হাসান বসরির সান্নিধ্যে

(সাহাবায়ে কিরাম রাদি.-এর পর এই উম্মাহর সবচেয়ে উত্তম ও সেরা মানুষগুলো হচ্ছেন তাবেয়িগণ। তাবেয়ি কারা? সহজ কথায়, যারা ঈমানের সাথে নিদেনপক্ষে একজন সাহাবিকেও দেখেছেন এবং ইসলামের ওপর তাঁর মৃত্যু হয়েছে।


রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কল্যাণশতাব্দীর লোক বলে অভিহিত করেছেন। এরচেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে? ইসলামের উত্থান-পরবর্তী সোনালী যুগ তাঁরা দেখেছেন। সেই সমাজের মানুষের আচার-বিচার, চলন-বলন... সবকিছুই তাদের দেখা। একদিকে যেমন সাহাবিদের সংস্পর্শে এসে নিজেরা হয়েছেন সর্বগুণে ঋদ্ধ, তেমনি শাসনকেন্দ্রিক নানান অস্থিরতার ছিলেন রাজসাক্ষী। তাই আমাদের যাপিত জীবনের যেকোনো সমস্যায় যখন আমরা তাদের পাঠ করি, তখন নিজেদের সমস্যাগুলোর সমাধান সহজেই খুঁজে পাই। স্বর্ণকার যেমন খাঁটি আর ভেজাল সোনার পার্থক্য করতে পারে, তেমনিভাবে সোনালী এই মনীষীগণও ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারতেন সহজেই। কী সে-ই মাণদণ্ড ছিল তাদের? বর্তমানে এই ফিতনার যুগে অনুস্বীকার্যভাবে তাঁরা খুব প্রাসঙ্গিক। এই উম্মাহর মুক্তিও যে সেই সালাফের অনুসরণের মাঝেই, তাদের পূর্বসূরী মনীষীদের পদাঙ্ক অনুকরণে। তাছাড়া জীবনে সঞ্জীবনীশক্তির জন্যও তাদের চর্চা আবশ্যক।


প্রিয় পাঠক, এই লক্ষ্যগুলোকে সামনে রেখেই আমাদের বর্ণাঢ্য এ আয়োজন। সালাফের জীবনপাঠ। আমরা ধারাবাহিক এই সিরিজে আমাদের সালাফ তথা পূর্বসূরি মনীষীদের জীবচরিত নিয়ে আলোচনা করবো। পরিচিত হবো তাঁদের সঙ্গে। একেবারে সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাঁদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।)


হাসান বসরির সান্নিধ্যে

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তিরোধানের পর উম্মাহাতুল মুমিনিন তথা নবিপত্নীগণ উম্মাহর সত্যিকারের অভিভাবক হিসেবেই আবির্ভূত হন। সবসময় তাদের ঘিরে থাকত জ্ঞান ও শিক্ষানুরাগীদের একদল। তাদের ঘরগুলোতে সবসময়ই মানুষের আনাগোনা হতো। উম্মে সালামা রাদি.-এর ঘরের অবস্থাও ব্যতিক্রম ছিল না। অনেকের আনাগোনার মধ্যে একজন নারীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। উম্মে সালামা রাদি.-এর আজাদকৃত দাসী। বিশেষ সেবিকা। তার একটা ফুটফুটে শিশু-সন্তান আছে। যাকে দেখলে, যে কারও মনে হবে—এ যেন আসমানের চাঁদ ধরায় মূর্তরূপে আগমন করেছে। কেমন মিষ্টি করে হাসে। মায়া মায়া চোখে তাকায়। শিশুটির মা ঘরদর গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকে। তাই উম্মে সালামা রাদি. তাকে কোলেপিঠে করে আগলে রাখেন। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেন—ছেলেটির চেহারায় কেমন যেন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরর কান্তিময় নুরানি চেহারার আভা ফুটে ওঠে।


শিশুটি কখনও কেঁদে ওঠে, অথচ তার মা আশপাশে নেই। তাই কান্না থামাতে উম্মে সালামা রাদি. নিজের বুকের দুধ তার মুখে পুরে দেন; কিন্তু আশ্চর্যকর বিষয় হচ্ছে—দুধ পেলে শিশুটি কান্না থামিয়ে সুবোধটি হয়ে যায়। উম্মে সালামা রাদি. আনন্দিত হন। শিশুটির ভবিষ্যত উজ্জ্বল দেখে তিনি সবসময় তাকে চোখে চোখে রাখেন। ছেলেটির মা-ও বুঝতে পারে, তার সন্তান অন্য আট-দশটা ছেলের মতো নয়। মায়ের মন আরও আশাবাদী হয়। নবির সাহাবিদের যাকেই পান, তাঁর কাছে নিয়ে যান দুআর জন্য। নবি পরিবারের সেবিকা হওয়ায় সবাই তাকে চেনে, সমীহ করে। তাই সাহস করে একদিন তিনি আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদি.-এর কাছে নিয়ে যান। উমর রাদি. অনেক অনেক দুআ করেন। একটা দুআ ছিল এমন,


আল্লাহ, তাকে দীনের ফিকহ দান করুন, আর বানিয়ে দিন মানুষের প্রিয়ভাজন।


প্রিয় পাঠক, নিশ্চয় আপনার কৌতূহলী মন বারবার জানতে চাচ্ছে, কার কথা বলছি আমরা! হ্যাঁ, আমরা সাইয়্যিদুত তাবেয়ি হাসান বসরি রহ.-এর কথা বলছি।


বংশনামা

রিজাল ও ইতিহাসের আলিমগণ হাসান বসরির ঊর্ধ্বতন পুরুষদের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন—হাসান বিন আবুল হাসান ইয়াসার আবু সাঈদ বসরি।


জন্ম

২১ হিজরি। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদি.-এর খিলাফতের আরও দু-বছর অবশিষ্ট ছিল। এ সময়টাতেই হাসান বসরি রহ.-এর জন্ম হয়। উসমান রাদি.-এর বিরুদ্ধে গজিয়ে ওঠা ফিতনার দিনগুলো তিনি কাছ থেকে দেখেছেন।


বাবা-মায়ের ব্যাপারে হাসান বসরি রহ. নিজেই বলেন, আমার বাবা-মা বনু নাজ্জার গোত্রের এক ব্যক্তির দাস-দাসী ছিলেন। সে লোক যখন বনু সালামা গোত্রের এক নারীকে বিয়ে করে, তখন আমার বাবা-মাকে বিয়ের মোহরানাস্বরূপ স্ত্রীকে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে বনু সালামা তাদের আজাদ করে দেয়। আরেক বর্ণনামতে, তাঁর বাবা ছিলেন যায়েদ ইবনু সাবিত রাদি.-এর আজাদকৃত দাস, আর মা ছিলেন উম্মে সালামা রাদি.-এর আজাদকৃত দাসী।


জ্ঞান-সাধনায় মহীরূহ হয়ে ওঠা

নববি হেরেমে যার লালন-পালন, উম্মুল মুমিনিন যার দুধ-মা, ইলমের সাগরে সাঁতরে বেড়ানো তাঁর সৌভাগ্যের স্বর্ণতিলক হবে না তো কার হবে? জন্মের পর থেকে প্রায় সতেরো বছর পর্যন্ত হিজাজের ভূমিতেই বসবাস করেছেন। ইলমের পরিবেশে, সাহাবিদের সাহচর্যে। সাহাবিদের মধ্যে যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছেন বা যাদের থেকে ইলম অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে উসমান বিন আফফান রাদি. রয়েছেন শীর্ষে। তাঁর জুমআর খুতবা বহুবার শুনেছেন। দুষ্কৃতিকারীরা যখন উসমান রাদি.-কে অবরুদ্ধ করে, হাসান বসরির বয়স তখন ১৪ বছর।


যে সকল সাহাবিদের থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন—ইমরান ইবনু হুসাইন, মুগিরা ইবনু শুবা, আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা, সামুরা ইবনু জুনদুব, আবু বকরাতা আস সাকাফি, নুমান ইবুন বাশির, জাবির, জুনদুব বাজালি, ইবনু আব্বাস, আমর ইবনু তাগলিব, মাকিল ইবনু ইয়াসার, আসওয়াদ ইবনু সারি, আনাস ইবনু মালিক প্রমুখ।


এরপর ৩৭ হিজরিতে তিনি বসরায় গমন করেন এবং সেখানের সাহাবি ও তাবেয়িদের কাছে ফিকহে বুৎপত্তি অর্জন করেন। এরপর ৪৩ হিজরিতে খোরাসান গমন করেন। সেখানের আমিরের বিশেষ সহকারী হিসেবে ১০ বছর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেন। তারপর পুনরায় বসরায় চলে আসেন এবং সেখানে দীনের নানামুখী খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর থেকে যারা হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আইয়ুব, শাইবান নাহবি, ইউনুস ইবনু উবাইদ, ইবনু আওন, হুমাইদ আত তওইল, সাবিত বুনানি ও মালিক ইবনু দিনার প্রমুখ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।


বরেণ্যদের স্বীকৃতি

বর্ণিত আছে, আনাস ইবনু মালিক রাদি.-কে একবার কেউ একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেন,


سلُوا مولانا الحسن، قالوا: يا أبا حمزة نسألكُ، تقولُ: سلوا الحسن؟ قال: سلوا مولانا الحسن؛ فإنَّهُ سمعَ وسمعْنَا فحفظَ ونسينا، وقال أيضًا: إنِّي لأغبط أهل البصرة بهذين الشيخين: الحسن البصري ومحمد بن سيرين


তুমি বরং আমাদের মাওলানা হাসানকে জিজ্ঞেস করো। লোকেরা বললো, আবু হামজাহ! (আনাস রাদি.-এর উপনাম) আমরা আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি, অথচ আপনি বলছেন, হাসান বসরির কাছে জিজ্ঞেস করতে? তখন তিনি পুনরায় বললেন, আমাদের মাওলানা হাসানকে জিজ্ঞেস করো। কারণ সে-ও আমাদের মতো শুনেছে (ইলম অর্জন করেছে) অতঃপর আমরা ভুলে গেছি আর সে মুখস্থ রেখেছে। এরপর তিনি আরও বলেন, হাসান বসরি ও মুহাম্মদ বিন সিরিন এই দুই শাইখের কারণে বসরাবাসীকে নিয়ে আমার ঈর্ষা হয়।


ইমাম গাজালি রহ. কী দারুণ বলেছেন,

হাসান বসরির কথা নবি-রাসুলদের কথার সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। আর তিনি চরিত্রগুণে ছিলেন সাহাবিদের মতো। সুসাহিত্যে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মুখ থেকে যেন কথা নয়, প্রজ্ঞার মুক্তা ঝরত।

আবু আমর বিন আলা বলেন,

আমি হাসান বসরির মতো বিশুদ্ধভাষী আর কাউকে দেখিনি।

মুহাম্মদ বিন সাঈদ বলেন,

হাসান বসরি একজন উন্নত চরিত্রের মানুষ ছিলেন। তাফসির, ফিকহ, সাহিত্যসহ ইলমের সব শাখা-প্রশাখায় তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। আর তাঁর ইবাদত ও দুনিয়াবিমুখতা ছিল প্রবাদতুল্য।

আবু বারদাহ বলেন,

আমি হাসান বসরির চেয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে দেখিনি।

হুমাইদ ইবনু হিলাল বলেন,

আবু কাতাদা আমাদের বলতেন, তোমরা এই শাইখকে (হাসান বসরি) ভালোভাবে আঁকড়ে ধরো। কারণ আমি তাঁর কথার সাথে উমর রাদি.-এর কথার মিল খুঁজে পাই।


আবু জাফর রাজি রাবি বিন আনাস রাদি. থেকে বর্ণনা করেন,

আমি ধারাবাহিকভাবে দশ বছর যাবত হাসান বসরির সান্নিধ্যে গিয়েছি, প্রতিদিনই তাঁর কাছে এমন কিছু শুনেছি, যা ইতোপূর্বে আর কারও কাছে শুনিনি।


এ ছিল তাঁর ইলমের স্বীকৃতি। ইলমের এ সাগরের স্তুতি যতই করা হবে ফুরোবার কথা নয়।


হাসান বসরির তাকওয়া

হাসান বসরি রহ.-এর তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতা ছিল অতুলনীয়। আসুন, আমরা এ বিষয়েও বরেণ্যদের মন্তব্য ও স্বীকৃতি জেনে নিই।


মাতার আল ওয়াররাক বলেন,

হাসান বসরি যখন নসিহত করেন, মনে হয় যেন তিনি পরকালে থেকে মাত্রই এসেছেন আর যা বলছেন, স্বচক্ষে দেখে এসেই বলছেন! আল্লাহু আকবার।


কাতাদা বলেন,

আমি তাঁর চেয়ে পৌরুষদীপ্ত, মানবিক কাউকে দেখিনি।


ইউনুস বিন উবাইদ বলেন,

হাসান বসরির চেয়ে কথা ও কাজে এত মিল আর কারও মাঝে দেখিনি।


আউফ বলেন,

জান্নাত লাভের পথ ও পদ্ধতি সম্পর্কে হাসান বসরির চেয়ে অধিক জ্ঞাত আর কাউকে পাইনি।


ইবনে ইমাদ হাম্বলী রহ. বিখ্যাত গ্রন্থ শাজারাতুজ জাহাব-এ লিখেছেন,

সাফফাহ আবু বকর হুজালিকে জিজ্ঞেস করেছিল, হাসান বসরির এই আকাশচুম্বী মর্যাদা লাভের রহস্য কী? উত্তরে তিনি বলেছেন, হাসান বসরি ১২ বছর বয়সে কুরআন মাজিদ হিফজ করেছেন। তারপর পুরো কুরআন মাজিদের তাফসির শিক্ষা লাভ করেছেন। তিনি কখনোই ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়াননি। স্বেচ্ছায় শাসনকাজে যুক্ত হননি। অন্যদের যা করতে বলতেন, তার উপর আগে নিজে আমল করতেন। যা করতে বারণ করতেন, প্রথমে নিজে তা থেকে বিরত থাকতেন। এটাই তাঁকে এই সুউচ্চ মর্যাদার আসনে সমাসীন করেছে।


সারি বিন ইয়াহইয়া বলেন,

হাসান বসরি প্রতি মাসের আইয়ামে বীজ (১৩,১৪,১৫ তারিখ), সম্মানিত ৪ মাস (মুহাররম, যিলহজ্ব, যিলকদ, রজব) এবং প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন।


একজন আপোসহীন বীর

হাসান বসরি শুধু ইলম অন্বেষণেই ব্যস্ত থাকেননি, তিনি ছিলেন যুগের একজন মুজাহিদও। বীরত্বে ও সাহসিকতায় ছিলেন প্রবাদতুল্য। ইমাম আসমায়ি তাঁর বাবার সূত্রে বর্ণনা করেন, আমি হাসান বসরির চেয়ে লম্বা ও মোটা আর কারও হাত দেখিনি। তাঁর হাত প্রস্তে এক বিঘত পরিমাণ মোটা ছিল।


বাস্তবেই তিনি ছিলেন পরিপুষ্ট দেহাবয়ব ও কান্তিময় চেহারার একজন সুপুরুষ। মুহাল্লাব ইবনু আবি সাফরা যুদ্ধের ময়দানে হাসান বসরিকে সম্মুখভাগে অন্তর্ভুক্ত করতেন। শুধুই তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার কারণে।


হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো সাহসী লোক যখন দুর্লভ ছিল, তখনও তার বিরুদ্ধে হাসান বসরি রহ.-এর কুশলী, আপোসহীন ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় পাতায় বিধৃত হয়ে আছে।


যাপিত জীবন

পোশাক-পরিচ্ছদ ও পানাহারে তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করতেন। সাল্লাম বিন মিসকিন রহ. বলেন,

আমি হাসান বসরিকে একটি আবা পরিহিত অবস্থায় দেখেছি। পোশাকটি তাঁর গায়ে স্বর্ণের মতো ঝলমল করছিল।


ইবনু উলাইয়া ইউনুসের সূত্রে বলেন,

হাসান বসরি শীতে কালোমতো চাদর এবং কুর্দি রুমাল ও কালো পাগড়ি পরিধান করতেন। আর গরমকালে কটনের লুঙ্গি, লম্বা জামা ও লাল ডোরাকাটা চাদর পরতেন।


আবু হেলাল বলেন,

আমরা একবার তাঁর কাছে যাই। ঘরে প্রবেশ করতেই খাবারের সুগন্ধ আমাদের নাকে আসে। খাবারের দস্তরে তিনি ফলফলাদিও রাখতেন।


আবু কাতাদা বর্ণনা করেন,

একবার হাসান বসরির শয়নঘরে যাই। তিনি তখন ঘুমোচ্ছিলেন। তাঁর শিয়রের পাশে একটি ঝুড়ি দেখতে পাই। আমরা সেটা টেনে এনে দেখি, তাতে ফল ও রুটি রাখা আছে। আমরা তা থেকে খেতে শুরু করি। ইতোমধ্যে তিনি জেগে ওঠেন। এবং আমাদের এ অবস্থায় দেখে আনন্দিত হয়ে বলেন, তোমরা আমার বন্ধুজন।


তবে উন্নত উপাধেয় আর দামি বসনের প্রতি তাঁর কামনা ছিল না। তাকে প্রিয় পোশাক কী—এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, সবচেয়ে মোটা, অমসৃণ ও মানুষের চোখে যা সাদামাটা, এমন কাপড়। তাঁর যাপিত জীবনও ছিল সাদামাটা। ঘরে আসবাবপত্র বলতে চাটাইয়ের বুননে তৈরি করা একটি খাট ছিল। এতে বিছানা-পাটি, বালিশ কিছুই ছিল না। যেন রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি।


একজন দরদি বক্তা

হাসান বসরি রহ.-এর যে গুণটি পৃথিবীবাসীকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত করেছে তা হচ্ছে, তাঁর দরদমাখা বয়ান। আত্মভোলা দুনিয়ামুখী মানুষদের আখিরাতমুখী করা হৃদয়ছোঁয়া বয়ান। তিনি একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নসিহা পেশ করতেন। মানুষকে উপদেশ দিতেন। তাঁর এই দাওয়াতি তৎপরতা ছিল তৎকালীন যুগান্তকারী। তিনি দেখেছেন আল্লাহর নবির প্রিয় সাহাবিদের। তাদের কাছ থেকে তাকওয়া, ইলম, আমল, এমনকি তাদের জীবনাচার ও কর্মতৎপরতা নিজের চোখে দেখেছেন, উপলব্ধি করেছেন। সেই বোধ থেকে তিনি লোকদের উপদেশ দিতেন। সাহাবিদের মাঝে আর তাঁর সময়ের লোকদের মাঝে চিন্তা ও আমলের পরিবর্তন দেখে দুঃখ করে বলতেন, আমি এই উম্মাহর শুরু যুগের এমন ব্যক্তিদের দেখেছি, যাঁরা নিশুতি রাতে জায়নামাজে কাটাতেন; সিজদা-ই তাদের শয়ন-নিদ্রা ছিল।


কখনো গম্ভীর গলায় বলতেন,

আমি সত্তর জন বদরে অংশগ্রহণকারী সাহাবির সংস্পর্শ পেয়েছি। যাঁদের দেখলে তোমরা পাগল বলতে, আর তাঁরা তোমাদের দীনদারি দেখলে বলতেন, এদের সাথে দীনের কোন সম্পর্ক নেই।


দুনিয়ার মূল্যায়ন তাঁর জবানে নানাভাবে ফুটে উঠেছে। কখনো তিনি বলতেন,

আদম সন্তান! তুমি দুনিয়ায় হাতেগোনা কয়েকটি দিবসের সমষ্টিমাত্র। এই দিবসগুলোর একটি গত হওয়ার অর্থ তোমার কিছু অংশ গত হয়ে যাওয়া।


পাপ ও পাপাচার থেকে তাওবার বিষয়ে তাঁর অসংখ্য মুক্তাখচিত বাণী রয়েছে। তিনি বলতেন,

আদম সন্তান! পাপকর্মে জড়িয়ে পরবর্তীতে তাওবা করার চেয়ে পাপকাজ পরিত্যাগ করাই বরং সহজ কাজ।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যাপিত জীবন সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন আমাদের সামনে নবি জীবনের পূর্ণ চিত্র ফুটিয়ে তোলে। তিনি বলেন,

আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠান। তারা তাঁর বংশপরিচয় জানত। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সম্বোধন করে বললেন, ইনি তোমাদের নবি। আমার পছন্দের ব্যক্তি। তোমরা তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করো। জেনে রাখো, তাঁর সামনে সকাল ও বিকেলে বাহারি পদের খাবার আসত না। তাঁর দরবার সবার জন্য ছিল অবারিত। তাকে পাহারা দেওয়ার জন্য কোনো প্রহরীও ছিল না। তিনি মেঝেতে বসতেন, সেখানেই তাঁর খাবারের দস্তর বিছানো হতো। পরতেন মোটা কাপড়। গাধায় চড়তেন নিঃসঙ্কোচে। এমনকি নিজের পেছনে কাউকে নিয়ে পথ চলতেও দ্বিধা করতেন না। খাবারের শেষে নিজের আঙ্গুলগুলো চেটে খেতেও লজ্জাবোধ করতেন না।


শাসকদের থেকে দূরে থাকা

হাসান বসরি রহ. সবসময় শাসকদের থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিতেন। বলতেন, শাসকদের কাছে যাওয়া নিফাকের (কপটতার) লক্ষণ। বলতেন, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার নিয়তেও শাসকদের দরবারে গমন করবে না। তিনি সবসময় জালিম শাসকের জন্য দুআ করার নিন্দাবাদ করতেন। আর বলতেন,

যে ব্যক্তি কোনো জালিমের ক্ষমতার স্থায়িত্বের জন্য দুআ করবে, সে প্রকারান্তরে আল্লাহর জমিনে তাঁর অবাধ্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট—এটাই বোঝাতে চাচ্ছে।


তাঁর কর্মপন্থা ছিল, তিনি শাসকদের নসিহাসম্বলিত চিঠি পাঠাতেন। একবার তিনি খলিফা উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ.-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে লেখা ছিল, আমিরুল মুমিনীন! দীর্ঘ নিরাপদ জীবন চাইলে এই দুনিয়ার পরিসমাপ্তি প্রয়োজন। অতএব আপনি এই লয়প্রাপ্ত দুনিয়া সর্বৈব ত্যাগ করে চিরস্থায়ী জানাতের পাথেয় সংগ্রহ করুন। ওয়াস সালাম।

উমর বিন আব্দুল আজিজ চিঠিটি পড়ে কেঁদে ফেলেন। বলেন, আবু সাঈদ অল্প কথায় আমাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নসিহা করেছেন।


কৃপণতা

কৃপণতা সম্পর্কে কত চমৎকার বলেছেন হাসান বসরি রহ.। কারও প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দুনিয়ায় যারা সম্পদ উপার্জনে বেপরোয়া; কিন্তু দান-সদকার বেলায় ব্যয়কুণ্ঠ—কিয়ামতের দিন তাদের আফসোসের সীমা থাকবে না। যখন সে দেখবে তারই রেখে যাওয়া সম্পদ পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারদের মালিকানায় আসার পর সে-ই ব্যক্তির দান-সদকার কারণে তার আমলনামা বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সে উপার্জন করেও আজ রিক্তহস্ত।


লোভ

তিনি বলেন,

কাউকে দুনিয়ার যেটুকু দেওয়া হয়, তাকে সে পরিমাণ লোভ ও লালসাও দেওয়া হয়।


মৃত্যু-ভয়

কেউ তাকে বলল, আমি মৃত্যুকে অপছন্দ করি! প্রতিউত্তরে তিনি বললেন, এর অর্থ হচ্ছে—তুমি নিজের সম্পদ সেখানে অগ্রীম পাঠাওনি। যদি পাঠাতে, তাহলে পরকালের সফরের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতে।


সংযত জবান

হাসান বসরি রহ. বলেন, যার জবান সংযত নয়—তার দীনদারি পরিপক্ক নয়। যে কথা বেশি বলে, তার মিথ্যাও বেশি প্রকাশ পায়।


সালিহিনদের ভালোবাসা কখন কাজে দেবে

তিনি বলেন,

আদমসন্তান! এটা মনে করো না যে, সালিহিনদের (সৎ ও নেককার ব্যক্তিবর্গ) প্রতি ভালোবাসা তোমার মুক্তির জন্য যথেষ্ট হবে! তাদের সাথে মিলিত হতে হলে অবশ্যই তোমাকে আমলের মাধ্যমেই তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ইহুদি-খ্রিষ্টানরাও তো তাদের নবিদের ভালোবাসার দাবি করে। অথচ এই দাবি তাদের কোনো কাজে আসবে না।


অনন্তের পথে যাত্রা

মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে হাসান বসরি রহ.—ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন—বারবার পড়ছিলেন। তাঁর ছেলে তাকে বললেন, বাবা, আপনার মতো ব্যক্তি কি দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কারণে আফসোস করতে পারে? তিনি বললেন, বেটা! আমি তো আমার নফসের প্রবঞ্চনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। কারণ এরচেয়ে বড় বিপদের সম্মুখীন কখনও হইনি।


হাসান বসরি রহ. যেদিন মৃত্যুবরণ করেন, সে-ই দিনটি ছিল রজব মাসের জুমআর রাত, ১১০ হিজরি বর্ষ। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। বসরা নগরীতে। তাঁর জানাজায় লোকসমাগমের বিষয়টি ইতিহাসে অবিস্মৃত হয়ে আছে। জুমআর নামাজের পর জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। অসংখ্য-অগণিত মানুষ এতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে। এমনকি সেদিন শহরের জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করার মতো কেউ অবশিষ্ট ছিল না। আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন।




তথ্যসূত্র :

১. সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/ ৩৩৭-৩৫১

২. আত তারিখুল কাবির : ২/২৫০৩

৩. হিলইয়াতুল আউলিয়া : ২/১৩১

৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ : ১/৬৬

৫. শাজারাতুয যাহাব : ১/১৩৬

৬. হাসান বসরি–ইবনুল জাওজি

৭. মাওয়ায়েজুল ইমাম হাসান বসরি



২২৮ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

হাসান মাহমুদ। একাডেমিক পড়াশোনার শুরু কওমি মাদরাসায়। বর্তমানে হাদিসের খেদমতে আছি এক মাদরাসায়। অনুবাদ ও সম্পাদনার সাথে জড়িয়ে আছি যদিও; তবে গবেষণাধর্মী পড়াশোনা ও ইতিহাসপাঠ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। ভাবি, স্বপ্ন বুনি কল্যাণ-শতাব্দীর সমাজব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার। ধ্যান-জ্ঞান জুড়ে থাকে ইসলামের বিজয়ের ভাবনা।

মন্তব্য

৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
রায়হান আবির

রায়হান আবির

২৩ অক্টোবর, ২০২০ - ০৬:০২ পূর্বাহ্ন

মাশাআল্লাহ। সিরিজটা চলতে থাকুক!

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

২৩ অক্টোবর, ২০২০ - ১৯:৫০ অপরাহ্ন

ইনশাআল্লাহ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
রোবায়েত হাসান

রোবায়েত হাসান

২৪ অক্টোবর, ২০২০ - ১৮:৪৭ অপরাহ্ন

লেখাটা খুব ভালো লেগেছে। আপনারা সিরিজটা কন্টিনিউ করুন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...