মুহাম্মাদ মুরসি : ইতিহাসের আকাশে নিভে যাওয়া এক তারা


মিসর। মুসলিম উম্মাহর গৌরবোজ্জ্বল অতীত। ইসলামের স্বর্ণোজ্জ্বল বহু শতাব্দীর ইতিহাস। মিসর... ইতিহাসের মহান সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়্যুবির মিসর। ঈমানদারদের চেতনার সূতিকাগার। মিসর... আল্লাহর দুশমনদের আতঙ্ক সুলতান রুকনুদ্দীন বাইবার্সের মিসর। মুসলমানদের প্রেরণার বাতিঘর। মিসর ঈমানদারদের চেতনার ক্যানভাস। মিসর মুসলিম উম্মাহর প্রেরণার এক সবুজ দিগন্ত। মিসর উম্মাহর ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মিসর মুমিনের হৃদয়ের স্পন্দন। এই মিসর থেকেই সবসময় ইসলামের বিজয়েরর সূচনা হয়েছে। এই মিসর সবসময় ইসলামকে আগলে রেখেছে। এই মিসরে আল্লাহ সবসময় জানবায মুজাহিদ দান করেছেন। এই মিসর সবসময় কালেমা খচিত জয়ের কেতন উড্ডীন রেখেছে। এই মিসর সবসময় ইসলামের পতাকাকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। এই মিসর ইমাম হাসান আল বান্না শহিদের সংগ্রামী জীবনের বিক্ষুব্ধ স্রোতের মিসর। এই মিসর তো মহাকালের ইতিহাসের ধ্রুবতারা সাইয়্যেদ কুতুব শহিদের রেনেসাঁর মিসর।


 ইহুদি-খ্রিষ্টানদের শ্যেনদৃষ্টি সবসময় এই মিসরের উপর নিবদ্ধ। তারা মিসরকে দমানোর সব অপচেষ্টা চালিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কারণ ইসলামি রেনেসাঁকে দমাতে হলে মিসরকে দমিয়ে রাখতে হবে। কারণ জিহাদের আগুনকে নেভাতে হলে—মিসরের ইসলামকে মৃতপ্রায় করে ফেলতে হবে। উসমানি খিলাফতের পতনের পর খিলাফত আন্দোলনে এই মিসরই ছিল সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। রেনেসাঁর পথিকদের হাতে হাত রেখে মিসর সবসময় ইসলামের পক্ষে অনেক বড়ো শক্তি রূপেই আবির্ভূত হয়েছিল। ইসলামি আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল। কিন্তু... কিন্তু ফিরআউনের প্রেতাত্মারা কখনো থেমে ছিল না। ইবলিসের দোসররা কখনো শান্ত ছিল না। কাফেরদের মানসদাস মুনাফিকরাও কখনো স্থির ছিল না। মিসর যখনই ইসলামের জন্য নিবেদিত হয়... যখনই ইসলামি চেতনায় জেগে ওঠে... তখনই ভয়ে তাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। 

তখন তাদের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়—যেভাবেই হোক মিসরকে থামাতে হবে। কারণ মিসরকে না থামালেই বিপদ।


উসমানি খিলাফত বিলুপ্ত হয়েছে, তো কি হয়েছে? এদের না থামালে আবারও মুসলিম বিশ্ব কারও নেতৃত্বে একসাথ হয়ে যাবে। একত্রিত হয়ে আবারও আল্লাহর দুশমনদের কোমর ভেঙ্গে দেবে। আল্লাহর দুশমনরা এতো অশান্ত হয়ে পড়ে কেন? কারণ তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছে। ইতিহাসের শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরেছে। তারা দেখেছে—সলিব-হেলালের লড়াই যখন তার পূর্ণ যৌবনে ছিল, মিসর থেকে এক সালাহউদ্দীন আইয়্যুবিই তাদের অগ্রযাত্রা রুখে দিয়েছিল। সব তছনছ করে দিয়েছিল। তারা দেখেছে—লেভান্ট আর আরববিশ্বকে যখন তারা গিলে ফেলেছিল, এক রুকনুদ্দীন বাইবার্সই তাদের দাফন করে ছেড়েছিল। সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। তারা শিক্ষা নিয়েছে—আব্বাসি খিলাফত বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, কিন্তু এই মিসরই আবার খিলাফতকে জিন্দা করেছে। উম্মাহকে হারানো ‘খিলাফতের সম্মান’ ফিরিয়ে দিয়েছে। আল্লাহর দুশমনরা শিক্ষা নিয়েছে এবং শপথ করেছে—আর যা-ই হোক, মিসরকে কখনো জাগতে দেওয়া যাবে না। মিসরের ঈমানদারদের চেতনাকে কখনো শাণিত করার ফুরসত দেওয়া যাবে না! কে জানে, কখন আবার কোন আইয়্যুবি জন্ম নেয়? কোনো বাইবার্স চিতার মতো খাবলে ধরে?


তারা ইমাম হাসান আল বান্নাকে শহিদ করে ভেবেছে, মিসরের ইসলাম মনে হয় শেষ! কিন্তু আল্লাহ আবারও সাইয়্যেদ কুতুবের মতো অকুতোভয় মুজাহিদ দান করেছিলেন মিসরকে। সাইয়্যেদ কুতুবও ইসলামের পতাকা হাতে শহিদ হয়ে যান। চারদিকে আল্লাহর দুশমনদের জয়জয়কার... এবার হাসান-কুতুবের বিপ্লবের ইশতেহার ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন একজন বিপ্লবী নেতার। আল্লাহ এবারও মিসরকে দান করলেন—একজন সংগ্রামী ও বিচক্ষণ নেতা। ইতিহাসের আকাশে উদিত হওয়া জ্বলজ্বলে স্নিগ্ধ তারা মুহাম্মাদ মুরসি-কে।


মুরসির পুরো নাম মুহাম্মাদ মুরসি ইসা আইয়াত। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে জন্মগ্রহণ করেন মিশরের শারকিয়া জেলার আদওয়া নামক গ্রামে। বাবা পেশায় কৃষক ছিলেন আর মা গৃহিণী। তিন ভাই ও দুই বোনের পরিবার। তিনিই সবার বড় ছিলেন। দারিদ্র্যের কষাঘাত সয়ে বড় হওয়া এই ছেলে পরবর্তী জীবনে হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। দুস্থদের মায়ায় সতত অস্থির ছিল। মায়া ও মমতা তার জীবনের এক বিস্তৃত অধ্যায় দখল করে নিয়েছিল। সাম্যের পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখা এই ছেলেটি তার রাজনৈতিক জীবনে বুঝতেই পারেনি—মায়া, মমতা, ভালোবাসা, ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সে যে ভুল পথে হেঁটেছিল। আসলে সবই হয়তো নিয়তির নির্মমতা!

শৈশবে গ্রামেই হিফজ সম্পন্ন করে মুরসি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষারও সেখানেই পাঠ চুকায়। গ্রাম্য পরিবেশে থেকে অন্য আট-দশটা ছেলের মতো শৈশবের উচ্ছলতায় মেতে ওঠেনি বালক মুরসি। তখন থেকেই দ্রোহ, দেশপ্রেম আর মাজলুম মানবতার জন্য হাহাকার করত তার হৃদয়কন্দর। আশৈশব ইসলাম কায়েমের স্বপ্ন লালন করা সেই ছেলেটি একসময় তার স্বপ্ন পূরণের জন্য মিসরের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসতে পেরেছিল। কিন্তু সে তার ভুল বুঝতে পারেনি... যখন বুঝতে পেরেছে, পানি বহুদূর গড়িয়েছে।


 গ্রামের মেঠোপথ মাড়িয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য মুরসি কায়রো আসেন এবং ১৯৭৫ সালে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক আর ১৯৭৮ সালে একই সাবজেক্টে গ্রাজুয়েট করেন। তারপর সেই বছরই উচ্চতর শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান—যুক্তরাষ্ট্রে। আর ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষা-জীবনের প্রবাহ থামিয়ে দিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন মুরসি। তখনই মুরসির হৃদয়ে ভালোবাসার তরঙ্গাভিঘাত হয়। যৌবনে উচ্ছ্বাস আসে। ভেতরে ভেতরে অজানা কাউকে নিয়ে সুখের সংসার গড়ে ওঠে। স্বপ্নিল অধরা প্রেমময় জীবন হাতছানি দিয়ে যায়। 

মুরসির সব অধরাকে ধরিয়ে দিতেই মুরসির জীবনসঙ্গিনী হয়ে আসে সতের বছরের চাচাতো বোন লাজুক নাজলা। মুরসির এতদিনের ‘অধরা প্রেম ও আধুরা ভালোবাসা’—নাজলা তাকে সবই দিল ষোলকলা পূর্ণ করে। এক টিভি সাক্ষাতকারে মুরসি চমৎকারভাবে স্বীকার করেছিলেন, “নাজলাকে বিয়ে করা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা”। সেই সফলতার সূত্র ধরে আর ভালোবাসার আবেশেই নাজলা মুরসিকে উপহার দিয়েছিল তাদের আকাশের পাঁচটা তারা—আহমাদ, উসামা, উমর, আব্দুল্লাহ আর শায়মা । সময় বহতা নদীর মতোই বয়ে যাচ্ছিল... জীবন নদীও ছিল বহমান...


১৯৭৫-৭৬ সময়টায় মুরসি সেনাবাহিনীতেও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা লাভের অদম্য আশা তাকে আবারও শিক্ষাঙ্গনে আসতে বাধ্য করেছিল। ওদিকে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ডিগ্রি লাভ করার পর সেখানেই অধ্যাপক হওয়ার অফারও পেয়ে যান। ১৯৮২-৮৫ পর্যন্ত মুরসি সেখানেই অধ্যাপনায় নিযুক্ত থাকেন। তারপর দেশে ফিরে জাকাজিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানেই থিতু হয়েছিলেন। 

দল, আদর্শ ও ভাবধারায় মুরসি ছিলেন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের অনুসারী ও সদস্য। ১৯৭৭ সাল থেকেই ইখওয়ানের সাংগঠনিক অবকাঠামোর সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে ইখওয়ান যখন রাজনৈতিক শাখা গঠন করে, তখন তিনি সদস্য হয়ে কাজ করেন। তারপর সময় না গড়াতেই তিনি সর্বোচ্চ কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। আর ২০০০ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাংগঠনিক জটিলতায় ইখওয়ানের অন্যান্য নেতাদের মতো তাকেও স্বতন্ত্রভাবে লড়তে হয়। যার কারণ খতিয়ে দেখলে বেরিয়ে আসে, তারও আগে হোসনি মোবারকের শাসনামলে ইখওয়ানকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সাংসদীয় সময়টায় সংসদে বিশেষ ভূমিকার জন্য তিনি সারাবিশ্বে শ্রেষ্ঠ সাংসদ সাব্যস্ত হন। অবশ্য এই সময়টাতে মুরসি কয়েকবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। 

তন্মধ্যে ২০০৬ সালে বিচারক নিয়োগে অনিয়মের জন্য ডাকা বিক্ষোভ মিছিলে রাবেয়া স্কয়ার থেকে তিনি গ্রেপ্তার হন। আরব বসন্ত শুরু হলে সমগ্র আরব জনগণ যখন বিক্ষোভে ফেটে পড়ছিল, মিসরেও তখন ইসলামপন্থীদের উপর চলছিল নির্যাতনের খড়গ। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ২৮ জানুয়ারি আরও ২৪ জন ইখওয়ান নেতার সাথে মুরসিও গ্রেপ্তার হন। ঠিক তারপরের সময়টাতেই মুরসির জীবনে নেমে আসে এক অন্যরকম বৈচিত্র্য। গ্রেপ্তার হওয়ার দুই দিন পরই মুরসি কায়রোর জেল থেকে পালিয়ে যান।


 তারপর রাষ্ট্রীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট আসে। ২০১২ সালের ৩০ জুন। এই প্রথম মিসরের মাটিতে অবাধ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইখওয়ান থেকে রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থী ছিলেন ইখওয়ান-নেতা খাইরাত আশ-শাতির। কিন্তু ঠুনকো কিছু অজুহাত দেখিয়ে নির্বাচন কমিশন শাতিরসহ আরও অনেক নেতাকেই নিষিদ্ধ করে দেয়। ঠিক তখনই পদপ্রার্থী হিসেবে নাম ওঠে আসে মুরসির। শেষমেশ ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি মুরসির মনোয়নকে চূড়ান্ত করে। অবশেষে ষড়যন্ত্রের সাগর পাড়ি দিয়ে আর চক্রান্তরের পাহাড় ডিঙিয়ে ২০১২ সালের নির্বাচনে মুরসি বিজয়ী হন। তখনকার মুরসির মুখের হাসি আর জেলের মুরসির মুখের হাসি... একই মুখেরই হাসি। কিন্তু আমার কাছে জেলে বন্দি মুরসির হাসি পবিত্র মনে হয়েছিল। যা অনুশোচনার পানিতে ধোয়া ছিল। জানি না, বন্দি হওয়ার পর সত্যিই মুরসি বাস্তবতা বুঝতে পেরেছিলেন কি না? গণতন্ত্র যে আলোআঁধারির খেলা, এটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন কি না?! রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরই নিয়মানুযায়ী তিনি ইখওয়ান ও ফ্রিডম থেকে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি নেন। 

তারপর থেকেই মিসরের গতি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করল। নীলের পানি আবারও প্রবাহ হতে শুরু করে কল্যাণের দিকে। নতুন মিসরের পথচলা শুরু হল। প্রথমেই তিনি ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত করলেন মিসরকে। শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে উন্নয়ন সাধন করলেন। খাদ্য ও উৎপাদনে মিসরকে স্বনির্ভর রাষ্ট্র বানাতেও সক্ষম হলেন। পুরো দেশে সুখ ও শান্তির বাতাস বইয়ে দিলেন। তাছাড়াও তিনি নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহর পক্ষে কথা বলতেন। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে হুংকার ছেড়ে বলেছিলেন, “এখন আর ফিলিস্তিনিরা একা নয়...”। রাফাহ ক্রস ও সুড়ঙ্গ পথ খুলে দিয়েছিলেন। তেল আবিব থেকে মিসরীয় দূতাবাস সরিয়ে নিয়েছিলেন। প্রকাশ্যে হামাসকে সমর্থন করেছিলেন। তিনি সবসময় ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ফাইরুজ মিলিয়ন সিটি এবং সিনাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল সেই যুদ্ধেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসরাইল তা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল এবং প্রস্তুতিও শুরু করেছিল এই আপদকে সরানোর। তাছাড়া পশ্চিমাদের চোখে মুরসির আরেকটা অপরাধ (!) ছিল যে, তিনি আমেরিকাকে রীতিমত বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে সিরিয়া বিষয়ে বিশ্বের ইসলামি স্কলারদের হস্তক্ষেপ কামনা করে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন থেকে গ্লোবাল ইবলিসি সোসাইটি তাকে পুরোদমে বিপদজনক মনে করতে শুরু করে।


তারপর যখন তিনি মিসরের সংবিধানেও হাত দিলেন, তাহরির স্কয়ারে দাঁড়িয়ে তার ভাষণে উদ্দীপ্ত কণ্ঠে বললেন—“আজ থেকে মিসরের সংবিধান আল্লাহর কুরআন…” ঠিক তখনই ফিরআউনের প্রেতাত্মাগুলো অনলে জ্বলার মতো ছটফট করতে শুরু করে ওঠে। আর আলে সৌদ তো ততদিনে ভয়ে তটস্থ। ব্যস, মুসলিম নামধারী গাদ্দার আর অপশক্তিগুলো মিলে যা করল, পৃথিবীর ইতিহাস এবং পৃথিবীবাসী তার সাক্ষী!! কিন্তু মুরসির জন্য আমার অফসোস... মুরসি গণতন্ত্রের চাকচিক্যে মজে গিয়েছিলেন। ইসরাইল-আমেরিকা আর মুসলিম নামধারী গাদ্দারদের সাথে মোকাবেলা করার কৌশল রপ্ত করবেন… যেখানে আপনদের থেকেও তার সতর্ক হওয়ার কথা, সেখানে তিনি পরদের উপরও ভরসা করে বসলেন। ইতিহাসের নির্মমতার আবারও পুনরাবৃত্তি হল। এক বছর না গড়াতেই পর্দার আড়ালের ইশারায় মুরসি সরকারের পতন হল। পতনের নায়ক হল সেই সরকারেরই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধান ইতিহাসের কলঙ্ক, উম্মাহর বিষফোঁড়া, আতাতুর্কের মানসসন্তান কুখ্যাত আবদুল ফাত্তাহ সিসি। 

মুরসির প্রতি অনাস্থা এবং জনবিক্ষোভের কথা জানিয়ে সংবিধান স্থগিত করে দেয় এই খবিস, মুনাফিক। বিচারপতি আদলি মানসুরকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান ঘোষণা করা হয়। মুরসিকে গ্রেপ্তার করে অজ্ঞাত স্থানে বন্দি করে ফেলা হয়। কয়েকমাস পর আদালতে হাজির করে কারাগার থেকে পলায়ন এবং হামাসের সাথে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ২০১৫ সালে যথাক্রমে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।


আহ... মুরসি... কিসের উপর ভরসা করে নির্লিপ্ত ছিলেন? আপনি কুরআন পড়েননি? আহ... মুরসি... কাদের উপর ভরসা করেছিলেন? সেই কাফেরদের উপর, যারা আপনার চোখের সামনেই সেকুলারিজমের হাত ধরে ইসলাম কায়েমের স্বপ্নে বিভোরদেরও মুহূর্তের মধ্যে ইতিহাসের পাতার অংশ বানিয়ে ফেলেছে! আপনি হয়তো ভাবতেও পারেননি কিংবা ভালো করেই জানতেন যে, তারা আপনাকেও ছাড়বে না... তারপরও কিসের হাতছানিতে বিভোর ছিলেন?!

মুরসি সবসময় বলতেন—ইসলামি আন্দোলন ও ইসলামি বিপ্লব হচ্ছে মিসরের মুসলমানদের অস্থি-মজ্জায় মিশে যাওয়া পবিত্র ইচ্ছা, অদম্য আকাঙ্ক্ষা। আর তাদের এই ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা চিরকাল অটুট থাকবে। মহাকালের গর্ভে কখনো হারিয়ে যাবে না।


 সর্বশেষ অবস্থা। গত ১৭ জুন ২০১৯, সোমবার। আদালতে মুরসি। উচ্চতর আদালতের রায় শোনানো হবে। মুরসি প্রায় ২০ মিনিটের মতো বক্তব্য প্রদান করেছিলেন। কিন্তু তিনি আবারও ভুল করলেন... বক্তব্যের মধ্যে তিনি বলে বসলেন, “আমার কাছে কিছু গোপন তথ্য আছে। মিসরের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য যা প্রকাশ করা জরুরি।”... ঠিক সেসময়েই মুরসিকে থামিয়ে দেয়া হল।

আকস্মিক বিরতি। আসামি সেলে মুরসি একা-ই। কিন্তু সেই সেল থেকে জীবিত মুরসি আর ফিরে আসেননি... মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া এক মুরসি ফিরে আসেন। হাসপাতালে নেয়ার পথেই শরিক হয়ে যান অনন্ত মহাকালের মিছিলে। আর তারই সাথে নিভে যায় ইতিহাসের আকাশের এক তারা।


 -আরবি আর্টিকেল অবলম্বনে...


১৯০৪ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

ফাহাদ আব্দুল্লাহ। পড়াশোনা মাদরাসা থেকে। তাদাব্বুরে কুরআন, সিরাত ও ইতিহাস নিয়ে সময় কাটাই। ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখি। দাওয়াহর জন্য টুকটাক লেখালেখি করি। এখনও পর্যন্ত ইতিহাসের ওপর দুটো অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উম্মাহর জন্য কিছু করে যেতে পারাকে জীবনের সফলতা মনে করি।

মন্তব্য

৫ টি মন্তব্য করা হয়েছে
Mohammad Badrudduza

Mohammad Badrudduza

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৬:২৭ অপরাহ্ন

মাশাআল্লাহ... চমৎকার একটা লেখা ছিল। মুরসিকে নিয়ে এত ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনাসমৃদ্ধ আর্টিকেল এটাই মনে হয় বাংলা ভাষায় প্রথম...

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
MOHAMMAD BASHIRUL ALAM

MOHAMMAD BASHIRUL ALAM

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ - ২১:১৩ অপরাহ্ন

সাম্যের পৃথিবী গড়ে তোলার স্বপ্ন তখন থেকেই দ্রোহ, দেশপ্রেম আর মাজলুম মানবতার জন্য হাহাকার করত তার হৃদয়কন্দর...

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৫:২৫ অপরাহ্ন

মুরসি মানেই ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবির রায়হান

আবির রায়হান

১৮ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৮:৫৫ অপরাহ্ন

আহ... মুরসি... কিসের উপর ভরসা করে নির্লিপ্ত ছিলেন?

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবির রায়হান

আবির রায়হান

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ - ১৮:৫০ অপরাহ্ন

আপনার লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হই। সাইয়েদ কুতুবটাও অসাধারণ ছিল

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...