জীবন মানেই নিরন্তর পরীক্ষা

এই পৃথিবীর কিছুই অনর্থক তৈরি করা হয়নি। প্রতিটি সৃষ্টির পেছনেই আছে মহান সৃষ্টিকর্তার সীমাহীন প্রজ্ঞা ও কুশল। বিষয়গুলো একজন মানুষ তখনই ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, যখন তিনি এগুলোকে নিজের বুঝ ও উপলব্ধিশক্তি কাজে লাগিয়ে বিবেচনা করেন, করার চেষ্টা করেন।

একজন ঈমানদার যখন নিজের বুঝশক্তি ও বুদ্ধিমত্তাকে হিদায়েত ও কল্যাণের কাজে ব্যয় করেন, তখন আল্লাহ তায়ালা তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আরো বাড়িয়ে দেন । পরবর্তীতে দেখা যায়—সময়ের সাথে সাথে তিনি যুক্তিবিচারের সাহায্যে খুব সহজেই যেকোনো বিষয় সহজে উপলব্ধি করতে পারেন। অনায়াসে বুঝতে পারেন এর পেছনে লুকিয়ে থাকা রহস্য।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে তা হচ্ছে, পার্থিব জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত... প্রতিটা ক্ষণই কিন্তু আমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। সে মুহূর্ত ও ক্ষণগুলো সুখের হোক বা দুখের—এগুলো মূলত আমাদের পরীক্ষার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। পারতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ফেলার মাধ্যমে আমাদের বোধ-বিশ্বাস ও কৃতজ্ঞতাবোধ পরখ করে দেখেন। সুখে-প্রাচুর্যে, দুঃখ ও দুর্দশায়... এককথায় সর্বাবস্থায় আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকি কি না, সেটা বিবেচনা করেই তিনি আমাদের সাহায্য করে থাকেন। আর বিপদে ফেলে আমরা কতটা ধৈর্যশীল, তাও তিনি যাচাই করেন—

আর ভালো ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদের পরীক্ষা করে থাকি। সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৩৫


বিভিন্নভাবে আমাদের পরীক্ষা করার কথা কুরআনে বিষয়টিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে—

আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৫


আমাদের যে পরীক্ষায় ফেলা হয়, অধিকাংশ সময় তার ফলাফলের ওপর-ই নির্ভর করে আমাদের জীবনের সবকিছু। সব পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা। স্বপ্ন ও সাধনা।

পার্থিব জীবনের পরীক্ষার ধারাবাহিকতায় আল্লাহ তায়ালা প্রথমেই আমাদের শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে পরীক্ষা নেন। যেমনটা কুরআনে বিবৃত হয়েছে—

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে। তাকে আমি পরীক্ষা করব। ফলে আমি তাকে বানিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। সুরা ইনসান, আয়াত : ২

কাজেই আমরা যা কিছু শুনি বা দেখি সব-ই আমাদের পরীক্ষারই অংশ। আল্লাহ তায়ালা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের পরীক্ষা করে দেখবেন, আমরা কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন যাপন করি নাকি বেপরোয়া প্রবৃত্তির চাহিদার পেছনে ছুটি।

আমরা আগেই জেনেছি, আল্লাহ বিভিন্ন বিপদ-আপদ ও দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখীন করে ঈমানদারদের দৃঢ়তার পরীক্ষা নেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হচ্ছে, কাফেরদের দ্বারা ঈমানদারদের অত্যাচারিত হওয়া। গালিমন্দ থেকে শুরু করে ঠাট্টা বিদ্রুপ, মানসিক আঘাত থেকে শুরু করে শারীরিক নির্যাতন—এসমস্ত অন্যায়ই একজন ঈমানদারের জন্যে আল্লাহর দেওয়া পরীক্ষা। কুরআনের একটি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে—

অবশ্যই তোমাদেরকে তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের জীবনের ব্যাপারে পরীক্ষা করা হবে। আর অবশ্যই তোমরা শুনবে তোমাদের পূর্বে যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে নিশ্চয় তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ। সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৬


এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে তা হচ্ছে, পার্থিব জীবনের এই লাঞ্ছনা-বঞ্চনা বা দুঃখ-দুর্দশা—সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বান্দার জন্য পরীক্ষা। এখন যে ব্যক্তি দ্বীনকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারেনি, শরিয়তের ইলম ও জ্ঞান অর্জন করেনি এবং ইসলামকে বোঝার চেষ্টা করেনি, তার জন্য এসব অসার বাক্যালাপ ছাড়া আর কিছু নয়। এই প্রসঙ্গে কুরআনে এক ইহুদির কাহিনি বর্ণিত রয়েছে—

আর তাদের কাছে জিজ্ঞেস করো সাগরের নিকটে অবস্থিত জনপদটি সম্পর্কে, যখন তারা শনিবারে সীমালঙ্ঘন করত। যখন তাদের কাছে শনিবারে তাদের মাছগুলো ভেসে আসত। আর যেদিন তারা শনিবার যাপন করত না, সেদিন তাদের কাছে আসত না। এভাবে আমি তাদেরকে পরীক্ষা করতাম। কারণ তারা পাপাচার করত। সুরা আরাফ, আয়াত : ১৬৩


শরিয়তের জ্ঞান এবং ইসলাম সম্পর্কে জানা ছাড়া, অন্য কেউ বুঝতেই পারবে না যে, আল্লাহ তাকে বিপদে ফেলে, দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত করে, তার পরীক্ষা নিচ্ছেন। তাই দেখা যায়—যাদের শরিয়তের জ্ঞান আছে এবং যারা হৃদয়ে ইসলামকে ধারণ করেছেন, তারা কখনো বিপদে পড়ে অভিযোগ করেন না। বরং ধৈর্য ধারণ করেন। এবং আবর্তিত এই বিপদ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে নিতে চেষ্টা করেন।

যাই হোক—একজন ঈমানদারের কখনোই একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, পার্থিব জীবন মানেই নিরন্তর পরীক্ষা। কখনো সুখ-প্রাচুর্য, আবার কখনো দুঃখ-দুর্দশা... কখনো আনন্দ-আহ্লাদ, আবার কখনো কষ্ট-বিষাদ; এরই সমষ্টি মূলত এই পার্থিব জীবন। আর মনে রাখতে হবে, ‘আমি ঈমান এনেছি’ বলেই কেবল কেউ এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যেতে পারবে না। যেমনটা কুরআনে এসেছে—

মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে? আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্যবাদী এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী। সুরা আনকাবুত, আয়াত : ২-৩


অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেছেন—

তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো যাচাই করেননি তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদ করেছে এবং কারা ধৈর্যশীল। সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৪২




১৮০২ বার পঠিত

অনুবাদক পরিচিতি

নীড়ে ফেরা পাখিটার এখনও অনেককিছুই অগোছালো, তাও চেষ্টা করছি বারবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে অনার্স, মাস্টার্স করেছি। নিজেকে ইসলামিক অনলাইন মাদ্রাসার একজন শিক্ষার্থী বলে পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। দ্বীনের খেদমত হিসেবে বেছে নিয়েছি ইসলামি কন্টেন্টের লেখা অনুবাদ করার কাজটিকে। আল্লাহ যেন আমার কাজগুলো কবুল করে নেন আর এই ওসিলায় এই আমাকে ক্ষমা করে দেন।

মন্তব্য

৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে
আবির রায়হান

আবির রায়হান

২৪ নভেম্বর, ২০১৯ - ২২:২১ অপরাহ্ন

অনুবাদ অনেক সুন্দর হয়েছে

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
জাকারিয়া

জাকারিয়া

২০ ডিসেম্বর, ২০১৯ - ১১:১৫ পূর্বাহ্ন

বেশ যুক্তি সম্মত কথা গুলো আরো চাই এমন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
সাদেকুল ইসলাম

সাদেকুল ইসলাম

১৭ জানুয়ারী, ২০২০ - ২২:৩৩ অপরাহ্ন

অনেক সুন্দর হয়েছে, অনেক ভালো লাগলো কিছু শিখতে পেরে, আল্লাহ আপনাকে আরও বিভিন্ন বিষয়ে লিখার তাওফিক দিন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
সাদেকুল ইসলাম

সাদেকুল ইসলাম

১৭ জানুয়ারী, ২০২০ - ২২:৩৫ অপরাহ্ন

অনেক সুন্দর হয়েছে, অনেক ভালো লাগলো কিছু শিখতে পেরে, আল্লাহ আপনাকে আরও বিভিন্ন বিষয়ে লিখার তাওফিক দিন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...