অপার অনুগ্রহের হাতছানি

ভুল মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো। মানুষ ভুল করবে, এরপর তা সংশোধন করবে। আবার ভুল করবে, অনুতপ্ত হবে, সংশোধনের পথে হাঁটবে—এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া অন্য সবকিছু অস্বাভাবিক। সংশোধনের পথে না হেঁটে, ভুল শোধরানোর চেষ্টা না করে হতাশায় ডুবে থাকা... স্বাভাবিক জীবনযাত্রার খেই হারিয়ে বসা... এসবই ভুল করার পর আবার করা ‘মারাত্মক ভুল’। পৃথিবীতে এমন কেউ কী আছে, যারা ভুল করেনি কিংবা করবে না? নেই, থাকবে না, থাকার কথাও না—এটাই বাস্তবতা।


মানুষ ভুল করে শয়তানের প্ররোচনায় আর সংশোধনের পথে হাঁটে নিজের ঈমানের প্রভাবে, নফসে লাউওয়ামার গুণে, অনুতপ্ত হৃদয়ের মহাগুণে। এটাই সুন্নাহ, সরলতা এবং ইসলামের উজ্জ্বল শিক্ষা। অনুসরণীয় আদর্শ। আচ্ছা, সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ মানব নবি-রাসুলগণও কী ভুল করেছেন? তারা ভুল করার পর কী করেছেন? কেউ যদি এমন প্রশ্ন করে বসে, তাহলে উত্তর হবে আগেরটাই। মানুষ মাত্রই ভুল। যেহেতু নবি-রাসুলগণ মানুষ, তাদের ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আল্লাহ তাআলার প্রিয় ও শ্রেষ্ঠ বান্দা নবি-রাসুলগণও ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কিন্তু তাদের থেকে ভুল প্রকাশ পাওয়াটা ছিল আল্লাহর বিশেষ প্রজ্ঞা। এর মাধ্যমে তিনি বান্দাদের শিক্ষা দিতে চেয়েছেন—ভুল করার পর কি করতে হয়। কীভাবে অনুতপ্ত হতে হয়। তাওবা করতে হয়। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হয়। দুআ করতে হয়। আসুন, আমরা কিছু দৃশ্য দেখি, আর ভুল করার পর কি করতে হয়, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব নবি-রাসুলগণের আমল থেকে তা শিক্ষা লাভ করি।


জান্নাতে হজরত আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম শয়তানের প্ররোচনায় ভুল করেন। আল্লাহর সুস্পষ্ট নিষেধ থাকার পরও শয়তানের প্ররোচনায় গন্দম খেয়ে ফেলেন। নিজেদের অজান্তেই আল্লাহর অবাধ্যতার শিকার হন। তারপর ভুল বুঝতে পেরে অত্যন্ত লজ্জিতও হন। কিন্তু অবাধ্যতার কথা স্মরণ করে অনুতপ্তমনে তারা কী করেছিলেন?


নবি মুসা আ.। কালিমুল্লাহ—আল্লাহর সঙ্গে যিনি সরাসরি কথা বলতেন। অনিচ্ছায় তাঁর মাধ্যমে একটা ভুল সংঘটিত হয়। এক কিবতিকে আঘাত করেন, ঘটনাক্রমে সে কিবতি এ আঘাতেই প্রাণ হারায়। তখন অনুতপ্ত হয়ে মুসা আ. কী করেছিলেন?


নবি ইউনুস আ.। আপন সম্প্রদায়ের মাঝে দাওয়াত দিয়ে আসছিলেন বহুদিন। কিন্তু তারা দাওয়াত তো গ্রহন করতই না, উল্টো নবিকে কষ্ট দিত। সম্প্রদায়ের লোকদের উপেক্ষা করে তিনি অন্যত্র চলে যান। আল্লাহর আদেশ ছাড়াই। নবির এ কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। তাই নবিকেও সম্মুখীন হতে হয় এক বিরাট পরীক্ষার। নিজের ভুলের কথা উপলব্ধি করতে পেরে প্রিয় নবির অবস্থা কেমন হয়েছিল?


হজরত নুহ আ.। মানবজাতির অবাধ্যতার কারণে পুরো তলিয়ে যাবে একটু পর। অবাধ্যদের মধ্যে নবির ছেলেও ছিল। একজন পিতা হিসেবে ভেতরে পিতৃমমতা কাজ করবে—এটাই স্বাভাবিক। অবাধ্য পুত্রের নিরাপত্তার জন্য তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করে বসেন। মহান আল্লাহ তাঁর এ কাজে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে নবি কী করেছিলেন?


নবি আইয়ুব আ.। কঠিন পরীক্ষার মুখে। পুরো শরীর পঁচে-গলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল। রোগের কারণে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। ধৈর্য্যের সবটুকুর পর আল্লাহর কাছে কী নিবেদন করেছিলেন?


ইসা আ.-এর সঙ্গীরা যখন তাঁর কাছে নিবেদন করেছিল আল্লাহ তাআলার কুদরত প্রত্যক্ষ করার জন্য আসমানি খাবারের। তারা বলেছিলেন, আমরা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে নয়, কেবল নিজেদের হৃদয়কে প্রশান্ত করতে এবং ইমানের প্রাচুর্য অর্জনের জন্য এ নিবেদন করেছি। তখন প্রিয় নবি কী করেছিলেন?


হজরত জাকারিয়া আ.। বার্ধক্যে এসে যখন সম্প্রদায়ের মাঝে হিদায়েত ও কল্যাণের স্থায়িত্বের জন্য নিজের উত্তরাধিকারের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন, তখন প্রিয় নবি কি করেছিলেন?


নবি দাউদ আ.। জালেম ও স্বেচ্ছাচারী বাদশাহ জালুতের বিরুদ্ধে জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। প্রবল শক্তিধর শত্রুর প্রতিপত্তি দেখে তিনি আল্লাহর কাছে কী নিবেদন করেছিলেন?


*****


হ্যাঁ, শয়তানের প্ররোচনায় গন্দম খাওয়ার পর নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে হজরত আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চান,


رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ.


হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা অবিচার করেছি নিজেদের উপর। আর যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন, আমাদের উপর দয়া না করেন; তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবো। [সুরা আরাফ : ২৩]


তারা প্রশান্ত হয়েছিলেন। লাভ করেছিলেন অপার অনুগ্রহের হাতছানি। বিফলে যায়নি তাদের দুআ।


হজরত মুসা আ. কিবতিকে আঘাত করার ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর দরবারে বিনয়াবনত হন। ক্ষমা চেয়ে দুআ করেন,


رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي.


হে আমার প্রতিপালক! আমি অবিচার করেছি নিজের উপর। আপনি আমার পাপ মার্জনা করুন। [সুরা কাসাস : ১৬]


প্রিয় নবি প্রশান্ত হয়েছিলেন। পেয়েছিলেন অপার অনুগ্রহের হাতছানি। দুআ কবুল হয়েছিল।


হজরত ইউনুস আ.-ও নিজের ভুলের জন্য রাজাধিরাজ মহান প্রভুর কাছে ক্ষমা চান। আকুতিভরা হৃদয়ে দুআ করেন,


لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ


আপনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। আপনি চির পবিত্র। নিশ্চয় আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত। [সুরা আম্বিয়া : ৮৭]


প্রিয় নবি মুক্তি পেয়েছিলেন মহাবিপদ থেকে। প্রশান্ত হয়েছিলেন। লাভ করেছিলেন অপার অনুগ্রহের হাতছানি।


হজরত নুহ আলাইহিস সালামও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে দোয়া করেন—


رَبِّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَسْأَلَكَ مَا لَيْسَ لِي بِهِ عِلْمٌ. وَإِلَّا تَغْفِرْ لِي وَتَرْحَمْنِي أَكُن مِّنَ الْخَاسِرِينَ


হে আমার প্রতিপালক! যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, আমি তা প্রার্থনা করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন আর আমার প্রতি দয়াপরবশ না হন; তবে তো আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব। [সুরা হুদ : ৪৭]


প্রিয় নবি প্রশান্ত হয়েছিলেন। লাভ করেছিলেন অপার অনুগ্রহের হাতছানি। দুআ কবুল হয়েছিল।


হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালাম পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীরের অংশ যখন পঁচেগলে খসে পড়ছিল, সবশেষে জিহ্বাও যখন আক্রান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, প্রিয় নবি তখন মিনতি করেন পরম প্রিয় বন্ধুর কাছে,


أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ


(হে আমার প্রতিপালক!) আমাকে স্পর্শ করেছে করেছে রোগ-বালাই। আর আপনি তো পরম দয়াবান। [সুরা আম্বিয়া : ৮৩]


প্রিয় নবি প্রশান্ত হয়েছিলেন। লাভ করেছিলেন অপার অনুগ্রহের হাতছানি। দুআ কবুল হয়েছিল। অসুস্থতা থেকে পূর্ণ আরোগ্য দান করেছিলেন পরম প্রিয় বন্ধু।


ইসা আলাইহিস সালাম সঙ্গীদের নিবেদনে সাড়া দিয়েছিলেন। আসমানি খাবারের দস্তরখান চেয়েছিলেন মহান প্রতিপালকের কাছে


رَبَّنَا أَنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِّنكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ


হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান থেকে অবতীর্ণ করুন দস্তরখান। যা আমাদের জন্য ঈদ সাব্যস্ত হবে। আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের জন্যও। এবং আপনার পক্ষ থেকে হবে এক নিদর্শন। আর আমাদের রিজিক দান করুন, আপনিই শ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা। [সুরা মায়েদা : ১১৪]


অপার অনুগ্রহের হাতছানি এসেছিল। দুআ কবুল হয়ে আসমানি দস্তরখান অবতীর্ণ হয়েছিল। প্রিয় নবি এবং সঙ্গীরা প্রশান্ত হয়েছিলেন।


হজরত যাকারিয়া আ.-ও উত্তরাধিকারের জন্য মহান প্রভুর কাছে দুআ করেন,


رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ


হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা ছেড়ে দেবেন না, আর আপনি তো উত্তম মালিকানার অধিকারী। [সুরা আম্বিয়া : ৮৯]


অপার অনুগ্রহের হাতছানি পেয়েছিলেন। দুআ কবুল হয়েছিল। বার্ধক্যেও আল্লাহ কুদরত দেখিয়ে দিয়েছিলেন। দান করেছিলেন হজরত ইয়াহইয়া আ.-কে ।


হজরত দাউদ আলাইহিস সালাম জিহাদের ময়দানে দুআ করেন,


رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ


হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য ধৈর্যের দ্বার খুলে দিন। আমাদের দৃঢ়পদ করুন। আর সাহায্য করুন জালেম সম্প্রদায়ের উপর। [সুরা বাকারা : ২৫০]


অপার অনুগ্রহের হাতছানি এসেছিল। দুআ কবুল হয়েছিল। মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে সাহায্য এসেছিল। বিশ্বাসীরা প্রশান্ত হয়েছিল।


*****


জীবনে চলার পথে বান্দাকে শত পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। শিকার হতে হয় কত দুঃখ-দুর্দশার। কখনো হতাশায় সবকিছু আচ্ছন্ন করে ফেলে, কখনো ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়, আবার কখনো ভারাক্রান্ত হৃদয়ে চোখের পানি ফেলতে হয়। কখনো আবার দীর্ঘ দিনের সাজানো পরিকল্পনা মুহূর্তের মধ্যেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, কখনো কখনো বিশাল-বিস্তৃত এ পৃথিবীও সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়। এসবকিছুই একজন বিশ্বাসী বান্দার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো। পার্থিব জীবনটাই পরীক্ষার। দুঃখ- দুর্দশা ও হতাশার।


আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

লোকেরা কি ধারণা করেছে, তারা ইমান এনেছি বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে; কোনো পরীক্ষায় ফেলা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরও পরীক্ষায় ফেলেছিলাম। (তাদের পরীক্ষায় ফেলা হবে) যাতে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেন কারা সত্য বলে এবং জেনে নেন মিথ্যাবাদীদের। [আনকাবুত : ২-৩]


পার্থিব জীবনে বান্দাকে জর্জরিত হতে হবে বহু দুঃখ-দুর্দশায়। কারণ দয়াময় প্রভু আগেই বলে দিয়েছেন, আমি ঈমানদারদের পরীক্ষা করব তাদের জান-মাল সবকিছু দিয়ে। আর সুসংবাদ কিন্তু ধৈর্য্য ধারণকারীদের জন্য—এটাও বলে দিয়েছেন। কেন এসব পরীক্ষা? দয়াময় প্রভু তা-ও বলে দিয়েছেন, যাতে তিনি সত্যবাদী আর মিথ্যাবাদীদের মাঝে পার্থক্য-রেখা টেনে দিতে পারেন। অনুগত বান্দাদের নৈকট্য দান করতে পারেন। আবার কখনো এই পরীক্ষা ও বিপদ-আপদ দিয়ে দয়াময় প্রভু বান্দার বিচ্যুতিগুলো ক্ষমা করে দেন, মুছে দেন তার ভুল-ত্রুটি ও পঙ্কিলতা। আমাদের প্রিয় নবিজি বলেছেন,

মুসলমান বান্দা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুঃশ্চিন্তা, রোগ-ব্যাধি, ক্লান্তি-শ্রান্তি এবং ক্ষয়-ক্ষতি যে বিষয়েরই সম্মুখীন হয়; এমনকি কাঁটাও যদি বিঁধে, তবে তার দ্বারা আল্লাহ বান্দার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন। [মুসলিম]


আবার কখনো দয়াময় প্রভু বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, দান করেন তাকে প্রভূত মর্যাদা এবং বিপুলতা দান করেন তার পুণ্যে। প্রিয় নবিজির চমৎকার হাদিসটি সেই আশার বাণীই শোনাচ্ছে,

হজরত সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবিজিকে জিজ্ঞেস করলাম : হে আল্লাহর রাসুল! লোকদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়? নবিজি উত্তর দিলেন, নবিগণ। তারপর যারা নবিগণের অধিক সাদৃশ্য ধারণ করেন, তারপর যারা নবিগণের অধিক সাদৃশ্য ধারণ করেন (নেককার বান্দাগণ)। বস্তুত বান্দাকে তার ধর্মাচারের দৃঢ়তা অনুপাতে পরীক্ষায় ফেলা হয়। সুতরাং ধর্মাচারে যদি সে দৃঢ় হয়, তবে তার উপর নেমে আসা পরীক্ষাও হয় কঠিন। আর যদি সে ধর্মাচারে নমনীয় হয় , তবে সে অনুপাতেই তার উপর পরীক্ষা আপতিত হয়। দুঃখ-দুর্দশা সবসময় বান্দার পেছনে লেগে থাকে, আর তা যখন তাকে ছেড়ে যায় তখন বান্দার অবস্থা হয়— বান্দা জমিনের উপর গুনাহমুক্ত হয়ে চলাফেরা করে। [তিরমিজি]


আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে নবিগণই সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু কেন আল্লাহ তার প্রিয়তম বন্ধুদের এত পরীক্ষায় কেন ফেলেছেন? যাতে আল্লাহর বান্দারা পরীক্ষা ও বিপদ-আপদে পড়ে ধৈর্যহারা না হয়। সত্যপথ থেকে বিচ্যুত না হয়। শিক্ষা নেয় সর্বশ্রেষ্ঠ মানবদের থেকে। আল্লাহ প্রিয় নবি-রাসুলগণের জীবনচরিত থেকে। যাদের প্রত্যেকেই ছিলেন পুত-পবিত্র। এবার দেখুন—আরেকটা হাদিস বলে ফেলি, আশা করি তা আপনার ভেতর প্রশান্তির এক হিমেল হাওয়া বইয়ে দেবে। প্রিয় নবিজি দিকনির্দেশনা দিয়ে কী চমৎকার বলেছেন—

যে ব্যক্তি আশা করে যে, দুর্দশা ও বিপন্নতার সময়ে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেবেন, তবে তার জন্য উচিত স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে বিপুল পরিমাণে আল্লাহকে ডাকা। [তিরমিজি, হাকিম]


*****


প্রিয় নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাহকে উৎসাহিত করেছেন—সুখে-দুঃখে, আনন্দ-আহ্লাদে কিংবা কষ্ট-বিষাদে সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার কাছে হাত পাততে। নিজের আত্মার আকুতি ও হৃদয়ের মিনতি মহান প্রভুর কাছে পেশ করতে। প্রিয় নবিজি এতে এত বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন যে, আনাস রাদি. তো বলেন, নবিজি আমাদের বলেছেন,

তোমাদের প্রত্যেকের তো উচিত সকল চাওয়া ও প্রয়োজনের কথা নিজের প্রতিপালকের কাছে পেশ করা। এমনকি জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলে সেটাও। [তিরমিজি]


বাস্তবিকপক্ষে বান্দার তো উচিত নিজের সবকিছুর কথা প্রথমে নিজের প্রভুকে জানানো। নিজের সব মিনতি তাঁর কাছে পেশ করা। কারণ বলা তো যায় না, কখন তার রহমতের দরিয়ায় জোয়ার আসে। বান্দা লাভ করে তার রবের অপার অনুগ্রহের হাতছানি।


তাই একজন মুমিন বান্দার উচিত—সুখে-দুখে সর্বাবস্থায় নিজের সবকিছুর জন্য মহান প্রতিপালকের কাছে চাওয়া। হাত পাতা। দুআ করা, যেমন দুআ শিখিয়েছেন আমাদের প্রিয় নবিজি।


اللَّهُمَّ آتِنَا في الدُّنْيَا حَسَنَةً وفي الآخِرَةِ حَسَنَةً، وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ


হে আল্লাহ! আমাদের দান করুন আপনি পার্থিব জীবনেও কল্যাণ এবং পরকালের জীবনেও কল্যাণ। আর আমাদের রক্ষা করুন জাহান্নামের আগুন থেকে। [মুসলিম]


اللَّهُمَّ إنِّي أَسْأَلُكَ الهُدَى وَالتُّقَى، وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى...


হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি— হেদায়েত, তাকওয়া, স্বচ্ছতা এবং স্বচ্ছলতা। [মুসলিম]


اللَّهُمَّ اغْفِرْ لي وَارْحَمْنِي وَاهْدِنِي وَارْزُقْنِي


হে আল্লাহ! আপনি আমাকে করে দিন। আমার প্রতি দয়া করুন। আমাকে হেদায়েতের উপর অবিচল রাখুন এবং আমাকে রিজিক দান করুন। [মুসলিম]


اللهم إني أعوذُ بكَ منَ الهمِّ والحزَنِ، وأعوذُ بكَ منَ العجزِ والكسلِ، وأعوذُ بكَ منَ الجُبنِ والبخلِ، وأعوذُ بكَ مِن غلبةِ الدَّينِ وقهرِ الرجالِ


হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে। আশ্রয় প্রার্থনা করি অক্ষমতা ও অলসতা থেকে। আশ্রয় প্রার্থনা করি কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে। আরো আশ্রয় প্রার্থনা করি অতিরিক্ত ঋণ এবং সবার ক্রোধ থেকে। [জামি সাগির]


اللَّهُمَّ إنِّي أَعُوذُ بكَ مِن زَوَالِ نِعْمَتِكَ، وَتَحَوُّلِ عَافِيَتِكَ، وَفُجَاءَةِ نِقْمَتِكَ، وَجَمِيعِ سَخَطِكَ


হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি আপনার দান করা নেয়ামত দূর হওয়া থেকে, সুস্থতা অসুস্থতায় পরিবর্তিত হওয়া থেকে, আকস্মিক শাস্তি থেকে এবং সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে। [মুসলিম]


২৮৮ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

ফাহাদ আব্দুল্লাহ। পড়াশোনা মাদরাসা থেকে। তাদাব্বুরে কুরআন, সিরাত ও ইতিহাস নিয়ে সময় কাটাই। ইসলামি সমাজ বিনির্মাণই জীবনের প্রধান লক্ষ্য। দাওয়াহর জন্য টুকটাক লেখালেখি করি। এখনও পর্যন্ত ইতিহাসের উপর একটা অনুবাদ ও একটা মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উম্মাহর জন্য কিছু করে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি।

মন্তব্য

১ টি মন্তব্য করা হয়েছে
শাহেদ আহমেদ

শাহেদ আহমেদ

১০ অক্টোবর, ২০২০ - ২৩:৪৭ অপরাহ্ন

কয়েকদিন থেকে অনেক দুশ্চিন্তায় ভোগছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ লেখাটি পড়ে অনেক প্রশান্তি পেলাম। জাযাকাল্লাহ খাইরান

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ফাহাদ আব্দুল্লাহ

ফাহাদ আব্দুল্লাহ

১৩ অক্টোবর, ২০২০ - ০১:০৪ পূর্বাহ্ন

আল্লাহ আপনাকে সবসময় প্রশান্ত রাখুন।

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...