সাইয়্যেদ কুতুব শহিদ : মহাকালের ইতিহাসে এক ধ্রুবতারা

১৯১৫-এর জুলাই মাস। উসমানি খিলাফতের মৃত্যুঘণ্টা বাজার সময় ঘনিয়ে এসেছে। ইহুদি লবি খিলাফতের পতন ঘটাতে নিজেদের সর্বস্ব নিয়ে মাঠে নেমেছে। পবিত্র নগরী মক্কায় নিযুক্ত উসমানি খিলাফতের আমির ও প্রতিনিধি আলি ইবনে হুসাইন শরিফের সাথে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। আলোচনা চলছে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস। ১৯১৬-এর মার্চে শেষ হলো সেই আলাপ। ব্রিটিশ প্রতিনিধি ম্যাকমোহন আর মক্কার আমির শরিফের মধ্যে সম্পাদিত হলো এক গোপন চুক্তি। আদতে সে চুক্তি বিশ্বাসভঙ্গের চুক্তি, বিশ্বাসঘাতকতার চুক্তি। সে চুক্তি ইতিহাসের নির্মমতার চুক্তি! মুসলিম উম্মাহর ভাগ্য বিপর্যয়ের চুক্তি!


শরিফ তার সমস্ত শারাফাত ভুলে গিয়ে, তার আভিজাত্যের কথা বিস্মৃত হয়ে বিশ্বাসভঙ্গ করে বসেছিল। বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের সাথে, বিদ্রোহ করেছিল ইসলামের সাথে। একজন মুসলিম হয়ে মুসলিম উম্মাহর ভাগ্য বিপর্যয়ের ষোলোকলা পূর্ণ করেছিল। অতি উৎসাহী হয়ে ইসলামের শত্রুদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল উম্মাহর হৃদস্পন্দনে আঘাত হানতে। মুসলমানদের শান্তি, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধ্বংস করার ঘৃণ্য খেলায় মেতে উঠেছিল। বিশ্বাসীদের ঐক্যের বন্ধন খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল নির্মমভাবে। যার বিনিময়ে তিনি প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন আরব, সিরিয়া, ইরাকসহ পুরো আরব ভূ-খণ্ডের রাজত্ব, স্বায়ত্তশাসন।


তদানীন্তন সময়ে উসমানি খিলাফতও অনেক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই দুর্বলতা কাটানো যেত, যদি খলিফা আরবদেরও সঙ্গে পেতেন আরবদের সহযোগিতা পেতেন, আর তারা বিদ্রোহের দাবানল না ছড়াত। কিন্তু হায় আরব! তখন তারা বিদ্রোহের নেশায় বুঁদ হয়ে ছিল। সাম্রাজ্য আর ক্ষমতা লাভের আশায় ভুলে গিয়েছিল বাস্তবতা, ইসলামের শত্রুদের শঠতা।


অবশেষে ১৯১৬-এর ১০ জুনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়ার দিবাস্বপ্নে শরিফ বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। খিলাফতের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষে অবস্থান নিলেন। আর ঈমান-আকিদা ও ইসলামের ভ্রাতৃত্বের কথা ভুলে গিয়ে নির্মমভাবে উসমানি খিলাফতের সৈন্যদের গলায় ছুরি বসিয়ে দিলেন। বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই খিলাফতের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল ভঙ্গুরদশা, তারপর আবার বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে লাগাতার হার এবং ভূমি হারানো। ইতিহাস সাক্ষী, আরবদের এই বিশ্বাসঘাতকতা খিলাফতের পতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছিল। আর উম্মাহকে ঠেলে দিয়েছিল দুর্যোগপূর্ণ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।


১৯২৪ সালের ৩ মার্চ। উসমানি খিলাফতের পতন হয়েছে। পুরো পৃথিবী শোকে মুহ্যমান। দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়। ক্ষত-বিক্ষত হয়েছিল অন্তর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা খিলাফত ছিল উম্মাহর ঐক্যের বন্ধন, ভালোবাসার নিদর্শন। এই খিলাফত ছিল মুসলমানদের শান্তি, সুরক্ষা ও নিরাপত্তা। যখনই খিলাফতের পতন হলো, মুসলমানরা নিজেদের একেবারে অসহায় মনে করল। সবাই কিংকর্তব্যবিমুঢ়। তবে বুঝতে পারছিল আসন্ন বিপর্যয়ের কথা। বস্তুত খিলাফতের পতনের পরই উম্মাহর ভাগ্যাকাশ ছেয়ে গেল বিপর্যয়ের কালো মেঘে, অশুভ সব বিপদে।


সত্যিই খিলাফতের পতনের পরই মুসলমানদের উপর উপর নেমে এলো একের পর এক দুর্যোগ। ফিলিস্তিনের ভূমি হারানোর মধ্য দিয়েই দুর্দশার সূচনা। আর নির্বোধ শরিফ? ইতিহাস হয়ে গেল বাকি সবকিছু। খিলাফতের পতনের পরপরই মুসলমানদের ওপর নেমে আসা এত দুর্যোগ আর দুর্দশা দেখে উম্মাহর উল্লেখযোগ্য অংশই বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। তা ছাড়া খিলাফতের ছায়া না থাকায় ততদিনে মুসলমানদের মধ্যেও আত্মিক অবক্ষয় ও নৈতিক বিপর্যয় দেখা দিলো। সবকিছু মিলিয়ে উম্মাহর জন্য দরদি কিছু মানুষ খুব বেশিই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তাই তারা খিলাফত ও ইসলামি শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন আন্দোলন শুরু করলেন। গ্রহণ করলেন প্রয়োজনীয় নানান পদক্ষেপ।


তারই ধারাবাহিকতায় ১৯২৮ সালে মিশরে প্রতিষ্ঠিত হয় ইখওয়ানুল মুসলিমিন। এ এক বিপ্লবী কাফেলা। জাহেলিয়াতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের কাফেলা, যা ইমাম হাসান আল বান্নার হাত ধরে এগিয়ে যেতে থাকে। এই দূর্বার কাফেলা উম্মাহর বিশিষ্টজনদের বোঝানোর চেষ্টা করে খিলাফতের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য, তারা সমাজ সংস্কারের প্রতি বিশেষভাবে মনযোগী হয়। সবার মাঝে ইসলামি মূল্যবোধকে জাগ্রত রাখার জন্য নিতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী সব পদক্ষেপ।

কিন্ত আচানক ঘটে যায় এক নির্মম দুর্ঘটনা। আততায়ীর গুলিতে শহিদ হন ইমাম হাসান আল বান্না। ইমাম বান্নার শাহাদাতের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে ঐতিহাসিকরা বলছেন—

ততদিনে ইহুদিরা নিজেদের জন্য এই আন্দোলনকে খুব ভালোভাবেই বিপদজনক হিসেবে ধরে নিয়েছিল। তাই খুব দ্রুতই এই বিপদজনক আন্দোলনের নেতাকেই সরিয়ে দিলো; যাতে কালের গর্ভে হারিয়ে যায় এই আন্দোলনও।

ইমাম হাসান আল বান্নার শাহাদাতের পর এই আন্দোলনের হাল ধরা, উম্মাহর মাঝে ইসলামি মূল্যবোধ জাগ্রত রাখা, উম্মাহকে উদবেগ ও উৎকণ্ঠা থেকে রক্ষা করা, সমাজ থেকে সার্বিক অবক্ষয় রোধ করা এবং উম্মাহকে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠায় উজ্জীবিত করার জন্য খুব প্রয়োজন ছিল এমন এক মহান নাবিকের, যার মাঝে থাকবে শুদ্ধতা, গভীরতা, চিন্তার প্রখরতা, অতুলনীয় প্রতিভা এবং যথাসময়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সার্বিক যোগ্যতা। ঠিক সেই প্রতিকূল সময়টাতেই উম্মাহর ভাগ্যাকাশে সৌভাগ্যের ধ্রুবতারা হয়ে উদিত হন সাইয়্যেদ কুতুব শহিদ।


পুরো নাম সাইয়্যেদ ইবরাহিম শাজেলি। আর কুতুব তাঁর বংশগত নাম। সাইয়্যেদ কুতুবের পূর্বসূরিরা ছিলেন জাজিরাতুল আরবের বাসিন্দা। মূল আরব ভূ-খণ্ডেই ছিল তাদের বসবাস। পরবর্তীকালে তারা হিজরত করে মিশরে এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৯ অক্টোবর মিশরের উসইউত জেলার মুশা নামক গ্রামে তাঁর জন্ম। গ্রামের মক্তবে কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক শ্রেণিও গ্রামের মাদরাসাতেই পড়েন। মাধ্যমিক শ্রেণিগুলোর পাঠ চুকান কায়রোস্থ মাদরাসাতুল মুআল্লিমিন আব্দুল আজিজ-এ। মেধার তীক্ষ্ণতা ও জ্ঞানার্জেন তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে নিয়ে যায় সমকালীন মিশরের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম-এ। আর ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ধর্ম ও সাহিত্যের উপর ডিগ্রি নিয়ে সমাপ্ত করেন প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা।


প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ করার আগেই তাকে একপ্রকার চাপে পড়েই শিক্ষকতায় নিযুক্ত হতে হয়। নিজের পড়ালেখা চালিয়ে নেওয়ার জন্যই ছিল মূলত এই কসরত। তারপর ভাগ্যের চাকা সেই সমান্তরালেই ঘুরল। কায়রোতে পড়াকালীন সময়েও তাকে একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হলো। কারণ, তখন তিনি তাঁর মামা আহমদ হোসাইন মুশির বাসায় থাকতেন; যিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ। পড়ালেখা শেষ না হতেই অর্থ সংকটে তাঁর মামার পারিবারিক অবস্থা হয়ে গেল শোচনীয়। সেই সময়টাতে রুটি-রুজির জন্য সাইয়্যেদ কুতুবকেও মামার সাথে কিছুদিন সাংবাদিকতা করতে হয়।


শৈশবে হিফজ সম্পন্ন করার সময়ই সাইয়্যেদ কুতুব দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিপুলভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। প্রভাবিত না হয়েও উপায় নেই। কারণ, তাদের বাড়িই যে ছিল আন্দোলনের কর্মীদের পরামর্শ কেন্দ্র। এতে নিজের অজান্তে তিনি শৈশবেই বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

পারতপক্ষে সাইয়্যেদ কুতুব উচ্ছলতামুখর শৈশবে তাঁর খেলার বয়সের অন্য আট-দশটা বাচ্চার মতো ছিলেন না। তিনি ছিলেন খুব গম্ভীর প্রকৃতির। দশ বছর বয়স থেকেই নামাজের প্রতি খুব যত্নবান ছিলেন। বড়োদের সাথে আলোচনা সভায়ও বসতেন এবং সবকিছু মনযোগ দিয়ে শ্রবণ করতেন। অথচ সমবয়সি বন্ধুরা তখন মত্ত থাকত তুমুল দুরন্তপনায়। তিনি শৈশবেও বেশ সাহসী ছিলেন। মাদরাসার ছাত্রদের পরস্পরের বিরোধ ও দ্বন্দ্বও তিনি উদ্যোগী হয়ে মিটিয়ে দিতেন।


কর্মজীবনে মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রথমেই সাইয়্যেদ কুতুবকে শিক্ষকতায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। শিক্ষকতা ছিল কুতুব পরিবারের বংশ ও ঐতিহ্যগত পেশা। কিন্তু পরিবারের ব্যয়ভার বহন করার জন্য এই পেশা যথেষ্ট ছিল না। সাইয়্যেদ কুতুবের ভাগ্যাকাশে সৌভাগ্যের তারকা উত্থিত হলো । তাঁর যোগ্যতা এবং একনিষ্ঠতায় অভিভূত হয় সরকারি শিক্ষাকর্মী ও পর্যবেক্ষকরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাঁর ডাক আসে। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে মন্ত্রণালয়ের অধীনেই তিনি নিযুক্তি পান প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা-পর্যবেক্ষণ টিমে। চার বছর টানা কাজ করেন এই পেশায়। তাঁর যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতায় কর্মকর্তারা প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। আর সেটাই তাঁর জন্য সুফল বয়ে আনে। ১৯৪৮ সালের ৩ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাইয়্যেদ কুতুবকে আমেরিকার পাঠানো হয়। আধুনিক শিক্ষা পরিচালনা এবং তার কর্মপন্থার উপর ডিগ্রি ও বিশেষজ্ঞতা অর্জনই ছিল এই সফরের মূল ও প্রধান উদ্দেশ্য।


আমেরিকায় অবস্থানকালে সাইয়্যেদ কুতুব আমেরিকা জীবন ও সমাজব্যবস্থা, তাদের বস্তুবাদী ও ভোগবাদী দর্শনের দুরবস্থা নিয়ে অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। মিশরের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তা প্রকাশিত হতো। তন্মধ্যে একটি প্রবন্ধ ছিল- যেমন আমেরিকা আমি দেখেছি। তিনি এই প্রবন্ধে লিখেছেন—

তারা (আমেরিকা)এমন এক জাতি যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান, উন্নতি ও অগ্রগতিতে পৃথিবীর নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাদের মানবিক অবস্থা ও সমাজব্যবস্থা এত-হীন যে, তা মানবিক অবস্থার প্রাথমিক স্তরেও নেই। আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো তা আরও অধঃপতিত।

ঠিক সেই সময়টাতেই বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হতে থাকে মিশরের বিপ্লবী সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্নার শাহাদাতের সংবাদ। এতে আমেরিকা ও পশ্চিমাদের আনন্দ উদযাপন দেখে তিনি এই আন্দোলনের ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন । আমেরিকা অবস্থানকালীন এই আন্দোলন নিয়ে তিনি ব্যাপক গবেষণা করেন।


পরবর্তীকালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর কাছে থেকে তাদের আন্দোলন ও কর্মধারা প্রত্যক্ষ করেন । এতে সাইয়্যেদ কুতুবের কাছে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যায়, পশ্চিমারা কেন এই আন্দোলনের ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ, কেন তারা এই আন্দোলনকে ঘৃণা করছে, আর কেনই-বা তারা হাসান আল বান্নার শাহাদাতে আনন্দ উদযাপন করছে? তারপর ইখওয়ানের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বাড়তে থাকে। সম্পর্ক হয়। একসময় তা গভীরে চলে যায়, আর সে সময় সাইয়্যেদ কুতুবও হয়ে যান এই আন্দোলনের একজন কর্মী। এই সংগঠনের একজন উচ্চপদস্থ সদস্য। ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন তাদের কর্মধারার সাথে।


এরপর তিনি আর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বেশিদিন কাজ করতে পারেননি। কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের চরম বিরোধিতা করতে শুরু করেন। এতে কর্মকর্তাদের প্রভাবশালী একটা অংশ তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়। আর তারাই কৌশলে তাদের পথের কাঁটা সাইয়্যেদ কুতুবকে সরিয়ে দেয়। এতে অবশ্য সাইয়্যেদ কুতুবের কোনো আফসোসই ছিল না; থাকার কথাও নয়। কারণ, তিনি ততদিনে ইখওয়ানুল মুসলিমিন নামের বিপ্লবী ইসলামি আন্দোলনের সদস্য যারা শরিয়াহর জন্য নিজেদের কুরবানি করার দৃপ্ত শপথ নিয়েছিল।


ইখওয়ানে যোগ দেওয়ার আগে সাইয়্যেদ কুতুব হিজবুল ওয়াফদ সংগঠনের দ্বারাও প্রভাবিত ছিলেন। অবশ্য ইখওয়ানে যোগ দেওয়ার পরও অনেকের মতে তিনি সালাফি জিহাদ আন্দোলন-এর সমর্থক ছিলেন। বিশেষত আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের রচনা তাঁর মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করত, আন্দোলিত করত তাঁর চিন্তা-সত্তাকে। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের রচনা থেকেই ইসলামি সাহিত্য অধ্যয়নের প্রতি ঝুঁকে পড়ার প্রেরণা লাভ করেন সাইয়্যেদ কুতুব। দীর্ঘ অধ্যয়নে ডুবে থাকেন । ইসলামের গভীরে চলে যান । উপলব্ধি করতে থাকেন শরিয়াহর মানহাজ ও পন্থা। তারপর তাঁর চিন্তাধারায়ও ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তখন তাকে প্রভাবিত হতে দেখা যায়, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা, ইবনুল কায়্যিম, ইবনে হাজম, হাসান আল বান্না, সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদি, আব্দুল হামিদ কিশক, শাকরি মুস্তফা, মাহমুদ শাকির প্রমুখের চিন্তাধারা দ্বারা।


সাইয়্যেদ কুতুব শারীরিকভাবে শীর্ণকায় ছিলেন। আরব বিশ্বের প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক শাইখ আলি তানতাবি যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসেন, সবিস্ময়ে বলেন—আমার ভাবতেও অবাক লাগছে, এই শীর্ণকায় ব্যক্তি কীভাবে এত সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ে কলম ধরেন? অনেকে সাইয়্যেদ কুতুবের বাগ্মিতা ও উপলব্ধি শক্তির উপমা দিতে গিয়ে তাকে ইবনে হাজম জাহিরির সঙ্গে তুলনা করেছেন। ততদিনে সাইয়্যেদ কুতুবের আল আদালাতুল ইজতিমাইয়্যহ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়; যা মিশরের জনসাধারণের মাঝে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। আর এর পরপরই ১৯৫৪ সালে তিনি সংগঠনের মুখপত্র পত্রিকা ইখওয়ানুল মুসলিমিন-এর সম্পাদক নিযুক্ত হন। এতে সংগঠনের কর্মধারায় নতুনভাবে প্রাণ সঞ্চার হয়।


কিছুদিন না গড়াতেই সামনে আসে মিশর সরকারের সাথে ব্রিটিশদের চুক্তি প্রসঙ্গ। ইখওয়ানুল মুসলিমিন পত্রিকাতে কঠোরভাবে এর সমালোচনা করা হয়। এতে জামাল আব্দুন নাসেরের সরকার পত্রিকা প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তার পরেই আবার ঘটে ইস্কান্দারিয়ায় ভাষণ দানকালে মিশরের প্রধানমন্ত্রী জামাল আব্দুন নাসেরের উপর প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা। এতে সরকার দোষারোপ করে ইখওয়ানকে এবং ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করে কর্মীদের। সময়টা ছিল ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে। সাইয়্যেদ কুতুবও গ্রেপ্তার হন। ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় সবাইকে। শিকার হতে হয় নির্মমতার। লোমহর্ষক সব শাস্তির।


সেই সময়টাতে জেলের অভ্যন্তরেই একের পর এক হত্যা করা হয় সে সকল ইখওয়ান কর্মীদের, যারা জামাল নাসের সরকারকে ইসলামবিরোধী তাগুত সরকার মনে করত। ১৯৬৪ সালে স্বাস্থ্যগত অবনতির কারণে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আব্দুস সালামের সুপারিশে সরকারিভাবে সাইয়্যেদ কুতুবকে মুক্তি দেওয়া হয়; যদিও তা কেবল আট মাসই স্থায়ী হয়েছিল। জেলে অবস্থানকালে তিনি বলেছিলেন— ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে দীর্ঘ সময় নিয়ে সার্বিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। যা তা আন্দোলন করে কখনো ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।


জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি নিজের অসমাপ্ত কাজে আত্মনিয়োগ করেন। পূর্ণতা দেন বিখ্যাত ও প্রসিদ্ধ তাফসিরগ্রন্থ ফি জিলালিল কুরআনে। পাশাপাশি মাআলিম ফি তারিক এবং আল মুসতাকবিল লিহাজাদ দ্বীন এই দুটো গ্রন্থও রচনা করেন।

১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জুলাই গ্রেপ্তার হন সাইয়্যেদ কুতুবের প্রিয় ভাই মুহাম্মদ কুতুব। যিনি নিজেও ইখওয়ানের উচ্চ পর্যায়ের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এতে সাইয়্যেদ কুতুবও থেমে থাকেননি। তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করে একটি পুস্তিকা রচনা করে ছড়িয়ে দেন জনসাধারণের মাঝে। যার ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে যায়। আর সেই অপরাধে ১৯৬৫ সালের ৯ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয় সাইয়্যেদ কুতুবসহ ইখওয়ানের বিশ হাজারেরও অধিক কর্মীকে, যাদের মধ্যে সাতশোরও অধিক ছিল নারী। সাইয়্যেদ কুতুবের দুই বোন আমিনা কুতুব ও হামিদা কুতুবও ছিলেন সেই বন্দিদের মধ্যে। তারপর রাষ্ট্রদোহিতার অপরাধে সাইয়্যেদ কুতুবকে শোনানো হয় ফাঁসির শাস্তি।

পরবর্তীসময়ে এক ইখওয়ান কর্মকর্তা বলেন, আমি সেই সময়টাতে সাইয়্যেদ কুতুবের পাশে ছিলাম। আমি তাকে বললাম, আদালতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তো আপনি কৌশল গ্রহণ করে বাঁচতে পারতেন। তখন সাইয়্যেদ কুতুব বলেছিলেন—

আমি আমার জন্য তা করাটা বৈধ মনে করিনি। তা ছাড়া একজন নেতার জন্য এমন ঘৃণ্য পথ অবলম্বন করার উচিতও নয়। আর যখনই তিনি ফাঁসির সংবাদ শুনেছিলেন, তিনি বলেছিলেন—আলহামদুলিল্লাহ, গত ১৫ বছর আমি অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করেছি এই শাহাদাতের মর্যাদা অর্জনের জন্য।

যেদিন ইতিহাসের মহান এই বিপ্লবী ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর করা হবে, সেদিন সাইয়্যেদ কুতুবের সম্মুখে পেশ করা হয় শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার জন্য ওজর পেশ করে ক্ষমা চাওয়ার শর্ত। জবাবে সাইয়্যেদ কুতুব রুদ্রমূর্তি ধারণ করে বলেন—

আমার দাওয়াত ও কাজের জন্য ক্ষমা চেয়ে আমি কখনো আল্লাহর দ্বীনের সাথে গাদ্দারি করব না। তারপর তাকে বলা হলো, ওজর পেশ না করলে সমস্য নেই, প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে। তখন সাইয়্যেদ কুতুব বলেন—

আশ্চর্য! আমি কেন প্রাণভিক্ষা চাইতে যাব? তোমরা যদি নিজেদের সত্যপথের অনুসারী মনে করে আমাকে শাস্তি দিতে চাও, তবে তো আমি সত্যকেই মাথা পেতে নেব। আর যদি বাতিলপন্থি হয়ে থাকো, তবে বাতিলের কাছে মাথা ঝুঁকানো মুমিনের স্বভাব নয়।

এটা এক শাশ্বত সত্য যে, সাইয়্যেদ কুতুব রাহ. বাতিলের সামনে যে দৃঢ়তা ও অবিচলতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। যুগের অসাধারণ মানুষরাই কেবল এমন দৃঢ়তা দেখাতে পারেন। তাই তো সাইয়্যেদ কুতুবের এই দৃঢ়তা যারা উম্মাহর জন্য কিছু করতে চায়, তাদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে।

ঐতিহাসিকরা লিখেন, সাইয়্যেদ কুতুবের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করার প্রাক্কালে আজহারের এক শায়েখ আসেন সাইয়্যেদ কুতুবকে তওবা করিয়ে কালিমা পড়াতে। তিনি সাইয়্যেদ কুতুবকে বললেন : কালিমা পড়ুন। সাইয়্যেদ কুতুব মুচকি হেসে বললেন—

ভাই আমার! তুমি যে কালিমা দিয়ে রুটিরুজি করো, আমরা তো সেই কালিমা প্রতিষ্ঠা করার জন্যই জীবন দিচ্ছি। আর তুমি এসেছ আমাদের ঈমান পূর্ণ করতে?

অবশেষে ১৩ জুমাদাল উলা ১৩৮৬ হিজরি মোতাবেক ১৯৬৬ সালের ২৯ আগস্ট মহাকালের ইতিহাসের এই ধ্রুবতারা অস্তমিত হয়। শাহাদাতের সৌভাগ্য লাভ করেন উম্মাহর ইতিহাসের বাতিলের সাথে আপসহীন এই বীর-শার্দুল। উম্মাহর জন্য রেখে যান এক উত্তম আদর্শ। বাতিলের সামনে মাথা না ঝুঁকানোর আদর্শ।


উম্মাহর গঠন, চেতনা, প্রেরণা ও বিপ্লবের নীতি প্রণয়নে সাইয়্যেদ কুতুব শহিদ রাহ. রেখে গেছেন, অনন্য ও অসাধারণ রচনাবলির এক ভাণ্ডার। বাস্তবতা হচ্ছে, তার প্রতিটি গ্রন্থই মনস্তত্ত্ব ও বিষয়ের গভীরতা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তার দিক থেকে অতুলনীয়। তিনি তাঁর প্রত্যেকটা রচনা দিয়েই উম্মাহর নির্লিপ্ততাকে দূর করতে চেয়েছেন। দিতে চেয়েছেন নির্জীব চেতনাকে সজীবতা। যা থেকে পরবর্তীকালে বাস্তবিকপক্ষেই উপকৃত হয়েছেন দাওয়াতের সব অঙ্গনের ব্যক্তিরা। প্রেরণা লাভ করেছে মুসলিম উম্মাহ যুগ-যুগান্তরে।


ঐতিহাসিকরা সাইয়্যেদ কুতুবের সাহিত্য ও ইসলামি দর্শন নিয়ে লেখালেখির সময়কে দুই ভাগে ভাগ করে থাকেন—প্রথম ভাগের সময়টা ছিল যখন সাইয়্যেদ কুতুব দারুল উলুমের শিক্ষানবিশ ছিলেন। তখন মিশরের খ্যাতনামা সাহিত্যিক আহমাদ হুসাইন জাইয়্যাত সম্পাদিত মাজাল্লাতুর রিসালায় সাইয়্যেদ কুতুবের লেখা ছাপা হতো। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর শৈশব-কেন্দ্রিক আত্মজীবনীগ্রন্থ তিফলুম মিনাল কারইয়াহ (মক্তবের শিশু)। আর এই প্রথম ভাগেই তিনি রচনা করেন, আননাকদুল আদাবি : উসুলুহ ওয়া মানাহিজুহ। জীবনের এই ভাগের সময় কাটিয়েছেন তিনি একজন সাহিত্যিক হয়ে। আর তাঁর ইসলামি জীবনব্যবস্থা, বিপ্লব এবং রাজনৈতিক বিষয়ের উপর যত রচনা সব প্রকাশিত হয়েছিল, তা সব দ্বিতীয় ভাগে। তাফসির ফি জিলালিল কুরআন, মাআলিম ফিত তারিক, খাসাইসিসুত তাসাউরিল ইসলামি, আলমুসতাকবিল লি হাজাদ দীন- এসব সাইয়্যেদ কুতুবের সবচেয়ে মূল্যবান ও বিখ্যাত গ্রন্থ; যা আজও সবার কাছে সমাদৃত। সাইয়্যেদ কুতুবের চিন্তাধারা কোটি হৃদয়ে ঝড় তুলছে প্রতিনিয়ত।


জীবনের প্রথমভাগে সাইয়েদ তাঁর পরমপ্রিয় শিক্ষক আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ দ্বারা বেশ প্রভাবিত ছিলেন। এই ভাগে সাইয়েদ ধর্মীয় পড়াশোনায় না যত্নবান ছিলেন, আর না তেমন গভীরতা রাখতেন। আক্কাদের সাহিত্য ও চিন্তার অনূকুলেই তিনি চিন্তা এবং লেখালেখি করতেন। তাঁর যেসব লেখা নিয়ে কিছুটা বিতর্কিত আছে— তার সব তিনি জীবনের এই ভাগেই লিখেছিলেন। বিশেষ করে মহান দুই সাহাবি মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে অসংযত মন্তব্য। সাইয়েদ নিজেই তাঁর জীবনের এই ভাগকে বলেছেন—মারহালাতুদ দিয়া (নষ্ট ভাগ)। দ্বিতীয় ভাগে এসে তাঁর ঝোঁক ইসলাম ও শরিয়তের দিকে হলেও এই ভাগের শুরুর দিকে তিনি তহা হুসাইন ও আক্কাদের চিন্তার বলয় থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেননি। আর ঠিক সেই সময়টাতেই তিনি ইখওয়ানের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁর বই আল আদালাতুল ইজতিমাইয়্যাহ প্রকাশিত হয়। যাতে মহান সাহাবি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে অসংযত মন্তব্য প্রকাশ পায়। কারণ, তখনও তিনি পুরোপুরিভাবে আক্কাদ-তহাদের চিন্তার বলয় থেকে বের হতে পারেননি।


সাইয়্যেদের বিরুদ্ধে তখন কলম ধরেছিলেন উস্তাদ মাহমুদ শাকের রাহ.। সাইয়্যেদও পালটা জবাব লিখলেন। তিনি সরাসরি বললেন—মহান সাহাবিকে নিয়ে অসংযত মন্তব্য করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি বরং ইসলামের উপর উত্থাপিত অভিযোগের জবাব দেওয়ার কসরত করেছেন। তারপর সাইয়্যেদ ইসলাম ও শরিয়তের বলয়ে প্রবেশ করলেন। তার চিন্তায় পরিপক্কতা এলো। তার জালিমের অবিশ্বাস্য জুলুমের শিকারও হলেন। তার জীবনের সে অংশটা হচ্ছে—নাসিখা। অর্থাৎ পূর্বের কৃত সমস্ত ভুলের রহিতকারী। তার লেখায় যে আপত্তিকর বিষয় ও আলোচনা ছিল, সেগুলো শোধরান এবং বইগুলোরও পরিমার্জিত সংস্করণ বের করেন। যেমন দারু ইহয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যাহ থেকে আলআদালাতুল ইজতিমাইয়্যাহ বইর ষষ্ঠ সংস্করণ বের হয়। এতে সাইয়েদ উস্তাদ মাহমুদ শাকিরের যে বিষয়গুলোর উপর আপত্তি করেছিলেন, তার সবটুকুই বাদ দেন। আর নতুন করে আদালাতুস সাহাবা (সাহাবা হকের মাপকাঠি) বিষয়েও লিখেন। সেখানে তিনি সাহাবা বিশেষত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রাশিদ (সুপথপ্রাপ্ত) বলে আখ্যায়িত করেন। তারপর হাজাদ দীন গ্রন্থে অন্য দুই সাহাবি—মুআবিয়া ও আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সম্পর্কে চমৎকার প্রশংসা করে।


এখন তার জীবনের দ্বিতীয়ভাগের শেষভাগের দিকে লক্ষ্য করলে যে বিষয়টা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে তা হচ্ছে—যারা সাইয়েদ কুতুবের ব্যাপারে বলে, তিনি সাহাবার শানে বেয়াদবি করেছেন; এটা ডাহা মিথ্যা কথা। তিনি তার বিভিন্ন গ্রন্থে জায়গায় জায়গায় সাহাবিদের সত্যের মাপকাঠি বলেছেন। তার অনন্য গ্রন্থ মাআলিম ফিত তরিক-এর মধ্যে সাহাবিদের অনন্য কুরআনি প্রজন্ম বলেও আখ্যায়িত করেছেন।


সাইয়্যেদ কুতুব শহিদ রাহ. ছিলেন খুবই দূরদর্শী। তার সবকিছুতেই ছিল গভীরতার ছাপ। আবেগকে ছাপিয়ে বিবেককে প্রাধান্য দেওয়ার শক্তি তার মধ্যে খুব ভালোভাবেই ছিল। তার অন্তর্দৃষ্টিও ছিল খুব প্রখর। যার গভীরতা ও প্রখরতা তার বিভিন্ন সময় লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থ থেকে খুব সহজেই অনুমিত হয়।

এক জায়গায় তিনি খুব চমৎকারভাবে নিজের অনুভূতির কথা লিখেছেন—

যখন আমরা নিজেদের জীবনকে আত্মকেন্দ্রিক করে ফেলি, তখন এই জীবন আমাদের কাছে খুব তুচ্ছ ও নগণ্য হয়ে ধরা দেয়; যেন মৃত্যুর আভাস দিয়ে তার সূচনা আর নির্ধারিত একটা সময়ের পর তার সমাপ্তি। কিন্তু যখন আমরা জীবনকে ধারণ করি অন্যের জন্য অর্থাৎ আমাদের জীবন যাপিত হয় একটা বিশেষ মিশন ও মহান চিন্তাধারার বাস্তবায়নে; তখন এই তুচ্ছ জীবনই আমাদের কাছে উদ্ভাসিত হয় ব্যাপ্তি ও গভীরতার সাথে। তখন মনে হয়, এই জীবনের সূচনাও মানবজীবনের সূচনালগ্ন থেকে। আর পার্থিব জীবন থেকে আমাদের বিদায়ের পর তা আরও ব্যাপ্তি পেতে থাকে, প্রসারিত হতে থাকে। আর সে অবস্থার সবচেয়ে উপকারের দিকটা হচ্ছে, আমরা আমাদের একাকী জীবনের অর্জনের চেয়েও দ্বিগুণ কিছু পেয়ে যাই। আর এই অর্জন কোন দিবাস্বপ্ন নয়। এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

আরেক জায়গায় নিজের আত্মোপলব্ধি এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন—

আমার অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি, সেই আত্মিক নির্মল প্রশান্তির মতো অন্যকিছুই হতে পারে না, যা আমরা লাভ করে অন্যকে সান্ত্বনা দিয়ে, সন্তুষ্ট করে, অন্যের বিশ্বস্ততা অর্জন করে, অন্য কারো মাঝে আশার আলো জ্বালিয়ে এবং অন্যকে প্রফুল্ল করে।

নিজের অনুভবের কথাটাই তিনি এভাবে লিখেছেন—

যখন আমরা মানুষের আত্মার চমৎকার দিকটা অনুভব করতে পারি, তখন নিজেদের অজান্তেই আমাদের মনে হতে থাকে—তার মাঝে বিপুল কল্যাণ প্রথিত আছে। যা হয়ত প্রথমবারের দেখায় অনুভব করা যায়নি।

আত্মতৃপ্তি প্রসঙ্গে এক জায়গায় লিখেন—

অনেক সময় আমরা মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই, কারণ আমরা নিজেদের চারপাশে আত্মতৃপ্তির একটা প্রাচীর তৈরী করে ফেলেছি। ফলে এখন মনে হয়, আমি তো আত্মিকভাবে তাদের চেয়ে অধিক পবিত্র। অন্তরের দিক থেকে অনেক উত্তম। ব্যক্তিগত দিক থেকে অতি উদার। কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা হচ্ছে, পরবর্তীতে আমরা আমাদের দাবিমতে বড় কিছু করতে পারি না। আফসোস, আত্মতৃপ্তি কেবল আমাদের ক্ষতিই করল। আমাদের সীমাবদ্ধতায় ফেলে দিলো।

একবিংশ শতাব্দীর আজকের দিনে এসেও সাইয়্যেদ কুতুব বিশ্বাসী মানুষদের হৃদয়ে বেশ শক্তিমান হয়ে বেঁচে আছে। বিশ্বাব্যাপী ইসলামপন্থীরা সাইয়্যেদ কুতুবের চিন্তা ও দর্শন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে অক্লান্তভাবে। সাইয়্যেদ কুতুব আমাদের প্রেরণার বাতিঘর।সাইয়্যেদ কুতুব শহিদ, মহাকালের ইতিহাসের এক ধ্রুবতারা

৯১৮ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

ফাহাদ আব্দুল্লাহ। পড়াশোনা মাদরাসা থেকে। তাদাব্বুরে কুরআন, সিরাত ও ইতিহাস নিয়ে সময় কাটাই। ইসলামি সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখি। দাওয়াহর জন্য টুকটাক লেখালেখি করি। এখনও পর্যন্ত ইতিহাসের ওপর দুটো অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উম্মাহর জন্য কিছু করে যেতে পারাকে জীবনের সফলতা মনে করি।

মন্তব্য

১১ টি মন্তব্য করা হয়েছে
আবিদ আল আহসান

আবিদ আল আহসান

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৮:২৪ অপরাহ্ন

ইতিহাস যদিও কম পড়া হয়। তবুও এই লেখাটা পড়লাম। ভালো লাগলো।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২০:৫৪ অপরাহ্ন

বেশি বেশি ইতিহাস পড়বেন। উপকার হবে। ইনশা আল্লাহ

এম এম নাজমুল আদিব

এম এম নাজমুল আদিব

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২১:৫২ অপরাহ্ন

ইতিহাস পড়তে আমার খুব ভাল লাগে। ধন্যবাদ আপনাকে....!

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৬:৪৮ অপরাহ্ন

জাযাকাল্লাহ

এস এম ইব্রাহীম সোহাগ

এস এম ইব্রাহীম সোহাগ

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১১:৫৮ পূর্বাহ্ন

অনেক ভালো লাগলো।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৬:২৯ অপরাহ্ন

জাযাকাল্লাহ

জহুরুল

জহুরুল

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন

আমাদের মাঝে ইসলামি ইতিহাস ছরিয়ে দেওয়ার মতো উপযুক্ত কোনো ওয়েব সাইট ছিল না,,, ""চিন্তাধারা"" এর মাধ্যমে আমরা ইসলামের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবো।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৬:১২ অপরাহ্ন

ইনশাআল্লাহ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১১:০৭ পূর্বাহ্ন

লেখার ফন্টটা পরিবর্তন করার অনুরোধ করছি। পড়ার মাঝে ছন্দপতন হয় এই ফন্টে। সন তারিখগুলো বুঝতে অনেক কষ্ট হয়।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবু আনাছ বিন ইলিয়াছ

আবু আনাছ বিন ইলিয়াছ

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২৩:২৯ অপরাহ্ন

বিপ্লবী ব্যক্তিদের শব্দমালা মৃত আত্মাকে জাগিয়ে তুলে।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আপেল মাহমুদ

আপেল মাহমুদ

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৫:১০ অপরাহ্ন

শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কিংবদন্তি নেতা সাইয়েদ কুতুব সর্ম্পকে লিখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আব্দুল হামিদ

আব্দুল হামিদ

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৬:১২ অপরাহ্ন

জাযাকুমুল্লাহ.

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ইরফান সাদিক

ইরফান সাদিক

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৬:৩২ অপরাহ্ন

ভালো হয়েছে মাশা আল্লাহ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
MOHAMMAD BASHIRUL ALAM

MOHAMMAD BASHIRUL ALAM

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৯:০৯ অপরাহ্ন

লেখাটা পড়লাম..

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...