দুআ কবুলের আদব (প্রথম পর্ব)

দুআ কবুল হয় না কেন? কীভাবে দুআ করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে? আমরা উত্তর খুঁজব। ড. ইয়াসির কাদি এই উত্তর খুঁজেছেন। আদতে দুআ কবুল হওয়ার জন্য বেশ কিছু আদবকেতা মেনে চলতে হয়। আমরা এখন সেসব আদবকেতা জানার চেষ্টা করব। চলুন শুরু করি।


০১. আল্লাহর তারিফ এবং নবির প্রতি দরুদ

দুআ করে আমরা আল্লাহর কাছে কিছু না কিছু চাই। কখনো ক্ষমা, কখনো-বা তাঁর দয়া। কখনো চাই জীবিকা। কাজেই তাঁর মর্যাদাসুলভ তারিফ করে,তাঁর মাহাত্ম্য-গুণগান বর্ণনা করে দুআ শুরু করাটা কর্তব্য।

নবিজি ﷺ একদিন মসজিদে বসে আছেন। দেখলেন, এক লোক মসজিদে প্রবেশ করে দু রাকাত সালাত পড়ল। সালাত আদায় করা হতেই সে ব, “আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন। আমার প্রতি দয়া করুন।” লোকটিকে নবিজি ﷺ বললেন, ইবাদাতগুজার, তুমি বড়ো তাড়াহুড়োপ্রবণ। সালাত শেষ হলে বসো। আল্লাহর জন্য উপযোগী তারিফ করো। আমার প্রতি দরুদ পেশ করো। তারপর তোমার দুআ করো।” এরপর অন্য এক লোক এলেন সালাত পড়তে। আল্লাহর যথাযোগ্য তারিফ, নবির প্রতি দরুদ পেশ করলেন। নবিজি ﷺ তাকে বললেন, “ইবাদাতগুজার, দুআ করো। তোমার দুআ কবুল হবে।”’

 প্রথম ব্যক্তির দুআ করাকে তিনি তাড়াহুড়োর নিদর্শন হিসেবে দেখেছেন। কারণসে উপযুক্ত উপায়-অবলম্বন গ্রহণ না করেই দুআ করে বসেছে।

আবদুল্লাহ বিন মাসউদ ؓ বলেছে, নবিজি ﷺ বলেছে-

আল্লাহর চেয়ে বেশি আত্মমর্যাদাবোধ আর কারও নেই। এজন্য তিনি প্রকাশ্যে-গোপনে সব ধরনের অশ্লীলতাকে নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহর চেয়ে বেশি আর কেউ প্রশংসা পছন্দ করেন না। এজন্য তিনি নিজে নিজের প্রশংসা করেছেন।’

আল্লাহর জন্য সব তারিফ। তিনি চ, তাঁর প্রশংসা করে আমরাও যেন উপকার পাই। যেহেতু আল্লাহ কারও ওপর নির্ভরশীল নন, কাজেই আমরা কখনো তাঁর একচুল ক্ষতিও করতে পারব না। আবার কানাকড়ি উপকারও করতে পারব না। কিছু লোক বল, ‘যেখানে আল্লাহ নিজে তাঁর প্রশংসা পছন্দ করেন, সেখানে আমাদের তা পছন্দ করায় দোষ কী’ একটু আগে আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা নিয়ে যা বললামতা থেকে এমন দাবির অযৌক্তিকতা স্পষ্ট।

কুরআনের অনেক জায়গায় মহান আল্লাহ তাঁর স্তুতি করেছেন। সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াতেই-

সকল সৃষ্টিজগতের প্রভু আল্লাহর জন্য যাবতীয় তারিফ।’ [কুরআন,১ : ১]
তিনি বারবার ক্ষমাকারী। মমতাময়। আরশের অধিপতি। মহামহিম। তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করেন।’ [কুরআ, ৮৫ : ১৪-১৬]


০২. আল্লাহর মহান মহান নাম ধরে আর্জি

আল্লাহর মাহাত্ম্যসূচক নাম ব্যবহার করা তাঁর তারিফ করার অন্যতম উপায়।

একবার নবিজি ﷺ শুনলেন এক লোক বলছে, “আল্লাহ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনিই আল্লাহ, আপনি ছাড়া আর কোনো উপাসনাযোগ্য উপাস্য নে, আপনি অদ্বিতীয়। সব সৃষ্টি সাহায্যের জন্য আপনার দিকে ফেরে,আপনার কোনো সন্তান নেই, আপনি কারও সন্তানও নন, আপনার কোনো সমকক্ষ নেই, এসব কিছুর উসিলায় আপনার কাছে চাচ্ছি!”

তার এমন কথা শুনে নবিজি ﷺ বললে,

আল্লাহর সেরা সেরা নাম ধরে সে তাঁকে ডেকেছে। এগুলোর বরাতে তাঁকে ডাকলে তিনি দান করেন। আর্জি পেশ করলে কবুল করেন।’”

হাদিসের ব্যাখ্যায় বলা হয়-

এ হাদিসে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহর একটি মহত্তম নাম (ইসমে আজম) আছে। এ হাদিসে বলা হচ্ছে, সে নাম ধরে তাঁকে ডাকলে তিনি সাড়া দেন। অন্যান্য হাদিসেও আল-ইসমুল-আজমের উল্লেখ আছে। ওসব বর্ণনায় এ হাদিসে উল্লেখকৃত নামগুলো নেই। তবে সব হাদিসেই আল্লাহ নামটি আছে। এ থেকে বলা যায় এই (আল্লাহ) নামটি ইসমে আজম।’

এ হাদিস থেকে আরেকটি জিনিস বোঝা যায়। নিজের ঈমানের উসিলায় দুআ করা যায়। দুআকারী লোকটি এখানে যেগুলোর উল্লেখ করে দুআ করেছেন তার মধ্যে আছে আল্লাতিনি ছাড়া উপাসনাযোগ্য কোনো উপাস্য নেই এই সাক্ষ্য। ঈমান আনাটা সুকর্মের মধ্যে পড়ে। নিজের সুকর্মের উসিলায় দুআ করা বৈধ। এর প্রমাণে গুহাবন্দি তিন লোকের দুআর কথা বলা যায়। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে ভালো ভালো কাজ করেছিলসেগুলোর উসিলায় আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন। আল্লাহ তাদের দুআয় সাড়া দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন গুহার দরজায় পড়ে থাকা পাথর।


০৩. দুহাত জড়ো করে তোলা

দুহাত জড়ো করে দুআ করার বিষয়টা কোনো মুসলিমের কাছেই অজানা নয়। বিষয়টা অসংখ্য হাদিসে এসেছে। ইবনু তাইমিয়্যা বলেছেন- 

‘দুআতে নবিজির হাত তোলার বর্ণনা এত বেশি হাদিসে আছে যে, গুনে শেষ করা যাবে না।’ 

আবু মুসা আশআরি ؓ বলেছেন-

‘নবিজি দুআ করলেন। আমি দেখলাম, তিনি হাত এত উঁচুতে তুললেন যে তার বগল দেখা যাচ্ছিল।’ 

ইবনু উমার ؓ বলেছেন-

‘নবিজি হাত উঁচু করে বললেন, “আল্লাহ, খালিদ যা করেছে আমি তা থেকে আপনার আশ্রয় চাই!”’ 

নবিজির মুক্তদাস আনাস ؓ বলেছেন-

‘তিনি এত উঁচুতে হাত তুলেছিলেন যে তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখা যাচ্ছিল।’ 

সালমান ফারসি বলেছেন, নবিজি ﷺ বলেছেন-

‘আল্লাহ লজ্জাশীল। মঙ্গলময়। (দুআতে) তাঁর বান্দা তাঁর কাছে হাত তুললে তিনি রিক্তহস্তে হতাশ করে ফিরিয়ে দিতে লজ্জা বোধ করেন!’ 
সুবহান আল্লাহ! সব সৃষ্টির যিনি প্রভু, সেই তিনি লজ্জা বোধ করেন আমাদের মতো নগণ্য সৃষ্টি হাত তুলে দুআ করলে! এ কথা জানার পর তাঁর প্রতি ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় আমাদের হৃদয় ভরে ওঠে না?

দুআর সময় হাতের তালু ওপরের দিকে মুখ করে রাখতে হবে। নবিজি ﷺ বলেছেন-

‘তুমি যদি আল্লাহর কাছে চাও, তাহলে হাতের তালু ওপরের দিকে রেখে চাইবে, হাতের পেছনের অংশ নয়।’ 

হাতের পেছনের দিক ওপরের দিকে রেখে দুআ করা অহংকারের লক্ষণ। এ থেকে বোঝা যায়, ব্যক্তির কোনো প্রয়োজন নেই।

দুআর সময় হাতের ব্যবহার নিয়ে সাহাবিদের থেকে তিন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রথমত; হাত না তুলে শাহাদাত আঙুল দিয়ে ইশারা। ক্ষমা চাওয়া, সাধারণ জিকির, খুতবার সময় দুআ অথবা আত্তাহিয়্যাতু পড়ার সময় এভাবে দুআ করা হয়।

দ্বিতীয় ধরনের বর্ণনায় আছে; কাঁধ পর্যন্ত হাত তোলা। হাতের তালু ঊর্ধ্বমুখী। সাধারণ দুআর বেলায় এভাবে দুআ করা হয়।

তৃতীয়ত; হাত তোলা হয় একেবারে জরুরি অবস্থায়। যেমন বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা অথবা আসন্ন শত্রুর হামলা থেকে রক্ষা পেতে। এসব ক্ষেত্রে আকাশপানে হাত মেলে ধরতে হয়। দুই হাতের তালু একসঙ্গে জুড়ে থাকে না। এভাবে মেলে ধরার সময় হাত এত বেশি প্রসারিত হয় যে বগল দেখা যায়। ইবনু আব্বাস বলেছেন-

‘দুআ করতে হবে হাত কাঁধ পর্যন্ত বা কাছাকাছি বরাবর তুলে। ক্ষমা চাইতে হবে (শাহাদাত) আঙুলের ইশারায়। আর্জি জানাতে হবে হাত পুরো মেলে দিয়ে।’ 

সাধারণ নিয়ম হচ্ছে দুআর সময় হাত তুলতে হবে। নবিজি ﷺ কেবল শুক্রবারের খুতবায় হাত তুলে দুআ করেননি। কাজেই খুতবায় বিশেষ কোনো দুআ না করলে, যেমন বৃষ্টির জন্য দুআ না হলে, হাত না তুলে দুআ করাই সুন্নাহ।

নিত্য দিনের দুআর সময়ও হাত তোলার প্রয়োজন নেই। যেমন মাসজিদে বা ঘরে প্রবেশ-বাহিরের দুআ।

বিশেষ কিছু দুআর বেলায় দুহাত জড়ো করে কাঁধ বরাবর তুলতে হবে। হাতের তালু কেউ চাইলে আকাশের দিকে মুখ করে রাখতে পারেন। আবার হয়; আর এখানে যা বলব, তা করতে হয় দুআ করার সময়।


০৪. কাবার দিকে মুখ ফেরানো

কাবার দিকে ফেরা খুবই বারাকামণ্ডিত এক কাজ। কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে আল্লাহ মুসলিম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। সেদিকে ফেরার মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর ইবাদাতের জন্য নির্মাণ করা প্রথম স্থাপনার দিকে মুখ ফেরায় প্রতিটি মুসলিম।

আমাদের নবিজি ﷺ দুআর সময় কাবামুখী হতেন। আবদুল্লাহ বিন জাইদ বলছেন-

‘নবিজি (মদিনা থেকে) বেরিয়ে এসে এই প্রার্থনার জায়গায় এলেন বৃষ্টির সন্ধানে। এরপর বৃষ্টি চেয়ে দুআ করলেন। তিনি কাবামুখী হলেন। তার পোশাকটা উলটিয়ে পরলেন।’  

ইমাম বুখারি যে অধ্যায়ের অধীনে এ হাদিসটি এনেছেন, তার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘কাবামুখী হয়ে দুআ’। এ থেকে বোঝা যায় এটি দুআর আদব।

কুরাইশরা যখন নবিজিকে অত্যাচার করত, তিনি তখনো কাবামুখী হয়ে ওদের বিরুদ্ধে দুআ করতেন।    

মোদ্দাকথা হলো, দুআর সময় কাবামুখী হওয়াটা উৎসাহব্যঞ্জক।


০৫. অজু

দুআ করার সময় অজু অবস্থায় থাকা সাধারণ আদবকেতার একটি অংশ। 

‘হুনাইনের লড়াইয়ের পর নবিজি পানি চাইলেন। এরপর অজু করে দুহাত উঁচুতে মেলে ধরে বললেন, “ইয়া আল্লাহ, উবাইদ বিন আমিরকে ক্ষমা করুন!” হাদিসটির বর্ণনাকারী আবু মুসা বলেছেন- আমি তাঁর বগলের শুভ্রতা দেখতে পাচ্ছিলাম।’ 


০৬. চোখের পানি ফেলা

দুআর আবেগে যখন চোখ থেকে পানি ঝরে, তখন বোঝা যায় সে দুআয় আন্তরিকতা আছে। চোখে পানি এলে আল্লাহর সামনে বিনয় ফুটে ওঠে। ফরিয়াদের গুরুত্ব প্রকাশ পায়। অশ্রুসজল আঁখি প্রমাণ দেয়, আল্লাহকে তার কত প্রয়োজন। তাঁর সাহায্য ছাড়া সে কত অসহায়।একবার নবিজি কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন। সেখানে ইবরাহিম নবির একটু দুআ ছিল-

‘হে আমার প্রভু, ওরা বহু মানুষকে বিপথে টেনে নিয়ে গেছে। যারা আমার অনুসরণ করবে তারা আমার। আর যারা মুখ ফিরিয়ে নেবে, আপনি তো সবচেয়ে ক্ষমাশীল, সবচেয়ে দয়াবান।’ [কুরআন, ১৪ : ৩৬]
‘আপনি যদি তাদের শাস্তিই দেন- তারা তো আপনারই দাসদাসী। আর যদি ক্ষমা করেন- আপনি তো মহা সম্মানী, প্রাজ্ঞ।’ [কুরআন, ৫ : ১১৮]

আয়াতগুলো পাঠ শেষে নবিজি ﷺ বললেনবো না।” 

ইয়া আল্লাহ, আমার উম্মাহ! আমার উম্মাহ!” বলতে বলতেই তার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে শুরু করল। আল্লাহ জিবরাইলকে বললেন, “(তিনি যদিও সব জানেন) জিবরাইল, মুহাম্মাদের কাছে গিয়ে শোনো তো কেন সে এভাবে কাঁদছে?” জিবরাইল নবিজির কাছে এসে কারণ জানতে চাইলেন। নবিজি ﷺ বললেন, “ইবরাহিম (আ.) ও ঈসা (আ.) তাদের অনুসারীদের চিন্তায় যেভাবে কাঁদছিলেন, তিনিও তাঁর উম্মাহর চিন্তায় চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি।” আল্লাহ বললেন, “জিবরাইল, মুহাম্মাদকে গিয়ে বলো, আপনার অনুসারীদের ব্যাপারে আমি আপনাকে সন্তুষ্ট করব। আপনার মনে কষ্ট দেবো না।” 


০৭. আল্লাহর থেকে সর্বোত্তম কিছু চাওয়া

দুআর সাড়া সঙ্গে সঙ্গে আসুক কিংবা দেরিতে- সবসময় আল্লাহর তরফ থেকে সর্বোত্তম কিছু প্রত্যাশা করতে হবে। দুআর সাড়া মিলবেই এমন সুধারণা রাখতে হবে। আল্লাহ বলছেন-

‘আমার বান্দারা আমার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে বলবে, আমি তো খুব কাছে। দুআকারীর ডাকে আমি সাড়া দিই।’ [কুরআন, ২ : ১৮৬]

নবি জাকারিয়া (আ.)-এর উদ্ধৃতি তুলে দিয়ে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলছেন-

‘আপনি অবশ্যই সব দুআ শোনেন।’ [কুরআন, ৩ : ৩৮]

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলছে-

‘তাদের প্রভু সাড়া দিয়ে বললেন, পুরুষ হোক কিংবা নারী- আমি তোমাদের কারও কাজ বিফল হতে হতে দেবো না।’ [কুরআন, ৩ : ১৯৫]
‘তোমাদের প্রভু বলেছিলেন, আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেবো!‘ আমার ইবাদাতের ব্যাপারে যারা অহংকারী, তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে যাবে।’ [কুরআন, ৪০ : ৬০]

নবি সালিহ (আ.) তার লোকজনদের বলেছিলেন-

‘তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, এরপর (অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে) তাঁর দিকে ফেরো। আমার প্রভু খুব কাছে, (ডাকলেই) সাড়া দেন।’ [কুরআন, ১১ : ৬১]

আল্লাহ বলেছেন-

‘নুহ আমাকে ডেকেছিল। আমিই সেরা সাড়াদানকারী।’ [কুরআন, ৩৭ : ৭৫]

আল্লাহ তাঁর জ্ঞান ও সহায়তার মাধ্যমে সবসময় আমাদের সঙ্গেই আছেন। দুআর সাড়া হবে কি হবে না, তা নবিজি ﷺ আল্লাহর হাতেই ছেড়ে দিতে বলেছেন। দুআর সাড়া পাওয়া যাবে, এই নিশ্চিত বিশ্বাস অন্তরে রাখতে বলেছেন। তিনি বলেছেন- 

‘তোমার দুআর সাড়া প্রদান করা হবে, এই নিশ্চিত বিশ্বাস রেখে আল্লাহর কাছে দুআ করবে।’ 

এ হাদিস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আল্লাহ সব দুআরই সাড়া দেন। তিনি যে বড়োই হিতসাধনকারী। আমরা যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে কিছু চাইব, তাঁর দয়ার আশা করব, দুআর আদবকেতা বজায় রাখব, তখন মনে এই নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতে হবে যে আল্লাহ সাড়া দেবেন।

হাত তুলে দুআ করলে রিক্ত হস্তে হতাশ করে সে হাত দুখানা ফিরিয়ে দিতে আল্লাহ যে লজ্জা পান, সে হাদিস তো একটু আগেই বলেছি।

আমরা তাঁর কাছে কোনো ফরিয়াদ না জানালেও তিনি সাড়া দিতে তৈরি থাকেন। সেখানে যখন চাইব, তখন কি তিনি সাড়া না দিয়ে পারবেন? আমাদের প্রয়োজনের ব্যাপারে অত্যন্ত দানশীল।

নবিজি ﷺ বলেছেন-

‘সব মাহাত্ম্য আর তারিফ শুধু তাঁর। তিনি বলেছেন- “আমার বান্দা আমাকে যেভাবে চিন্তা করবে, আমি সেভাবে তার সঙ্গে আচরণ করব। সে যখন আমাকে স্মরণ করে, আমি তখন তার সাথে থাকি।’” 

তো কেউ যদি আল্লাহর কাছ থেকে কেবল ভালো কিছুর প্রত্যাশা করে, যদি মনে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে যে আল্লাহ তার আশা, তার আকাক্সক্ষাকে গুড়িয়ে দেবেন না, তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তার প্রত্যাশা পূরণ করবেন। 

অন্যদিকে সে যদি সাড়া পাওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান হয়, যদি মনে করে সাড়া বোধ হয় আর পাবে না, তাহলে তার সঙ্গে এ রকমই আচরণ করা হবে। শাওকানি এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন-

‘এ হাদিসে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উৎসাহিত করছেন তাঁর কাছ থেকে সেরাটা প্রত্যাশা করতে। তিনি তাদের সঙ্গে তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করবেন। সুতরাং যে তাঁর কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করবে, তাকে তাঁর কল্যাণ দিয়ে অবগাহন করান হবে। তাঁর চমৎকার বদান্যতা দেখতে পাবে সে। কিন্ত যে এ রকম হবে না, তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হবে না। এর মানে কেউ যখন তাঁকে স্মরণ করে তিনি তাঁর সাথেই থাকেন। আর তাই আল্লাহর ব্যাপারে সবসময় সুধারণা রাখা বান্দার জন্য বাধ্যতামূলক। কুরআন-হাদিসে যেখানে যেখানে আল্লাহর অসীম দয়ার উল্লেখ আছে, সেগুলো মনে করে করে সে এই অবস্থা অর্জনে নিজেকে সাহায্য করতে পারে।’

একজন খাঁটি মুসলিম কখনোই আল্লাহর ব্যাপারে নিরাশ হতে পারে না। নবিজি ﷺ বলেছেন-

‘আল্লাহর ব্যাপারে ভালো ধারণা না রেখে তোমাদের কেউ যেন মারা না যায়।’ 

আমরা জানি না কখন আমাদের বিদায়ঘণ্টা বাজবে। সেজন্য এ হাদিসের শিক্ষা-অনুযায়ী সবসময় আল্লাহর ব্যাপারে সুধারণা রাখতে হবে। তাঁর থেকে ভালোটা আশা করতে হবে। তাহলে যখন মৃত্যু দুয়ারে কড়া নাড়বে, এই বিশ্বাসই অন্তরে প্রবল থাকবে।

ইবনুল কায়্যিম বলেছেন-

‘এ বিষয়টি নিয়ে কেউ গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে বুঝবে, আল্লাহর কাছ থেকে সবচেয়ে ভালো কিছু প্রত্যাশা করা আর ভালো কাজ করা একই কথা। কেউ যখন আল্লাহর কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করে, কেবল তখনই তো সে আসলে ভালো কাজ করে। কারণ, সে আশা রাখে, আল্লাহ তার এই কাজের জন্য পুরস্কার দেবেন। কাজগুলো কবুল করবেন। আল্লাহর প্রতি ভালো প্রত্যাশা থাকার কারণে সে করেছে এগুলো। কাজেই আল্লাহর প্রতি একজন মানুষের প্রত্যাশা যত ভালো থাকে, তত বেশি ভালো কাজ করে সে।’ 

অর্থাৎ আপনার মধ্যে যদি আল্লাহর প্রতি সুধারণা থাকে, তাহলে আপনি বেশি বেশি ভালো কাজ করবেন। যে লোক লাগাতার পাপ করে যায়, কোনো ভালো কাজ করে না, সে আসলে আল্লাহর দয়ার ব্যাপারে নিরাশ। এ বিষয়ে তার ধারণা অস্পষ্ট।


০৮. বিনয় ও ভয় রেখে দুআ

দুআ করার সময় এ দুটো বিষয় মাথায় রাখা কুরআনের আদেশ। মহান আল্লাহ বলছেন-

‘তোমরা মিনতিভরে সঙ্গোপনে তোমাদের প্রভুকে ডাকো। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালোবাসেন না।’ [কুরআন, ৭ : ৫৫]

জাকারিয়া (আ.) ও তাঁর স্ত্রীর ব্যাপারে আল্লাহ বলছেন-

‘তারা ভালো কাজে ছিল খুব তৎপর। আশা ও শঙ্কা নিয়ে আমায় ডাকত। আমার প্রতি ছিল খুব বিনয়াবনত।’ [কুরআন, ২১ : ৯০]

তাই আল্লাহর কাছে যখন কিছু চাইব, খুব বিনয়ের সঙ্গে চাইব। নিজেকে তাঁর সামনে একেবারে এলিয়ে দিতে হবে। মহান আল্লাহর সামনে আমরা এমন কী আসলে? কত ভুল করি আমরা। তাঁর প্রতি দায়িত্ব পালনে কত অবহেলা করি। এরপরও কি বিনয়ে বিগলিত না হয়ে তাঁর কাছে আমাদের কিছু চাওয়া উচিত?’


০৯. শুধু আল্লাহর কাছে অভিযোগ

কারও সহানুভ‚তি বা দরদ পাওয়ার আশায় আল্লাহ বাদে অন্য কারও কাছে অভিযোগ তোলা যাবে না। এটা আমাদের তাওহিদের জ্ঞানে পূর্ণতার লক্ষণ। সত্যিকার মুসলিম তার যাবতীয় বিষয় আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে। তার দুরবস্থার কথা শুধু তাকেই জানায়। কারও কাছ থেকে সহানুভ‚তির আশা করে না।

যেকোনো সঙিন সময়ে আল্লাহর নবিরা আল্লাহর দারস্থ হতেন, তাঁর নিকট সাহায্য চাইতেন।

নবি জাকারিয়া (আ.) তখন অনেক বৃদ্ধ। অথচ কোনো সন্তান হয়নি। তিনি আল্লাহর কাছে মিনতি জানালেন-

‘প্রভু আমার, আমাকে নিসঙ্গ রাখবেন না। আপনি যে সেরা উত্তরাধিকারী।’ [কুরআন, ২১ : ৮৯]

জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে ইবরাহিম (আ.) সহায়সম্বলহীন তাঁর স্ত্রী-সন্তানকে রেখে গেলেন সম্পূর্ণ একা। তাদের বিরূপ পরিস্থিতি তুলে ধরে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানালেন-

‘প্রভু গো, নিষ্ফলা উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের পাশে আমার বংশধরদের রেখে এসেছি, যাতে তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করতে পারে। প্রভু গো, কিছু লোকের মন তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন। তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিন, যাতে তারা কৃতজ্ঞচিত্ত হয়।’ [কুরআন, ১৪ : ৩৭]

নবি আইয়ুব (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালা ভীষণভাবে পরীক্ষা করেছিলেন। তার সম্পদ-পরিবার সবই চলে গিয়েছিল। তার শরীরও সাংঘাতিক অসুখে বিপর্যস্ত। তিনি কাতরকণ্ঠে ফরিয়াদ জানালেন-

‘বড়ো কষ্টে পড়েছি, আপনি যে সবচেয়ে করুণার আধার।’ [কুরআন, ২১ : ৮৩] 

নবি ইয়াকুব (আ.) জানেন না তার আদরের মানিক ইউসুফ (আ.) কোথায় আছেন। ওদিকে ইউসুফের ভাই বেনইয়ামিনও বন্দি। চারপাশে এত বিপদের ভিড়ে নবি ইয়াকুব আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানিয়েছিলেন-

‘আমি আমার দুঃখ-কষ্টগুলোর নালিশ কেবল আল্লাহকেই করি।’ [কুরআন, ১২ : ৮৬]

তো বুঝতেই পারছেন আপনার যেকোনো ত্রাহি পরিস্থিতিতে আল্লাহর দিকে ফেরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া যেখানে কেউ কারও কোনো লাভ বা ক্ষতি করতে পারে না, সেখানে আল্লাহ বাদে অন্যদের কাছে কিছু চাওয়ার কী মানে? কেন আমরা অন্যের করুণা চাইব? যার কাছেই চাই না কেন, সে নিজেই তো তার অসহায়ত্ব আর অসামর্থ্যরে কারণে আল্লাহর করুণাপ্রার্থী!


১০. নীরবে দুআ

দুআ করার সময় এতটা জোরে করবেন না যে আশেপাশের মানুষ শুনতে পায়। দুআ করতে হয় চাপাস্বরে। আল্লাহ বলছেন-

‘তোমার প্রভুকে ডাকো বিনয়াবেশে, সংগোপনে। সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া লোকদের তিনি ভালোবাসেন না ’ [কুরআন, ৭ : ৫৫]

এজন্য আল্লাহ তায়ালা নবি জাকারিয়ার দুআর প্রশংসা করেছিলেন-

‘সে যখন তার প্রভুকে ডেকেছিল সংগোপনে।’ [কুরআন, ১৯ : ৩]

হাদিসেও এর প্রমাণ আছে। সাহাবিরা একবার সফরে বের হয়েছিলেন। তারা উচ্চস্বরে আল্লাহর জিকির করছিলেন। নবিজি ﷺ তাদের বললেন-

‘ওহে লোকসকল, নিজেদের প্রতি সদয় হও। তোমরা বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছ না। তোমরা যাঁকে ডাকছ, তিনি সব শোনেন। সবসময় কাছে।’ 

ইবনু তাইমিয়্যা নীরবে দুআ করার পেছনে বেশ কিছু প্রজ্ঞা তুলে এনেছেন- 

  • এটা ঈমানের পরিচায়ক। কারণ, যে নীরবে দুআ করছে, সে বিশ্বাস করে আল্লাহ তাঁর অতি গোপন আকুতিও শোনেন। লুকোনো চিন্তাও জানেন।
  • এটা আল্লাহর সামনে শ্রদ্ধা ও সুন্দর আচরণের পরিচায়ক। মনিবের সামনে দাসের গলা উঁচু করা যেমন শোভা পায় না, বাদশার সামনে প্রজা যেমন গলা চড়াতে পারে না, তেমনি মহা প্রভুর সামনে বান্দার আওয়াজ উঁচু করা সাজে না। মহান আল্লাহ যেহেতু সবকিছু শোনেন, তা-ই উচ্চস্বরে দুআ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
  • নীরবে দুআ করার মাধ্যমে বিনয় ও নম্রতা অর্জিত হয়। এটাই তো ইবাদাতের মূল কথা। বিনয়ী ব্যক্তি নম্রভাবে তার আর্জি পেশ করে। আর অহংকারী ব্যক্তি তার স্বরে চেচায়। দুআর সময় কণ্ঠ নামিয়ে রাখলে বিনয়ী স্বভাব অক্ষুণ্ন রাখা যায়। 
  • এতে আন্তরিকতাও প্রকাশ পায়। কারণ, অন্যেরা তার দুআ শুনছে না।
  • দুআতে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়। শব্দ করে দুআ করলে চিন্তাধারায় ব্যাঘাত আসে। নিশব্দে দুআ করলে সে দুআর কথামালায় বেশি মনোযোগ দিতে পারবে। মনসংযোগ ভালো হবে।
  • একজন সত্যিকার বিশ্বাসী দুআর সময় যে আল্লাহর কত নিকটবর্তী, তা বোঝা যায় এ থেকে। এভাবে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক মজবুত হয়। সে বোঝে আল্লাহ তার কত নিকটে! আর এজন্যই মহান আল্লাহ তায়ালা নবি জাকারিয়ার নিঃশব্দ দুআর প্রশংসা করেছেন।
  • শব্দ না করে দুআ করা শরীর ও জিহ্বার জন্য সহজতর। মানুষ এতে সহজে কাহিল হয় না। যে কারণে দীর্ঘক্ষণ সে এভাবে দুআ চালিয়ে যেতে পারে। 
  • শব্দ করে দুআ করলে আশেপাশের মানুষ বিরক্তি প্রকাশ করতে পারে এবং তাতে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়। এতে দুআয় ব্যাঘাত ঘটে। শব্দ না করলে আশপাশ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ণ মনোযোগের সাথে সে দুআ করতে পারবে।
  • এটা একজন মানুষকে হিংসা থেকে রেহাই দেয়। মানুষ ও জিন স্বভাবতই হিংসাকাতর। তারা কাউকে যখন আল্লাহর সঙ্গে নিবিড় আলাপনে মগ্ন দেখে, তখন তাদের হিংসা হয় বৈকি। এজন্য নিরালায় দুআ করলে, সে অন্যের হিংসার হাত থেকে বাঁচে।

ইবনু আব্বাস ؓ বলেছেন-

‘শব্দ করে দুআ করার চেয়ে শব্দ না করে দুআ করা সত্তরগুণ ভালো।’  একদল লোক মাসজিদে উচ্চস্বরে জিকির করছিল বলে ইবনু মাসউদ মাসজিদ থেকে তাদের বের করে দিয়েছিলেন। বের করার সময় বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় তোমরা বিদআতি।’ 

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন- দুআ কবুলের আদব (দ্বিতীয় পর্ব)


 [এই আর্টিকেল আপনার কাছে উপকারী বিবেচিত হলে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন।]


৪৩৩ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

ড. ইয়াসির ক্বাদির জন্ম আমেরিকার টেক্সাসে ১৯৭৫ সালে। হুস্টন ইউনিভার্সিটিতে প্রথমে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ওপর বিএসসি করেছেন। মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ১৯৯৬ সালে। প্রথমে হাদিস ও ইসলামি শাস্ত্র অনুষদ থেকে আরবি ভাষার ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন সেখানে। পরে দাওয়াহ অনুষদ থেকে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। আমেরিকায় ফিরে ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে ধর্মতত্ত্বে পিএইচডি করেন। ২০০১ সাল থেকে তিনি আল-মাগরিব ইন্সটিটিউট-এর অ্যাকাডেমিক বিভাগের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া অধ্যাপনা করেছেন টেনিসির রোডস কলেজের ধর্মশিক্ষা বিভাগে। ২০১১ সালে দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন-এর এক নিবন্ধে অ্যান্ডি এলিয়ট...

অনুবাদক পরিচিতি

মাসুদ শরীফ। পড়াশোনা করেছেন ইলেট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। বর্তমানে পুরোদস্তুর পাঠক-লেখক-অনুবাদক। তিনি আসলে অনুবাদ করেন না। ভিন ভাষার ভাবটাকে নিজের ভাষার ঢঙে ‍রূপান্তর করেন মাত্র। এক স্ত্রী, দুই কন্যা, বাবা-মা, বোনদের নিয়ে দুনিয়ার মুসাফিরখানায় বেশ ভালো আছেন।

মন্তব্য

১ টি মন্তব্য করা হয়েছে
ইবনে সিদ্দি

ইবনে সিদ্দি

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২২:০০ অপরাহ্ন

তথ্যবহুল, আলহামদুলিল্লাহ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...