‘চিন্তা’ কী?

মানুষের স্বাভাবিক ও সামগ্রিক কার্যক্রমের মূল সূতিকাগার হলো তার ‘চিন্তা’ করার ক্ষমতা। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই যুগে আমরা অনেকেই যেন এই চিন্তা করতেই ভুলে গিয়েছি। আমরা প্রায়শই জ্ঞাননির্ভর তথ্যের ব্যাপারে সংশয়ে পড়ে যাই এবং ধারনা পরিস্কার না থাকায় কোনো একটি ইস্যুর তথ্য হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটিকেই ‘চিন্তা’ হিসেবে ধরে নেই।


চিন্তা মানে কেবলই তথ্য সংগ্রহ করা নয়। আবার তথ্য পর্যালোচনা বা ডাটা এনালাইসিসকেও চিন্তা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। আবার কোনো একটি বিষয়কে একটি ধারনার সাথে সম্পর্কযুক্ত করে দিলেই কিংবা বিভিন্ন ধারনার মধ্যে যৌক্তিক একটি সম্পর্ক স্থাপন করলেও চিন্তা তৈরি হয় না। আবার কেবলমাত্র মানসিক প্রক্রিয়াদির মাধ্যমেই চিন্তা বিকশিত হয় না। চিন্তার ধরন ও কাঠামো তার চেয়ে অনেক বড়ো কিছু।


কোনো একটি বিষয় এরকম না হয়ে কেন ওরকম হলোএই ধরনের প্রশ্নের উত্তর নিরন্তরভাবে খুঁজে যাওয়ার নামই হলো চিন্তা। কোনো জিনিস নেই মানেই তার অস্তিত্বই নেই। আর অস্তিত্বের দুর্ভেদ্য শৃংখলের বাইরে যেহেতু আর কোনোকিছুরই কোনো অবস্থান নেই, তাই আমাদের যাবতীয় চিন্তাভাবনা অস্তিত্ব আছে এমন সব বিষয় এবং তার অগণিত প্রকারভেদকে ঘিরেই। আমরা বৈজ্ঞানিক কোনো গবেষনা করি কিংবা সকালের স্নিগ্ধ বাতাসের উপর সুন্দর কোনো কবিতা লিখি অথবা আধুনিক কোনো শহর নিয়ে পর্যালোচনা করিআমাদের সব কার্যক্রমই চারিপাশের অস্তিত্বকে কেন্দ্র করেই।


তাই সব ধরনের চিন্তাকে বাস্তব এবং অস্তিত্বের মধ্যেই রাখতে হবে। তা না হলে আমরা আত্মজ্ঞানের ফাঁদ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব না। এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বলা যায়শুধুমাত্র মনের গহীনের কার্যক্রমকে ঘিরেই চিন্তাধারা আবর্তিত হয় না। কার্টেজিয়ান তত্তে (ফরাসি দার্শনিক দেকার্তের দর্শন) মনের ও পৃথিবীর দ্বৈত স্বত্বার কথা বলা হয়েছে। এগুলো কখনোই সক্রিয় হয় নাযদি ব্যক্তির চিন্তা অস্তিত্বের মধ্যেই দৃঢ়ভাবে ডুবে থাকে। অতীত যুগের দার্শনিকরা তাই আধ্যাত্মবাদ ও দার্শনিক সংশয়বাদকে বরাবরই খারিজ করে দিয়েছেন।


অস্তিত্বের বিষয়টি একেবারে বিমূর্ত কোনো ধারনা নয়। বরং এটি সবচেয়ে বেশি বাস্তব ধারনা। আমরা আমাদের মনে এই অস্তিত্বের বিষয়টিকে একটি চিন্তা বা ধারনার আদলেও ধারন করতে পারি। তবে যেভাবেই বলি না কেন, অস্তিত্বের বাস্তবতাটি বরাবরই সাদামাটা মানসিক পরিস্থিতির তুলনায় একটু ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেকোনো একটি দৃশ্য আর সেই দৃশ্যের ছবির মধ্যে যে পার্থক্য থাকে, অনেকটা সেরকম। আমরা যখন ছবি তুলি, তখন একটি মুহূর্তকে ধরে রাখি। দৃশ্যপটের মধ্যে যে স্বাভাবিক গতি ছিল, তা কেড়ে নিয়ে আমরা শুধুমাত্র স্থির মুহূর্তকে ধরতে পারি। এখানে গতির ব্যাপারটি ধরে রাখা যায় না। পরবর্তীতে যখন ছবিটি আবার আমরা দেখি, তখনও আমাদের কাছে তা অবাস্তব কিছু মনে হয় না। ছবিটি কাল্পনিক কিছু নয়, আবার নিরেট বাস্তবও নয়। প্রতিটি বিমূর্ত শিল্পকর্মের বিষয়েই একই ঘটনাই ঘটে। কারণ, বিমূর্ত শিল্পকর্মে অস্তিত্বের গতিশীলতা থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। আমরা স্থির কোনো মুহূর্তকে তাই বাস্তব হিসেবে গন্য করি না। কারণ, বাস্তবে কোনোকিছুই এমন গতিহীন হয় না।


মানুষের চিন্তা বলতে বাস্তবতার মাঝে অনুশীলনকেই বোঝায়। প্রতিটি মানসিক অবস্থান কিংবা যৌক্তিক সম্পর্কগুলোকে আমরা বাস্তবতার সাথেই মেলাতে চেষ্টা করি। উজুদ (অস্তিত্ব) আর মাওজুদ (বিদ্যমান) সত্ত¡াগুলোর মাঝে পার্থক্য নিরুপন করার মাধ্যমে আমরা বিষয়টিকে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারি। আমাদের চারপাশের অস্তিত্বমান বিষয়গুলোর মধ্যে আছেগাছ, আকাশ, বাসা-বাড়ি, সড়ক প্রভৃতি। এগুলোর প্রতিটিরই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। একটি অপরটির থেকে পুরোই আলাদা। কিন্তু নিজের মতো করে সবগুলোই টিকে থাকে। অনেক পার্থক্যের মাঝেও তাদের মাঝে একটি মিল রয়েই যায়; আর সেই মিলটি অস্তিত্বের। এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রখ্যাত দার্শনিক মুল্লা সাদরা বলেছেন, ‘তারা সবই অস্তিত্বের প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।’ ব্যাপারটা এমনও নয় যে, অস্তিত্বমান বা জীবিত সবগুলো সত্ত্বা মিলে অস্তিত্বের ব্যাখ্যাাটিকে দাঁড় করায়। অস্তিত্বের ইস্যুটা বরং আলাদা। অস্তিত্ব হলো সেই বাস্তবতা, যা প্রতিটি জীবিত সত্ত্বাকে তার মতো করে টিকিয়ে রাখে। আমরা পৃথিবীতে যা দেখি বা অনুভব করি, তার সবটার ভেতর দিয়েই অস্তিত্বের ধারনাটি বিদ্যমান থাকে। পর্বত, পশুপ্রাণী, মানুষ, বায়ু, বৃষ্টি, শহর-বন্দর সবকিছুকে নিয়েই আমাদের অস্তিত্ব। অস্তিত্বের অগনিত উপাদান-উপকরন রয়েছে। অস্তিত্বের রং অসীম। শুধুমাত্র কিছু জীবিত সত্ত্বার সমন্বয়েই অস্তিত্ব নির্ধারিত হয় না। এর ব্যাপকতা আরও অনেক বেশি।

যেভাবে একটি বস্তু তার অস্তিত্ব বজায় রাখে, আমরা মানবজাতিও তাই করি। আমাদের এই অংশগ্রহনই অস্তিত্বের সাথে একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে দেয়। আমরা বিশেষ ধরনের সম্পর্ক সৃষ্টিতে এবং বজায় রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।


আমরা কোনো বস্তু, মুহূর্ত, পরিস্থিতি অথবা কোনো একটি সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করি, মূলত তখন আমরা অস্তিত্ব এবং এর অগনিত উপকরণ নিয়েই মগ্ন থাকি। বিষয়টি এমনও নয় যে, অস্তিত্বের পৃথিবীর অবস্থান পরোক্ষ কিংবা আমরা অর্থহীন কোনোকিছুকে জোর করে তাৎপর্যপূর্ন বানাবার চেষ্টা করছি। বরং, এখানে প্রতিটি বিষয়েরই নাম, উদ্দেশ্য, অনুপাত এবং তাৎপর্য রয়েছে এবং এগুলোর সবই আমাদের সাথেও স্বতন্ত্রভাবে সম্পর্কিত। পশ্চিমা দর্শনগুলোর অধ্যাত্মবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পৃথিবী ও মানবজাতিকে একটি অর্থহীন বস্তুতে পরিনত করেছে। আমরা এখনো এই দৃষ্টিভঙ্গির ফাঁদেই আটকা পড়ে আছি। আমরা ধরে নিয়েছি যে, আমাদের সাথে এই বিশ্বজগতের বুঝি কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা অহংকার ও অজ্ঞতায় এতটাই ডুবে আছি যে আমরা ধারনা করে নিয়েছি, আমাদের উপকারে আসা ছাড়া এই বিশাল অস্তিত্বের যেন কোনো প্রয়োজনই নেই। অথচ প্রকৃত সত্য এর পুরোই বিপরীত। আমরা বুঝি বা না বুঝি, পৃথিবীর একটি প্রকট তাৎপর্য রয়েছে। আমরা কেবলমাত্র একটি বাস্তবতার অংশ, যার আকৃতি আমাদের তুলনায় অনেক অনেক বড়ো।

অন্যদিকে মানুষের জানার সাধ্যের মধ্যে যতটুকু আছে, ততটুকু পরিমান বস্তুর প্রকৃত বাস্তবতাকে চিনে নেওয়ার ক্ষমতাকেই মুসলিম দার্শনিকরা দর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। দর্শনের এই সংজ্ঞাটি অস্তিত্বের ধারনাকে এবং অস্তিত্বের সাথে আমাদের সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠিত করে। প্রতিটি বস্তুর আলাদা বাস্তবতা আছে। আমরা ততটুকুই বুঝতে পারি, যতটুকু আমাদের সামর্ত আছে। আমরা গোটা পৃথিবীর কর্তৃত্ব দাবি করি না। আমরা অস্তিত্বকে নিজেদের দাসও মনে করতে পারি না। আমরা কেবলমাত্র আমাদের অস্তিত্বের যত্ন নিতে পারি, আমাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারি। অস্তিত্বের জগতের সাথে আমাদের সম্পর্ক কোনোভাবেই আধিপত্য বিস্তার করার মতো নয়, বা জুলুম করার মতোও নয়।


চিন্তার কারলে বুদ্ধিবৃত্তিক, যৌক্তিক ও অনুভূতির সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে আমরা অস্তিত্বের জটিল বিষয়গুলোকে কিছুটা হলেও বুঝতে পারি। অস্তিত্বের জগতকে আমরা যখন মানসিক কাঠামোতে নিয়ে আসি, তখনই আমরা আসলে বড়ো ভুলটা করি। বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে যখন বহু স্তর বিশিষ্ট অস্তিত্বের কাঠামোর আলোকে পর্যালোচনা করা যাবে, তখনই আমরা প্রকৃত বাস্তবতা ও সত্যকে উপলব্ধি করতে পারব। দৃষ্টিভঙ্গিকে অস্তিত্বের কাঠামোর আলোকে পর্যালোচনা করার মানে হলো জ্ঞান অর্জন করা, নিয়ন্ত্রিত চিন্তার বাইরে গিয়ে চিন্তা করা এবং তর্কলব্ধ জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া। পৃথিবীকে বোঝার জন্য আমাদেরকে নিজেদের মন ও অন্তরকে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করতে হবে। দর্শন ও যুক্তি এক্ষেত্রে যেমন গুরুত্বপূর্ন, ঠিক তেমনি চিত্রকলা, কবিতা বা ধর্মও কম গুরুত্বপূর্ন নয়। কোনো চিন্তাই অর্থবহ হয় না, যতক্ষন না সেই চিন্তাকে জ্ঞানের পর্যায়ে না নেওয়া হয় এবং সেই চিন্তা দিয়ে অস্তিত্বের রহস্যকে উম্মোচন করা না যায়। চিন্তা করার ক্ষমতা আমাদেরকে তখনই সমৃদ্ধ করবে, যখন আমরা উপলব্ধি করতে পারব যে, আমরা এই পৃথিবীর শাসক নই; বরং কেবলমাত্র এর রক্ষক ও জিম্মাদার।

৫৭৭ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

ড. ইব্রাহিম কালিন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিস্যেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের বিশেষ উপদেষ্টা ও মুখপাত্র। খ্যাতিমান মুসলিম চিন্তাবিদ ও দার্শনিক জনাব কালিনের জন্ম তুরস্কে। পড়াশোনা করেছেন দর্শন শাস্ত্রে, পিএইচডি করেছেন আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি থেকে। তিনি জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রিন্স আল-ওয়ালিদ সেন্টার ফর মুসলিম-খ্রিস্টিয়ান আন্ডারস্টান্ডিং’-এর একজন সম্মানিত ফেলো। তিনি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ২০০১ সালে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০২ সালে মেরি ওয়াশিংটন কলেজে, ২০০২ সাল থেকে ২০০৪ পর্যন্ত কলেজ অফ দ্যা হলি ক্রসে অধ্যাপনা করেছেন।

অনুবাদক পরিচিতি

আলী আহমাদ মাবরুর। পেশায় সাংবাদিক। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। সম্প্রীতি তাঁর বেশ কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ পাঠকপ্রিয় হয়েছে। স্বপ্ন দেখেন এক আলোকিত সমাজের।

মন্তব্য

৩ টি মন্তব্য করা হয়েছে
Lutfur rahman

Lutfur rahman

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৭:৫৭ অপরাহ্ন

ভাবছিলাম, চিন্তা সম্পর্কে প্রাথমিক আলোচনার কেন নিবন্ধ থাকবে কিনা৷ ধন্যবাদ সুন্দর অনুবাদের জন্য!

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবুনছর

আবুনছর

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২১:৩১ অপরাহ্ন

না পাড়াটাই ভালো ছিল।এখনতো চিন্তায় পড়ে গেলা। মাথায় আর কিছুই ডুকছেনা।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০৫:৩৬ পূর্বাহ্ন

মাথা ঘুরছে।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...