শিশুদের ১০টি শিক্ষণীয় গুণ

‘দুররিয়াহ’ একটি আরবি শব্দ—যার অর্থ পরিবার-পরিজন। শব্দটি কুরআনে বারবার উল্লেখিত শব্দগুলোর একটি। শব্দটি কুরআনে ১৯ টি সুরার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে মোট ৩২ বার আলোচিত হয়েছে। যার দ্বারা খুব সহজেই শব্দটির তাৎপর্য ও গুরুত্ব উপলব্ধি হয়। এই গুরুত্ব বিবেচনায়ই মূলত বলা হয়ে থাকে—


পরিবার হচ্ছে সমাজের ভিত্তি


ইসলাম সবসময় পরিবারিক যে কোনো বিষয়ে গুরুত্ব দানের ওপর জোর দিয়ে এসেছে। যখন আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে ভাবি, তখন সাধারণত যেসব চিন্তাভাবনা আমাদের মাথায় ঘুরপাক খায়—

সন্তান বেড়ে উঠবে কীভাবে?

তাদের মৌলিক চাহিদার যোগান দিব কীভাবে?

তাদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলব কীভাবে?

তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করব কীভাবে? ইত্যাদি... ইত্যাদি...


বাস্তবেই একটি শিশুর মা-বাবার জন্য এসব বিষয়ে চিন্তিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। যেমনটি আমাদের আদর্শপুরুষ প্রিয়নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রাখাল (দায়িত্বশীল), আর তোমাদের প্রত্যেকেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। [বুখারি ও মুসলিম]


আরেক হাদিসে প্রিয়নবি বলেছেন—

তোমরা তোমাদের সন্তান ও পরিবারকে উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দাও। [মুসান্নাফ ইবনে আব্দুর রাজ্জাক]


যদিও আজকাল আমরা নিজেদের শিশুদের নিয়ে তেমন একটা ভাবি না। যা-ও যৎসামান্য একটু ভাবি—শেষমেশ তাদের আমরা নিজেদের শিক্ষার্থীদের মতোই দেখি, এর বেশি কিছু নয়। অর্থাৎ আমরা মনে করি—আমাদের শিশুরা তো অবুঝ, তাই তারা তাদের অভিভাবকদেরই অনুসরণ করবে। সোজা কথা, আমরা তাদের কোনো বিশেষত্ব বা অনন্য প্রতিভা নিয়ে ভাবার ফুরসত পাই না কিংবা তাদের অবুঝ ভেবে অথবা তুচ্ছ বিষয় মনে করে, ভাবার প্রয়োজন অনুভব করি না। অথচ আমি মনে করি, আমাদের শিশুদের মাঝেও এমনকিছু স্বভাবজাত দক্ষতা ও বিশেষত্ব রয়েছে, যা আমরা যারা নিজেদের বড়ো বা অভিভাবক মনে করি—তাদেরই অধিকাংশের মাঝে নেই। আমি সেসবের মধ্যে অল্পকিছু নোট করেছি, যা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি—


অধ্যবসায় :

আমাদের শিশুরা সহজে হাল ছাড়ে না। তারা তাদের লক্ষ্যপানে তারা অবিচলতার সাথে এগিয়ে যায়। কোনো বাধা-বিপত্তিই তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারে না। তারা যা চায়, ভালো হোক বা মন্দ—তা না পাওয়া পর্যন্ত নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল থাকে। অথচ এক্ষেত্রে এসে দেখা যায়, আমরা বড়োরাই অনেক সময় নিজেদের সামলাতে হিমসিম খাই। তো সে হিসাবে আমরা নিজেদের শিশুদের চেয়ে পিছিয়ে।


ভুলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব :

বুঝ হওয়ার আগ পর্যন্ত বা ‘ভুল করা’ খারাপ—এটা বলে সতর্ক করার আগ পর্যন্ত তারা নিজেদের ভুলগুলোকে ভুল মনে না করে, নতুন কিছু শেখার অভিজ্ঞতা হিসাবে নেয়। আমার মনে হয়, আমরা বড়োরাও আমাদের কৃত ভুলগুলোকে ভুল হিসাবে নিয়ে হীনমন্য না হয়ে বরং শেখার সুযোগ হিসাবে নিতে পারি।


পারতপক্ষে আমাদের সফলতা ‘কখনো ভুল হবে না’-এর মধ্যে নয়। বরং প্রকৃত সফলতা হচ্ছে, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে।


হৃদয়ের পবিত্রতা :

শিশুরা কখনো কারো প্রতি অসন্তোষ পুষে রাখতে পারে না। তারা সহজে ক্ষমা করতে অভ্যস্ত। তারা তাদের অনুভূতির ব্যাপারে অত্যন্ত স্বচ্ছ। আমাদেরও উচিৎ শিশুদের মতো স্বচ্ছ আন্তরিকতার সাথেই কারো সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা এবং আচার-আচরণেও পানির মতো কোমল হওয়া। আপনি যদি কখনো কোনো শিশুর সাথে একটু শক্ত বা অসদয় আচরণ করে বসেন, কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরই আবার শিশুটির সাথে হাসিমুখে কথা বলেন; তাহলে দেখবেন—সহজেই সে অতীতের সেই অসদয় বা কড়া আচরণের কথা ভুলে গিয়েছে। অথচ বড়োদের দেখুন, তারা অন্যের সামান্য অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্যও ক্ষোভ পুষে রাখে অনেক দিন। অনেক সময় তো তার উপর করা অনুগ্রহের কথাও ভুলে যায়। তো হৃদয়ের স্বচ্ছতা ও পবিত্রতার বিষয়টা আমাদের শিশুদের থেকেই আমাদের গ্রহণ করতে হবে।


মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা :

শিশুরা সহজে যে কোনো পরিবর্তনকে মানিয়ে নিতে পারে এবং সবসময় তারা ইতিবাচক থাকে, বুঝে হোক বা না বুঝে। তারা নমনীয় থাকে, থাকার চেষ্টা করে। বিপরীতে বড়োরা কঠোর এবং পরিবর্তন বিরোধী হয়ে থাকে। অনেক সময় এই পরিবর্তনেই যে তার কল্যাণ, সেটাও বুঝতে চায় না।


হাসি-খুশি :

এক জরিপে দেখা গিয়েছে—শিশুরা দিনে গড়ে প্রায় ২০০ বার হাসে... সেখানে বড়োরা দিনে গড়ে ১৭-১৮ বার হাসে। অথচ হাসি-খুশি থাকাটা স্বাভাবিক জীবন যাপন ও অনন্য জীবনধারার জন্য আবশ্যক। আমরা মনে করি, এই মুখের হাসি আর এমন আহামরি কী? অথচ মনোবিজ্ঞানীরা খুব গুরুত্বের সাথে বলেছেন, মানুষের হাসির প্রভাব কেবল তার মুখের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা সংক্রামক। তার আশপাশেও চমৎকার প্রভাব ফেলে। আর মনের গভীরেও...


আবিষ্কারের প্রবণতা :

শিশুরা প্রকৃতিগতভাবেই কৌতূহলী হয়ে থাকে। তাদের সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব আবিষ্কার করে যাচ্ছে। আমরা যারা বড়ো, তাদেরও উচিত নিষ্পাপ শিশুদের মতো আবিষ্কার ও কৌতূহলের পথ অনুসরণ করে অজানা কে জানা। যে কোনো কিছু শেখার চেষ্টা করা। এতে সাধারণত নিজের একটা ব্যস্ততা তৈরি হয়; যা তাকে অলসতার কারণে সৃষ্ট বিষণ্নতা এবং কর্মহীনতার দরুন সৃষ্ট বিরূপ মনোভাব থেকে রক্ষা করবে।


আস্থা :

লক্ষ্য করলে দেখবেন—শিশুরা সহজে অন্যকে বিশ্বাস করে ফেলে। যারা অন্যের উপর আস্থা রাখে তারা, অন্যের উপর কম বিশ্বাসীদের চেয়ে বেশী সুখী, সমাদৃত এবং বেশী নৈতিকতার অধিকারী হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তব হলেও এ কথা অনস্বীকার্য যে, বড়োদের ভেতর আস্থা ও বিশ্বাসের এই গুণটার বড্ড অভাব। অথচ এই আস্থা ও বিশ্বাস হচ্ছে ভালোবাসার একটা অনিবার্য অংশ—যা ছাড়া ভালোবাসা অপূর্ণ। আর ভালোবাসা ছাড়া মানব ও মানবতা—দুটোই অসম্পূর্ণ। আর যেখানে মানব ও মানবতাই অসম্পূর্ণ, সেখানে সুস্থ সমাজের আশা করা দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়!


আত্মবিশ্বাস :

শিশুরা সবসময় নিজেদেরকে জগতের সবচেয়ে সুন্দর, শক্তিশালী আর অগ্রগামী ভাবতেই ভালোবাসে। এ ভাবনা যে শিশুরা ধরে রাখতে পারে, কালের পালাবদলে তারাই একসময় মহিরুহ হয়। বরেণ্য হয়। আমাদের বড়োদেরও উচিত নিজেদের ভেতর আত্মবিশ্বাসের চাষাবাদ করা। কারণ এই আত্মবিশ্বাসের ক্ষমতা এত বেশি যে, যখন তার কর্মদ্যোমতার গুণ যোগ হয়; তখন তার অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। আর তার প্রভাবও স্থায়িত্ব পায় কাল-কালান্তর...


কর্মচঞ্চলতা :

শিশুরা কখনো থেমে থাকে না। পেছনে ফিরে তাকানোর আবার সময় কোথায় তাদের? কর্মচাঞ্চল্য তাদের প্রাণস্পন্দন হয়ে কাজ করে। এক্ষেত্রে বড়োরা অনেক পিছিয়ে। অনেকে তো বয়সের অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টাকে আমলেই নেয় না। অথচ কর্মচঞ্চলতা হচ্ছে—মানসিক বিষয়। এটা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট যে, বয়সের ভার পড়ে একজন মানুষের শরীরে, তার মনে নয়। তো বয়সের ভারকে মনের উপর ফেলে কর্মচঞ্চলতা থেকে বঞ্চিত থাকাটা নিশ্চয় বুদ্ধিমানের কাজ নয়? আমরা বড়োরা এই রোগে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। (ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশগুলোতে এই রোগটা কম। সেখানকার বুড়ো-বুড়িদেরও অনেক রোমান্টিক দেখা যায়। সবচেয়ে বড়কথা—তারা মনে করে জীবনের উল্লেখযোগ্য একটা সময় অশান্তি ও মানসিক চাপে ভুগে [যা সাধারণত পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে হয়ে থাকে], বুড়োকালে এসেও তাতে ভোগার কোনো অর্থই হয় না!)


জানার প্রতি অনুরাগ :

গুগল, স্মার্ট ফোনের এই যুগে আমাদের শিশুরা এমন এমন তথ্য আবিষ্কার করে, যা আমরা ভাবতেই পারি না। আমরা যদি আমাদের কান খোলা রেখে শিশুদেরকে শুনি আর চোখ খোলা রেখে তাদের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করি, তাহলে আমরা অবাক হতে বাধ্য হব। শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়েছে, তারা স্কুলে এমন জিনিস শিখছে, যা আমরা কখনো শিখিনি। তো সেক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই তাদের কাছ থেকে চমৎকার বিষয়গুলো শেখা উচিত।


আপনাকে-আমাকে-আমাদের সবাইকে শিশুদের এই মূল্যবান গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রশংসা করতে হবে। এবং তাদের স্বাভাবিক গতিতে প্রস্ফুটিত হতে দিতে হবে। তাদের অবহেলা করবেন না। সবসময় তাদের ছোটো-বড়ো সব কাজের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। ভুল হলে তাদের বোঝাবেন। শুধরে দিবেন। আর ভালো করলে অবশ্যই পুরস্কৃত করবেন। এককথায়—


আপনি তাদের সহযোগী হোন, প্রতিপক্ষ নয়। বন্ধু হোন, বিরোধী নয়।


আমরা আমাদের থেকে অগ্রগামী এক প্রজন্মের অপেক্ষা করছি, যারা আমরা যা অর্জন করতে চেষ্টা করেছি তা ধরে রাখবে এবং আমাদের মিশন ও ভিশন সাকসেস করতে সংগ্রাম করবে।

মনে রাখবেন! আপনার সন্তানকে সৎকর্মশীল করে গড়ে তোলাও এক প্রকার সদকায়ে জারিয়া। সন্তানের আগে আপনি মারা গেলে এর জন্য পুরষ্কার পেতে থাকবেন কেয়ামাত পর্যন্ত। আর যদি সে আগে মারা যায় তাহলে এ কাজটি আপনার আমলনামা ভারি করবে, ইনশাআল্লাহ।


সর্বোপরি, আপনার অর্জন নয় বরং আপনার অবদান দ্বারা আপনার জীবনকে পরিমাপ করুন। আল্লাহ আমাদের শিশুদের রক্ষা করুন, তাদের ইহকাল ও পরকালের কল্যাণে ভূষিত করুন এবং তাদের সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আমিন।

১০৩৯ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

Vice-President of AlMaghrib Institute. Senior Scholar. Head of Islamic Theology and Ethics Department. Master’s in Islamic Theology, World Religions and Modern Religious Sects. PhD in Theology. Imam of Clear Lake Islamic Center. Director of Texas Da‘wah Convention. Gives fatwah as member of American Muslim Jurists Association (AMJA). Answers fiqh questions on Twitter.

অনুবাদক পরিচিতি

মন্তব্য

৫ টি মন্তব্য করা হয়েছে
মুনতাসির মামুন

মুনতাসির মামুন

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ - ২৩:১৯ অপরাহ্ন

জাঝাকাল্লহ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
গুলজার হোসাইন

গুলজার হোসাইন

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ - ২৩:০১ অপরাহ্ন

ধন্যবাদ! সুন্দর লেখা...

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ - ০২:২১ পূর্বাহ্ন

ALHAMDULILLAH ...

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ - ০৬:০৯ পূর্বাহ্ন

Ameen!

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
গোলাম রববানী

গোলাম রববানী

২৪ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৬:০৯ অপরাহ্ন

মাশা আল্লাহ্! চমৎকার!

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...