তাকদির : পূর্ব নির্ধারিত, না পরিবর্তনশীল?

আমাকে একজন প্রশ্ন করেছিল— ‘তাকদির কি পূর্ব নির্ধারিত, না পরিবর্তনশীল?’


এ প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় ও দার্শনিক দিক থেকে ইতোমধ্যেই পৃথিবীতে প্রচুর আলোচনা হয়েছে এবং এখনও চলছে। এখানে আমি খুব সহজ ভাষায় প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

‘তাকদির’ আমার কাছে খুবই সহজ একটি বিষয় মনে হয়। এ বিষয়ে আমাদের মনে সাধারণত দুটো প্রশ্ন জাগে।

এক. ‘তাকদির’ বা ভাগ্য যদি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আগেই নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের আর ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করে লাভ কী?


দুই.

আমরাই যদি নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারি, তাহলে আল্লাহ দ্বারা নির্ধারিত ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে হবে কেন?


এ দুটো প্রশ্নের উত্তর জানার আগে কিছু উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি আমরা প্রাথমিকভাবে বুঝতে চেষ্টা করব।


উদাহরণ : ০১

বিশ্বজগতে আমরা যা কিছু দেখি এবং যা কিছু চিন্তা করতে পারি, সবকিছুর দুটো দিক থাকে। একটি অংশ পূর্ব থেকে নির্ধারিত এবং অন্য একটি অংশ পরিবর্তনশীল। যেমন, ইচ্ছা করলে আপনি এ লেখাটা না পড়ে অন্য লেখায় চোখ বুলাতে পারেন। কিন্তু ইচ্ছা করলেই চোখ বন্ধ করে নাক দিয়ে এই লেখাটা দেখতে পারবেন না। চোখ বন্ধ করে নাকের সাহায্যে কোনো কিছু দেখার চেষ্টা আপনি করতেই পারেন, কিন্তু মানুষের নাক দিয়ে কোনো কিছুই দেখা সম্ভব না। এই যে নাক দিয়ে মানুষ দেখতে পারে না, এটা আল্লাহ তায়ালা পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এই নির্ধারিত বিষয় বদলে দেওয়া যায় না। শত চেষ্টাতেও মানুষ নাক দিয়ে কোনো কিছু দেখতে পারে না। আবার, চোখ দিয়ে মানুষ যা ইচ্ছা তা দেখতে পারে— এটাও আল্লাহ তায়ালা আগ থেকেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।


এরপর ধরুন, আপনি ইচ্ছা করলেই আপনার হাতের মোবাইলটা বন্ধ বা চালু করতে পারেন। কিন্তু, আপনি ইচ্ছা করলেও মোবাইলের ব্যাটারিটা খুলে রেখে ওই মোবাইলটি চালু করতে পারবেন না। তারপর ধরুন, ফেসবুকে আপনার যা ইচ্ছা তা পড়তে ও লিখতে পারেন। কিন্তু ইচ্ছা করলেই মার্ক জুকারবার্গ এর ফেসবুককে আপনি গুগল+ বানিয়ে ফেলতে পারবেন না। মার্ক জুকারবার্গ যে পদ্ধতিতে ফেসবুক সাজিয়েছে, আপনাকে সে পদ্ধতি মেনে নিয়েই ফেসবুক ব্যবহার করতে হবে।


বিশ্বের সবকিছুর এমন দুটো দিক আছে। সবকিছুর ক্ষেত্রেই একটু স্বাধীনতা দেওয়া আছে, আবার পূর্ব নির্ধারিত একটি ফর্মুলাও দেওয়া রয়েছে। আমাদের জীবনের একটি ইচ্ছাশক্তি আছে, আবার আমাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। আমাদের ইচ্ছাশক্তি বাস্তব দুনিয়ার অনেককিছুই পরিবর্তন করতে পারে, আবার অনেককিছুই পরিবর্তন করতে পারে না। মানুষ কী পরিবর্তন করতে পারবে এবং কতটুকু পরিবর্তন করতে পারবে—এটা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়। এই নির্ধারিত হওয়ার বিষয়টাকে বিশ্বাস করার নামই তাকদির।


উদাহরণ : ০২

প্রত্যেক মানুষেরই কিছু না কিছু ক্ষমতা রয়েছে। মানুষ তার স্বাধীন ইচ্ছার মাধ্যমে সেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে পারে। তবে একটি ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে তার চেয়ে বড়ো অন্য একটি ক্ষমতা থাকে।


যেমন, একজন মন্ত্রী চাইলে দেশের জন্যে ভালো কিছু করতে পারে, সে ক্ষমতা তার আছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা তারচেয়েও বেশি। প্রধানমন্ত্রী চাইলে মন্ত্রীর ক্ষমতাকে রোধ করতে পারে। অর্থাৎ মন্ত্রীর ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অধীনে।


এরপর ধরুন, কোনো প্রাইভেট ব্যাংকের ম্যানেজার তার ক্যাশিয়ারকে টাকা গোনার ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু যেকোনো সময় ক্যাশিয়ারের সে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার যোগ্যতা ম্যানেজার রাখে। অর্থাৎ, ক্যাশিয়ারের ক্ষমতা ম্যানেজারের ক্ষমতার অধীনে। তেমনি কোনো অফিসে কর্মচারীর ক্ষমতা তার কর্মকর্তার ক্ষমতার অধীনে। ঠিক একইভাবে আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে কিছু না কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন, কিন্তু মানুষের সকল ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতার অধীনে। এ বিশ্বাসের নামই তাকদির-এ বিশ্বাস।


উদাহরণ : ০৩

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কিছু ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, আবার ইচ্ছার সীমাবদ্ধতাও দিয়েছেন। ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে আমাদের ভাগ্য আমরা পরিবর্তন পারি ঠিক, কিন্তু আমাদের সেই ইচ্ছাশক্তি এবং ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষমতা স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।


কল্পনা করুন, মহাসড়কের পাশে একটি পার্ক আছে। শহরের একটি পরিবার তাদের ৬ বছর বয়সি একটি বাচ্চাকে নিয়ে ঐ পার্কে হাঁটতে গেল। বাচ্চাটির আব্বু-আম্মু তাকে ঐ পার্কের ভিতরে খেলার অনুমতি দিলো, কিন্তু রাস্তায় যেতে নিষেধ করল। বাচ্চাটি খেলেতে খেলতে যখনি রাস্তায় চলে যেতে লাগল, তখনি তার আব্বু-আম্মু তাকে ধরে ফেলল। পার্কের ভিতরে যা ইচ্ছা তা করার স্বাধীনতা বাচ্চাটির থাকলেও রাস্তায় যাওয়ার স্বাধীনতা বাচ্চাটির নেই। কারণ, রাস্তায় গেলে বাচ্চাটি গাড়ির নিচে পড়বে।


এই যে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, এটা তকদিরের অন্তর্ভুক্ত। আমরা যা কিছু ইচ্ছা করি, তার সবকিছু বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তার সবকিছু বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা আল্লাহর আছে। এটা বিশ্বাস করার নাম তাকদির।


এবার মূল প্রশ্নে আসি তাকদির বা ভাগ্য কি পূর্ব নির্ধারিত, না পরিবর্তনশীল? এই প্রশ্নটির মধ্যে একটি শব্দ হলো পূর্বপূর্ব শব্দের অর্থ অতীত। মানে, ভাগ্য কি অতীত থেকে নির্ধারিত থাকে?


অতীত শব্দটি সময়ের সাথে সম্পর্কিত। সময়কে মানুষ সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করে। যথা : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। মানুষ সময়ের অধীন। সময়ের মাত্রা-জ্ঞান ব্যতীত মানুষ কোনো কিছু কল্পনা করতে পারে না। তাই মানুষ প্রশ্ন করে– ভাগ্য কি পূর্ব থেকে নির্ধারিত? কিন্তু, আল্লাহ সময়ের অধীন নয়, তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে। আল্লাহর ক্ষেত্রে অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎকাল বলে কিছু নেই। যেমন : আল্লাহ তায়ালা বলছেন –

আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহর কাছেই রয়েছে। কিয়ামতের ব্যাপারটি তো চোখের পলকের ন্যায়, অথবা তার চাইতেও দ্রুত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর শক্তিমান। সূরা নাহল : ৭৭

তাকদির বোঝার জন্য এই আয়াতটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এই আয়াতে তাকদির সম্পর্কে বেশ কিছু অনুসিদ্ধান্ত রয়েছে। 


অনুসিদ্ধান্ত ০১ : 

আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিনে সবকিছুর গায়েব জানেন। এখানে গায়েব জানার অর্থ হলো, আল্লাহ তায়ালা ভবিষ্যতের বিষয়াবলিকে ঠিক সেভাবেই জানেন, যেভাবে তিনি অতীতের বিষয়াবলিকে জানেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালার নিকট অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই।


অনুসিদ্ধান্ত ০২ : 

আল্লাহ তায়ালা সময়ের অধীন নয়, তিনি সময়ের অনেক ঊর্ধ্বে। তাঁর কাছে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সব একই। ফলে, পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে কেয়ামত পর্যন্ত এই সময়টা মানুষের কাছে হাজার হাজার মিলিয়ন বছর হলেও আল্লাহর কাছে একটি চোখের পলকের চেয়েও কম সময়। অর্থাৎ, আল্লাহর ক্ষেত্রে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এগুলো নেই। বিষয়টা আরেকটু বিস্তারিত বলি।


দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার মতো সময়ও একটি মাত্রা। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতা ব্যতীত যেমন কোনো মানুষকে কল্পনা করা যায় না, তেমনি সময় ব্যতীতও কোনো মানুষকে কল্পনা করা যায় না। মানুষ যখন পৃথিবীতে আকৃতি লাভ করে, তখন সে একটি সময়ে প্রবেশ করে; আবার যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন এই সময় থেকে বের হয়ে যায়। তাই মানুষ সময়ের অধীন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার জন্ম ও মৃত্যু নেই, শুরু বা শেষ নেই। সূত্র আল কুরআন ৫৭:৩

তাই আল্লাহ তায়ালা সময়ের অধীন নয় বরং সময়-ই আল্লাহ তায়ালার অধীন। মানুষের বর্তমান, অতীত বা ভবিষ্যৎকাল আছে। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎকাল বলে কিছু নেই। মানুষ সময়ের বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে পারে না, কিন্তু আল্লাহর কাছে সব কালই বর্তমান কাল।


অনুসিদ্ধান্ত ০৩ : 

আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টিজগতের সবাইকে কিছু কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন। কিন্তু সকল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের মালিক তিনি। এ তিনটি অনুসিদ্ধান্তের পর আমরা বলতে পারি,

“আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের ভাগ্য পূর্ব নির্ধারিত –এ কথাটা কেবল মানুষের জন্যে প্রযোজ্য। আল্লাহর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ, মানুষের জন্যে যা অতীত, আল্লাহর জন্যে তা অতীত নয়; আবার, মানুষের জন্য যা ভবিষ্যৎ, তাও আল্লাহর জন্য ভবিষ্যৎ নয়। আল্লাহর নিকট অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবই এক। তিনি ভবিষ্যৎকে অতীতের মতোই জানেন। তিনি যখন মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন, তখন অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ বলে কোনো কিছু থাকে না। কিন্তু মানুষ যেহেতু অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালের মধ্যে থাকে, তাই মানুষকে বোঝানোর জন্যে রাসূল (স) বলেছেন যে, মানুষের ভাগ্য অতীত বা পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে।

এবার, কুরআনুল কারিম থেকে কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক।


উদাহরণ- ০১

নিচের দুটো আয়াত দেখুন। প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, মানুষের ওপর যে বিপদ আসে, তা আগেই লিপিবদ্ধ করা থাকে। কিন্তু, দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন যে, মানুষের কৃতকর্মের কারণেই তার উপর বিপদ আসে।

পৃথিবীতে এবং তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ করা আছে। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ। সূরা হাদিদ : ২২
তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক গোনাহ তিনি ক্ষমা করে দেন। সূরা শূরা : ৩০

দেখে মনে হয়, আয়াত দুটো কি পরস্পর বিপরীত? উত্তর : না। একটু লক্ষ্য করলেই দেখব, মানুষ যখন কোনো কাজ করে, তখন সে কাজের একটি অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ থাকে। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎকাল একই।


তাই দেখুন বিপদের ব্যাপারটা যখন আল্লাহ তায়ালার সাথে সম্পর্কিত হয়েছে তখন তিনি বলেছেন, বিপদ আসার আগেই তা আল্লাহ নিকট লেখা থাকে এবং এটি আল্লাহর জন্য খুবই সহজ একটি কাজ। কিন্তু বিপদের ব্যাপারটা যখন মানুষের সাথে সম্পর্কিত হয়েছে, তখন আল্লাহ বলছেন, মানুষের কৃতকর্মের ফলেই বিপদ আসে। আল্লাহর ক্ষেত্রে সময় এবং মানুষের সময় দুটো বিষয়ের পার্থক্য মাথায় রাখলে আয়াত দুটোর মাঝে কোনো বৈপরীত্য আর থাকে না।


উদাহরণ– ০২

এবার অন্য দুটো আয়াত দেখুন। প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, তিনি যদি চাইতেন, তাহলে মানুষ শিরক করত না। কিন্তু দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলছেন– মুশরিকরা বলছে আল্লাহ যদি চাইতেন, তাহলে মুশরিকরা শিরক করত না

যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন তবে তারা শিরক করত না। আমি আপনাকে তাদের রক্ষক নিযুক্ত করিনি এবং আপনি তাদের কার্যনির্বাহী নন। সূরা আনয়াম : ১০৭
মুশরিকরা বলল যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষরা তাঁকে ছাড়া অপর কারও ইবাদত করতাম না এবং তাঁর নির্দেশ ছাড়া কোনো বস্তুই আমরা হারাম করতাম না। তাদের পূর্ববর্তীরা এমনই করেছে। রাসূলের দায়িত্ব তো শুধু সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছিয়ে দেওয়া। সূরা নাহল : ৩৫

লক্ষ্ করুন, দুটি আয়াতে একই কথা বলা হচ্ছে। প্রথম আয়াতে যে কথা বলে আল্লাহর ক্ষমতা বোঝানো হয়েছে, অথচ দ্বিতীয় আয়াতে সে একই কথা বলেই মুশরিকদের অন্যায়ের কথা বলা হচ্ছে। তাহলে আয়াত দুটো কি পরস্পর বিরোধী? উত্তর : না।


আল্লাহ তায়ালা মানুষকে শিরক করার ক্ষমতা দিয়েছেন বলেই মানুষ শিরক করতে পারে। কিন্তু শিরক করার ক্ষমতা মানুষকে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, মানুষকে তিনি শিরক করার অনুমতি দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের চোখ দিয়ে দেখার ক্ষমতা দিয়েছেন, কিন্তু সবকিছু দেখার অনুমতি দেননি। অন্যদিকে নাক দিয়ে দেখার ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেননি, তাই আমরা শত চেষ্টা করলেও নাক দিয়ে কোনো কিছু দেখতে পারব না। সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সীমাবদ্ধ ক্ষমতার কারণেই আমরা করতে পারি। ভালো বা খারাপ যা-ই করি না কেন, সেই ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালা আমাদের দিয়েছেন বলেই আমরা তা করতে পারি। তিনি তাঁর ক্ষমতা আমাদের থেকে কেড়ে নিলে আমরা যেমন ভালো কোনো কাজও করতে পারব না, তেমনি খারাপ কোনো কাজও করতে পারব না।


এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। মানুষ যখন কোনো কিছু চায়, তখন তা সময়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মানুষ বর্তমানে কোনো কিছু চাইলে তা ভবিষ্যতে গিয়ে পরিপূর্ণ হয়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো কিছু ইচ্ছা করেন, তখন সেটি সময়ের অধীন হয় না। অর্থাৎ যেহেতু তাঁর কাছে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সব একই, তাই তিনি কোনো কিছু চাওয়া মাত্রই তা হয়ে যায়। তাই আল্লাহর চাওয়া ও মানুষের চাওয়ার মাঝে অনেক বড়ো পার্থক্য রয়েছে।


এ কারণেই উপরোক্ত আয়াতে মুশরিকরা যখন দাবি করে—আল্লাহ চেয়েছেন বলেই আমরা শিরক করেছি তখন সেটি একটি ভ্রান্ত দাবিতে পরিণত হয়। অথচ আল্লাহ তায়ালা নিজেই বলেছেন— আমি চাইলে তারা কেউ শিরক করত না। এখানে আল্লাহর চাওয়া এবং মানুষের চাওয়ার পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।


উদাহরণ– ০৩

কুরআনের আরও দুটো আয়াত দেখুন। এখানে প্রথম আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, তাঁর জ্ঞান ব্যতীত একটি গাছের পাতাও ঝরে না। কিন্তু দ্বিতীয় আয়াতে তিনি বলছেন, কোনো জাতি নিজেই তার ভাগ্য পরিবর্তন না করলে আল্লাহ সে জাতীর ভাগ্য পরিবর্তন করে দেন না।

অদৃশ্য জগতের চাবি তাঁর কাছেই রয়েছে, এগুলো তিনি ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। স্থলে ও জলে যা কিছু আছে, তা তিনি জানেন। তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না, অথবা রসযুক্ত বা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। সূরা আন’আম : ৫৯
এটি এজন্য যে, আল্লাহ কখনো সেসব নেয়ামত পরিবর্তন করেন না, যা তিনি কোনো জাতিকে দান করেছিলেন, যতক্ষণ না সে জাতি নিজেই নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে নেয়। বস্তুত আল্লাহ শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী। সূরা আনফাল : ৫৩

প্রথম আয়াতে বলা হচ্ছে, গাছের একটি পাতাও আল্লাহর অজ্ঞাতসারে পড়ে না, সব আগে থেকেই কিতাবে লিখা আছে। আর, দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে, মানুষ তার ভাগ্য পরিবর্তন না করলে আল্লাহ নিজ থেকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেন না। তাহলে আয়াত দুটি কি পরস্পর বিরোধী?


উপরের উদাহরণ দুটোর মতো এখানেও আল্লাহর ক্ষমতা ও মানুষের ক্ষমতার পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন। প্রথম আয়াতে আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হচ্ছে কিন্তু দ্বিতীয় আয়াতে মানুষের করণীয় ও মানুষের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হচ্ছে।


এখানে দ্বিতীয় আয়াতটি একটু ভালোভাবে লক্ষ করলে বিষয়টি একেবারে পরিষ্কার হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা আগ থেকেই মানুষকে কিছু নিয়ামত বা সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। মানুষ যদি সে সুযোগ গ্রহণ করে, তাহলে তার ভাগ্য পরিবর্তন হবে। আর যদি সুযোগ গ্রহণ না করে, তাহলে সে বঞ্চিত হবে।


এখন মানুষ আল্লাহর নিয়ামত গ্রহণ করবে নাকি বর্জন করবে -এটা আল্লাহর পক্ষে আগ থেকেই জানা সম্ভব। কারণ, মানুষের যেমন অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ কাল আছে, আল্লাহ তায়ালার ক্ষেত্রে এমন কোনো অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎকাল নেই। মানুষের অতীত ও ভবিষ্যৎকাল আল্লাহর জন্যে একই। তাই মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আগ থেকেই জানেন।


বিষয়টি আরও সহজভাবে বলার জন্য সর্বশেষ একটি উদাহরণ দিচ্ছি।

ধরুন, তাজা ঘাসে পরিপূর্ণ একটি মাঠ। একজন রাখাল একটি গরুর গলায় রশি লাগিয়ে তাকে ওই মাঠে ছেড়ে দিলো। মাঠের নির্দিষ্ট অংশে ইচ্ছামতো বিচরণ করার ক্ষমতা গরুটির আছে, যেখান থেকে ইচ্ছা সেখান থেকে খাবারের সুযোগও তার আছে। কিন্তু গরুর গলার রশি যতদূর যায়, তার বাইরে গিয়ে ঘাস খাওয়ার সুযোগ গরুটিকে দেওয়া হয়নি। এখন, গরুটি ইচ্ছা করলে মাঠের নির্দিষ্ট অংশের তাজা ঘাসগুলো খেয়ে নিজের পেট পূর্ণ করতে পারে অথবা কিছু না খেয়ে উপাস থাকতে পারে। রাখাল জোর করে ওই গরুটিকে ঘাস খাইয়ে দেবে না।


এভাবে আল্লাহ তায়ালা আমাদের কিছু নেয়ামত পূর্ব থেকেই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আমরা যদি চেষ্টা করি, তাহলে আল্লাহর ওই নিয়ামত অর্জন করতে পারব আর চেষ্টা না করলে ওই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হব।


এখানে একটি বিষয় লক্ষ রাখতে হবে। রাখাল যেহেতু মানুষ, তাই সে সময়ের দ্বারা অবদ্ধ। গরুটি ঘাস খাবে কী খাবে না এটা রাখাল আগ থেকে জানে না। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা যেহেতু সময়ের ঊর্ধ্বে, তাই তিনি আগ থেকে জানেন, মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া নেয়ামত গ্রহণ করবে কী করবে না।


অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা সময়ের ঊর্ধ্বে, তাই তিনি মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন বলে মানুষও যদি ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের আশা ত্যাগ করে, তাহলে মানুষ ভবিষ্যৎকে হারিয়ে ফেলবে। এটাই আল্লাহ তায়ালার সুন্নত এবং এটার নামই তাকদির। সুতরাং তাকদির বা ভাগ্য হলো এমন একটি বিষয়, যা আল্লাহর সামগ্রিক ইচ্ছা এবং মানুষের সীমাবদ্ধ ইচ্ছার দ্বারা পরিবর্তনশীল। এখানে আল্লাহর ইচ্ছা সময়ের অধীন নয়, কিন্তু মানুষের ইচ্ছা সময়ের অধীন।

১৮৩৮ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

জোবায়ের আল মাহমুদ। জীবনের শুরু থেকে মাদ্রাসায় পড়েছেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে অনার্স শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্যে তুরস্কে স্কলারশিপ নিয়ে পড়ছেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ‘আল কোর'আনে মনের ধারণা’। এ ছাড়াও তিনি দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি করেন।

মন্তব্য

১৫ টি মন্তব্য করা হয়েছে

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০১:৫৮ পূর্বাহ্ন

জোবায়ের অসাধারণলিখেছেন🥰🥰🥰

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১০:০৬ পূর্বাহ্ন

অসাধারণ, সত্যিই আমার চিন্তাশক্তিকে নাড়া দিয়েছে...যা আগে কখনো কল্পনাতেও মাথায় আসেনি। জাজাকাল্লাহখাইরান

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ইমরান হোসাইন

ইমরান হোসাইন

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৫:৪৮ অপরাহ্ন

ভাই আপনাকে ধন্যবাদ, আজকে বিষয়টাকে নতুনভাবে দেখলাম। জাজাকাল্লাহ খাইরান হায়াতি

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
শরীফ মাহমুদ

শরীফ মাহমুদ

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০০:৪৯ পূর্বাহ্ন

অসাধারণ লিখেছেন ভাই, এই প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টিকোন থেকে বিষয়গুলো ভেবে দেখা হয়নি।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবদুল ওয়াহেদ

আবদুল ওয়াহেদ

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন

আল্লাহু আকবর। এ জাতীয় একটি লিখা আমি অনেক আগে থেকেই খুঁজছিলাম। আল্লাহ আপনাকে নেক হায়াত দান করুন।আমিন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আসাদুল্লাহ আল গালিব

আসাদুল্লাহ আল গালিব

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৩:৪৪ অপরাহ্ন

অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাই আপনাকে। আপনার লেখাটা কপি করলাম

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
সাবিত

সাবিত

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৪:৫০ অপরাহ্ন

দু'আ করলে কি আল্লাহ তায়ালা তাক্বদির পরিবর্তন করে দেন?

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৭:৩৭ অপরাহ্ন

দোয়ার সাথে চেষ্টাটাও করতে হবে,,,

ম‌োহাম্মদ ইউসুফ

ম‌োহাম্মদ ইউসুফ

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৫:১৪ অপরাহ্ন

আল্লাহু আকবর। অসাধারন ল‌েখা । আল্লাহ আপনাকে নেক হায়াত দান করুন।আমিন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ক্ষমাশীল মহান আল্লার গোলাম

ক্ষমাশীল মহান আল্লার গোলাম

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৭:০৬ অপরাহ্ন

اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَ الۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ وَ جَادِلۡہُمۡ بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ ؕ اِنَّ رَبَّکَ ہُوَ اَعۡلَمُ بِمَنۡ ضَلَّ عَنۡ سَبِیۡلِہٖ وَ ہُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُہۡتَدِیۡنَ ﴿۱۲۵﴾ তুমি তোমরা রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। নিশ্চয় একমাত্র তোমার রবই জানেন কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হিদায়াতপ্রাপ্তদের তিনি খুব ভাল করেই জানেন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২৩:২২ অপরাহ্ন

ভাই অনেক ধোঁয়াশা কাটলো,ধন্যবাদ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
দ্বীন ইসলাম

দ্বীন ইসলাম

০৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১২:১৮ অপরাহ্ন

অসাধারণ লেখনি বিষয়গুলো নিয়ে অনেকে বিতর্ক করে, সম্পুর্ণ বুঝাতে কষ্ট হয়,, আলহামদুলিল্লাহ অনেক উপকৃত হলাম। জাযাকাল্লাহ খায়ের

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ফয়সাল।

ফয়সাল।

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০০:৪৫ পূর্বাহ্ন

এ বিষয় টাতে মাঝে মাঝে প্যাচ লেগে যেত। অনেক সময় গুলিয়ে ফেলতাম। মাশা আল্লাহ, এখন ভালোভাবে তকদিরে বিশ্বাসের ব্যাপারে ক্লিয়ার হলাম।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
রফিক

রফিক

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১২:৫৭ অপরাহ্ন

খুবই জটিল একটি বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২১:৩৯ অপরাহ্ন

জাজাকাল্লাহ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
Md. Abdullah Al Mamun

Md. Abdullah Al Mamun

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২২:০৭ অপরাহ্ন

I would like to know the e-mail number of the writer

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...