ব্যর্থ মানুষদের ১০টি বদভ্যাস
ভালো গুণ কী কী আছে তা না খুঁজে, নিজের বদভ্যাসগুলো পরিত্যাগের চেষ্টা করুন।

জীবনে প্রথম যেই সফল মানুষকে দেখেছিলাম, যদ্দুর মনে পড়ে—তিনি একজন উদ্যোক্তা। তাঁর অনেক বড়ো বড়ো অর্জন ছিল। বড়ো স্বপ্ন ছিল। আমার কাছে সফল ও সার্থক মানুষের প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন তিনি। আমি তাঁর মতো হতে চাইতাম। তখন তাঁর বয়স চল্লিশের কোঠায়। তিনি আমার একজন গ্রাহক ছিলেন। আমার বয়স তখন চব্বিশ বছর। নতুন কিছু শিখতে খুবই আগ্রহী ছিলাম। সবসময় শেখার একটা উত্তেজনা ভেতরে কাজ করত। তাকে আমি সবসময় হাসিখুশি দেখতাম। তাঁর টাকা-পয়সাও ছিল প্রচুর।

সময় গড়াতে গড়াতে একসময় আমরা পরস্পর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হলাম। একদিন জানলাম, আমাদের সাক্ষাতের পাঁচ বছর পূর্বেই তিনি তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়েছেন। এই ক্ষতি পোষানোর মতো নয়।  প্রিয়জন হারানো এই মানুষটির চিন্তাধারা আমার খুব ভালো লাগত। অনেক বিপদ-আপদের ভেতরেও তিনি তাঁর সময় ও অর্থের সদ্ব্যবহার করেছেন। তাঁর আরেকটি ভালো গুণ ছিল; তিনি মানুষকে খুবই আপন করে নিতে পারতেন।


তিনি প্রায়ই আমাকে বলতেন—

ব্যর্থ না হওয়ার চেষ্টা চালানোই সফলতার গোপন সূত্র।


একদিন আমার কাছে রহস্য উন্মোচন করেছিলেন, মানুষ কেন সুখের সন্ধান পায় না, কেন ভেঙ্গে পড়ে এবং কেন তার পথ চলা থেমে যায় ইত্যাদির। তিনি বলেছিলেন, তিনি এসব নিয়ে ভাবেন, জানার চেষ্টা করেন, তারপর সিদ্ধান্ত নেন, তিনি একই ভুলগুলো বারবার করবেন না। আমার কাছে মনে হলো, তাঁর চিন্তা যথার্থ। ‘এটি করলে, ওটি পাব’—এমন গতানুগতিক চিন্তাই আমরা সাধারণত করি। সফলতা আসলে এত সহজলভ্য ও অনুমানযোগ্য কোনো বিষয় নয়। তাই অন্যরা  কীভাবে সফল ও সার্থক হলো তা না দেখে, আমি আমার সেই বন্ধুর উপদেশমতো চলতে লাগলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যেভাবেই হোক—সেসব অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যেগুলো আমার লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্তরায় হয়ে আছে। চলুন দেখে নিই এমন ১০টি বদভ্যাস যেগুলো আমারা নিজেরাই তৈরি করি। আর নিঃসন্দেহে যেগুলো আমাদের লক্ষ্য অর্জনের পথে অনেক বড়ো প্রতিবন্ধক হয়ে আবির্ভূত হয়। আপনার মধ্যে যদি এগুলোর কোনোটা থাকে, তবে নিজেকে নিয়ে একটু ভাবুন এবং নিজের ভেতর আমূল পরিবর্তন আনার চেষ্টা করুন। 


১। সবসময় অন্যমনস্ক থাকা

গ্রেগ মিকইউন একজন টাইম ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট। তিনি তাঁর Essentialism নামক বইয়ে তাঁর এক বন্ধুর গল্প লিখেছেন—সেই বন্ধু একটি চাকরি ছেড়ে দিয়ে আরেকটি চাকরি খুঁজছিল। সে মিকইউনের কাছে এ ব্যাপারে পরামর্শ চায়। সেই ধারাবাহিকতায় তারা একদিন সাক্ষাৎ করে। কথা বলার সময় হঠাৎ তাঁর  বন্ধু মোবাইলে টাইপ করা শুরু করে। মিকইউন বলেন, ১০ সেকেন্ড চলে যায়... তারপর ২০ সেকেন্ড... এভাবে অনেক সময়। তবুও সে চ্যাটেই ব্যস্ত। এভাবে কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সেই বন্ধু চলে যায়।

আমি যখন কাজে মনোযোগ দিতে পারি না, তখন আমি এই গল্পের কথা ভাবি। নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিই, যে-মুহূর্তে যার সাথে আছি, সেখানে মনোযোগ দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ মিকইউনের সেই বন্ধুটি যদি অন্যমনস্ক না হতো, নিজের সমস্যা সমাধানে মিকইউনসহ ভাবত, তবে সে সুন্দর একটি পরামর্শ যেমন পেত; হয়তো তার সুবাদে একটি চাকরিও জুটিয়ে নিতে পারত। 


২। অগ্রিম কথা বলা

‘আমি ম্যারাথন দৌঁড়-প্রতিযোগিতার জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছি’, ‘আমি একটি ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছি’—ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অগ্রিম বলে বেড়ানোর চেয়ে ওটা বাস্তবায়ন করাই উত্তম। উদ্যোক্তা ডেরেক সিভারস ২০১০ সালে টেড টকে একটি বক্তব্য দেন। ‘তোমার লক্ষ্যকে নিজের মধ্যেই রাখ’-এই শিরোনামের আলোচনায় তিনি দেখান যে, নিজের পরিকল্পনা সর্বত্র প্রচার করলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। আপনি ভালো কিছু করার ইচ্ছা পোষণ করে তা অন্যদের জানালেন, তারা আপনার প্রশংসা করল; আর এইটুকু প্রশংসা পেয়ে আপনার মধ্যে আত্মতুষ্টি চলে আসল। ফলে কাজের কাজ কিছুই হলো না। উলটো ক্ষতিই হলো!

‘আপনি যখন অন্যকে আপনার পরিকল্পনার কথা বলেন, এবং অন্যরা সেটার স্বীকৃতিও দেয়, তখন মনোবিজ্ঞানীরা এটাকে বলেন—সামাজিক বাস্তবতা ।’ সিভার তার আলোচনায় আরো বলেন, ‘অন্যদের কাছে এই সস্তা স্বীকৃতি লাভের পর আপনার মন বলে, কাজটি তো করেই ফেললাম। যেহেতু আপনি এটুকুতেই সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন, এখন বাস্তবে কাজটি করতে যে পরিশ্রম করা দরকার, তা করতে আপনি আর অনুপ্রাণিত হবেন না।’ এর ফলে আপনি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলেন।

আপনার আনন্দ অন্যের সাথে ভাগাভাগি করতে দোষ নেই। কিন্তু ভালো কোনো সংবাদ না পাওয়ার আগ পর্যন্ত কেবল আপনার ‘ইচ্ছা’ কী সেটা বলে বেড়ানোর প্রয়োজন কোথায়?!


৩। ভুল মানুষদের সাথে সময় ব্যয়

যেসব বন্ধুর সাথে আপনি সময় কাটান, তারা আপনাকে সেরা ব্যক্তি হতে যেমন উৎসাহিত করতে পারে, ঠিক একইভাবে তারা আপনার ভালো কিছু করার ইচ্ছাকে একেবারে নষ্টও করে দিতে পারে। ধরুন, আপনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে চান। তাহলে আপনি সেসব বন্ধুর সাথে সময় কাটান, যারা আপনাকে এই ইতিবাচক পরিবর্তনে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করবে। অন্যদিকে এই লক্ষ্য অর্জনে আপনি কি পুরোপুরি ব্যর্থ হতে চান? যদি চান, তাহলে বিভিন্ন বদভ্যাসে অভ্যস্ত বন্ধুদের সাথে সময় কাটান। ব্যস, আপনার সব স্বপ্ন মাটি হয়ে যাওয়া। মোদ্দাকথা হলো, মানুষ একে অপরের ভালো ও মন্দ অভ্যাস দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই যে ব্যক্তি সফল হতে চায়, তাকে সতর্কতার সাথেই নিজের বন্ধু বাছাই করে নিতে হবে।


৪। সবসময় নেতিবাচক চিন্তা করা

আমার সেই উদ্যোক্তা বন্ধুর মতো আপনিও বিপদ-আপদে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করুন। সব জিনিসের মধ্যে মন্দটি না খুঁজে তার ভেতরের ভালো দিকটি বের করে আনার চিন্তা এবং চেষ্টা দুটিই করুন। দেখুন, অনেক লোক আছে যারা সবসময় শুধু শুধু অভিযোগ করে—‘ধুর! সকালে বৃষ্টির কারণে জুতোগুলোই ভিজে গেল’! এ জাতীয় হাস্যকর অভিযোগও অনেকে করে থাকে। আপনি আবহাওয়া বদলাতে পারবেন না। আপনি বরং আরেক জোড়া জুতো পরতে পারেন। জীবনে খারাপ পরিস্থিতি আসবেই। যা একেবারেই সাময়িক সময়ের জন্য। কিন্তু আপনি যদি সবসময় সবকিছু নিয়ে নাক সিটকান, তবে আপনার জীবন বিষিয়ে উঠবে—এটা নিশ্চিত!


৫। কালক্ষেপণ

কলেজে পড়াকালীন একবার আমার প্রফেসরকে একটু বাড়তি সময় দিতে বলেছিলাম; থিসিস জমা দেওয়ার জন্য। তিনি কী বলল জানেন? ‘সপ্তাহখানেক সময় দেওয়া যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সময়টা বাড়ালে তোমার লেখাটি কি আরো সুন্দর হয়ে যাবে?

আমরা দুজনই জানতাম, এর উত্তর হলো ‘না’। তারপর আমি থিসিসের কাজ যথাসময়ে শেষ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করলাম। আমি আপনাকে বলব—কেবল তখনই দেরি করুন, সময় নিন; যখন সেই অতিরিক্ত সময়ে আপনি আরো ভালো কিছু করতে পারবেন। আর যদি আন্দাজ করতে পারেন, সময় নিয়ে কাজটায় আহামরি কোনো পরিবর্তন আনতে পারবেন না। তাহলে বাড়তি সময় নেওয়ার চিন্তা বাদ দিন। কাজটি এখনই করে ফেলুন। প্রয়োজনে কঠিন পরিশ্রম করুন...


৬। ভালো শ্রোতা না হওয়া

ভালো শ্রোতা হলে, আপনাকে যে কোনো বিষয়ে সঠিক পথের সন্ধান পেতে বেগ পেতে হবে না। মূল্যবান ও অন্তরঙ্গ সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখতেও এটি দরকার। সবাই আনুষ্ঠানিক কোলাকুলি করে। কিন্তু কয়জনে খোঁজ নেয়—‘কেমন আছ?’ বলে। তাই অন্যকে সময় দিন, তাকে প্রশ্ন করুন, তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং গুরুত্ব দিন। আপনিও অন্যের কাছে গুরুত্ব পাবেন।


৭। অলসতা

জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন আমরা আমাদের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে চাই। অনেকসময় বাসা থেকে বের হওয়াটাই কষ্টকর মনে হয়। এমনকি তা মজার কোনো কাজের জন্য হলেও। কিন্তু নতুন নতুন অভিজ্ঞতাই তো জীবনকে সুন্দর করে তুলে। আপনি যখন অলসতায় নিমজ্জিত হন, তখন আপনি প্রকৃতপক্ষে নিজের জীবনটাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। যেটি আপনার বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, ব্যবসার অংশীদার ও অন্য লোকদের কাছেও আপনাকে খাটো করে। তারা আপনাকে হয়ত বলে না।


৮। অনুসন্ধিৎসু না হওয়া

একটা সময় ছিল যখন কৃষকের ছেলে কৃষকই হতো। মেয়েদের পেশা পছন্দ করার কোনো অধিকার ছিল না। এবং নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরের বিষয়ে জানার সুযোগও ছিল সীমিত। কিন্তু আজকাল নতুন বিষয় জানার সুযোগ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। অবশ্য কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অবশ্য অবস্থা যত উন্নতই হোক সেটা থাকবেই। তবে অনস্বীকার্য বাস্তবতা হচ্ছে—যারা তথ্যের অবাধ প্রবাহের সুযোগ নিতে জানে, যারা পড়াশোনা করে, যারা প্রশ্ন করতে জানে, এবং যাদের অনুসন্ধিৎসু একটি মন আছে, তারা নিজের সুন্দর ভবিষ্যত বিনির্মাণে বেশি সামর্থ্য রাখে।


৯। সুন্দর মনের মানুষ না হওয়া

একজন সুন্দর মনের মানুষ হোন। আপনি যদি না বোঝেন, সুন্দর মনের মানুষ হওয়ার মাহাত্ম্য কী? তাহলে আমি বলব, আদতে আপনি একজন অবুঝ ও অপরিপক্ক মানুষ।

মনে রাখবেন! আত্মিক প্রশান্তি ও সফলতা অর্জনের অনিবার্য একটা ধাপ হচ্ছে—সুন্দর মনের মানুষ হওয়া!


১০। হাল ছেড়ে দেওয়া

সফলতা লাভের নিশ্চিত পথ হলো, ব্যর্থ হলে পুনরায় চেষ্টা করা।

কথাটা টমাস এডিসনের। সফলতাকে আপনি যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুন না কেন, তা চেষ্টা ছাড়া কখনো আসে না। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি আসে বার বার ব্যর্থ হওয়ার পর।  



৫৩৮ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

Author of 6 books, including What It Takes To Be Free. I share daily self-improvement tips about productivity, habits, decision making, personal finance, etc.

অনুবাদক পরিচিতি

মন্তব্য

৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
হাফিজ আহমদ

হাফিজ আহমদ

০৮ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৬:৩০ অপরাহ্ন

খুবই উৎসাহ পেয়েছি।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবুনছর

আবুনছর

০৮ নভেম্বর, ২০১৯ - ২০:৩২ অপরাহ্ন

নতুনভাবে উদ্দিপনা নিয়ে কাজে নেমে পড়বো আজ থেকে ইনশাআল্লা।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আব্দুল বারী

আব্দুল বারী

০৮ নভেম্বর, ২০১৯ - ২২:৩৬ অপরাহ্ন

গুরুত্বপূর্ণ লেখা । অসংখ্য ধন্যবাদ ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...