ঋণ পরিশোধের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম ঋণ পরিশোধ করার বিষয়ে সব সময়ই অনেক বেশি গুরুত্ব ও তাগিদ প্রদান করেছে। আল্লাহর কাছে সদাচরণের যে তালিকা রয়েছে, তার মধ্যে এটা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি। যেসব লোভ, অসদাচার এবং অতি আকাঙ্ক্ষা একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে তার ঋণ পরিশোধ করার মানসিকতা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, সেগুলোকে ইসলাম সর্বাত্মকভাবে হারাম ঘোষণা করেছে। 


এ ধরনের অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলোঋণ কেবল তখনই নেওয়া যাবে, যখন আসলে তা না নিয়ে আর কোনো উপায় নেই। ঋণ না নিলে বড়ো বিপদের আশঙ্কা আছে এমনটা না হলে ঋণ নেওয়াকে পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়। একটি হাদিসে এসেছে, সব ধরনের পাপের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করা হলো এমন একটি পাপ, যার জন্য কর্মফল ভোগ করতেই হবে।

‘যদি একজন ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা যায়, তাহলে শেষ বিচারের দিনে এর কর্মফল তাকে পেতেই হবে। তবে মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হতে পারে। প্রথমত, যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে করতে নিঃস্ব হয়ে যায় আর সে কারণে আবারও জিহাদ করার জন্য যদি সে ঋণ নেয়। দ্বিতীয়ত, যদি কোনো মুসলমানের পরিচিত কেউ মারা যায় এবং সেই মৃত ব্যক্তির জানাজা ও অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য যদি ঋণ নেওয়া হয় এবং তৃতীয়ত, যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে এই আশঙ্কা থাকে যে, তার বোধ হয় কখনোই বিয়ে হবে না এবং নিজের ইজ্জত ও ধর্মীয় হককে রক্ষা করার জন্য যদি সে বিয়ে করার অভিপ্রায়ে ঋণ গ্রহণ করে। আল্লাহ এই তিন ধরনের ঋণগ্রস্তকেই কিয়ামতের দিনে মাফ করতে পারেন।’ ইবনে মাজাহ : ২৪৩৫

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল ﷺ বলেন,

‘শেষ বিচারের দিন আল্লাহ ঋণগ্রস্তদের তাঁর সামনে উপস্থিত হতে বলবেন। অতঃপর তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে, “হে আদম সন্তান, কোন উদ্দেশ্যে তোমরা ঋণ নিয়েছিলে? কেন তোমরা অন্যের হক নষ্ট করেছ?” ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি উত্তরে বলবে, “হে আমার প্রভু, আপনি জানেন আমরা ধার করেছিলাম; কিন্তু আমরা তা খাইনি, পান করিনি কিংবা অপচয়ও করিনি। কিন্তু আগুন লেগে যাওয়ায় বা চুরি হওয়ায় বা অন্য কোনো কারণে আমরা সেই ঋণ আর পরিশোধ করতে পারিনি।” আল্লাহ তায়ালা তখন উত্তরে বলবেন, “হে আমার বান্দা, তুমি ঠিক কথাই বলেছ। তবে এটা পরিশোধ করার দায় এখন আমার।” তখন আল্লাহ সেই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ভালো কাজগুলো এনে একটি পাল্লায় মাপতে বলবেন। যদি তার নেক কাজের পরিমাণ খারাপ কাজের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে সে আল্লাহর বিশেষ করুণায় জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ আহমাদ : ১৭০৮

এখানে দেখা যাচ্ছে, যারা পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে ঋণ গ্রহণ করে আল্লাহ তাদের অপারগতা বিবেচনা করবেন। কিন্তু যারা লোভে পড়ে বা আত্মতুষ্টির জন্য ঋণ নেয় বা পর্যাপ্ত থাকার পরও আরও বিলাসিতার উদ্দেশ্যে ঋণ নেয় এবং পরবর্তী সময়ে সেই ঋণ পরিশোধ নিয়ে আর তৎপর থাকে না, হাদিসে তাদের চোর বলে সম্বোধন করা হয়েছে। রাসূল ﷺ বলেছেন,  

‘যে ব্যক্তি অন্যের সম্পত্তি থেকে ঋণ গ্রহণ করে এবং সেই ঋণ পরিশোধ করার ইচ্ছা রাখে, তাহলে সে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলেও আল্লাহ নিজে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেবেন। কিন্তু যে ঋণ পরিশোধ করার ইচ্ছা ব্যতিরেকে ঋণ নেয়, তাকে আল্লাহ ধ্বংস করে দেবেন।’ বুখারি

ইসলাম ঋণ গ্রহণ করার সময় কয়েক স্তরের গ্যারান্টি বা জামিন নির্ধারণ করার কথা বলেছে। সেক্ষেত্রে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তিও জামিন হতে পারে। যেন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে তাগিদ অনুভব করেন এবং কেউ যেন তার বকেয়া দেনা পরিশোধ না করে ছাড় না পায়।

‘আবু কাতাওয়া রা. থেকে বর্ণিত। একবার এক ব্যক্তি রাসূল ﷺ-কে প্রশ্ন করেন, “হে আল্লাহর রাসূল, যদি আমি আল্লাহর পথে জিহাদ করতে গিয়ে শহিদ হই, তাহলে আমার সব পাপ কি ক্ষমা করে দেওয়া হবে?” রাসূল ﷺ উত্তর দেন, “হ্যাঁ, যদি তুমি জিহাদ করতে গিয়ে মারা যাও, যদি তুমি ধৈর্যশীল হও, যদি তুমি আল্লাহর নিয়ামতের শুকরগুজারি হও, যদি তুমি সামনের সারিতে থেকে দ্বীনের শত্রুকে মোকাবিলা করতে পারো এবং পিছু না হটো।” লোকটা আবার তার প্রশ্ন করল। এবার রাসূল ﷺ উত্তর দিলেন, “তোমার গুনাহ মাফ করা হবে; কিন্তু তোমার কোনো ঋণ থাকলে সেটা মাফ করা হবে না। জিবরাইল এইমাত্র আমাকে খবরটা দিয়ে গেলেন।”’ মুসলিম

যেহেতু ঋণ নেওয়ার বিষয়টা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং একজন মুসলমানের ঈমান যেকোনো সময় এই ঋণের কারণে নষ্ট হতে পারে বা তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যেতে পারে, তাই বিচক্ষণ লোকেরা সব সময় ঋণ নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করেন। 

‘আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত। একবার জিহাদের ময়দানে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সময় রাসূল ﷺ রাস্তার একটি মোড়ে থামলেন এবং সকল সৈন্যের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বললেন, “তোমরা শুনে রাখো, যদি কারও কোনো ঋণ থাকে আর তার মধ্যে এই আশঙ্কা থাকে যে সে যুদ্ধের ময়দানে শহিদ হয়ে যেতে পারে, তাহলে ঋণগ্রস্ত অবস্থায় না মরার চেয়ে উত্তম হবে যদি সে ফিরে যায়। আমার সাথে তার যাওয়ার দরকার নেই। কারণ, সেই অপরিশোধিত ঋণটি তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে পারবে না।”’ রাজিন

বর্তমান সময়ে এসে আমাদের চারপাশে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মুসলমানরা ধার নেওয়া এবং দেওয়াকে একটি চটকদার বিষয় বানিয়ে ফেলেছে। এমনকী তারা নিজেদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য বা যৌন চাহিদা পূরণের জন্যও ঋণ নেয়। এমনকী তারা খ্রিষ্টান বা ইহুদিদের কাছ থেকে সুদের ভিত্তিতে ঋণ নিতেও দ্বিধা করে না। যদিও আল্লাহ এসব কার্যক্রমকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। 

যদি জেলে যাওয়ার ভয় না থাকত, তাহলে আমরা প্রতিনিয়ত কত মানুষের অধিকার নষ্ট করতাম তার কোনো হিসেব নেই। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে তাদেরই বেশি পছন্দ করেন, যারা প্রতিশ্রুতি পূরণ করে, চুক্তি মেনে চলে। আর যারা মানে না, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর লানত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,

‘আর তাদের অধিকাংশ লোককেই আমি প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়নকারীরূপে পাইনি; বরং তাদের অধিকাংশকেই পেয়েছি হুকুম অমান্যকারী হিসেবে।’ সূরা আল আরাফ : ১০২

৬৪৮ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

মুহাম্মাদ আল গাজালি একজন বিশ্বখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ। তিনি ১৯১৭ সালে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪১ সালে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনে মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যায়, কাতার বিশ্ববিদ্যালয় এবং আলজেরিয়ার আবদ আল কাদির বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা করেন। তিনি দীর্ঘদিন ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিউট অব ইসলামিক থট (আইআইআইটি)-এর কায়রো শাখার একাডেমিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সালে ৭৮ বছর বয়সে কায়রোতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি মোট ৯৪টি বই লিখেছেন। তার রচনাবলি মুসলিম বিশ্বের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে উজ্জীবিত করেছে। তিনি ইসলামের মৌলিক শিক্ষাসমূহকে তরুণদের সামনে যুগোপযোগী করে উপস্থাপন...

অনুবাদক পরিচিতি

আলী আহমাদ মাবরুর। পেশায় সাংবাদিক। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। সম্প্রীতি তাঁর বেশ কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ পাঠকপ্রিয় হয়েছে। স্বপ্ন দেখেন এক আলোকিত সমাজের।

মন্তব্য

১ টি মন্তব্য করা হয়েছে
আব্দুল্লাহ আলমাসুদ

আব্দুল্লাহ আলমাসুদ

১৬ অক্টোবর, ২০১৯ - ১৪:০৭ অপরাহ্ন

জাযাকাল্লাহ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...