বিদাআত : অন্ধ আবেগ আর ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা

ইসলামের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা আকিদা; আর আকিদারই একটা উপশাখা বিদআত (নতুনত্ব)। বিদআত বুঝতে অনেকগুলো বিষয় সামনে রাখতে হবে। বিদআত আদতে কী, কখন বিদআত দ্বীনে অন্তর্ভুক্ত হলো, নতুনত্বের সংযোজন মানে আসলে কী, বিদআতের প্রক্রিয়াগুলোই-বা কী, নতুনত্ব সংযোজনের ঝুঁকি কী, বিদআতের ইতিহাস কী—এসব বিষয়াবলিকে বিবেচনায় রেখে বিদআত বুঝতে হবে। ইসলামের তৃতীয় শতাব্দী থেকে শুরু করে আজ অবধি এই বিষয়ের ওপর অনেকগুলো ভালো ভালো গ্রন্থ রচিত হয়েছে। এই সব ক্লাসিক গ্রন্থের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত একটি গ্রন্থ হলো ইতিসামুস শাতিবী; যা আন্দালুসের প্রখ্যাত ইমাম শাতিবী (র.) আজ থেকে আরও ৭০০ বছর আগে লিখে গেছেন।


অন্য আরও অনেক বিষয়ের মতো এই বিদআত নিয়েও ইখতিলাফ রয়েছে। আমরা হয়তো আজ একটা বা তারও অর্ধেক পরিমাণ বিষয় শেখার চেষ্টা করব। আমরা খুবই মৌলিক কিছু বিষয়াদি নিয়েই কথা বলব। মত-পার্থক্য পরিহার করার চেষ্টা করব। আমরা এমনভাবে আলোচনা করব, যেন ভিন্ন মতের সকলের প্রতি আমাদের সহানুভূতি থাকে। অন্তত বোঝার চেষ্টা করব—কেন, কোনো প্রেক্ষিতে মতপার্থক্য সৃষ্টি হলো।


বিদআত কী? ভাষাগতভাবে বিদআত কী, আর বাস্তবে বিদআতের স্বরূপটা কী? বিদআত শব্দটি এসেছে আরবি ‘ب’, ‘د’ এবং ‘ع’ অক্ষর থেকে। আর পারিভাষিকভাবে বিদআত মানে হলো এমন কিছু—যা আগে কখনোই দেখা যায়নি বা করা হয়নি। এ কারণে আল্লাহর একটি নাম হলো ‘আল বাদি’বাদিউস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। আল্লাহকে বাদি’ বলা হয়; কারণ, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তা এর আগে কেউ করেনি, করতে পারেনি এবং করতেও পারবে না। অন্যদিকে পবিত্র কুরআনে রাসূল (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে,

‘কুল মা কুনতুন বিদাম মিনার রাসূল’। হে নবি! আপনি বলে দিন—আপনি রাসূল থেকে বিদাআত নন।

অর্থাৎ আপনি নতুন কোনো রাসূল নন। আপনার আগেও এ রকম আরও অনেক নবি-রাসূল এসেছিল এবং তারা আপনার মতো একই বার্তা নিয়েই এসেছিল।


এগুলো সবই বিদাআত শব্দের পারিভাষিক অর্থ। বাস্তব বা শরিয়াতের ব্যাখ্যা কিন্তু আরেক রকম। যেমন, আরবিতে সালাত শব্দের অর্থ ইবাদত বা প্রার্থনা। কিন্তু আমরা সালাত বলতে যা বুঝি, তা নির্ধারণ করে দিয়েছে ফিকহ। জাকাতের পারিভাষিক অর্থ বিশুদ্ধ করা, পবিত্র করা। কিন্তু জাকাত বলতে আমরা এখন যা বুঝি, তা ফিকহই নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফিকহ অনুযায়ী জাকাত মানে হলো সম্পদকে বিশুদ্ধ করা।


ইসলামি শরিয়াতের পরিভাষায় বিদাআত মানে হলো নতুন একটি তত্ত্ব, নতুন একটি চিন্তা বা নতুন একটি তত্ত্বকে ইসলামে সংযোজন করা। এতটুকু ব্যাখ্যা নিয়েই যদি আমরা ভাবনা শেষ করি, তাহলে বিদাআত হলো সুন্নাহর একেবারে বিপরীত একটি বিষয়। সুন্নাহ মানে হলো রাসূল (সা.) যা করেছেন, করতে বলেছেন; আর বিদাআত হলো তিনি যা করেননি, অথচ এরপরও মানুষ তা করে যাচ্ছে। এ কারণে প্রায়োগিক অর্থে বিদাআতকে কখনোই ইতিবাচকভাবে দেখা হয়নি, বরং বিদাআতকে বরাবরই নেতিবাচক বিষয় হিসেবেই গণ্য করা হয়। বিদাআতের বিষয়ে নবিজির (সা.) যে হাদিসগুলো বর্ণিত আছে, সেগুলোও নেতিবাচক অর্থই বহন করে। আবু দাউদে বর্ণিত সেই হাদিসটির কথা এখানে বলতে পারি।

মহানবি (সাঃ) বলেছেন, “অবশ্যই তোমাদের মধ্যে যারা আমার বিদায়ের পর জীবিত থাকবে, তারা অনেক রকমের মতভেদ দেখতে পাবে। অতএব, তোমরা আমার সুন্নাহ অবলম্বন করো, আর সেটা নিজেদের দাঁত দ্বারা দৃঢ়তার সাথে ধারণ করো। (তাতে যা পাও মান্য করো এবং অন্য কোনোও মতের দিকে আকৃষ্ট হয়ো না।) আর (দ্বীনে) নবরচিত বা নতুন করে সংযোজিত কর্মসমূহ হতে সাবধান! কারণ, নিশ্চয় প্রত্যেক বিদআত (নতুন সংযোজন) হল ভ্রষ্টতা। (সূত্র: আবু দাউদ ৪৪৪৩)

আরেকটি বহুল ব্যবহৃত হাদিসও এখানে উল্লেখ করা দরকার, যা বুখারি ও মুসলিম উভয় গ্রন্থেই আছে। সেটা হলো : 

যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে নিজের পক্ষ থেকে কোনো নতুন কিছু উদ্ভাবন করল, যা এর মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য; আর যে বা যারা এই কাজটা করবে, তারাও প্রত্যাখাত হবে। ৮২ (বুখারি ও মুসলিম)

আমরা কেউই ইসলামে নতুন কিছু ঢোকাতে চাই না। এজন্য দেখবেন—সারা বিশ্বের প্রতিটি মসজিদে যে খুতবা পাঠ করা হয়, বিশেষত জুমার দিনে ও ঈদের দিনে, সেটা সকলেই একটা বাক্য দিয়ে শুরু করেন। আর এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে একেবারে প্রথম থেকেই। রাসূল (সা.) নিজেও এই আয়াত দিয়ে অসংখ্যবার খুতবা শুরু করেছেন। খুতবার মূল অংশে যাকে আমরা খুতবাতুল হাজা বলেই জানি, সেই অংশে এই কথাটি পাওয়া যায়।

‘ওয়া খাইরুল হাদি (মুহাম্মাদ সা.) ওয়া শাররিল উমুরি মুহদাতাতুহা ওয়া কুল্লাহ মুহদাতাতিন বিদায়া ওয়া কুল্লা বিদাতিন দলালা ওয়া কুল্লা দলালাতিন ফিন নার।’
যা আমরা রাসূলের (সা.) কাছ থেকে পাই সেটা হলো সর্বোত্তম নির্দেশনা, আর পরবর্তীতে যা যুক্ত হয়েছে, তা হলো নিকৃষ্ট। আর নতুন করে যা যোগ হলো, তা-ই বিদাআত। আর প্রতিটি বিদাআতই ভ্রষ্টতা, আর প্রতিটি ভ্রষ্টতাই আমাদের জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে।

রাসূল (সা.) যখন জুমার নামাজে কিংবা কোনো বিয়েতে খুতবা দিতেন, তিনিও অধিকাংশ সময় এই কথাগুলো দিয়েই খুতবা শুরু করতেন। বিদাআতের ব্যাপারে এটা ইসলামের খুবই স্পষ্ট ও পরিষ্কার অবস্থান। 

বুখারি ও মুসলিমে আরেকটি হাদিস এসেছে 

শেষ বিচারের দিনে রাসূল (সা.) অসংখ্য লোকের ভীড়ে তাঁর কিছু উম্মতকে চিনতে পারবেন এবং তাদেরকে নিজের পানির কুপ থেকে পানি পান করার জন্য ডাকতে থাকবেন। ওই মানুষগুলো যখন তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে অগ্রসর হতে থাকবে, তখন ফেরেশতারা সেখানে আসবে এবং তাদের মাঝখানে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে এবং তাদেরকে ওই পানির কাছে যেতে বাধা দেবে। রাসূল (সা.) বলবেন ওরা তো আমার উম্মত, ওদেরকে আসতে দাও। ফেরেশতারা বলবেন, আপনি জানেন না, আপনার ওফাতের পর ওরা কী করেছে। ওরা নতুন নতুন অনেক জিনিস দ্বীনের মধ্যে যুক্ত করেছে।

একটু ভাবলেই আমরা বুঝতে পারব—কেন বিদাআতকে এতটা কঠোরভাবে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মূলত ইসলাম হলো একটি পুর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। আর যেটা সম্পূর্ণ ও বিশুদ্ধ, তার সাথে নতুন কিছু যুক্ত করার অবকাশ নেই। 

যেমনটা সূরা আল মায়েদাহর ৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন 

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।

এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায়—ইসলাম সম্পূর্ণ ও পুর্ণাঙ্গ; আর নতুন কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। এখন কেউ যদি হঠাৎ করে নতুন কোনো বিষয় নিয়ে আসে, তাহলে কেমন হবে? আমরা আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়তই সফটওয়্যারগুলোর আপডেট দেখি। মাইক্রোসফট, ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার, অ্যাপল সফটওয়্যার-এর আপডেট ভার্সন আসে। এগুলোর আপডেট প্রয়োজন হয়। কারণ, আগের ভার্সন-এ কোনো ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে। কিন্তু ইসলাম এতটাই ত্রুটিমুক্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, এর কোনো আপডেট ভার্সন প্রয়োজন নেই।

এ কারণে ইমাম মালিক (র.)-এর একটি মন্তব্য তামাম দুনিয়ায় খুবই পরিচিত। তিনি বলেছেন 

‘ইসলাম যেহেতু সম্পূর্ণ, তাই পরবর্তীকালে যে ব্যক্তিই এর সাথে কোনো কিছু যোগ করবে আর মনে করবে ইসলামের কল্যাণের জন্যই আমি এমনটা করছি, সে প্রকারান্তরে রাসূলকেই (সা.) অভিযুক্ত করল। নতুন সংযোজনে প্রমাণ হয় যে, রাসূল (সা.) ঠিকমতো ও যথার্থভাবে ইসলামের বার্তা পৌঁছাতে বা বোঝাতে পারেননি।’ 

এটা মনস্তাত্বিকভাবেও বোঝার বিষয়। আপনি যদি মনে করেন যে, ইসলামে এই বিষয়টা এভাবে এলে ভালো হতো কিংবা আমি যেভাবে করছি, বর্তমান বাস্তবতার আলোকে এটাই ইসলামের জন্য বেশি কল্যাণকর, তাহলে আমি আসলে নিজেকে কোনো জায়গায় নিচ্ছি, কোন স্থানে দাঁড় করাচ্ছি? আমি এই প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়ার মানে হলো, রাসূল (সা.) এই কাজটি করে যেতে পারেননি কিংবা এভাবে ভাবেননি বলেই আমাদের এখন এভাবে কাজ করতে হচ্ছে।


আসহাবে রাসূল এবং ইসলামের প্রখ্যাত আলেমদের জীবন ও কর্ম থেকে প্রমাণ করা যাবে—ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলিকে পরিবর্তন কিংবা এর সাথে নতুন কোনো কিছু যুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। যদিও আমাদের মধ্যে এমন কিছু প্রাজ্ঞসর মানসিকতার মুসলমান আছেন, যারা মনে করেন সফটওয়্যার-এর মতো ইসলামেরও সময়ের আলোকে আপডেট হওয়ার প্রয়োজন আছে। এটা একান্তই তাদের দর্শন। তারা এই ধরনের চিন্তার মধ্যে কোনো সমস্যাও খুঁজে পান না। তারা মনে করেন—পূর্বে যে ইসলাম ছিল, তা সে সময়ের জন্য ঠিক ছিল। আজকের ইসলামকে বর্তমান সময়ের আলোকে দেখতে হবে। ঠিকই একইভাবে ভবিষ্যতে যে সময় আসবে, তার আলোকে ইসলামকে তখন আবার ভিন্ন রূপে হাজির করতে হবে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—আল্লাহ কুরআনকে অনেক বছর আগে নাজিল করেছেন; বর্তমান বাস্তবতার আলোকে কুরআন থেকে Pick & Choose প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পছন্দসই আয়াত নিয়ে নিজেদের কৌশলকে পরিমার্জিত ও সংশোধন করতে হবে। যারা এভাবে ভাবছেন—তারা তাদের চিন্তাধারা নিয়ে থাকুক; আমি আগাগোড়াই তাদের সমালোচনা করে যাব। মূলধারার অধিকাংশ মুসলমান মনে করে—ইসলাম সম্পূর্ণ এবং এর আর কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।


বিদাআত কখনো দুনিয়াবি বিষয়ে হয় না; হয় ধর্মীয় বিষয়ে। আমরা যে আচার-আচরণ, প্রথা ও দুনিয়াবি কাজ করি, এগুলোতে কোনো বিদাআত নেই। এগুলো হারাম হতে পারে, কিন্তু বিদাআত হবে না। প্রতিটি হারাম যে বিদাআত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে প্রতিটি বিদাআত নিঃসন্দেহে হারাম বলেই গণ্য হবে। ধরা যাক, বাজারে নতুন একটি ড্রাগ এলো; ঠিক কোকেনের মতো। এটা যদি কেউ খায় তাহলে সেটা হারাম হবে, কিন্তু বিদাআত হবেনা। এটা তখনই বিদাআত হবে, যদি এটা ধর্মীয় কোনো বিষয়ে সম্পৃক্ত হয়। আবার কেউ যদি হারাম কোনো কাজকে ধর্মীয় কাজ হিসেবে পালন করে, তাহলেও সেটা বিদাআত হয়ে যায়। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যে কাজগুলো করা হয়, সেগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমনঃ হারাম, হালাল, মুবা বা মুস্তাহাব প্রভৃতি। কিন্তু এগুলোকে বিদাআত বলা যাবে না। দুনিয়াবি কোনো ইস্যুতে বিদাআত হয় না। ব্যবহার, লেনদেন, সংস্কৃতি-এগুলোতে বিদাআত হওয়ার সুযোগ নেই। হারাম অবশ্যই হতে পারে।


এ ব্যাপারে আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যায়; উদাহরণটা কফি সংক্রান্ত। ‘কাহুয়া বা কফি’ বলতে আমরা যে জিনিসটাকে বুঝি, সেটা প্রথম আবিষ্কার হয় একাদশ শতকে মুসলমানদের সুফিদের মাধ্যমে। এই তথ্য অনেকেই জানে না। সুফি-সাধকরা গভীর রাতে জিকিরে বসার আগে এই পানীয় পান করতেন—যেন তারা জেগে থাকতে পারেন। অনেক কট্টরপন্থি আলেম সে কারণে কফিকে হারাম ও বিদাআত দুটোই মনে করতেন। বিভিন্ন তরিকাধারী সুফি এই কফি পান করাকে অনেকটা ধর্মীয় আচারাদি হিসেবেই পালন করতেন। এ কারণে ১১, ১২ ও ১৩ শতকে আমরা কফি নিয়ে অনেক ফতোয়াও খুঁজে পাই। সেই সময়ে মক্কাতে কফি হারাম ঘোষণা করা হয়েছিল। বায়তুল্লাহর সামনে এক ব্যক্তিকে কফি পান করার অপরাধে বেত্রাঘাতও করা হয়েছিল। কফিকে সে সময় মদের সমগ্রোতীয় হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। একটা সময় পরে যখন সুফিরা এই চর্চা থেকে সরে গেল, তখন আস্তে আস্তে পরিস্থিতি বদলে গেল। অনেকেই বুঝতে শুরু করল—কফি আসলে মদ নয় এবং তারও বেশ পরে কফিকে নিষিদ্ধ করা ফতোয়াও প্রত্যাহার করা হয়।


যেটা বোঝা দরকার, তা হলো আপনি যদি দুনিয়াবি একটি কাজকে ধর্মীয় কাজ হিসেবে মেনে নেন কিংবা আশা করেন যে, আল্লাহ এই কাজটি করলে আপনাকে পুরস্কার দেবেন, তাহলে এটা হারাম হয়ে যাবে। কিন্তু যদি এটা আপনি দুনিয়াবি কোনো কাজকেই দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ রাখেন, তাহলে এটা কখনোই বিদাআত হবে না; তবে হারাম হতে পারে। একইভাবে কম্পিউটার, প্রযুক্তি বা অন্যান্য বিষয়গুলোও কখনো বিদাআত হবে না। একটু আগে উল্লেখ করা রাসূল (সা.)-এর হাদিসটি স্মরণে রাখা দরকার। তিনি বলেছেন,

‘যদি কেউ নতুন কিছু আমাদের এই দ্বীনের কাঠামোর ভেতরে সংযোজন করে, তাহলেই সেটা বিদাআত।’

তিনি কিন্তু ঢালাওভাবে সব পরিবর্তনকেই অগ্রাহ্য করেননি বা অনুৎসাহিতও করেননি। 


এখন আসা যাক বিদাআতের সংজ্ঞায়। বিদাআতের সর্বসম্মত কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যায় না। ইসলামের শুরু থেকেই বিদআাতের ব্যাপারে দুটো ভিন্ন দর্শন কার্যকর ছিল। অনেক পুরোনো ইসলামি সাহিত্যেও এই দুই ধারার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই দুই ধারার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এই সময় অবধি বিরাজ করছে। 


প্রথম ধারার মত হলো, ইসলামেরই অন্যান্য উৎস থেকে সহায়ক প্রমাণাদি পাওয়া গেলে কিছু পরিবর্তন করা যাবে। এই ধারা ইসলামের মূল চেতনার মধ্য থেকে কিছু পরিবর্তনকে অনুমোদন করে। কিন্তু ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনা অনুমোদন করে না, এমন কোনো পরিবর্তনকে তারা সমর্থন করে না। এই ধারার অন্যতম প্রবর্তক হলেন ইমাম শাফেয়ি (র.) এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল উমম’। এই ধারায় ইমাম শাফেয়ি ছাড়াও আছেন—আব্দুস সালাম, ইমাম হাজার (র.)-সহ আরও অনেকেই। আলেমদের অনেকেই এই মত ধারণ করতেন। ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এই প্রসঙ্গে বলেন— 

‘ভাষাগত অর্থে নতুন কিছু সংযোজন মানেই হলো বিদাআত। কখনো কখনো বিদাআত হলো পাপের সমতুল্য আবার কখনো কখনো বিদাআতকে উৎসাহও দেওয়া উচিত। বিদাআত তখনই পাপ হয়ে যায়, যখন তা কুরআন, সুন্নাহ এবং মূল জামায়াতের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। কিন্তু যদি এমন কিছু নতুন হিসেবে আসে, যেগুলো কল্যাণকর এবং যা ইসলামের মূল উৎসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাহলে ভালো বিদাআত।’ 

আল-ইজ্জ ইবন আব্দুস সালাম (র.), যিনি ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি ইন্তেকাল করেন এবং যাকে সুলতানুল উলামা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তিনি বিদাআত প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত ধারণা দেন। তিনি বলেন, 

বিদাআতেরও কয়েকটি ভাগ আছে। যেমন ওয়াজিব, মুবা, মুস্তাহাব, মাকরুহ এবং হারাম। কিছু কিছু বিদাআত আছে যা ওয়াজিব যেমন গোটা কুরআনকে একটি গ্রন্থ হিসেবে সংরক্ষন করা।

এভাবে প্রতিটি স্তরের ব্যাপারেই তিনি উদাহরণ দিয়ে বিদাআতকে ব্যাখা করেছেন। তিনি আরও বলেন, 

যখন আমরা রাসূলের (সা.) এই হাদিসটির সূত্র ধরে বলি যে, প্রতিটি বিদাআতই ভ্রষ্টতা, আমরা সকলেই জানি, যে রাসূল (সা.) এখানে শাব্দিক অর্থে কথাটা বলেননি। তাহলে তিনি কি অর্থে বুঝিয়েছেন। এই প্রসংগে ইমাম শাফেয়ি (র.) এবং তার সমসাময়িক অন্যন্য মনিষীগণ (এটাকে শাফেয়ি মাজহাবের কোনো ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না) বলেন, রাসূল (সা.) যখন বলছেন যে বিদাআত মানেই ভ্রষ্টতা, তিনি আসলে এর মাধ্যমে মাকরুহ আর হারাম বিদাআতকেই বুঝিয়েছেন। 

এটা হলো প্রথম ধারা; যাদের মত ছিল—ইসলামের ভেতর কোনো পরিবর্তন হলেই মোটাদাগে তা ভুল নয়। ছোটো ছোটো পরিবর্তন করা যাবে, যদি তা ইসলামের মূল চেতনা ও উৎসগুলোর বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন হয়। 


এ প্রসংগে এই ধারার লোকেরা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।

একবার রামাদান মাসের এক রাতে মসজিদে নববিতে তারাবিহ পড়তে এসে উমর বিন খাত্তাব (রা.) দেখলেন যে, মসজিদের বিভিন্ন স্থানে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় অনেকেই তারাবিহর নামাজ আদায় করছে। এই দৃশ্য দেখে তিনি সবাইকে ডাকলেন এবং বললেন, আমরা কেন একসাথে একই জামায়াতে একজন ইমামের পিছনে তারাবিহ আদায় করি না? এই কথা বলে তিনি সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম একজন ক্বারি উবাইয়া বিন কাহাফকে (রা.) নামাজ পড়াতে বললেন এবং সেই রাতে সবাই একসাথেই নামাজ আদায় করলেন। পরের রাতে তাকে আর বলতে হলো না। তিনি দেখলেন, সবাই একসাথেই জামায়াতবদ্ধ হয়ে তারাবিহর নামাজ আদায় করছে। এই দৃশ্য দেখে উমর বিন খাত্তাব (রা.) হাসলেন আর বললেন ‘নি’ইমাতুল বিদাতি হাযিহি’—অর্থাৎ, কি সুন্দর এক বিদাআত।

এই ঘটনাটি বুখারি শরিফে পাওয়া যাবে। আগের মতো এখানেও রাখতে হবে, খলিফা উমরের (রা.) কথায়ও যে বিদাআত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তাকে পারিভাষিক অর্থে নেওয়া যাবে না। সব বিদাআত ভ্রষ্টতা- এই মানসিকতা নিয়েও বিবেচনা করা যাবে না। তিনি ইবাদত নিয়ে নতুন কোনো ফতোয়া দেননি। তিনি শুধু একটি অভ্যাসকে ইতিবাচকভাবে পাল্টে দিয়েছেন। আরবি কথাগুলোকে কখনোই পারিভাষিকভাবেই শুধু নেওয়া যাবে না।


ইমাম শাফেয়ি (র.) এবং তার সমর্থকরাও পারিভাষিক অর্থে বিদাআতকে বিবেচনা করেননি। তারাই প্রথম বলেছেন যে, বিদাআত খারাপ জিনিস, এটা জাহান্নামে নিয়ে যাবে; কিন্তু সব পরিবর্তনই খারাপ নয়। যদি কোনো বিদাআত উম্মতের জন্য ভালো হয়, তাহলে তা করা যাবে। এটা হলো বিদাআত নিয়ে প্রথম ধারা; যেখানে অসংখ্য আলিম ও স্কলারদের সহমত রয়েছে। 


দ্বিতীয় যে ধারা, তাতেও অনেক বড়ো বড়ো ও প্রসিদ্ধ আলিম ও স্কলারদের অনুমোদন আছে। এই তালিকায় আছেন আল কারাফি, আন্দালুসিয়ার বিখ্যাত ইমাম শাওতাবি, আর সবচেয়ে বড়ো যে দুই স্কলার—শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (র.) এবং ইবনুল কাইউম (র.)। এই ধারার মত হলো, ভালো বিদাআত বলতে আসলে কিছু নেই। সকল বিদাআতই ভুল। পুরনো সাহিত্য বা ঘটনা থেকে যদি কোনো বিদাআতের রেফারেন্স তাদেরকে দেওয়া হলে তারা বলেন—এগুলোকে পুরোপুরি বিদাআত বলা যায় না। খলিফা উমরের (রা.) জামায়াতে তারাবিহর নামাজ পড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তাহলে তারা বলেন—রাসূল (সা.) নিজেও দুএকবার জামায়াতে তারাবিহ পড়ে গেছেন, তাই এটা নতুন কিছু নয়। ইবনে তাইমিয়া বিদাআতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন—

যদি কোনো কাজ আল্লাহর পক্ষ থেকে সওয়াব পাওয়ার আশাতেও করা হয়; অথচ শরিয়াতে কাজটি করতে বলা হয়নি, তাহলেও সেটা বিদাআত। 

সংজ্ঞাটি চমৎকার। তবে এই সংজ্ঞাকে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে গেলে কিছু সংকটের সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন আসতেই পারে, শরিয়াত করতে বলেনি বা অনুমোদন করেনি বলতে কী বোঝায়? ইবনে তাইমিয়ার প্রতি পূর্ন শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এরকম কিছু সংশয়ের কারণেই তাঁর মতামতকে একেবারে সর্বস্তরের মানুষ গ্রহন করতে পারেনি। তিনি যেটাকে মনে করছেন—শরিয়াত অনুমোদন করেনি, অপর মতের ধারকরা এমনটি মনে করছেন না। তবে উভয় পক্ষই বিদাআত নিয়ে বেশি খোলামেলা আলোচনা না করার বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রকৃত সত্য হলো, এই দুই ধারার কেউই বিদাআতের প্রসার ঘটাতে চাননি। বিদাআতকে যদি সমর্থন করা হয়, তাহলে গতকাল থেকে আজকে কিছু পরিবর্তন হবে, আজ থেকে আগামীকাল আরও কিছু পরিবর্তন ঘটবে; এরকম হতেই থাকবে। একটা সময়ে গিয়ে হয়তো আসল বিষয়টা হারিয়েই যাবে।


এই পর্যায়ে আমরা জানব—বিদাআতের কী কী ক্যাটাগরি আছে এবং কোনগুলোর ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। বেশ কয়েক ধরনের বিদাআত আছে। এই পর্যায়ে আমরা বিদাআতের পাঁচটি ধরন নিয়ে আলোচনা করব। এর মধ্যে প্রথমটি হলো বিদাআতুল ফা’লিয়া বনাম বিদাআতুল তারকিয়াহ। 


বিদাআতুল ফেলিয়া এবং বিদাআতুল তারকিয়াহ

বিদাআতুল ফেলিয়া মানে হলো এমন কোনো নতুন কাজ করা, যা আগে করা হয়নি। বিদাআতুল তারকিয়াহ হলো এমন কোনো কাজ ছেড়ে দেওয়া, যা আগে হয়েছে। অর্থাৎ এই দুটো বিদআত পুরোপুরি বিপরীত ধরণের। 

এ প্রসংগে আমরা সহিহ বুখারির সেই বিখ্যাত হাদিসটির কথা বলতে পারি, যেখানে তিন জন ব্যক্তি হযরত আয়িশার (রা.) কাছে এসে রাসূলের (সা.) জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। আয়িশা (রা.) তাদেরকে কিছু ঘটনা ও উদাহরণ দেওয়ার পর তারা মন্তব্য করল—ও আচ্ছা! এটা তো তেমন কিছু কঠিন নয়; আমি তো আরও কঠিন মনে করেছিলাম। আমি এর চেয়েও ভালো আমল করতে পারি। তারপর সেই তিনজনের মধ্যে একজন বলল, আমি এখন থেকে প্রতিদিন রোজা রাখব। আরেকজন বলল, আমি এখন থেকে প্রতিরাতই ইবাদতে কাটাব। আর তৃতীয় জন বলল, আমি কখনো বিয়েই করব না।”

এই কথাগুলোর মধ্যে বিদাতুল ফেলিয়া ও বিদাতুল তারকিয়াহ দুটোই আছে। প্রথম দুইজন যেভাবে ইবাদত করতে চেয়েছে, রাসূল (সা.) সেভাবে করেননি। আর তৃতীয়জন বিয়ে ছেড়ে দিতে চেয়েছে, অথচ রাসূল (সা.) নিজেই বিয়ে করেছিলেন। সুতরাং তাদের কেউ কেউ বেশি আমল করে সওয়াব অর্জন করতে চেয়েছিলেন, আবার কেউ কেউ বৈধ আমল ছেড়ে দিয়ে সওয়াব পেতে চেয়েছিলেন।


বিদাতুল আকিদা এবং বিদাতুল আমালিয়া

দ্বিতীয় ক্যাটাগরিটা হলো, বিদাতুল আকিদা এবং বিদাতুল আমালিয়া; আকিদা সম্পর্কিত বিদাআত এবং আমল সম্পর্কিত বিদাআত। বিদাআতুল আকিদা বলতে আকিদার সংকটকে বোঝায়। যেমন সুন্নি মতাদর্শের মুসলমানরা সুন্নি ছাড়া অন্য সকল মতাবলম্বীকেই বিদাতুল আকিদার দোষে দোষী মনে করে। সুন্নিদের চোখে কাদেরিয়া গ্রুপ, মুতাজিলা গ্রুপ, ইমামপন্থী শিয়া, খারিজি সবই বিদাতুল আকিদায় সম্পৃক্ত। সুন্নিরা মনে করে এসব গ্রুপগুলো এমন কিছু নীতিতে বিশ্বাস করছে, যা সুন্নাহ অনুমোদন করে না। এ কারণেই সুন্নিরা নিজেদেরকে যেমন আহলে সুন্নাহ বলে দাবি করে, তেমনি এর বাইরের অন্য সবাইকে আহলে বিদাআত বলেই সংজ্ঞায়িত করে। সুন্নি ধারার মধ্যে ছোটোখাট বিষয় নিয়ে বিতর্ক হলে অসুবিধা নেই; তবে সুন্নাহর মূল নীতিমালাতে যদি ভ্রষ্টতা থাকে, তাহলেই সুন্নিরা তা বিরাট বড়ো অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।  


অন্যদিকে বিদাআতুল আমালিয়া হলো কার্যক্রমের আংগিকে বিদাআত। যেমন, আমাদের মধ্যে সুফি গোষ্ঠীর অনেককেই আল্লাহকে পাওয়ার মোহে নিজে শরীর নানাভাবে নাড়িয়ে আমল করার চেষ্টা করে। তারা এটা করে সওয়াবের আশায়। তবে সব সুফিই এমনটা করে না। চরমপন্থীরাই এ ধরনের আচরণ করে। বর্তমান সময়ের সুফিদের মধ্যে অনেক ধীরস্থির ও চিন্তাশীল মানুষ রয়েছেন, যারা অত্যন্ত সংযতভাবে ধ্যান-সাধনা করে থাকেন। তাসাউফ বললেই সবাইকে গণহারে এরকম ধরা যাবে না। দু-একটি গ্রুপ এরকম থাকতে পারে। তবে তাসাউফের চর্চাকারী অধিকাংশই অত্যন্ত উত্তম রূপে ধর্মচর্চা করেন। ইদানিং অনেকেই হোয়াটসএ্যাপ বা ইউটিউব-এ এরকম সুফি গ্রুপের উত্তেজিত কর্মকান্ড নিয়ে মজা করেন, ভাইরাল করেন। এটা ঠিক নয়। এসব আচরণ নিয়ে অনেক কথা থাকতে পারে; তাই বলে ঠাট্টা-তামাশা করা উচিত নয়। এসব দৃশ্য দেখলে আমাদের সন্তানদেরকে সতর্ক করতে পারি। আমরা বলতে পারি—এভাবে রাসূল (সা.) ইবাদত করেননি। ব্যাস এটুকুই। তাই বলে আমরা এটা নিয়ে বাচ্চাদের সামনে উপহাস করব না। আমাদেরকে বুঝতে হবে, সতর্ক করা, অনুমোদন না করা আর তামাশা করার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।

ইমাম মালিক (র.) যখন প্রথম শুনলেন ও দেখলেন—একটা গ্রুপের মুসলমান এভাবে উত্তেজিত হয়ে লাফালাফি করে জিকির করছে, তখন তিনি শুধু এটুকুই বলেছিলেন—এরা কি পাগল হয়ে গেছে? ব্যাস! আমরাও এই চেতনাটুকু উপলব্ধি করার চেষ্টা করব।


বিদাতুল কুল্লিয়া এবং বিদাআতুজ জুয'ইয়্যা

তৃতীয় ক্যাটাগরির বিদাআত হলো বিদাতুল কুল্লিয়া আর বিদাআতুজ জুয'ইয়্যা। বিদাআতুল কুল্লিয়া এমন একটি চিন্তাধারা বা নীতিমালার বিদাআত, যা নতুন করে আরও অনেক ইস্যুকে কভার করে। এগুলো এমন বিদাআত, যা নতুন করে অনেকগুলো সমস্যার জন্ম দেয়। 'আমাদেরকে সুন্নাহ অনুসরণ করার দরকার নেই'—এমন চিন্তা করাটাই বিদাআত। কিন্তু কেউ যদি এই বিদাআতি চিন্তা করে, তাহলে তার এক কথাতেই আরও অসংখ্য সমস্যা ও সংকটের সৃষ্টি হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ বলে, আমার ইমাম বা শেখ যা বলছেন বা যা তিনি স্বপ্নে দেখেছেন, তা অন্ধভাবে অনুসরন করতে হবে, এমনকি কোনো প্রশ্নও করা যাবে না। এটাও বিদাআতি কুল্লিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ, এই একটি বিদাআত থেকে আরও অসংখ্য বিদাআতের জন্ম হবে। তাই বিদাআতুল কুল্লিয়া অনেক বড়ো একটি বিষয়। সেই অনুযায়ী বিদাআতুল জুয'ইয়্যা অনেক ছোটো পরিসরের বিষয়। জুয'ইয়্যা বিদাআতের উদাহরণ হতে পারে দলগতভাবে জিকির করা। এটা হলো সামান্য একটা কাজ। এই ধরনের বিদাআতে অনেক বড়ো কিছু হওয়ার বা অনেকগুলো বিদাআত সংঘটিত হওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি কেউ কেউ এমনও বলেন যে, বিদাআতুজ জুয'ইয়্যা বলতে যে বিদাআতগুলোকে বোঝানো হয়, সেগুলো আসলে বিদাআতই নয়।


বাসিকা এবং বিদাআত মুরাক্কাবা

বিদাআতের আরেকটি ক্যাটাগরি হলো বিদাআত বাসিকা এবং বিদাআত মুরাক্কাবা। এটাকে বড়ো গুনাহ আর ছোটো গুনাহ হিসেবেও দেখা যায়, ঠিক যেভাবে আমরা কবিরা আর সগিরা গুনাহকে আলাদা করি। বিষয়টা আরেকটু ভিন্নভাবেও বলা যায়। আমরা বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার সময় আরবি অনেক শব্দকে ঠিকমতো ব্যাখ্যা করি না। ফলে শ্রোতা মূল বিষয়টা না বুঝে উল্টো আরও সন্দেহের মধ্যে পড়ে যায়। যেমন আমরা বলি, খুন করা হারাম। আবার অন্য প্রসংগে বলতে গিয়ে বলি, মিউজিকও হারাম। এই যুগের একটা ছেলে তখন বুঝতে পারে না—হত্যা আর মিউজিককে কীভাবে একই পাল্লায় মাপা হলো। কিন্তু আসলে বিষয়টা তো সমান নয়। হারাম একটা লম্বা পরিধির বিষয়। আর সব হারামের ওজনও এক রকম নয়। এই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে না বলায় এ জাতীয় সংকটের জন্ম হয়। একারণেই ইসলামে সব গুনাহকে এক রকমভাবে বিচার না করে কবিরা ও সগিরা গুনাহর নামে পৃথক করা হয়েছে। মিউজিককে আপনি সগিরা গুনাহের একটি ছোটো উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন, কোনোভাবেই খুন বা হত্যাকান্ডের মতো বড়ো গুনাহকে এর সাথে মেলানো যাবে না। ঠিক একই ঘটনা বিদাআতের বেলায়ও প্রযোজ্য। বিদাআতের ক্ষেত্রেও বড়ো বিদাআত যেমন আছে, তেমনি ছোটো বিদাআতও আছে।


এই বড়ো-ছোটো বিদাআতের বিষয়টা স্কলারবৃন্দ নির্ধারন করে গেছেন। কদর বা ভাগ্যকে অস্বীকার করাকে সকল ধারার আলিম বড়ো বিদাআত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আবার মুসলমানদের মধ্যেই এমনও অনেকে আছেন, যারা প্রথম তিন খলিফা নিয়ে অনেক বাজে ধারনা পোষন করেন। এগুলো বড়ো আকারের বিদাআত। এগুলোর তুলনায় দলীয়ভাবে জিকির করা অনেক ছোটো বিদাআত। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন যে এটা বিদাআতই নয়। অতএব এই আলোচনার সার কথা হলো সব বিদাআতই একই মানের নয়।


বিদাআত হাকিকিয়া বনাম বিদাআত ইজাফিয়া

এরপর আমরা কথা বলব সর্বশেষ তথা পঞ্চম ক্যাটাগরির বিদাআত নিয়ে। এটা নিয়ে একটু বিস্তারিত কথা বলার চেষ্টা করব। এটা নিয়েই আমাদের মধ্যে বিতর্ক বেশি দেখা যায়। বিদাআত হাকিকিয়া হলো সত্যিকারের বিদাআত। এগুলো হলো এমন কিছু নতুনভাবে সংযোজন করা, যার কোনো দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে আর কখনো কোথাও দেখা যায়নি। শরিয়াতে এর সমর্থনে কোনো দলিলও পাওয়া যায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জিকির করতে করতে দাঁড়িয়ে যাওয়া এবং তারপর লাফানো বা উত্তেজিতভাবে ছুটোছুটি করা; এগুলো সবই বিদাআত হাকিকিয়া। রাসূলের (সা.) কিংবা সাহাবিদের জীবনে কোথাও এ ধরনের আচরণের কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। এগুলো অনেকটাই ভিত্তিহীন। সহজ করে বলতে গেলে, বিদাআত হাকিকিয়া চিহ্নিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ। এই বিদাআতগুলো খুবই স্পষ্ট, পরিস্কার ও সন্দেহাতীত।


বিদাআতে ইজাফিয়া হলো সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত বিষয়। ইজাফিয়া মানে হলে নতুন কিছু সংযোজন করা। অর্থাৎ কিছু একটা আছে, আপনি শুধু এটার সাথে আরেকটু কিছু যোগ করে দিলেন। কিংবা একটা কিছু বলা আছে, আপনি শুধু একটি ঘুরিয়ে বললেন। মূলত এই বিদাআতটিকে নিয়েই মূল দুটি ধারা (ইমাম শাফেয়ি (র.) এবং ইমাম ইবনে তাইমিয়ার (র.) ধারার) মধ্যে বিতর্ক ও মতপার্থক্য বেশি হয়েছে। বিদআত ইজাফিয়া হলো, এমন কিছু বিষয় যা অনুমোদিত হয়েই আছে, তবে আপনি তার সাথে আরেকটু কিছু যোগ করে দিলেন। যেমন হতে পারে, আপনি এর সাথে সময়ের একটি সীমা যোগ করলেন। কিংবা একটি সংখ্যা জুড়ে দিলেন কিংবা বিষয়টার সাথে কোনো স্থানকে যুক্ত করে ফেললেন।


উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন তরিকার কথা বলা যায়। যেমন কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশাবন্দী। সাধারনভাবে এসব তরিকার নিয়ম আছে। আপনি মুরিদ হিসেবে শাইখের কাছে গেলে, তিনি আপনাকে বাইয়্যাত দিবেন। তারপর আপনার হাতে একটা কাগজ দিবেন, যেখানে কিছু আমলের কথা উল্লেখ থাকবে। ধরা যাক, সেখানে লেখা—৩ বার সূরা ইখলাস, ৭ বার আয়াতুল কুরসি, ১০ বার তাসবিহ বা তাহরিম ইত্যাদি। স্বাভাবিক চোখে যদি এই আমলগুলোকে দেখা যায়, তাহলে কোনো সমস্যাও নেই। শাইখ হয়তো বিভিন্ন ওয়াক্তের নামাজের পর এই সব আমলগুলো পালন করার কথা বলে দেবেন। মুরিদ সেটা হয়তো পরবর্তী ৩ মাস আমল করে তারপর আবার শাইখের কাছে গিয়ে রিপোর্ট দেবেন। শাইখ হয়তো এরপর সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পরবর্তী স্তরে উন্নত করবেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে—এই কাজটায় বিদাআত কোনটা? আপনি যদি সূরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসি বা জিকির করেন, থাওলে তার কোনোটাই খারাপ আমল নয়, বিদাআতও নয়। কিন্তু বিদাআত হলো এর পাশে লেখা সংখ্যাটি। অর্থাৎ শাইখ যে অমুক ওয়াক্তের পর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক বার সূরা ইখলাস পড়তে বললেন বা আয়াতুল কুরসি আমল করতে বললেন, এটাই হয়তো তিনি যোগ করেছেন।


কেউ যদি তাকে চ্যালেঞ্জ করে—এই সংখ্যা আপনি কোথায় পেয়েছেন, শরিয়াতের কোথায় এগুলোর সংখ্যা উল্লেখ করা আছে? তখন তিনিও হয়তো পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বলবেন, আপনিই বলেন শরিয়াতের কোথায় এগুলোকে অনুমোদন করা হয়নি? কেন আমি ফজরের পর ৩ বার আয়াতুল কুরসি পড়তে পারবনা? পড়লে দোষটা কোথায়? এই ধরনের বিষয়গুলোই হলো বিদাআতে ইজাফিয়া।

ধরা যাক মিলাদের কথা। অনেকেই মিলাদে গান বা বাজনা ছেড়ে মহিলাসহ নৃত্য করে। মিলাদের কট্টর সমর্থকরাও এগুলো অনুমোদন করে না। এগুলো নিয়ে আলোচনারই কিছু নেই। কিন্তু কেউ যদি রাসূলের (সা.) শানে একত্রিত হয়ে দুরুদ পড়ে, তার উপর আলোচনা করে, তাহলে সমস্যা কোথায়? এটা সারা বছর যেকোনো দিনে করলেও কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো যদি এই আমলটা কেউ বিশেষ একটি দিনেই শুধু পালন করে। 


কেউ যদি বলে, আজকে মিলাদের দিন বা গতকাল মিলাদের দিন গেছে। এ উপলক্ষ্যে আমি ১ হাজার বার দুরুদ পাঠ করেছি। এটা বছরের যেকোনো দিনই করা যায়, তাতে দোষও নেই। কিন্তু যখনই একটি বিশেষ দিনকে উপলক্ষ্য করে এরকম করা হবে, তখনই আপত্তি করার সুযোগ চলে আসে। ইমাম তাইমিয়ার চিন্তাধারা যারা লালন করে, তারা এটাকে বিদাআতে ইজাফিয়া মনে করেন। কিন্তু ইমাম শাফেয়ির মতধারার অনুসারীরা এটাকে বিদাআত মানতে চান না। তাদের কথা হলো, এই কাজগুলো তো শরিয়াত-বিরোধী নয়। শরিয়াতে দুরুদ পাঠ করা বা জিকির করাকে অনুমোদন করেছে। কেউ যদি নির্দিষ্ট দিনে বা নির্দিষ্ট ওয়াক্তে এই আমলটা করে ফায়দা পায় বা স্বস্তি পায়, তাতে অসুবিধার তো কিছু নেই। তারা এক্ষেত্রে বেশ কিছু দৃষ্টান্তও উপস্থাপন করেন। যেমন, একটি হাদিস যা ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, আবুদাউদ ও আহমাদ-এ এসেছে। 

একবার রাসূল (সা.) জোহর বা আসরের নামাজ জামায়াতে আদায় করছিলেন। তিনি রুকু থেকে যখন সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই বললেন—সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ। ঠিক তখনই একজন সাহাবি একটি জিকির স্বতপ্রনোদিতভাবে তৈরি করে ফেললেন। তিনি বললেন, রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ, হামদান কাসিরান, তাইয়্যেবান মুবারাকান ফিহি। যথারীতি নামাজটি শেষ হলো। নবিজি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন—কে এই জিকিরটা পাঠ করেছে? যে সাহাবি এটা পড়েছিলেন, তিনি তো ভয় পেয়ে গেলেন! কোনো অন্যায় হলো কিনা। রাসূল (সা.) আবার বললেন, কে এই জিকিরটা আল্লাহ খুশি হবেন মনে করে পাঠ করেছো? তখন ঐ সাহাবি স্বীকার করলেন। রাসূল (সা.) বললেন, জিকিরটা এতটাই সুন্দর হয়েছে যে, আমি দেখতে পেলাম—জিকিরটা পাঠ করার সাথে সাথে আমার সামনে উপস্থিত ৩০ জন ফেরেশতা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু করে দিলো—কে সবার আগে উর্ধ্বাকাশে গিয়ে এই জিকিরটার আমলকে লিখে রাখবে।

তার মানে একজন সাহাবি তার নিজের মতো করে একটা জিকির তৈরি করে ফেললেন! তাও নামাজের ভেতরে! অনেকেই প্রশ্ন করতে পারে—কে তোমায় এতটা সাহস দিলো? কিন্তু আল্লাহর রাসূল কিন্তু অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তেই তা অনুমোদন করেছিলেন।


হাদিসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, হযরত বেলাল (রা.) রাসূলের (সা.) সংগী হিসেবে প্রথম ব্যক্তি, যিনি জান্নাতে ঢুকবেন। তিনি এমন কী আমল করেছিলেন, যার ফলে এই সম্মান পেলেন? এ প্রশ্ন করা হলে বেলাল (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন—আমি যখনই অযু করি, তখনই দুই রাকাত নামাজ আদায় করি। এখন যদি প্রশ্ন আসে, এই আমলটি তিনি কোথায় পেয়েছিলেন? কোথাও না। এটা তিনি নিজ থেকেই আমল করেছিলেন। কোনো নির্দেশনা না থাকলেও এই ধরনের আমল করায় কোনো নিষেধও ছিল না; তাই বেলাল (রা.) খুব সন্তুষ্টচিত্তেই এই আমল করতেন।  


আমরা উদাহরণ হিসেবে হযরত খুবাইব বিন আরাত (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনাকে সামনে আনতে পারি। কাফেররা যখন তাকে মক্কার বাইরে ধরে ফেলল এবং তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো, তিনি বললেন, তোমরা আমাকে হত্যা করার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ দিও। তিনি এই দুই রাকাত নামাজ পড়ার সূত্র কোথায় পেলেন? কোথাও না। কিন্তু তিনি যে চর্চা শুরু করে দিলেন, তা সারা বিশ্বে এক রকমের সুন্নাহ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। আজও যখন কোথাও কাউকে হত্যা করা হয়, অথবা ফাঁসি দেওয়া হয়—সেটা ইসলামিক আইনে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে হোক কিংবা জালিমের অধীনে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেওয়া হউক—তখন এই দুই রাকাত নামাজ পড়তে দেওয়ার বিধান চালু হয়ে আছে। বিষয়টা ধর্মীয় ইবাদাত তথা নামাজ সংক্রান্ত। কিন্তু ফাঁসির আগে পড়ার এই বিধানটা চালু করে গেলেন একজন সাহাবি। কিন্তু তাতেই-বা সমস্যা কি? যদি একজন মানুষ তার জীবনের শেষ আমল হিসেবে দুই রাকাত নামাজ পড়তেই চায়, তাতে কোনো অন্যায় বা অপরাধ হওয়ার তো কথা নয়।


আরেকটা উদাহরণও হাদিস থেকে দেওয়া যায়। এটা সহিহ বুখারিতেও আছে।

একবার এক অমুসলিম এলাকায় একদল মুসলিম আটকা পড়ে যায়। সেখানে আটকে পড়া মুসলমানদের কোনো খাবার বা ন্যায্য সুবিধা দেওয়া হচ্ছিল না। ঘটনাক্রমে সেই গোত্রপ্রধানের একজন ছেলে অসুস্থ হয়ে যায়। অসুস্থ বলতে—তাকে জ্বীন পাকড়াও করে। গোত্রপ্রধান তাঁর গোত্রের কারও কাছে এই ব্যাপারে সাহায্য না পেয়ে একটা পর্যায়ে মুসলমানদের কাছে এসে বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি রুকিয়া জানো? কেউ কি আমার ছেলেটাকে জ্বীনদের আসর থেকে মুক্ত করতে পারবে? একজন সাহাবি বললেন, -'আমি পারব। কিন্তু আমাকে এর বিনিময়ে ৩০টি ভেড়া দিতে হবে।' গোত্রপ্রধান রাজি হলো। সাহাবি সেই অসুস্থ ছেলেটার কাছে গিয়ে সূরা ফাতিহা পড়ে ফু দিলেন। ছেলেটা জ্বীনমুক্ত হলো। পরবর্তীতে সেই সাহাবি মদিনায় আসার পর রাসূল (সা.) তাকে প্রশ্ন করলেন—তুমি কীভাবে জানলে যে সূরা ফাতিহা পড়ে রুকিয়া দেওয়া যায়?

আসলে সাহাবি নিজের অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাসের জায়গা থেকেই এই আমলটি করেছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন। রাসূল (সা.) এর আগে কখনো বলেননি যে সূরা ফাতিহা পড়ে জ্বীন তাড়ানো সম্ভব। কিন্তু সেই সাহাবি আসলে নিজের বুদ্ধি থেকেই গোটা কুরআন থেকে সূরা ফাতিহাকেই এই কাজটি করার জন্য বেছে নিয়েছিলেন।


আরেকটি হাদিসও আছে, যেখানে জানা যায়—একজন সাহাবি প্রতি রাকাতে সূরা ইখলাস পড়তেন। কেন পড়তেন, কে বলেছে? কিন্তু তিনি এটা আমল করতেন।


আমরা আবারও হযরত উমর (রা.) ও তারাবিহর নামাজ জামায়াতে পড়ার ঐ বিষয়টিতে ফিরে যাব। মজার ব্যাপার হলো, বিদাআত নিয়ে কট্টরপন্থী (ইবনে তাইমিয়া) এবং উদারপন্থী (ইমাম শাফেয়ি, ইমাম শারতায়য়ি) উভয়ই এই ঘটনাটিকে নিজেদের দৃষ্টিভংগির আলোকে ব্যাখা করেছেন। যারা কট্টরপন্থী, তারা বলছেন—হযরত উমর (রা.) নতুন কিছু করেননি; কারণ, রাসূল (সা.) নিজেও তারাবিহ পড়েছেন। আর যারা উদারপন্থী তারা বলছেন, না এই ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য এটা নয়। রাসূল (সা.) কখনোই তারাবিহ পড়ার ব্যাপারে আদেশ দেননি। তিনি মাঝে মাঝে তারাবিহ পড়তেন। তখন সাহাবিরা এসে তার পেছনে দাঁড়িয়ে গেছেন। তিনি তাদেরকে উৎসাহিত করেননি, আবার নিরুৎসাহিতও করেননি। ফলে তার ওফাতের পরে সবাই যে যার মতো তারাবিহ পড়ত। হযরত উমর (রা.) বরং সবাইকে তারাবিহ এক ইমামের পেছনে পড়ার প্রবর্তন করেছেন। এখন যে আমরা এশার পরে জামায়াতে তারাবিহ পড়ি, এটা হযরত উমর (রা.) প্রথম শুরু করেছেন। যেটাকে বিদাআতে ইজাফিয়া বলা যায়।


ঠিক একইভাবে হযরত উসমান (রা.) জুমার নামাজে দুইটি আজান দেওয়ার বিধান চালু করেন। এর আগে দুই আজান দেওয়ার বিধান ছিল না। এমনকি আজও মুসলিম বিশ্বের সবখানে জুমার নামাজে দুই আজানই দেওয়া হয়। না দিলেও অসুবিধা নেই। কিন্তু হযরত উসমান (রা.) প্রবর্তিত এই অনুশীলনকে বিদাআতে ইজাফিয়া বলা যায়। কিন্তু এটা তিনি কেন করেছিলেন? হযরত উসমান (রা.) লক্ষ্য করে দেখলেন, অনেক ব্যবসায়ী আজানের পর ব্যবসা গুটিয়ে নামাজে আসতে কিছুটা সময় নেয়। আজানের উদ্দেশ্য যেহেতু মানুষকে নামাজের জন্য ডাকা। হযরত উসমান (রা.) ভাবলেন, শুক্রবার যেহেতু বড়ো জামায়াত; তাই একটা বাড়তি আজান দিয়ে এই ব্যবসায়ীদেরকে নামাজের প্রস্তুতির জন্য একটু আগাম আহবান জানালে ভালো হয়। ব্যবসায়ীরা সতর্ক হলো, আবার আগে থেকে প্রস্তুতিও নিতে পারল। ফলে নামাজের জামাআতে সময়মতো তারা শামিলও হয়ে যেতে পারল। কিন্তু এই কাজটি এর আগে নবিজি (সা.) করেননি, হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমরও (রা.) করেননি। কিন্তু উদারপন্থীদের মতে এটা কোনো সমস্যা নয়। হযরত উসমান (রা.) শরিয়াতের বিধানের মধ্যে মানুষকে নামাজের জন্য ডাকার যে বিধান আজানকেই ব্যবহার করেছেন। শুধুমাত্র আংগিক ভিন্ন ছিল; যেন আরও কিছু মানুষ নামাজে শামিল হতে পারে। তাই এই উদ্যোগকে নেতিবাচকভাবে দেখার কিছু নেই।


বিদাআতে হাকিকিয়া এবং বিদাআতে ইজাফিয়া নিয়ে এই ছিল আমার আলোচনা। এ ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে আমার মত হলো, উম্মাহ’র মধ্যে এই দুই ধারার বিদাআত নিয়ে যে মতপার্থক্য আছে, তা অত্যন্ত যৌক্তিক মতপার্থক্য। তাই আমাদের উচিত এই দুই ধারার প্রতি সম্মান রাখা, কাউকে হেয় না করা এবং ধারনা করা যে, উভয়ের অবস্থানই গ্রহনযোগ্য এবং তারা সঠিক চিন্তারা ওপরই আছেন। এমনকি আমরা যদি কোনো একটি ধারাকে সমর্থনও করি, তথাপিও অপর ধারাটির প্রতি যথাযথ সম্মান রাখা উচিত। যেমন আমি ব্যক্তিগতভাবে ইবনে তাইমিয়ার চিন্তাধারার সাথে একমত; শুধু একটি কারণে আর তা হলো মূল বিষয়ের কাছাকাছি থাকা সবসময়ই নিরাপদ ও কম ঝুঁকিপূর্ন। 


এমনকি সাহাবিদের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। উদাহরণ হিসেবে কুরআন সংকলনের কথা বলা যায়। হযরত আবু বকর (রা.) এই কাজটি করতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু হযরত উমর (রা.) তাকে চাপ দিলেন। তাকে বোঝালেন, এতে ইসলাম-বিরোধী কোনো কিছু হচ্ছে না; বরং এতে ভালোই হবে। আবার হযরত উসমান (রা.) তার সময়ে এসে তার সংগ্রহকৃত কুরআন ছাড়া বাকি কুরআনগুলোকে প্রত্যাখান করতে বললেন। কিন্তু তার এই দৃষ্টিভংগি ইবনে মাসউদ (রা.) মানতে পারেননি। তিনি বলেছেন, আমি রাসূলের (সা.) কাছ থেকে কুরআন শুনেছি ও মুখস্থ করেছি। আমি আপনারটা তাহলে কেন মেনে নেবো?  


এমনকি কুরআনের বিভিন্ন চিহ্ন দেওয়া নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম মালিক (র.) বলেছেন, কুরআনে একটা বিন্দু বা কোনো রকমের জের-জবর-পেশ-তাশদিদ দেওয়াও বিদাআত। কুরআনকে সেভাবেই রাখতে হবে, যেভাবে এটা ছিল। এখন আমাদের মধ্যে কয়জন এসব চিহ্ন ছাড়া কুরআন পড়তে সক্ষম? এমনকি যারা কুরআন ভালো জানেন বলে দাবি করেন, তাদের পক্ষেও এসব চিহ্ন ছাড়া কুরআন পড়া কঠিন হয়ে যাবে। তাহলে কে ইমাম মালিকের সেই ফতোয়া শুনবে? বাস্তব কারণেই তার ফতোয়া মেনে নেওয়া কঠিন। এখন তো শুধু কুরআনেই এই চিহ্ন পর্যন্তই সীমিত নেই। অহরহ ক্যালিওগ্রাফি হচ্ছে, যেখানে কুরআনের আয়াতকে নানা নকশায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। কেউ আপত্তি তুলছেন না। বরং সবাই পছন্দই করছেন। কিন্তু ইমাম আহমাদ (র.) কুরআনের এমন নকশাকে পছন্দ করতেন না। তিনি এটাকেও বিদাআত মনে করতেন। তাদের জায়গা থেকে সেই বাস্তবতায় তারা ঠিক, তবে আমাদের জন্য এটা বাস্তবসম্মত নয়।


এরপর যদি হযরত উমরের (রা.) খলিফা হওয়ার বিষয়টা ভাবা যায়। আবু বকর (রা.) নিজেই হযরত উমরের (রা.) নাম প্রস্তাব করে যান। শাসনকাজ পরিচালনা শরিয়াতের অংশ। কিন্তু কে শাসন করবে, এটা কীভাবে নির্ধারিত হবে? একজন শাসকের পর পরবর্তী শাসক কীভাবে নির্ধারিত হবে? আবার হযরত উমর (রা.) তার উত্তরাধিকারী হিসেবে একজনের নাম বলে যাননি। বরং তিনি ৬ জন সাহাবির নাম প্রস্তাব করে যান, যার মধ্যে থেকে একজন খলিফা হবেন। এই পদ্ধতিগুলো কীসের ভিত্তিতে প্রণয়ন করল?


এরপর আলোচনা করা যায় ইসলাম শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে। কী পদ্ধতিতে আমরা মানুষকে ইসলাম শেখাবো? ধরা যাক, ফিকাহ, আকিদা, তাফসির শেখানো হবে। সাহাবিদের মধ্যে কি এভাবে শিখানোর কোনো ইতিহাস আছে? একজন সাহাবি শনিবার ফিকাহ শেখাবেন, আরেকজন রবিবার আকিদা? তাহলে আমরা এ পদ্ধতি কোথায় পেলাম? আবার আমরা ইসলাম শিক্ষার নানা স্তরও বের করেছি। উচ্চতর স্তর, মধ্যম স্তর। যোগ্যতা ও দক্ষতা বুঝে আমরা ছাত্রছাত্রীদেরকে ভাগ করে তাদের উপযোগী পদ্ধতিতে আমরা ইসলাম শিক্ষা দেই। কিন্তু এসব পদ্ধতি আমরা কোথায় পেয়েছি? আবার আরেকটি পদ্ধতি হলো মাদ্রাসা। এখন আমরা মাদ্রাসা বলতে যা বুঝি, এরকম কোনো কিছু কি অতীত সময়ে ছিল? সাহাবিদের সময়ে এগুলো ছিল না। কিন্তু তাবেয়ি তাবে তাবেয়িনরা এসব শুরু করেন। এমনকি আগে তো বই লেখার বিধানও ছিল না; সব কিছু সাহাবিদের মাথায় থাকত। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিম স্কলারবৃন্দ এ ধরনের বই লিখতে শুরু করেন। এ কারণেই প্রথম হাদিস গ্রন্থ হিসেবে আমরা ইমাম মালিকের (র.) মুআত্তা পাই রাসূলের (সা.) ওফাতের ১৭০ বছর পর। মানুষ পয়সা দিয়ে বই কিনে জ্ঞান অর্জণ করবে, এটা তখন মানুষের মেনে নেওয়াই কষ্ট ছিল। তখন জ্ঞান অর্জন করার উপায় ছিল ওস্তাদের সাহচর্যে থাকা। অর্থাৎ ইসলাম শেখার গোটা প্রক্রিয়াটাই পরবর্তী সময়ে নতুনভাবে তৈরি হয়েছে।


যারা কট্টরপন্থী তারা অবশ্য এই পরিবর্তনগুলোকে বিদাআত বলতে নারাজ। তারা এটাকে উসুলুল ফিকাহ’র একটি স্তর হিসেবেই বিবেচনা করে; যাকে তারা মাসলাহা মুরসালাহ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। মাসলাহা মুরসালাহ হলো এমন কিছু কাজ, যার মাধ্যমে সাধারণভাবে অনেক মানুষের উপকার হয়। আমি এ বিষয়ে খুব একটা বিস্তারিত না বলে শুধু এটুকুই বলব যে বিদাআতে ইজাফিয়া আর মাসলাহা মুরসালাহ খুবই কাছাকাছি বিষয় এবং অনেক সময় একটা অপরটাকে ছাপিয়েও যায়। এ দুটোকে স্পষ্টভাবে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করা কঠিন। ধরা যাক, কুরআন সংগ্রহের বিষয়টা। কট্টরপন্থী গ্রুপটি বলবে, এটা মাসলাহা মুরসালাহ। আর উদারপন্থী গ্রুপটি বলবে, এটাও বিদাআতে ইজাফিয়া। 


আপনি উম্মাহর দিকে তাকালে এরকম অনেক চর্চাই দেখবেন, যেগুলো ইসলামের প্রথম যুগে ছিল না। যেমন, রামাদানের তারাবিহর নামাজে কুরআন খতম করা। এমনকি হযরত উমর (রা.) নিজেও এই পদ্ধতি চালু করেননি। অথচ এটা সারা পৃথিবীতেই চলছে। তারাবিহর নামাজের গোটা বিষয়টাই ধর্মীয়ভাবে আইনসিদ্ধ নয়। অথচ বায়তুল্লাহ, মদিনা শরিফসহ সব জায়গাতেই এই নিয়ম চলছে। রামাদানের প্রথম দিন সূরা ফাতিহা শুরু করবে এবং শেষ দিনে সূরা নাস দিয়ে এক খতম পাঠ করবে; আর মানুষ সওয়াবের আশায় দলে দলে সেই নামাজে শরীকও হচ্ছে। এগুলো সবই বিদাআতে ইজাফিয়া; যদিও আমি এই আমলগুলোতে কোনো সমস্যা দেখি না। 

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই চর্চাগুলো শুরু হলো কোথা থেকে? রাসূল (সা.) কি কখনো এভাবে তারাবিহর নামাজে কুরআন খতম করে লম্বা দুআ করেছেন? অথচ মানুষ এই নামাজ পড়তে যাচ্ছে। মক্কায় রোজার মাসে প্রায় ৪০ লাখ অতিরিক্ত মানুষ সমবেত হয় শুধু এই খতমে তারাবিহতে শরিক হওয়ার জন্য। এটা এখন ধর্মীয় আচারাদিতে পরিণত হয়েছে। অথচ রাসূল (সা.) তার সাহাবিগণ, এমনকি তাবেয়িগণও এভাবে তারাবিহর নামাজে কুরআন খতম করেননি।


আমরা কুরআনখানি নামক পৃথক একটি অনুষ্ঠান চালু করেছি। যেকোনো মৃত ব্যক্তির কথা আপনার মনে পড়ল, আপনি তার স্বরণে একবার সূরা ইয়াসিন পড়ে নিলেন। কেউ এতে আপত্তি করবে না। এমনকি ইবনে তাইমিয়া বা ইবনে বাজের মতো কট্টরপন্থী আলিমরাও আপত্তি তোলেননি। কিন্তু আমরা যেভাবে মৃত মানুষের জন্য আয়োজন করে কুরআন পড়ি, কেউ কি তার স্বপক্ষে একটা হাদিসও উপস্থাপন করতে পারবেন? কিন্তু মানুষ কোনো তথ্যসূত্রের তোয়াক্কা না করেই এই চর্চা অব্যাহত রেখেছে। তারা মনে করে কুরআন পাঠে তো দোষের কিছু নেই; সেটা আপনি যেই উদ্দেশ্যেই করেন না কেন।


কিংবা ধরুন, তাসবিহ ব্যবহারের বিষয়টা। এখনতো ফোনে ফোনেও তাসবিহ ব্যবহার করা যায়। এই যে আমরা ৩৩টা পাথরের টুকরো দিয়ে তাসবিহ বানিয়ে ১০০ বার করে তাসবিহ, তাহরিম, তাহমিদ পড়ি, এর কোনো প্রচলন কি আগে ছিল? রাসূল (সা.) বা তার সাহাবিরা কেউ কি আগে তাসবিহ ব্যবহার করেছেন? না, করেননি। তারপরও এখন আমরা সবাই এটা ব্যবহার করি। সারা পৃথিবীর মুসলমানরা এটা মেনে নিয়েছেন। এমনকি ইবনে তাইমিয়াও এটাকে মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, হাতে গুনতে পারলে ভালো, তাসবিহ ব্যবহার করলেও কোনো অসুবিধা নেই। আবার মনে করুন, মিলাদ প্রসংগ। এভাবে বিশেষ দিনে কিছু লোক একত্রিত হয়ে মিলাদ পড়ার বিধান কোনো কালেই ছিল না। তারপরও ইবনে হাজার (র.) বলেছেন, যদি কিছু মানুষ বিশেষ একটি দিনে একত্রিত হয়ে দান-সাদাকা করে, রাসূলের সিরাত নিয়ে আলোচনা করে, জিকির করে, দুরুদ পাঠ করে, তাহলে অসুবিধা কি? এটা বিদাআত হলেও বিদআতে হাসানা, অর্থাৎ কল্যানকর বিদাআত। তিনি বলতেন, একটা দিনে যদি কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে রাসূলের (সা.) প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য দুরুদ পড়ে, কিছু আয়োজন করে, তাহলেও তাতে দোষের কিছু নেই।


আবার মনে করুন, একজন মানুষ সোমবার জন্ম গ্রহন করেছেন। তিনি ঠিক করলেন যে, সোমবারে তিনি রোজা রাখবেন। এখন যারা একটু কট্টরপন্থী, তারা হয়তো ভাবলেন, সোমবারে তো রাসূল (সা.) নিজেও রোজা রাখতেন। তাহলে অসুবিধা কী? তখন উদারপন্থীরা বলবে, সে তো তার জন্মদিনকে স্মরণ করে সোমবার রোজা রাখতে চাইছে। এখন সোমবারে যেহেতু রোজা রাখার একটা সুন্নাহ আছে, যদি তার সাথে তার জন্মদিনটাকেও স্মরণ করা হয়, তাহলে অসুবিধা কী?


রোজা দুই তিন সপ্তাহ আগে থেকেই আমরা আপনাদের সামনে রোজা বিষয়ে কিছু খুতবা দেই। মহররম মাস আসলে হিজরির গুরুত্ব বর্ণনা করে আমরা খুতবা দেই। রোজার মাসের মাঝামাঝি গিয়ে আমরা বদর দিবস নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু এগুলো কোথা থেকে শুরু করার প্রেরণা পেলাম? এগুলো আমরা এখন মেনে নিয়েছি এবং এগুলোই আমাদের কাছে অধিকতর বাস্তব মনে হয়। একপক্ষ হয়তো আমার এই খুতবাকে সমসাময়িক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন বলবে, অন্যপক্ষ হয়তো বলবে আমি রাসূলের (সা.) উপর আলোচনা করছি। দুটোই কিন্তু ঠিক। এই বিষয়গুলো নিয়ে তাই চরমপন্থী মনোভাব রাখা উচিত নয়। 


আমি এও লক্ষ্য করেছি আমি যদি ফেসবুকে সব রকমের বিতর্ক এড়িয়ে কোনো সাধারণ পোষ্ট দেই, তবুও কমেন্টে নানা ধরনের উগ্র প্রতিক্রিয়ার ঝড় বয়ে যায়। এই ধরনের উগ্র মানসিকতা অনেক সময় আমাদেরকে বিরক্ত করে এবং সমস্যাকেও আরও ঘনীভূত করে। ইদানিং তাই একেবারে সাধারন মন্তব্যও করাও ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষজন সেই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেও ঝগড়া শুরু করে দেয়। মিলাদ নিয়ে একপক্ষ খুব উৎসাহী, আবার রক্ষনশীলদের অনেকেই মিলাদের বিরুদ্ধে খুব সক্রিয়। কিন্তু রক্ষনশীলদের অন্যতম শীর্ষ নেতা ইবনে তাইমিয়া এই মিলাদকে বিদাআত মনে করলেও তিনি কিন্তু বরাবরই তার উপস্থাপনায় ও বক্তব্যে অত্যন্ত উদার ছিলেন। তিনি কখনোই মিলাদকারীদেরকে কর্কশ ভাষায় সমালোচনা করেননি। তিনি এ প্রসংগে বলেছেন যদিও মিলাদ একটি বিদাআত তথাপি সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ এই কাজটির জন্য সওয়াব পেয়ে যাবে; কারণ, তারা ভালো নিয়ত থেকেই কাজটি করছে। 


ইবনে তাইমিয়ার ভাবনাটা এমন—“আমি এই কাজটি সমর্থন করতে পারছি না, আমি মনে করি এটা সঠিক নয়। কিন্তু যারা এটা করছেন, তারা হয়তো তাদের ভালো নিয়তের জন্য সওয়াব পেয়ে যাবেন”। কী অসাধারন মন্তব্য! কোনো যুদ্ধ নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই নয়, কাউকে অপমান বা হেয় করাও নয়। এটাই ছিল ইসলামের মহান মনীষিদের আচরণ ও মানসিকতা। 


আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ইস্যুটা নিয়ে নির্মোহ থাকতে চাই। আমি জানি, বিদাআতের এই বাক্সকে অনুমোদন করে দিলে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু ঢুকতেই থাকবে, পরিবর্তন হতেই থাকবে। তাই আমি সেই ব্যাপারে নিয়ন্ত্রন রাখতে চাই। আবার একই সংগে আমি মানুষের চাহিদার আলোকে রামাদানের দুই-তিন সপ্তাহ আগে থেকেই রামাদানের উপর খুতবাও দিতে চাই। কারণ, এটাই আমার কাছে বাস্তব মনে হয়। মানুষ যখন যেই বিষয়ে শুনতে চাইবে, সেই বিষয়েই আমি কথা বলব। এখন কেউ যদি আমার মতো একই যুক্তিতে মিলাদকে অনুমোদন করতে চান, করতে পারেন। যেমনটা আগেও বলেছি, কোনো বিষয়কে তখনই খারাপ বলা যাবে, যখন তা শরিয়তের গণ্ডির বাইরে গিয়ে তা করা হবে।


এতক্ষন যা আলোচনা করলাম, এর বাইরেও একটি চরমপন্থী গ্রুপ আছে যারা বিদাআত নিয়ে ভীষন রকম কট্টরপন্থী অবস্থান ধারণ করে। তারা একেবারে শক্ত মানসিকত ধারণ করে আছে; ফলে তারা এখন এসে যেগুলোকে বিদআত বলছে, সেগুলো শুনলে আমাদের অনেকের কাছেই রীতিমতো বিস্ময়কর মনে হয়। 


উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তারা কুরআনের কোনো তাফসিরে যাওয়াকে বিদাআত মনে করে। ক্বারি সম্মেলনে, যেখানে অনেক ক্বারি কুরআন থেকে তিলাওয়াত করে আর আমরাও তিলাওয়াতের মাঝখানে নানা দুআ ও দুরুদ পড়ি, এটাকেও তারা বিদাআত মনে করেন। রাসূল (সা.) বা সাহাবিরা এটা করেননি—কথাটি সত্যও বটে। তারা আরও বলে, আমরা যেভাবে দড়ি দিয়ে বা মার্কার দিয়ে নামাজের লাইনগুলোকে সোজা রাখি, এটাও বিদাআত। সুন্নাহ হলো ইমাম সাহেব নিজেই নামাজের আগে চোখ দিয়ে লাইনগুলো সোজা আছে কিনা দেখবেন। রাসূল (সা.) নিজেও লাইনের মাঝখান দিয়ে হেঁটে হেঁটে দেখতেন যে নামাজের সবার দাঁড়ানো সোজা ও সঠিক আছে কিনা। তাই আমরা এখন লাইন সোজা রাখার জন্য যে প্রক্রিয়াগুলো করছি, এগুলো তাদের চোখে বিদাআত। তারা আরও বলেন, মসজিদের ভেতর থেকে আজান দেওয়া বিদাআত। আজান দিতে হবে মসজিদের বাইরে গিয়ে; যেমনটা রাসূলের (সা.) সময়ে করা হতো। আমি উত্তর আমেরিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক মসজিদের কথা জানি, যারা শাইখ আল বানির চিন্তাধারাকে লালন করে, তারা মাইক্রোফোনকে টেনে মসজিদের বাইরে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে আজান দেয়। এই গ্রুপটি ৫০ বছর আগে অবশ্য মাইক্রোফোনের ব্যবহারকেও বিদাআত মনে করত, যদিও এখন সেখান থেকে তারা সরে এসেছে। 


আমি নিজে এ ব্যাপারে গবেষণা করেছি, যেখানে দেখেছি ১৯৪০ সালের দিকে নাজদ এলাকার আলিমরা এবং ৫০ ও ৬০ সালের দিকে ভারত ও পাকিস্তানের একদল আলিমরা এই মাইক্রোফোন ব্যবহারকে বিদাআত মনে করত। তাদের যুক্তি ছিল আপনাকে কান দিয়ে মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে হবে, যন্ত্রের মাধ্যমে আসলে হবে না। তাদের মত ছিল যন্ত্র দিয়ে আজান দিয়ে নামাজ পড়লে গোটা নামাজটাই বাতিল হয়ে যাবে; কারণ, এটা সুস্পষ্ট বিদাআত। এই ধরনের চিন্তাধারার মানুষের অবস্থানকে আমি বুঝতে পারি, সম্মানও করি। আমি শাইখ আল-বানির প্রতিও খুবই শ্রদ্ধা রাখি। তিনি একজন বড়ো আলিম ছিলেন। তাই তার মত বা দৃষ্টিভংগির সাথে আমি দ্বিমত করতে যাব না। তার আরেকটি আলোচিত ফতোয়া ছিল, ইমামের মিম্বার ৩ সিঁড়ি বিশিষ্ট হতে হবে। এর এক সিঁড়ি বেশি বা কম হলেও হবে না। এখন ওনার এই চিন্তাধারাকে আমরা কীভাবে নেবো? বর্তমান সময়ে যেভাবে মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতে এই বিষয়টা কতটুকু বাস্তব? 


এই আলোচনার সারাংশ হলো, একদল মনে করছেন—ইসলাম যে বিষয়গুলোকে অনুমোদন করেছে, তা একটু নিজের মতো করে অনুশীলন করাতে দোষের কিছু নেই, যদি ব্যক্তি তাতে কোনো কল্যান খুঁজে পান। যেটাকে তারা বিদাআতে ইজাফিয়া হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আরেক দল এই ব্যাপারে একটু রক্ষনশীল থাকতে চাইছেন, আর তাতে দোষেরও তেমন কিছু নেই। আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, সতর্কতার জন্য আমরা মূল জিনিসটার যত কাছে থাকতে পারি, ততই ভালো। বিদাআতে ইজাফিয়ার এই ইস্যুগুলো বড়ো কোনো বিদাআত নয়, আকিদার সাথেও সম্পর্কিত নয়, এমনকি কেউ কেউ এটাও বলছেন যে, এগুলো আদৌ বিদাআত কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ আছে। তাই এই বিদাআতে ইজাফিয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সহানুভূতিশীল ও উদারমনস্ক হওয়া উচিত। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিয়ামতের দিন মানুষকে তার নিয়তের আলোকেই শাস্তি বা পুরস্কার দেবেন। আর যেহেতু উভয় ধারার ভেতরেই ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা তৈরি হওয়ার পেছনে বড়ো বড়ো আলিমদের মতামত রয়েছে, তাই আমাদের এই বিষয়ে উভয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।

আমি ব্যক্তিগতভাবে যেই মতই পেশ করি না কেন, সেটা মুখ্য বিষয় নয়। যদি দেখি এই বিদাআতে ইজাফিয়া কোনো মানুষের মধ্যে আল্লাহ ও তার রাসূলের ব্যাপারে মহব্বত বাড়িয়ে দিচ্ছে, কিংবা একজন মানুষ সাধারনভাবে মসজিদে যায় না, কিন্তু এরকম কোনো বিদাআতে ইজাফিয়া অনুশীলন করার অজুহাতে মসজিদমুখী হয়েছে, তাহলে আমি কেন ছোটো খাট এই সব ইস্যু তুলে তাদেরকে বাঁধা দিতে যাব? যতক্ষন একজন মানুষ পরিস্কারভাবে হারাম কাজ না করছে, ততক্ষণ আমি ফেতনা, ফ্যাসাদের দিকে যেতে চাইব না। হারাম কিছু করলেই শুধু আমি না করব, বাঁধা দেবো।


এই আলোচনা শেষ করব, সূরা হাদিদের ২৭ নং আয়াত দিয়ে।

“অতঃপর আমি তাদের পশ্চাতে প্রেরণ করেছি আমার রসূলগণকে এবং তাদের অনুগামী করেছি মরিয়ম তনয় ঈসাকে এবং তাঁকে দিয়েছি ইঞ্জিল। আমি তার অনুসারীদের অন্তরে স্থাপন করেছি নম্রতা ও দয়া। আর বৈরাগ্য, সে তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে; আমি এটা তাদের উপর ফরজ করিনি; কিন্তু তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে এটা অবলম্বন করেছে। অতঃপর তারা যথাযথভাবে তা পালন করেনি। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাসী ছিল, আমি তাদেরকে তাদের প্রাপ্য পুরস্কার দিয়েছি। আর তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।” 

এখানে আল্লাহ তায়ালা হযরত ঈসার (আ.) অনুসারীদেরকে নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছেন, আর বৈরাগ্য, সে তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে; আমি এটা তাদের উপর ফরজ করিনি; কিন্তু তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে এটা অবলম্বন করেছে।

এখানে প্রথমে আল্লাহ তাদেরকে সমালোচনা করেছেন; কারণ, তারা বৈরাগ্য জিনিসটা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে, যাকে আমরা বিদাআত বলছি। আল্লাহ নিজেই বলছেন, এটা আমি তাদেরকে করতে বলিনি; কিন্তু তারা নিজেরাই এটা করেছে, তবে নিজেদের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য। এখানে এসে আল্লাহ আবার তাদের প্রশংসা করছেন। আর সবশেষে বলেছেন তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাসী ছিল, আমি তাদের প্রাপ্য পুরস্কার দিয়েছি। অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা ঈমানদার ছিলেন, তারা ঠিকই পুরস্কার পাবেন; যদিও তাদের অধিকাংশই ছিল ফাসিক।


এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, মানুষ তার ভালোবাসার গভীরতা থেকে অনেক সময় অনেক কাজ করে, যা আদতে করা উচিত নয়। আমরা যদি সৎ সাহসী হই, তাহলে আমাদেরও উচিত এই ধরনের কাজে তাদেরকে উৎসাহ না দেওয়া। কিন্তু তারা যদি সেই কাজগুলো অব্যহত রাখে, আর এই ধারণা পোষন করে—এর মাধ্যমে আল্লাহ খুশী হবেন, তাহলে আল্লাহ তাদের নিয়তের আলোকে যা ভালো মনে করবেন, তাই সিদ্ধান্ত নিবেন। ইবনে তাইমিয়া যেমনটি বলে গেছেন, আল্লাহ তাদের সুন্দর নিয়তের জন্য পুরস্কারও দিতে পারেন। তাই একাডেমিকভাবে যখন কথা বলবেন, তখন নিজেদের পর্যালোচনা তুলে ধরবেন। আর যখন সাধারনভাবে কথা বলবেন, তখন সবাই সবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন।


যে বিদাআত ইসলামের বিধি-বিধানের বা নির্ধারিত গণ্ডির সম্পূর্ণ বাইরে, যা ইসলামে নতুন কিছু আনছে, যা ইসলামের মূল ভিত্তি বা আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক, তাকে অবশ্যই আমরা মানব না। আর যে বিদাআত মৌলিক ইস্যুতে নয়, ছোটোখাট ধর্মীয় আচারাদি পালনের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা উদার মানসিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করব। বারাকাল্লাহ।


[ এই আর্টিকেল আপনার কাছে উপকারী বিবেচিত হলে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন।]

২৫৮১ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

ড. ইয়াসির ক্বাদির জন্ম আমেরিকার টেক্সাসে ১৯৭৫ সালে। হুস্টন ইউনিভার্সিটিতে প্রথমে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ওপর বিএসসি করেছেন। মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ১৯৯৬ সালে। প্রথমে হাদিস ও ইসলামি শাস্ত্র অনুষদ থেকে আরবি ভাষার ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন সেখানে। পরে দাওয়াহ অনুষদ থেকে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। আমেরিকায় ফিরে ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে ধর্মতত্ত্বে পিএইচডি করেন। ২০০১ সাল থেকে তিনি আল-মাগরিব ইন্সটিটিউট-এর অ্যাকাডেমিক বিভাগের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া অধ্যাপনা করেছেন টেনিসির রোডস কলেজের ধর্মশিক্ষা বিভাগে। ২০১১ সালে দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন-এর এক নিবন্ধে অ্যান্ডি এলিয়ট...

অনুবাদক পরিচিতি

আলী আহমাদ মাবরুর। পেশায় সাংবাদিক। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। সম্প্রীতি তাঁর বেশ কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ পাঠকপ্রিয় হয়েছে। স্বপ্ন দেখেন এক আলোকিত সমাজের।

মন্তব্য

১৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে
হুসাইন তারেক

হুসাইন তারেক

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৪:০০ অপরাহ্ন

মাশাআল্লাহ। বিদআত নিয়ে এত পরিষ্কার ধারণা আর কোথাও পাইনি। আল্লাহ পাক আমাদের বিদআত থেকে দূরে থাকার তৌফিক দিন, বাড়াবাড়ি দূর করে দিন। ধন্যবাদ চিন্তাধারাকে, একটা দারুণ আর্টিকেল আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
হুমায়ুন

হুমায়ুন

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৪:৩৯ অপরাহ্ন

অসাধারণ একটা লেখা,যাযাকাল্লাহ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
মাহমুদ

মাহমুদ

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৪:৩৫ অপরাহ্ন

বিদায়াত নিয়ে জাস্ট অসাধারণ কিছু… লেখক এবং অনুবাদকের জন্য দুআ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ওমর মুকতার

ওমর মুকতার

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৫:৪৩ অপরাহ্ন

এক কথায় অসাধারন আলোচনা।ইয়াসির কাদির আর্টিকেল পড়ো বুঝা গেল উনি যথেষ্ট জ্ঞানী আর ভারসাম্যপুর্ণ লেখক।বিদায়াতে ইজআফিয়া নিয়ে উনার আলোচনাটা আমার কাছে সবচেঢে বেটার মনে হঢেছে।উনাবে যথেষ্ট সহনশীলও মনে হল।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
হাফিজ  আহমদ

হাফিজ আহমদ

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৭:৫৮ অপরাহ্ন

বিদাআত এতোদিন যা কিছু পড়েছি এটাই বেস্ট। অনেক ভুল ভেঙ্গেছে। কট্টর থেকে আরো উদার হওয়ার উৎসাহ পেয়েছি। আরবী পরিভাষাগুলো লেখার ক্ষেত্রে বাংলায় প্রচলিত বানানটা অনুসরণ করলেই ভালো বলে মনে করি। যদি সম্ভব হয় কুরআন কিংবা হাদীসের উদ্বৃতিসমূহের আরবি দিলে আরো সুন্দর দেখাবে।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
জাযাকাল্লাহ খায়ের

জাযাকাল্লাহ খায়ের

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২১:৪৫ অপরাহ্ন

মুহা মেসবাহ্

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আশরাফুল

আশরাফুল

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০৬:৩২ পূর্বাহ্ন

আলহামদুলিল্লাহ।বিদয়াত সম্পর্কে নতুন ভাবে জানলাম

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
গাজী নুরুল আহাদ

গাজী নুরুল আহাদ

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১০:১৬ পূর্বাহ্ন

আলহামদুলিল্লাহ, এতো দিন পর বিদআত সম্পর্ক একটা স্বচ্ছ ধারণা পেলাম। আল্লাহ্ লিখক, অনুবাদক ও চিন্তাধারা সাইটের পরিচালককে নেক হায়াত দান করুক। আমীন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আলম

আলম

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০০:২৭ পূর্বাহ্ন

অসাধারন আল্লাহ আপনাদেরকে উত্তম প্রতিদান দিন আমিন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
Husain Mohammad Ashiqur Rahman

Husain Mohammad Ashiqur Rahman

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১০:৫১ পূর্বাহ্ন

Thank you for the article. It's simple and easy to understand.

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
মুহাম্মাদ হাসান।

মুহাম্মাদ হাসান।

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১৩:১৬ অপরাহ্ন

বিদাত নিয়ে সংক্ষেপে অসাধারণ আর্টিকেল। বারাকাল্লাহু ফীকুমা (মূল লেখক ও অনুবাদককে)।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ফারুক আল আব্দুল্লাহ

ফারুক আল আব্দুল্লাহ

০১ অক্টোবর, ২০১৯ - ০০:০০ পূর্বাহ্ন

অনেক সুন্দর আর স্বচ্ছ ধারণা পেলাম শুকরিয়া❤

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
হাসান ইমাম

হাসান ইমাম

০৩ অক্টোবর, ২০১৯ - ০৮:২১ পূর্বাহ্ন

এই ধরনের সহনশীল ইসলামি স্কলারের লেখা বেশি বশি করে প্রচার হওয়া উচিত। মাদখালি বাংলা গুরুফ মতি. মাদানি গংরা যেভাবে বেদায়াতি বেদাতি বলে সমাজটাকে ভেংগে চুরমার করে দিচ্ছে তাতে এই ইতিব্যাক লেখাগুলো মলমের মত কাজ দিবে।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
জহিরুল ইসলাম

জহিরুল ইসলাম

১১ অক্টোবর, ২০১৯ - ১৫:৪০ অপরাহ্ন

অসাধারণ বক্তব্য।আল্লাহ ওনার উপর রহম করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...