নবীজির দিনরাত

মাইকেল এইচ হার্ট তাঁর The 100 : A Ranking of the Most Influential Persons in History বইয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে লিখেছেন—

“My choice of Muhammad to lead the list of the world’s most influential persons may surprise some readers and may be questioned by others, but he was the only man in history who was supremely successful on both the religious and secular levels.”

‘পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেওয়া মানুষগুলোর মধ্যে আমার চোখে সেরা নেতা হচ্ছেন—মুহাম্মাদ। আমার এই অবস্থান দেখে হয়তো আপনি ভ্রু কুঁচকাবেন, হয়তো অনেকে এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন। কিন্তু সত্য এটাই। ধর্ম ও জাগতিক—উভয় দিকে সবচেয়ে সফল কম্বিনেশন করেছেন তিনি।’

ইতিহাসের মহান আদর্শ ও সর্বোত্তম চরিত্রের ধারক আমাদের নবিজি। এবং খুব সম্ভবত সবচেয়ে ‘মিসকোটেড’ ব্যক্তিত্বও তিনি। পৃথিবীর তাবৎ বিপ্লবীদের ব্যাপারে স্টিভ জবসের একটা অবজার্ভেশন আছে—

“You can quote them, disagree with them, glorify or vilify them. About the only thing you can’t do is ignore them. Because they changed things. They pushed the human race forward.”

‘আপনি তাদের উদ্ধৃত করতে পারবেন, তাদের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারবেন, তাদের মহামান্বিত কিংবা নিন্দা করতে পারবেন। কেবল তাদের উপেক্ষা করতে পারবেন না। কারণ, তারা পরিস্থিতি ও কাঠামো বদলে দিয়েছিল। ক্ষয়িষ্ণু পশ্চাদগামী মানব সভ্যতাকে দিয়েছেন এক নতুন আবে-হায়াত।’

নবিজির বিপ্লবী জীবনের সাথে এই কথাগুলো একেবারেই প্রাসঙ্গিক—এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমাদের নবিজির পুরো জীবন সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি প্রতিটি মুহূর্তও। পুরো পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি অনুসারী মুসলমান তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে সদা তৎপর। মানুষের জন্য তিনি উসওয়াতুন হাসানা। মহান আদর্শ। তিনিই আমাদের ‘আইডল ও হিরো’। শয়নে-স্বপনে, আধো জাগরণে—প্রায় সবক্ষেত্রেই তিনিই আমাদের পারফেক্ট মডেল। কিন্তু আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁর জীবনঘনিষ্ট শিক্ষা যত ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত ছিল, আদতে তার ধারেকাছেও কিছু হচ্ছে না।

নবিজি জীবনের সর্বোত্তম ব্যবহার The best version of life নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্ত যারা নিজেদের তাঁর অনুসারী বলে দাবি করেন, বাস্তবে তারা খুব কমই তাকে ধারণ করতে পারছেন। আমরা এই আর্টিকেল একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে অনুবাদ করছি। এই আর্টিকেল মূলত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৈনন্দিন রুটিন। এই রুটিনকে আমরা আপনাদের জন্য ‘দৈনন্দিন গাইডলাইন’ হিসেবে উপস্থাপন করছি। এখানে আপনি কেবল নবি-জীবনের সাথে আপনার জীবনের সৌন্দর্য ও সাযুজ্যতাই খুঁজে পাবেন না, পাশাপাশি একটি আদর্শময় জীবন গড়ে তোলার অভ্যাস ও রুটিনের ব্লুপ্রিন্ট পাবেন। আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও সামাজিক উৎকৃষ্টতার উপাত্তও খুঁজে পাবেন।

পবিত্র কুরআনে এই নির্দেশনাই দেওয়া হয়েছে—

‘তোমাদের জন্য রাসুলের জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ [সুরা আহজাব, আয়াত : ২১]


১৪০০ বছর আগের একজনের লাইফস্টাইল কেন অনুসরণ করব?

দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস ও রুটিনই জানিয়ে দেয়, আমরা জীবনের মূল্যবান সময়গুলোর সঠিক ব্যবহার করতে পারছি কি না। এখন চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, আমাদের দৈনন্দি জীবনের সাথে খাপ খায়—এমন একটি রুটিন নিশ্চিত করা। এমন রুটিন তৈরি করতে হবে, যা আমাদের একটি অর্থবহ ও প্রভাবশালী জীবনের দিকে নিয়ে যাবে। কারণ দিনশেষে আমরা সকলেই সফল হতে চাই এবং ব্যর্থতাকে জীবন থেকে মুছে ফেলতে চাই।

প্রশ্ন হলো—এসব অভ্যাস ও রুটিন আদতে কী? আর কোনটিই আমাদের প্রোডাক্টিভ ও অর্থবহ জীবনের নিশ্চয়তা দিবে?

সাধারণভাবে সহজ উত্তর হলো—সমকালীন সফল মানুষদের অভ্যাস ও রুটিন হুবহু কপি করা। গুগলে গিয়ে টাইপ করুন—Habits of successful people। আপনি তখন সহস্র ডকোমেন্টস পাবেন। অসংখ্য নিবন্ধ, বই ও ব্লগ খুঁজে পাবেন, যেখান থেকে সফল মানুষদের অভ্যাস ও রুটিন কী ছিল—তা বোঝা যায়; যেগুলো আমরা করি না বা করতে পারি না। কিন্তু এক্ষেত্রে তিনটি সমস্যা দেখা যায়—

• আংশিক সত্যতা : আমরা শুধুমাত্র তাদের জীবনের ‘প্রকাশিত’ অংশগুলোর খবর পাই। তাদের ব্যক্তিসত্তার সামগ্রিক আবহ আমাদের কাছে অস্পষ্ট থাকে।

• এককেন্দ্রিকতা : তাদের জীবনের ‘প্রকাশিত’ কাজের খতিয়ান ছাড়া সামাজিক-আধ্যাত্মিক বয়ান খুবই কম দেখা যায়।

Most modern-day successful people have had a “leg-up” on the social ladder and are starting off from a solid socio-economic base or live in centers of civilization that allow them opportunities to prosper. Think of all the successful Silicon Valley entrepreneurs, it’s hard to imagine some of them succeeding at the scale they did if they started from the slums of an impoverished nation.

• দ্য ওয়ান পারসেন্ট : আধুনিক যুগে সফলতার অন্যতম পূর্বশর্ত আর্থ-সামাজিক ভিত্তি।


আরেকটা পূর্বশর্ত হচ্ছে—আপনাকে সভ্যতার মধ্যবিন্দুতে অবস্থান করতে হবে, যেন সম্ভাব্য সব উপায়-উপকরণের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেন। সিলিকন ভ্যালির উদ্যোক্তাদের কথাই চিন্তা করে দেখুন না। তারা যদি দরিদ্র কোনো দেশে জন্ম নিয়ে কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিত, তাহলে কী এভাবে সফল হতে পারত? এগুলো ব্যক্তির সফলতার ক্ষেত্রে মইয়ের একেকটি ধাপের মতো। বিপরীতে মধ্যবিন্দুতে অবস্থান করা এলাকার বাইরে প্রান্তিক এলাকায় যার অবস্থান অথবা বস্তিবাসী দরিদ্রদের মাঝে যার অবস্থান, সার্ভে করলে সেখানে সফল কাউকে খুঁজে পেতে মাইক্রোস্কোপ লাগবে।

এসব প্যারামিটারের ঠিক বিপরীত প্রান্তে আমাদের নবিজির অবস্থান ঠিক এ রকম—

• জীবনের প্রত্যেকটি বিষয়ে তিনি একশ পার্সেন্ট সফল। ঐতিহাসিক বা জীবনীকাররাও এর স্বীকৃতি দিয়েছেন নিঃসঙ্কোচে।

• নবিজির জীবনের প্রকাশ্য দিক তো আছেই, তাঁর একান্ত অন্তরঙ্গ জীবনের বর্ণনাও আমরা পাই। যা সচরাচর অন্যান্য অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গের পাওয়া যায় না।

• তখনকার সভ্যতার ‘কেন্দ্র’ হতে তাঁর অবস্থান ছিল একেবারে ‘স্যাটেলাইট’-এ (মরুভূমি আরবে)

• নবিজি তাঁর জীবদ্দশায় বাবাকে পাননি। মাকেও হারান মাত্র ছয় বছর বয়সে। প্রাচুর্য তাঁর কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারেনি।

• মিশন বাস্তবায়নের করতে বাঁধার পাহাড় মাড়িয়েছেন। এ জন্য তাঁকে হারাতে হয়েছে আপন বন্ধুদের। আত্মীয়-স্বজন, পরিবারের কাছে হয়েছেন ‘চোখের বালি’।

• ১৪০০ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর বার্তা এখনো অক্ষত-অবিকল। সকলের কাছেই তিনি বরিত ও সমাদৃত।

এমন একজন সফল মানুষের রুটিন আমরা এখন দেখব। কীভাবে তিনি দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলোতেও সিদ্ধান্ত নিতেন এবং কীভাবে এই অভ্যাস, সিদ্ধান্ত, রুটিন তাকে এক অনুসরণীয় অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

কল্পনা করুন তো! একজন মানুষ মরুভূমিতে বেড়ে উঠছে, খুব সাদাসিধে জীবন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন না! নেট বা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার ব্যাপারেও তার ধারণা নেই! এমন একজন মানুষ কীভাবে পৃথিবীর বৃহৎ অংশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীর মডেল হয়ে উঠতে পারেন? ভেবেছেন কখনো?

প্রযুক্তি আমাদের জীবনমান উন্নত করেছে ঠিক; সমান্তরালে আমাদের মানবতাবোধ কেড়ে নিয়েছে। আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অস্বাভাবিক করে দিয়েছে। পারতপক্ষে এটাই হচ্ছে ‘আধুনিকতার বিড়ম্বনা’। মার্টিন লুথার কিং বলেন—

“our scientific power has outrun our spiritual power, we’ve created guided missiles but misguided humanity”

আজকের ২১ শতকের বাসিন্দারা আমরা পূর্বপুরুষদের থেকে নিজেদের ‘ভিন্ন’ ভাবি। তাদের সেকেলে আর নিজেদের আধুনিক মনে করি। টেকনোলজির ব্যবহার, আধুনিক অবকাঠামো, নতুন নতুন আবিষ্কার নিয়ে আমরা নিজেদের ‘উৎকৃষ্ট সভ্যতার প্রতিনিধি’ বিবেচনা করি। নিজেদের ‘সুপিরিয়র’ মনে করার প্রবণতা মনের অজান্তেই আমাদের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। আমাদের যুক্তি হচ্ছে, ‘সুপিরিয়র’ হয়ে আমরা কেন ‘ইনফেরিয়র’ পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করতে যাব?

দুর্ভাগ্য হলো, পূর্বপুরুষদের যাপিত জীবনকে কখনো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে চাইনি আমরা। যদি পর্যালোচনা করি, আমরা দেখব—তাদের জীবনধারাকে বোঝার জন্য একটু ভিতরে প্রবেশ করি। সেখানে আমরা দেখব, পূর্বপুরুষরা ঠিক সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে, এখন আমরা যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছি। চ্যালেঞ্জগুলো হলো—

“finding meaning and purpose in life, balancing between their various roles, being successful in their endeavours, maintaining relationships, and leaving a legacy to be remembered. They loved, bled, cried, laughed, and lived their humanity and left us an example for us through their stories and example. And what better story to follow and learn from then the story of a man who according to his wife was a walking breathing Qur’an (the last divine message to mankind).”

‘জীবনের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দ্যেশ্য খুঁজে ফেরা, জীবনের বাঁকে বাঁকে নানান কাজের ভারসাম্য রক্ষা করা, নিজ সামর্থ্যের মধ্যে সফলতার যুদ্ধ, সম্পর্ক ছিন্ন না করা, বিস্মৃত উত্তরাধীকারের পুনর্জাগরণ। তারা ভালোবাসতেন, রক্তাক্ত হতেন, কাঁদতেন, হাসতেন। তারা আমাদের মতোই যুদ্ধ করে জীবন চালিয়ে নিয়েছিলেন। তারা আমাদের জন্য উপমা ও উদাহরণ হয়ে আছেন। আমরা এখন এমন একজন মানুষের রুটিন অনুসন্ধান করব, যিনি তাঁর স্ত্রীর বর্ণনায় ‘জীবন্ত কুরআন’! তিনি নবি মুহাম্মাদ সাল্লল্লাহু আলাইহিস সালাম! পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ।’

স্পেশাল মানুষ আবার স্পেশাল হন কীভাবে? উত্তর হলো, অভ্যাস ও রুটিন মাফিক জীবন যাপনের কারণে। নবি-রাসুলগণের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার রুটিন ঐশী নির্দেশনাপ্রাপ্ত; তাই তাদের জীবনই আমাদের অনুসরণের জন্য ‘বেস্ট অপশন’। নবিজির রুটিন অনুসরণ করার মাধ্যমেই কেবল আমরা উত্তম চরিত্র ও সর্বোত্তম আদর্শের ধারক-বাহক হতে পারি।

এবার বলুন—নবিজির রুটিনকে আপনি ধারণ করতে প্রস্তুত? এই নিবন্ধ পড়ুন। খুলে দিন হৃদয়ের বদ্ধ-দুয়ার। এখন আপনি যা অর্জন করবেন, তা নিঃসন্দেহে আপনার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করবে, বদলে দিবে আপনার লাইফস্টাইল।

প্রস্তাবনা

মূল আলোচনা শুরু করার আগে কিছু পয়েন্ট মাথায় রাখতে হবে আমাদের—

1. ‘রুটিন’ নবিজির যাপিত জীবন বর্ণনার জন্য যথার্থ শব্দ নয়। রুটিন মানে ধারাবাহিক সুনির্দিষ্ট কার্যবিধি। কিন্তু নবিজি তো তাঁর প্রতিটি দিন সাজিয়েছেন পরিবার ও উম্মাহর প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে। তাই নবিজির দিনরাতকে ঠিক ৯.০০-৫.০০টার ফিক্সড রুটিনের মতো নেওয়া যায় না। একইসাথে কিছু ব্যাপারে তিনি টিপিক্যাল রুটিন মেনে চলেছেন (বিশেষত সালাতের ক্ষেত্রে), কখনোই সময় নষ্ট করেননি এবং সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন।

2. নবিজির জীবনের রুটিন বুঝতে হলে আপনাকে তাঁর একটি বিখ্যাত হাদিসকে সামনে রাখতে হবে। তিনি বলেছেন—‘আমি প্রেরিত হয়েছি নিখুঁত ও সর্বোত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দিতে’। (আদাবুল মুফরাদ)। সুতরাং তাঁর প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত ও পছন্দ, সময় ব্যয়, যাদের সাথে যেভাবে সময় ব্যয় করেছেন এবং প্রতিদিন যেভাবে সময় ব্যয় করেছেন—সবকিছুই এই হাদিসের আলোকে ভাবতে হবে। নিবন্ধটি পড়তে এই পয়েন্ট বিবেচনায় রাখতে হবে।

3. রাসুলুল্লাহর জীবনের মিশন ছিল উম্মাহর নাজাত ও মুক্তি নিশ্চিত করতে তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করা। ‘দায়ি ইলাল্লাহ’ হিসেবে এটা ছিল তাঁর ফুলটাইম প্রফেশন। একইসাথে তিনি ছিলেন পিতা, নানা, স্বামী, শ্বশুর এবং শাসক। এই নিবন্ধ পড়তে গিয়ে এটাও বিবেচনায় রাখবেন।


রুটিনের আলোচ্য ধারা-উপধারাগুলো নবিজির মদিনার জীবনের শেষ দিকের; মানে পৃথিবী থেকে তাঁর প্রস্থানের কাছাকাছি সময়ের। তখন সবকিছু মোটামুটি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল, ইসলামি রাষ্ট্র স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল, অধিকাংশ প্রতিপক্ষই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় প্রবেশ করেছে। তখন তিনি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শক্তিশালি ও প্রভাবশালী অবস্থানে।

নিজেদেরকে আপাতত একটু ভিন্ন জগতে নিয়ে যাই। নবিজির গোটা জীবনের একটা চিত্র আঁকি। এমন হাইরেজুলেশনের একটা ইমেজ তৈরি করি—যেখানে সবকিছু থাকে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার। তারপরে ইমেজটাতে একটা একটা করে ফোকাস পয়েন্টে টাচ করি। ইচ্ছামত বড়-ছোট করি। ইমেজের প্রতিটা টাচি পয়েন্টের সেই ‘বিম্ব’র সাথে নিজের ‘প্রতিবিম্ব’কে মেলাই।





নবিজির সকালের রুটিন

চলুন, চোখটা এবার বন্ধ করুন। নিজেকে মক্কার একটা গৃহে কল্পনা করুন। যেমন-তেমন গৃহ নয়! মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহর গৃহ! কল্যাণের আধার ও সকল সৃষ্টিজীবের যিনি সরদার—তার গৃহ! কী দেখবেন এখন?

প্রায় ফজরের মুহূর্ত। একটু পরে মুআজ্জিন সুউচ্চ রবে আজান দিবেন। নবিজি মহান রবের সম্মুখে দীর্ঘ সিজদারত। এখন খানিকটা বিশ্রামে। এই তো শুরু হলো। বেলাল রাদি.-এর কন্ঠের মধুর, সুমিষ্ট মদিনার অলি-গলিতে। আজানের সেই সুরে চিরায়ত অভ্যাসে নবিজি জেগে উঠলেন। এরপর বললেন —

الْـحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أمَاتَنَا وإِلَيْهِ النُّشُورُ

(আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা’দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর।) -বুখারি : ৬৩১২

‘প্রশংসা সেই সত্তার, যিনি আমাদের মৃত্যু পর পুনরায় জীবিত করেছেন। আর তার দিকেই পুনরুত্থান হবে।’

হাতে তুলে নিলেন সবসময়ের সেই ‘মিসওয়াক’। কিছুক্ষণ জোরে জোরে শ্বাস নিলেন, বুকভরে ভোরের নির্মল বাতাস টেনে নিলেন।

গভীর মনোযোগের সাথে আজানের জবাব দিচ্ছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছেন সালাতুল ফজরের।

দুরাকাত সুন্নাত ঘরেই সেরে নিলেন। ফজরের জামাত শুরুর আগ পর্যন্ত ঘরেই অবস্থান করছেন। ডান কাঁধে ভর করে হালকা বিশ্রামে আছেন, অপেক্ষা করছেন সালাতে ইমামতি করার। উম্মুহাতুল মুমিনিন জাগ্রত হতে পেরেছেন কিনা খোঁজ-খবর নিলেন। শান্ত, সৌম্য, স্থিতধী হয়ে তিনি উম্মুহাতুল মুমিনিনের সাথে কোয়ালিটি কিছু সময় কাটালেন। এই সময়চক্র নিয়ে নবিজি তাঁর প্রিয় সাহাবিদের বলেছেন—যে ব্যক্তি ভোরে সুস্থতা নিয়ে ঘুম থেকে ওঠে, বাসায় নিরাপদ থাকে এবং সারা দিনের খাদ্যসামগ্রী তার কাছে মজুদ থাকে, তাহলে পৃথিবীর সব সম্পদ তাকে দেওয়া হয়েছে। [সুনানে তিরমিজি]

মসজিদ মুসল্লি দ্বারা পরিপূর্ণ। বেলাল রাদি. দেখলেন—মোটামুটি সবাই চলে এসেছে, জামাতের সময় সন্নিকটে। বেলাল রাদি. নবিজির হুজরার সামনে গিয়ে ধীরেধীরে বলতে শুরু করলেন— ‘সালাত... সালাত... ইয়া রাসুলুল্লাহ!’

ঘর থেকে বেরিয়ে আসলেন রাহমাতুল্লিল আলামিন। খোলা আকাশের দিকে তাকিলে দুআ পড়লেন بِسْم اللَّهِ توكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، وَلا حوْلَ وَلا قُوةَ إلاَّ بِاللَّهِ


(বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা-হাওলা ওয়া লা-কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহি।) -তিরমিজি, আবু দাউদ


‘আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করছি আল্লাহ ব্যতিত কোনো অভিভাবক নেই আর নেই কোনো শক্তি ।’


এরপর বললেاللَّهُمَّ إِنِّي أعوذُ بِكَ أنْ أَضِلَّ أو أُضَلَّ ، أَوْ أَزِلَّ أوْ أُزلَّ ، أوْ أظلِمَ أوْ أُظلَم ، أوْ أَجْهَلَ أو يُجهَلَ عَلَيَّ


(আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা আন আদিল্লা আও উদল্লা আও আজলিমা আও উজলামা আও আজহালা আও ইয়ুজহালা আলাইয়্যা।) -আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ


অর্থাৎ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট বিপথগামী হওয়া ও করা থেকে, অত্যাচার করা ও অত্যাচারিত হওয়া থেকে, অজ্ঞতা প্রকাশ করা ও অজ্ঞতা প্রকাশের পাত্র হওয়া থেকে আশ্রয় চাই।


ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন। আর بسم الله والصلاة والسلام على رسول الله اللهم افتح لي ابواب رحمتك


(বিসমিল্লাহি ওয়াসসলাতু ওয়াসসালামু ‘আলা রাসুলিল্লাহ। আল্লাহুম্মাফ্ তাহলি আবওয়াবা রাহমাতিকা।) - মুসলিম : ১১৬৫

‘আল্লাহর নামে প্রবেশ করছি। আর আল্লাহর রাসুলের ওপর সালাত ও সালাম প্রেরণ করছি। হে আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দ্বারগুলো উন্মুক্ত করে দিন।’

নবিজিকে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখেই ইকামাত শুরু করলেন বেলাল রাদি.। নবিজিকে সামনে রেখে সাহাবিরা পেছনে সুশৃঙ্খলভাবে দণ্ডায়মান। নবিজি ও তাঁর সাহাবিরা এখন এক দীর্ঘ এক নামাজে অবগাহণ করবেন। বিশ্ব-নিয়ন্তা মহান রবের সম্মুখে সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন। বরকতময় সালাতুল ফজর, প্রত্যুষের নামাজ। দিনের শুরুতেই রবের দরবারে সিজদার আয়োজন!

নামাজ শেষ হলো। প্রিয় সাহাবিদের মুখোমুখি হয়ে বসলেন নবিজি। ছোট্ট একটা সময় দুআ-দরুদ ও তিলাওয়াতে কেটে যায়। তারপর কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। চলল নানাবিধ আলোচনা। নবিজির আলোচনা শুনে কেউ কাঁদছেন, কেউ আগামীর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন বুনছেন। কেউ কিছু জানতে চাইলেন। উত্তর দিলেন নবিজি। কে যেন রাত্রিবেলা কী এক স্বপ্ন দেখেছেন। বিনয়ের সাথে নবিজির কাছে ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। নবিজি ব্যাখ্যা দিলেন। সাহাবিরা গল্প করছে, নানান প্রসঙ্গে আলাপ তুলছে—নবিজি শুনছেন। কী এক অপরূপ দৃশ্য! সূর্য পুবাকাশে উদিত না হওয়া পর্যন্ত নবিজি এভাবে বসে থাকলেন।

সূর্যের লালিমা আকাশে ফুটে উঠেছে। নবিজি ডান পা রেখে ঘরে প্রবেশ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَ الْمَوْلَجِ ، وَخَيْرَ الْمَخْرَجِ ، بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا

(আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাল মাওলাজি ওয়া খাইরাল মাখরাজি বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তায়াক্কালনা।) -আবু দাউদ : ৫০৯৬

‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কল্যাণকর গমন এবং শুভ নির্গমন প্রার্থনা করি। আপনার নামেই প্রবেশ করি এবং আপনার নামেই বের হই। আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ওপরই কেবল ভরসা করি।’

ঘরে ঢোকামাত্রই আবারও মিসওয়াক হাতে নিলেন। মিসওয়াক শেষে পারিবারের সদস্যদের সাথে আলাপে মগ্ন হলেন। কিছু খেয়ে নিলেন। যেদিন ঘরে কিছু নেই, বলে বসলেন—আজ আল্লাহর জন্য রোজা থাকলাম।


নবিজির সকালের রুটিন এবং আমাদের জীবন

এতক্ষণ যা বর্ণনা করা হলো, তার সাথে এখন নিজেদের মিলিয়ে নিন। সকালের রুটিনে নবিজির সাথে আমাদের কী কী পার্থক্য বিদ্যমান—তাএক নজরে দেখে নিই।

• তিরমিযীর বর্ণনায় এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—‘প্রভাতকালীন সময় আমার উম্মতের জন্য বরকতময়।’ সূর্যোদয়ের পূর্বে শয্যাত্যাগ ছিল নবিজির অভ্যাস। এই প্রত্যুষে শয্যাত্যাগ সাফল্যের এক গোপন মন্ত্র। অধুনা সফল লোকেরাও এই সত্যে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী।

• সকালের শুরুতে নবিজির ফোকাস পয়েন্ট খেয়াল করুন। মুআজ্জিনের আজানে তাঁর ঘুম ভাঙছে, আজানের জবাব দিচ্ছেন, দুআ পড়ছেন, ঘুম থেকে উঠেই তাহারাত ও পবিত্রতা অর্জনে মনযোগী হচ্ছেন। শয্যাত্যাগ হতে শুরু করে মসজিদে গমনের আগ পর্যন্ত সব কাজেই তাঁর মনোসংযোগের গভীরতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। এবার নিজেদের কথা ভেবে দেখুন! নবিজির কর্মপন্থার ঠিক বিপরীতে আমাদের অবস্থান। আমাদের শুরুটাই হয় অস্থিরতা দিয়ে। ঘুম থেকে উঠেই ক্লান্তি, অবষাদ। স্মার্টফোন আসক্তি আমাদের গভীর রাত পর্যন্ত জাগ্রত রাখছে। আবার ঘুম ভাঙলেই ফেসবুক, হোয়াটস এ্যাপ, ইমোর নোটিফিকেশন চেক করি। আমাদের ফোকাস পয়েন্টটাই আলাদা।

• আল্লাহর দরবারে সিজদাহ দিয়ে দিন শুরু করতেন নবিজি। প্রত্যুষেই উপলব্ধি করতেন—আরেকটি দিন আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার পক্ষ থেকে উপহার পেয়েছেন। নিজেকে এই বার্তা স্মরণ করিয়ে দিতেন, মৃত্যুর পরে আরেকটা জীবন আছে। অনন্ত মহাকালের জীবন। এই অনুভূতি তাঁকে সর্বোচ্চ পরিশ্রমের দিকে নিয়ে যেত। এবং সেই দিনটি সর্বোত্তমভাবে (Best Version of Life) পরিচালনা করার স্পৃহা জাগিয়ে তুলত।

• প্রতিটি ক্ষণে তিনি বিবেক ও মস্তিষ্কের সচেতন ব্যবহার করতেন। ঘর বা মসজিদে ঢোকা বা বের হওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি কোন পা আগে ফেলবেন, সেটাও খেয়াল রাখতেন। স্থান ও সময় অনুপাতে প্রাসঙ্গিক দুআ করতেন। নবিজির দুআগুলো পর্যালোচনা করে দেখলে আপনি বিষ্মিত না হয়ে পারবেন না। যখন, যেভাবে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে, সেভাবেই চেয়েছেন। আসলে দুআ তাঁকে আধ্যাত্মিকভাবে সবসময় সজীব রাখত।

• সালাত বা জিকরুল্লার মাধ্যমেই হতো নবিজির দিনের সূচনা। এরপর তিনি আজকের দিনকে সর্বোত্তম প্রোডাক্টিভ উপায়ে ব্যবহারের প্ল্যান করতেন। বিপরীতে আমাদের ফোকাস কী? জাগতিক কাজগুলো হয়ে যায় আমাদের ‘প্রাইম ফোকাস’। ঘুম থেকে উঠেই ই-মেইল চেকিং। দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার কারণে বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি।

• সূর্যোদয়ের পূর্বেই আপনজনদের খোঁজখবর নিতেন তিনি। তাদের সমস্যাগুলো জেনে নিতেন এবং সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করতেন। নিজেকে খুব ব্যস্ত হিসেবে উপস্থাপন করতেন না।

• প্রিয় নবিজির জীবন ছিল একেবারেই অনাড়ম্বর। খাবার থাকলে খেতেন, না থাকলে রোজা থাকতেন। হিসাব সিম্পল। আর আমরা তো চা-কফি বা বাহারি আইটেমের নাস্তা ছাড়া আমাদের দিনের শুরুটা কল্পনাই করতে পারি না। তাই না?


নবিজির দিনের রুটিন

নবিজির দিনের শুরু হতো ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে গমনের মধ্য দিয়ে। মসজিদে ঢুকেই দুরাকাত নামাজ পড়তে ভুলতেন না তিনি। তাঁর নামাজ শেষ হলেই সাহাবিরা তাদের ‘মধ্যমণি’কে ঘিরে বসতেন। এই সময়টা ছিল সাহাবিদের কাছে খুবই আগ্রহের। নবিজির এই ‘অফিসিয়াল টাইমে’ সাহাবিরা তাদের মনের অব্যক্ত কথাগুলো প্রাণ খুলে তাঁর সাথে শেয়ার করতেন। এই ‘অফিসিয়াল টাইম’কে তিনি খুবই ‘স্মার্ট এপ্রোচ’এ ‘প্রোডাক্টিভ’ করে নিতেন। উম্মাহর কান্ডারীদের সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের জন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞা প্রদান করতেন।

দূর-দূরান্তের ‘নও-মুসলিম’ এমনকি ‘অমুসলিম’রাও নবিজির সাহচর্য লাভে ধন্য হওয়ার আশায় ভীড় করত। এটা সহজেই অনুমেয় যে ,এই ‘অফিসিয়াল টাইম’ নবিজি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতেন। যাতে কাউকে বিফল মনোরথে ফিরে যেতে না হয়।

এই সমগ্র কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হওয়ার সময় নবিজির জন্য কোন ‘তারকা’ খচিত আলাদা আসন ছিল না। যাতে তাঁকে সহজে চেনা যায়। বরং অবস্থা এমন ছিল—আগন্তুকরা সাধারণের ভীড়ে ‘অনন্য ও অসাধারণ’ ব্যক্তিত্বের অধিকারী নবিজিকে চিনতে না পেরে জিজ্ঞাসা করত ‘এখানে আল্লাহর নবি কে?’ বা ‘আচ্ছা, আল্লাহর নবি কোথায়?’ আজকের যুগে এসব কল্পনা করা যায়?!

নবিজির কাছে হাদিয়া হিসেবে আসা খাবার সকলেই ভাগ করে খেতেন। কখনো খাবারের কমতি পড়লে নবিজির সঙ্গে খাবার খেতে পারার অকৃত্রিম বরকতে তারা তাদের ক্ষুধার কথা ভুলে যেতেন।

সূর্যোদয় হতে দ্বিপ্রহরের সময়কে নবিজি আত্মীয়স্বজন ও মদিনার এতিম-দুস্থদের খোঁজ-খবর নেওয়ার কাজে লাগাতেন। আদরের দুই নাতির সাথে এই সময়টায় তাঁর বেশ জমত। আবার অসুস্থদের সেবা-শ্মশ্রূষার জন্যও তিনি এই সময়টাকেই ব্যবহার করতেন। সাহাবিদের সাথে মদিনার অলি-গলি ঘুরে বেড়াতেন। যাদের সাথে তাঁর মোলাকাত হতো, তাদের সাথিই প্রাণ খুলে কথা বলতেন। তাদের তিনি বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করতেন কীভাবে তাদের সহযোগিতা করতে পারেন।

তারপর বাড়ি ফেরা। বাড়ি ফিরেই স্বভাবগত অভ্যাসমতো তিনি মিসওয়াক করে নিতেন। ঘরের লোকদের সালাম দিতেন। অভিবাদন জানাতেন। সময় করে দুরাকাত নফল নামাজ পড়ে নিতেও ভুলতেন না। নামাজ শেষে খাবার গ্রহণ-পর্ব অনুষ্ঠিত হতো—যদি খবার না থাকত তাহলে রোজার আমল জারি থাকত।

মদিনার উৎসাহী মহিলারা ‘তাওহীদ’ ও ‘ফিকহ’ ও বিভিন্ন বিষয়ে জানার জন্য এই সময়ে নবিজির কাছে আসত। তাদের মধ্যে এমন অনুসন্ধিৎসু মানসিকতার দেখা মিলত যে, মনে হতো তারা যেন এক জনাকীর্ণ মসজিদে অবস্থান করছে।

এই সময়ে নবিজি যেন পূর্ণ সংসারী হয়ে যেতেন। পত্মীদের গৃহস্থালী কাজে সাহায্য করা বা খোশগল্পরত হওয়াসহ কোনো কিছুই যেন বাদ যেত না। কী এক ‘প্রোডাক্টিভ’ সময়ই না কাটাতেন নবিজি। আবার কখনো কখনো বড় ও মুরুব্বি সাহাবিদের কেউ কেউ এই সময়ে নবিজির সাক্ষাতের জন্য আসতেন। তারা চলে গেলে নবিজি খানিকটা বিশ্রাম নিতেন।

বেলাল রাদি.-এর আজানে তাঁর বিশ্রামপর্বের সমাপ্তি ঘটত। বাসায় সুন্নত আদায় করে মসজিদে যেতেন। শুরু হতো মুয়াজ্জিনের ইকামাত। ইমাম তে নবিজি নিজেই। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

নামাজ শেষ। চলত কিছু সময়ের জন্য আধ্যাত্মিকভাবে উন্নতির মোটিভেশন। এ পর্ব শেষ করে বাসায় গিয়ে জোহরের অবশিষ্ট দুরাকাত আদায় করে নিতেন। আসরের পূর্ব পর্যন্ত সময়কে এভাবে নবিজি কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য ‘মনিটরিং’ এর কাজে লাগাতেন মসজিদে বসে।

আসরের নামাজ শেষে তিনি সাধারণত বাসার সবাইকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দিতেন। এ যেন এক জান্নাতি আভা! একান্ত কাছে পেয়ে সবাই নবিজির কাছে বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইতেন। নবিজিও তাদের একান্ত খোঁজ-খবর নিতেন।


নবিজির দিনের রুটিনের প্রতিফলন

নবিজির জীবনচরিত অবশ্যই আমাদের জন্য অনুকরণীয়। তবে এক্ষেত্রে কিছু বিষয় ধর্তব্য—

• সকালবেলা ‘অফিস টাইম’ মেইনটেইন করতেন নবীজি। যার কারণে লোকেরা এই সময়কে বেছে নিত তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য। আধুনিক কালের যেকোনো ‘নির্বাহী’কে একথা মাথায় রাখা দরকার যে, তিনি যেন সকলের জন্য ‘এভেইলেবল’ হন।

• যার কাজই ছিল গোটা পচনশীল মানবতাকে রক্ষা করা তিনি আবার ঘুমান কি অরে! হ্যাঁ, একথা সত্য তিনি ঘুমাতেন। আর এখানেই চলে আসে ‘ভারসাম্য’ রক্ষা করার বিষয়টা। অর্থাৎ সবধরনের জিম্মাদারি ও দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তিনি নিজেকে বিশ্রামের জন্যও কিছু সময় দিতেন। যাতে করে পরবর্তীতে দায়িত্ব পালনে তাকে কোনোধরনের বিঘ্নতার শিকার হতে না হয়।

• তাঁর সারাদিনই ছিল ইবাদতময়। দিনের খুবই অল্প সময় ছাড়া বাকি সময়টুকু তিনি যেকোনোভাবে স্রষ্টার আরাধনায় ব্যয় করতেন।

• আমরা সাধারণত প্রত্যাশা করি যে, লোকেরা আমাদের দেখতে আসুক। কিন্তু নবিজি ছিলেন এর ব্যতিক্রম। আত্মীয়স্বজন বা অসুস্থ কারো দেখাশোনায় তাঁর চাইতে অগ্রগামী কেউ ছিল না।

• সারাদিনের কর্মব্যস্ততার জন্য আমাদের পক্ষে পরিবারকে ‘কোয়ালিটি টাইম’ দেওয়া হয় না। নানান অভিযোগে আমরা জর্জরিত হই। ‘তুমি খুব ব্যস্ত! আমাকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার ফুসরত তোমার কখনো হলো না’ এমন অনুযোগ নবিজির প্রিয়জনদের কাছ থেকে কখনো আসেনি।

‘ঘরে কী করেন নবিজি?’—আল আসওয়াদ জানতে চাইলেন আয়েশা রাদি.-এর কাছে। উত্তর এলো—‘নামাজ ছাড়া (ঘরে অবস্থানকালীন) বাকি সবটুকু সময় তিনি পরিবারের জন্য ব্যয় করেন।’

নবিজির সন্ধ্যাকালীন রুটিন

‍মদিনার লোকেরা সাধারণত সন্ধ্যার পরই রাতের খাবার গ্রহণ করত। এজন্য মাগরিবের নামাজ যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করতেন নবিজি। ঘরে ফিরে সুন্নত আদায় করে সবার সাথে খাবার খেতেন। ঘরে খাবার না থাকলে খেজুর ও পানি পান করে কাটিয়ে দিতেন পুরো রাত। কখনো কখনো এমনও হতো যে, অনেক দিন নবিজির ঘরের চুলায় আগুন জ্বলত না।

তাঁর অভ্যাস ছিল—তিনি মেঝেতে বসেই খাবার শুরু করতেন ‘বিসমিল্লাহ’ বলে। খাবারের ব্যাপারে তাঁর কোনো অভিযোগ-অনুযোগ কেউ কোনোদিন শুনেনি। যারা তাঁর সাথে খেতে বসতেন, তারা খুবই ‘উপভোগ্য’ সময় কাটাতেন। খাবার গ্রহণ শেষে আঙুল চেটে নিতেন। সবশেষে চলত হাত ধোয়া-মোছার পর্ব।

ইশার সময় হলে মসজিদে যেতেন। সাহাবিরা চলে এলে জামাত শুরু হতো। নবিজি কখনো এশার জামায়াত দীর্ঘ করতেন না। সারাদিনের কর্মব্যবস্ততার কারণে লোকেরা সাধারণত এই সময়ে খুবই ক্লান্ত থাকত। মসজিদ থেকে বাসায় এসে সুন্নত আদায় করে নিতেন। এ সময়ে তাঁর ব্যস্ততা কম থাকত। ‘ফ্যামিলি টাইম’ মেইন্টেইন করতেন অথবা এই সময়ে কারও বাড়িতে বেড়াতেন। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত শুনতেন। আবার, কখনো বাড়ি ফেরার পথে মসজিদে নববিতে অবস্থানরত ‘আসহাবে সুফফা’র মিলিত হতেন।

ঘরে ফিরেই চলত ঘুমানোর প্রস্তুতি। পরিধেয় জামা খুলে ঝুলিয়ে রাখতেন। নবিজির বিছানা ছিল একেবারেই সাধারণযা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তিনি চামড়ার তৈরি বিছানায় শয়ন করতেন । এর ফলে নবিজির পিঠে দাগ পড়ে যেত সবসময়।

নবিজির একান্ত প্রিয় সময় রাতের মধ্যপ্রহর। এই সময়ে তিনি গভীর মনোসংযোগের সাথে সমস্ত আবেগ-অনুভূতি ঢেলে দিয়ে রবের সাথে একান্ত আলাপনে মিলিত হতেন। বড়ই ‘অপূর্ব’ ছিল তাঁর এ নামাজ। তাহাজ্জুদের নামাজে কোনো প্রকারের তাড়াহুড়ো নয় বরং যত দীর্ঘ করা যায়, ততই ভালো লাগত তাঁর। প্রতি রাকাতে ১০০ আয়াত তেলাওয়াত করতেন। শুধুমাত্র দীর্ঘ তেলাওয়াতই এ ‘তাহাজ্জুদ’র সৌন্দর্য ছিলনা। রুকু-সিজদাতেও তেলাওয়াতের সমপরিমাণ সময় ব্যয় করতেন। ভাবা যায়! নামাজকালীন সময়ে কখনো কাঁদতেন, আবার কখনো রবের শুকরিয়া আদায় করতেন। এ রকম তথ্য পাওয়া যায় মসজিদে নববীতে নবিজির সাথে ‘তাহাজ্জুদে’ অংশগ্রহণকারী এক সাহাবীর বর্ণনায়। রাতের যখন একেবারে শেষভাগ তখন তিনি স্ত্রীকে ডেকে তুলতেন। কোনো কোনো রাতে এই সময়ে তিনি ‘কবরস্থানে’ চলে যেতেন। মন খুলে দুআ করতেন মরহুম-মরহুমাদের জন্য। ইমানদার নর-নারীদের জন।

ফজরের আযানের আগ পর্যন্ত তিনি হালকা বিশ্রাম নিতেন। এভাবেই কাটত নবিজির অসাধারণ জীবনের সাধারণ—তবে অনুসরণীয় দিনরাত!

নবিজির রাতের রুটিন ও আমাদের লাইফস্টাইল

• একজন মানুষ হিসেবে ‘মানবিক’ কারণে নবিজি বিশ্রাম নিতেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারকে তিনি ‘Quality Time’ দিতেন।

• রাতের শেষপ্রহরের তাহাজ্জুদকে রবের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির মোক্ষম সুযোগ হিসেবে নেন। দীর্ঘ ‘তাহাজ্জুদ’

তাঁর কাছে কোন বোঝা মনে হয়নি।

• সকলের প্রতি তিনি ছিলেন সমান আন্তরিক। কতটা মুহাব্বাত থাকলে গভীর রাতে নির্জন কবরস্থানে গিয়ে পরকালবাসীদের জন্য দুআ করা যায়! ভালোবাসা কি পরিমাণ থাকলে ঘুমন্ত স্ত্রীকে ঘুম ভাঙিয়ে শেষরাতের ইবাদত ও নামাজের জন্য গুরুত্বারোপ করেন। শাশ্বত সত্য তো এই যে, তা জীবনের সবকিছুই আমাদের জন্য গভীর ভাবনার বিষয়।

নবিজির রুটিন কি আমাদের চিন্তায় নাড়া দেয়?

একথা চরম সত্য যে-‘নবিজির জীবনই আমাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ’। উম্মাহর প্রতি প্রিয় নবিজির সবচেয়ে বড় মোটিভেশন ছিল ‘ভালোবাসা’। নবিজির জীবনে ভালোবাসার কী প্রভাব ছিল সেটাই দেখুন না... ভালোবাসার দিগ-দিগন্তহীন সমুদ্রে ডুব দেওয়ার মাঝে কী কল্যাণ; সেটাই দেখুন!

• রবের প্রতি প্রগাঢ় ‘ভালোবাসা’ - সর্বাবস্থায় তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

• পরিবারের প্রতি ‘ভালোবাসা’- তাকে তাদের প্রতি দায়বদ্ধ করে তুলে।

• সাহাবিদের প্রতি ‘ভালোবাসা’ - তাদের কাছে পৌঁছাতে ব্যাকুল করে তুলে।

• গোটা মানবতার প্রতি ‘ভালোবাসা’- তাকে পার্থিব জীবনে উম্মাহর কল্যাণ আর পরকালের মুক্তির জন্য ব্যাপৃত রাখে। করলেন। দুআ পড়লেন—

৮৮৩ বার পঠিত

অনুবাদক পরিচিতি

সাইফুল সুজন। জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেটে। পড়াশোনা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পলিটিক্যাল স্টাডিজ’ বিভাগে। রাজনীতি ও এর গতিধারায় আগ্রহী পাঠক। ইসলামি পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখেন। বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতারত লড়াইয়ের একজন অংশীদার হিসেবে কন্ট্রিবিউট করতে চান। জ্ঞানকাণ্ড ও কর্মকাণ্ডের সমন্বয়েই ইতিহাস রচিত হবে শ্বাসত বিশ্বাসীদের হাত ধরে নতুন করে আবারও।

মন্তব্য

৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
ফাহাদ আবদুল্লাহ

ফাহাদ আবদুল্লাহ

৩১ জানুয়ারী, ২০২০ - ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন

অসাধারণ হয়েছে। মাশাআল্লা।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
Markflady

Markflady

২৩ মার্চ, ২০২০ - ০৬:১০ পূর্বাহ্ন

Venta Viagra En Espana https://apcialisle.com/# - buy generic cialis online safely Baclofen Pas Cher 10mg <a href=https://apcialisle.com/#>buy real cialis online</a> Pfizer Zithromax

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ - ২১:৪১ অপরাহ্ন

জাজাকাল্লাহ খাইরান

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
md. rabbani nahid

md. rabbani nahid

০৩ মার্চ, ২০২০ - ০০:০৫ পূর্বাহ্ন

আল্লাহু আকবার। আল্লাহ লেখায় বরকত বাড়িয়ে দিন। এককথায় অসাধারণ। মা শা আল্লাহ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...