আর তোমরা এমন ফ্যাসাদ থেকে বেঁচে থাক যা শুধু জালেমদের ওপরই তা পতিত হবে না, অন্য সবাইও এর শিকার হতে পারে। জেনে রেখ যে, আল্লাহর আযাব অত্যন্ত কঠোর। (সূরা আনফাল : আয়াত ২৫)


তাই কোনো বিপর্যয়ের মুখে পড়লেই আল্লাহ আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন- এমনটা বলা যাবেনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্লেগ বা এজাতীয় মহামারিগুলো শুধু আজাব নয়, কিছু বান্দার জন্য তা রহমতেরও কারণ হয়।’ অর্থাৎ এ পৃথিবীর বিপর্যয় বা পরীক্ষাগুলো যেমন শাস্তি হতে পারে তেমনি নেয়ামতও হতে পারে। সুস্বাস্থ্য নিঃসন্দেহে নেয়ামত। একই ভাবে টাকা পয়সাও নেয়ামত। আবার ঠিকমতো কাজে না লাগালে এগুলো শাস্তির কারনও হয়ে যায়। তাই দুনিয়ার প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তি কোনোদিনই সফলতার মানদন্ড হতে পারে না।


পঞ্চম শিক্ষা

পঞ্চম যে শিক্ষা আমরা পাই তা খুবই প্রাসঙ্গিক। এ মহামারির কারণে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক মানুষগুলো নতুন করে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয় স্বজনের গুরুত্ব অনুধাবন করবে। অসুস্থ ব্যক্তির পাশে সর্বপ্রথম তার পরিবারই এসে দাঁড়ায়। আমরা তো আজকাল শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকি। এটা ইসলামের শিক্ষা নয়। কোনো সভ্য সমাজই এমন মানসিকতা সমর্থন করে না। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরের ভালোবাসার যেমন দরকার ঠিক তেমনি আবার অপরের কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ারও প্রয়োজন আছে। করোনা ভাইরাস একটি সুন্দর পরিবার, সুন্দর সমাজ, দায়িত্ববান সরকার ও প্রশাসনের গুরুত্বকে যেন নতুন করে প্রতিষ্ঠা করে।


ইসলাম পূর্ব আরব ছিল জাহিলিয়াতে আচ্ছন্ন। ইসলাম এসে সেখানে সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করে। আরব থেকে মধ্য এশিয়া, চায়না থেকে আন্দালুস হয়ে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত ইসলামের আলোক শিখা ছড়িয়ে পড়েছিল। এর কারণ ইসলাম মানুষকে শুধু ধর্মকর্মই শেখায়নি, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা ও একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোও নির্মাণ করে দেখিয়েছে। ইসলাম বিশ্বকে খোলাফায়ে রাশেদার মতো শাসন উপহার দিয়েছে। রাষ্ট্রব্যবস্থায় চেক এন্ড ব্যালেন্স কীভাবে করতে হয় তাও শিখিয়েছে ইসলাম। এই মহামারি যেন মুসলিম সংহতি, একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থাএবং বিশ্বনীতির প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে আবার আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে।


ষষ্ঠ শিক্ষা

করোনা সঙ্কট থেকে ষষ্ঠ শিক্ষা আমরা তাকদির সম্পর্কে পাই। যার বাস্তবতা অনেকেই অস্বীকার করে থাকে। কিন্তু তাকদিরে বিশ্বাস রাখা ইসলামের মৌলিক দাবি। খেয়াল করে দেখুন, কেন অমুক দেশ আক্রান্ত হচ্ছে, আপনি কেন নয়? কেন আপনার পাশের মানুষটি আক্রান্ত হচ্ছে কিন্তু আপনি সুস্থ আছেন? এই বিষয়গুলো কোনো তামাশা বা খাম খেয়ালীর বিষয় নয়। একজন মানুষ সব ধরনের সতর্কতা নিয়ে, মাস্ক পড়ে, দিনের মধ্যে শতবার হাত সাবান দিয়ে ধুয়েও করোনায় আক্রান্ত হতে পারে। আবার আরেকজন মানুষ করোনা আক্রান্ত শহরের মাঝখান দিয়ে অসতর্কভাবে হেটেও নিরাপদ থাকতে পারে। আল্লাহ বলেন,

পৃথিবীতে এবং তোমাদের নিজেদের ওপর কোন বিপদ আসে না; যা সংঘটিত করার পূর্বেই আমি কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। (সূরা হাদিদ : আয়াত ২২)

এর মানে এই নয় যে, আমার সতর্কতা গ্রহণ করবো না। আমরা সবই করবো। কিন্তু ভাগ্য নির্ধারণের বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবো। আমরা আল্লাহর কাছে দুআ করবো। নিজেদের ও দেশ ও জাতির হেদায়েত কামনা করবো। কেননা, দুআ হলো বিশ্বাসীদের হাতিয়ার যার মাধ্যমে কদরের পরিবর্তন করা যায়।


আমওয়াসের প্লেগ সম্পর্কে একটি বিবরণী সিরাত গ্রন্থগুলো থেকে পাওয়া যায়। একদিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদি. সিরিয়ার দিকে যাত্রা করলেন। যখন তিনি সউদি ও সিরিয়ার সীমান্তবর্তী একটি এলাকায় পৌঁছলেন, তখন তাঁর সাথে সৈন্যবাহিনীর প্রধান আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাদি. ও তাঁর সাথীগণ সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা তাকে জানান যে, সিরিয়ায় (প্লেগ) মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ইবনে আব্বাস রাদি. বলেন, তখন উমর রাদি. আমাকে বললেন, আমার কাছে প্রাথমিক পর্যায়ে যারা হিজরত করেছিলেন, সেই মুহাজিরদেরকে ডেকে আন। আমি তাদেরকে ডেকে আনলাম। উমর রাদি. তাদেরকে সিরিয়ায় চলমান মহামারির কথা জানিয়ে তাদের কাছে সুপরামর্শ চাইলেন। তখন তাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়ে গেল। কেউ বললেন, আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বের হয়েছেন। তাই তা থেকে ফিরে আসা ঠিক হবে না। আবার কেউ কেউ বললেন, আপনার সাথে রয়েছেন অবশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও নবীজির সাহাবিগণ। কাজেই আমাদের কাছে ভাল মনে হয় না যে, আপনি তাদেরকে এই মহামারির মধ্যে ঠেলে দেবেন।


উমর রাদি. বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে উঠে যাও। তারপর তিনি বললেন, আমার নিকট আনসারদেরকে ডেকে আন। সুতরাং আমি তাদেরকে ডেকে আনলাম এবং তিনি তাদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। কিন্তু তারাও মুহাজিরদের পথ অবলম্বন করলেন এবং তাদের মতো তারাও মতভেদ করলেন। সুতরাং উমর রাদি. বললেন, তোমরা আমার নিকট থেকে উঠে যাও। তারপর আমাকে বললেন, এখানে যে সকল বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবি আছেন, তাদেরকে ডেকে আন।

আমি তাদেরকে ডেকে আনলাম। তখন তারা পরস্পরে কোন মতবিরোধ করলেন না। তারা বললেন, আমাদের রায় হল, আপনি লোকজনকে নিয়ে ফিরে যান এবং তাদেরকে এই মহামারির কবলে ঠেলে দেবেন না। তখন উমর রাদি. লোকজনের মধ্যে ঘোষণা দিলেন যে, আমরা ভোরে প্রত্যাবর্তনের জন্য রওনা হব। আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাদি. বললেন, আপনি কি তাকদির থেকে পলায়ন করার জন্য ফিরে যাচ্ছেন? উমর রাদি. বললেন, হে আবু উবাইদাহ! যদি তুমি ছাড়া অন্য কেউ কথাটি বলত... তারপর হযরত উমর বললেন, হ্যাঁ... আমরা আল্লাহর তাকদির থেকে বের হয়ে আবার আল্লাহর তাকদিরের দিকেই ফিরে যাচ্ছি।

তার মানে কেউ যদি কোথাও থেকে সুস্থ হয় বা অসুস্থ হয় কিংবা সেখান থেকে বাঁচার জন্য অন্য কোথাও যায় আর সেখানেও যদি অসুস্থ হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে, এটাই তার নিয়তি ছিল। আবার তাকদির মানে এমনটাও নয় যে, আমরা সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থা নিব না। বরং তাকদির মানে হচ্ছে, সব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও আমরা আল্লাহর ওপরই পূর্ণ ভরসা রাখব। সূরা তাওবাহর এই আয়াতে আল্লাহ বলেন,

‘আপনি বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য রেখেছেন তা ঠিকই আসবে আর যা রাখেন নি তা আমাদের কাছে কখনোই পৌঁছবে না। তিনি আমাদের কার্যনির্বাহক। আল্লাহর ওপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।’ (সূরা তাওবাহ : আয়াত ৫১)

তাই করোনার এই সঙ্কট থেকে আমাদের এই শিক্ষাই নেওয়া উচিত যে, নিয়তির ওপর আমাদের আস্থা ও ভরসা আরো অনেক বাড়াতে হবে।


সপ্তম শিক্ষা

সর্বশেষ যে শিক্ষাটির কথা বলব, তা শুধু করোনা নয়, বরং এ জাতীয় বৈশ্বিক যেকোনো মহামারির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সেই শিক্ষাটি হলো, যেকোনো মূল্যে আমাদের ঈমানকে আবার ঝালাই করে নিতে হবে। আল্লাহর কাছে আমাদেরকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে, ফিরে যেতে হবে—এই বোধটিকে আবার জাগ্রত করতে হবে। এ ধরনের মরণঘাতী রোগের একটি সাধারণ ইতিবাচক প্রভাব হলো, যারা অধার্মিক বা নাস্তিক, তারাও এ জাতীয় দুযোর্গে ধর্মপরায়ণ হয়ে যায়। আর আল কুরআনে আল্লাহ বেশ কয়েকটি আয়াতে বলেছেন, যখুনি তিনি মানুষের ওপর দুর্যোগ নাজিল করেন, তাদেরকে সংকটে ও উদ্বেগে অবতীর্ণ করেন, তখনই মানুষ তাঁকে স্মরণ করে। মনে রাখবেন, দুর্যোগে বা বিপদে পড়ে যখন মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে বা আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, আল্লাহ কখনোই এ জাতীয় প্রত্যাবর্তনকে নিয়ে নিন্দা করেন না। বরং আল্লাহ সমালোচনা করেছেন এই বলে যে, মানুষ বিপদে পড়লে আমাকে স্মরণ করে কিন্তু যখন বিপদ কেটে যায় তখন সে আবার আমাকে ভুলে যায়। একজনের বিপদের মুহূর্তে অন্যজন যখন সাহায্য করে, পরবর্তীতে সাহায্যকারী ব্যক্তি তার সাহায্যের খোঁটা দিয়ে বসে—এটা মানুষের বৈশিষ্ট্য কিন্তু এটা আল্লাহর ফিতরাত নয়।


তাই বিপদের সময় আল্লাহকে ডাকা বা ঈমানকে সংহত করার মধ্যে কোনো দোষ নেই। বরং সত্যি কথা হলো, এমনটাই হওয়া উচিত। এটাই মুমিন ও মুসলিমদের দায়িত্ব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো সংকটে পড়তেন তখনি তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। নামাজকে দীর্ঘ করতেন। তাহাজ্জুদ পড়তেন। এটাই আমাদের দায়িত্ব। আমি বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকছি—এমনটা ভেবে অপরাধবোধে ভুগবেন না। অপরাধবোধ আপনার তখন হওয়া উচিত, যদি বিপদ কেটে গেলে আপনি আবার আল্লাহকে ভুলে দুনিয়াদারিতে ব্যস্ত হয়ে যান।


তাই এ জাতীয় বিপদের সময় নামাজ ও দুআর পরিমান বাড়ানো উচিত। আর যদি এ সঙ্কট কেটে যায়, আমরা যদি এরপরও বেঁচে থাকি, তাহলে কখনোই যেন আমরা আল্লাহকে ভুলে না যাই। বরং আল্লাহকে আমরা শুকরিয়া জানাবো, তাঁর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ হবো কেননা এত বড় বিপদের পরও তিনি আমাদেরকে হেফাজত করেছেন।

এই জাতীয় ফিতনা ও বিপর্যয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদেরকে সতর্ক করা যাতে আমরা সময় ফুরানোর আগে আল্লাহর কাছে ফিরে আসি। আল্লাহ আমাদেরকে ছোট ছোট বিপদ দিয়ে সতর্ক করেন যাতে আমরা বড় বিপর্যয় তথা জাহান্নামের আগুন থেকে আমরা নিজেদেরকে মুক্ত রাখতে পারি। আল্লাহ কুরআনে জানিয়েছেন, ‘বান্দাকে শাস্তি দিয়ে তাঁর কোনো লাভ নেই।’


সুতরাং এটা নিশ্চিত যে, এ ধরণের বিপদ-বিপর্যয় পাঠানোতে আল্লাহর কোনো ফায়দা নেই। বরং এ সমস্ত সঙ্কট আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা। কারণ আল্লাহ আমাদেরকে ভালোবাসেন। তিনি চান, আমরা সত্য পথে ফিরে যাই। তাঁর নির্দেশিত সীরাতুল মুস্তাক্বীমের পথে চলি, হালাল কাজ করি, হারাম কাজ থেকে বিরত রাখি। হালাল খাবার খাই। হালাল পথে আয় করি। নামাজ ও দুআর পরিমান বৃদ্ধি করি। আল্লাহর কাছে নিজেদের অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাই। তাওবাহ করি। অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি থেকে নিজেদেরকে সংযত রাখি।


আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সবাইকে এই মহামারি থেকে হেফাজতে থাকার তাওফিক দেন। আল্লাহর পাঠানো এই পরীক্ষা থেকে সতর্ক হয়ে ভবিষ্যতের জীবনকে ইতিবাচকভাবে গঠন করার সামর্থ্য দিন। আমিন।


৫৪০ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

ড. ইয়াসির ক্বাদির জন্ম আমেরিকার টেক্সাসে ১৯৭৫ সালে। হুস্টন ইউনিভার্সিটিতে প্রথমে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ওপর বিএসসি করেছেন। মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ১৯৯৬ সালে। প্রথমে হাদিস ও ইসলামি শাস্ত্র অনুষদ থেকে আরবি ভাষার ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন সেখানে। পরে দাওয়াহ অনুষদ থেকে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। আমেরিকায় ফিরে ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে ধর্মতত্ত্বে পিএইচডি করেন। ২০০১ সাল থেকে তিনি আল-মাগরিব ইন্সটিটিউট-এর অ্যাকাডেমিক বিভাগের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া অধ্যাপনা করেছেন টেনিসির রোডস কলেজের ধর্মশিক্ষা বিভাগে। ২০১১ সালে দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন-এর এক নিবন্ধে অ্যান্ডি এলিয়ট...

অনুবাদক পরিচিতি

তাকদিরের ওপর ভরসা করে জীবন ধারণ করা আল্লাহর এক বান্দা। ছোট্ট এ জীবনে নিজের সম্পর্কে বলার মতো কিছু নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। থাকাটা বরং অস্বাভাবিক মনে হয়।

মন্তব্য

২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
আসাদ পারভেজ

আসাদ পারভেজ

২৩ মার্চ, ২০২০ - ২২:১৭ অপরাহ্ন

সকালে একবার এবং রাতে একবার পড়েছি।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
এডমিন

এডমিন Admin

২৩ মার্চ, ২০২০ - ২২:০১ অপরাহ্ন

মাশাআল্লাহ

Mohammad Mizanur Rahman Mitoo

Mohammad Mizanur Rahman Mitoo

০৪ মে, ২০২০ - ১২:৫৯ অপরাহ্ন

Lekhati pore manosikotar poriborton aslo

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...