সূরা আল মুলকঃ বৈশ্বিক মহামারীর আধ্যাত্মিক ঔষধ

কোনো সন্দেহ নাই, করোনা মহামারীতে আমরা সকলেই আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি। সমসাময়িক প্রেক্ষাপট এবং তার সমাধানের রাস্তার দিকে চোখ বুলালে আমাদের হতবিহ্বল হয়ে যেতে হয়। কিন্তু এই পরিস্থিতির নিরসনে শান্তি ও স্বস্তি লাভের কি কোনো উপায় আছে?


পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা আল মুলক খুলে দেখুন, একটা উপায় খুঁজে পাবেন। সূরা মুলকে এমন একটা বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে; যা আমাদের একটি শক্তিশালী প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারনা দেয় এবং একটা মাধ্যমের সন্ধান এনে দেয়। সূরা আল মুলক আমাদের শান্তির নিশ্চয়তা দিচ্ছে এবং অনেক ভীতি ও অনিশ্চয়তার উত্তর দিতে পএই প্রবন্ধে আমরা সূরা মূলক হতে অনুপ্রাণিত কিছু চিন্তা ও পাঠ শেয়ার করব।


মনস্তাত্বিক পরিবর্তনঃ বিশ্ব-নিয়ন্ত্রকের কাছে নিয়ন্ত্রন ছেড়ে দিন


আল্লাহ তায়ালা সূরা মুলকের প্রথম আয়াতেই বলছেন-

 تَبٰرَکَ الَّذِیۡ بِیَدِہِ الۡمُلۡکُ ۫ وَ ہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرُۨ 'পূণ্যময় তিনি, যার হাতে রাজত্ব। তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান।' (৬৭ঃ১)


মার্চের ২৯ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থার মহাপরিচালক বৈশ্বিক মহামারী নিয়ে এক শব্দের একটি টুইট করেন। তা হচ্ছে ‘বিনম্রতা’। পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই টুইটের একটা ব্যাখ্যা দেন-

‘এই মহামারী আমাদের উপলদ্ধি করতে বাধ্য করেছে যে আমরা কতটা অরক্ষিত। আমাদের হাতে নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই আমাদের বিনয়ী হতে হবে।'

বিশ্বের পরাশক্তিরাও এই অনিবার্য সত্য মেনে নিয়েছে। আজকের এই সঙ্কটে দাঁড়িয়ে কোনো বিশ্ব নেতা, রাজা বা সিইও এসে আমাদের বলতে পারবে- ‘চিন্তা করো না, সবকিছুই আমার নিয়ন্ত্রনে আছে’। বলতে পারবে? না, কেউ এখন আর এমনটি বলছে না, বলতে পারছে না।


সূরা মুলক-এর প্রথম শব্দ ‘তাবারাকা’। আরবি শব্দটির বাংলা অর্থ করা হয় ‘পবিত্র’ বা ‘মহিমান্বিত’। ‘তাবারাকা’ শব্দটি ‘বারাকাহ’ শব্দের সুপারলেটিভ ফর্ম; যার অর্থ ‘মহিমা, মাহাত্ম্য, প্রাচুর্য’। ‘বারাকাহ’ শব্দ গুণ ও উৎকর্ষের স্থায়ী তাৎপর্য ধারণ করে। যখন ‘বারাকাহ’ শব্দের সুপারলেটিভ ফর্ম-এ সৃষ্টিকর্তাকে বর্ণনা করা হচ্ছে, তখন চূড়ান্তভাবেই তার সকল সৃষ্টির ক্ষেত্রে সবকিছুর উপরই সার্বভৌম। তাঁর হাতে রয়েছে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রন এবং পুরো মহাবিশ্বের আধিপত্য তাঁর হাতের মুঠোয়।


প্রোডাক্টিভ মুসলিম কোম্পানিতে আমরা যে মৌলিক বারাকাহ সংস্কৃতি প্রচার করি, তা হলো- ‘আল্লাহকেন্দ্রিক বনাম আত্মকেন্দ্রিক’। এটা এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন উপলব্ধি করতে পারছি ‘ব্যক্তি’ হিসেবে আমরা কতটা ক্ষুদ্র ও অসহায়। আমরা মানবিক ক্ষমতার বাইরে অনিবার্য বিষয়গুলো মোকাবেলা করতে কতটা অক্ষম। কিন্তু যখন আমরা অসীমের দিকে পরিচালিত হই, তখন আমরা শান্তি ও প্রশান্তির সাথে অনুভব করতে পারি- তিনি সব কিছুর ওপর সক্ষম।


এই মহামারীর আগে আমরা অনেকেই চারপাশে তৈরি করা ক্ষুদ্র দেবতাদের ঘিরে জীবন গড়ে তুলেছিলাম। আমরা নিজেরাই এদের সৃষ্টি করি, আবার নিজেরাই এদের সেবা দিয়ে এসেছি চরম একাগ্রতার সাথে। কিন্তু এ সবকিছুই এখন নিজেদের ক্ষমতার সীমাবহির্ভূত নতুন এক বাস্তবতার কাছে নতি স্বীকার করে নিয়েছে। যে ক্যারিয়ার আমাদের সালাত থেকে দূরে রাখত, পরিবার থেকে দূরে রাখত এবং গতানুগতিক জীবনের ‘ইদুর-দৌড়’ নিয়ে ব্যস্ত রাখত, সে ক্যারিয়ার এখন আর এই মহামারী থেকে আমাদের সুরক্ষা দিতে পারছে না। এটাই সত্য। যে সব সামাজিক সম্পর্ক সময়ের সাথে খাপ-খাওয়ানোর নামে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধকে অবহেলা ও উপেক্ষা করা শেখাত, সে সম্পর্ক হয়তো আর বেশিদিন টিকে থাকবে না।


এসবকিছুই যেন আমাদের নির্দেশ দিচ্ছে- ‘ক্ষুদ্র দেবতা’ ছেড়ে দেওয়ার এবং তার বদলে ‘একমাত্র সত্য ইলাহ’ আল্লাহর সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করার। ইতোপূর্বে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ভেবে যেসব শক্তি-কাঠামোর উপাসনা করতাম, আজ তার অসাড়তা চোখের সামনে দৃশ্যমান। আমাদের তৈরি করা উপাস্যরা নিজেরাই বড্ড অসহায়! এখন আমরা কেবল মহা-প্রতাপশালী মহান আল্লাহর কাছেই সাহায্য, শান্তি ও বিশালত্ব খুঁজতে পারি; আর কারও কাছে নয়! আমরা যখন নিজেদের ইচ্ছাকে কেবল সেই মহা-নিয়ন্ত্রকের ইচ্ছার সাথে মিলাতে পারব, তখন আমাদের অনেক ভীতি ও বোঝা সহজে কমিয়ে ফেলা সম্ভব।

‘আল্লাহ তোমাদের দায়িত্বের বোঝা হাল্কা করতে চান। কারণ মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই দুর্বল।’ (৪:২৮)


প্রথম পাঠ

আল্লাহকেন্দ্রিক হও, আত্বকেন্দ্রিক নয়

পূর্ব থেকে পশ্চিম পুরো পৃথিবীটাই আল্লাহর নিয়ন্ত্রনে। যখন আমরা নিজেদেকে একমাত্র নিয়ন্ত্রক, সক্ষম ও যোগ্য মালিকের সাথে মানিয়ে নিতে পারব, তখনই আমরা অনেক বেশি প্রশান্তি অনুভব করব। আর ঠিক তখনই আমাদের আতংক, চাপ ও দুশ্চিন্তার উপশম হবে। দিনা মোহাম্মদ বাসিওনি নামের একজন টুইট করেছেন এভাবে-

যদি সমস্যাসগুলোকে আমরা পুরোপুরি পার্থিব সীমিত মাধ্যমগুলোর হাতে ছেড়ে দেই, তাহলে আমাদের আতংকিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যখনই আমরা অসীমের দিকে মূখ ফিরাই, তখন আমরা প্রশান্তি অনুভব করি। কারণ, আমরা জানি যে তিনি সকল কিছুর উপর কর্তৃত্বশীল।


সূরা আল মুলকের দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আমাদের জানাচ্ছেন-

الَّذِیۡ خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَ الۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَ ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفُوۡرُ যিনি সৃষ্টি করেছেন জীবন ও মরণ, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাময়।’(৬৭ঃ২)


আধুনিক বিশ্বে মৃত্যুর প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা আছে এবং তারা জীবন নিয়ে আচ্ছন্ন। কিন্তু এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন গুরুত্বের সাথে বলছেন যে তিনি মৃত্যুকে জীবনের আগে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের মৃত্যুর তারিখ, সময় ও দৃশ্যপট আমাদের সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্ধারণ করা হয়েছে; এমনকি তিনি আমাদের শরীরে রুহ ফুকে দেওয়ারও আগে।


আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ রাদি. এর একটি বর্ননায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

‘প্রত্যেক মানুষ তার মায়ের পেটে ৪০ দিন বীর্যরূপে জমা থাকে। তারপর পরিবর্তিত হয়ে রক্তপিণ্ডের আকার হয়। এরপর পরিবর্তিত হয়ে মাংসপিণ্ড হয়। অতঃপর আল্লাহ তার কাছে ফেরেশতা পাঠিয়ে রুহ ফুঁকে দেন। আর তার প্রতি চারটি নির্দেশ দেওয়া হয়। লিখে দেওয়া হয় তার আয়ু, তার জীবিকা, তার আমল ও সে দুর্ভাগা, না সৌভাগ্যবান। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩৩২)


এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি রিমাইন্ডার

করোনা ভাইরাস কারও মৃত্যু সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের আগে মৃত্যু নিয়ে আসবে না। এটি আমাদের না মৃত্যুর গতি বাড়াবে, না এটি মৃত্যুর কোনো বিলম্ব করবে। আমাদের মৃত্যুর তারিখ আমাদের শরীরে রুহ ফুঁকে দেওয়ারও আগে নির্ধারিত করা হয়ে গিয়েছে। এই বিষয়টা আমলে নেওয়া এ কারনেই খুব জরুরি, যেন আমরা শুধুমাত্র করোনা ভাইরাসের কারণেই আতংকিত না হই। বরং এই মহামারী থেকে মৃত্যুর নিকটবর্তিতাকে শক্তভাবে স্বরন করি।


আমরা যখন ভীত এবং আমাদের অথবা আমাদের প্রিয়জনদের জীবন নিয়ে শংকিত, আমরা যেটা করতে পারি, তা হলো- মৃত্যুর সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে যেতে পারি এবং স্বরণ করি যে তিনিই একমাত্র অতুলনীয় ক্ষমাশীল ও দয়াময়। এবং আমরা তাঁর কাছে চাই,

হে আল্লাহ! আপনি যদি এই সময়কেই আমার, আমার মাতাপিতার, আমার সন্তানদের জন্য মৃত্যু ও আপনার নিকট ফিরে যাওয়াকে নির্ধারন করে রাখেন, তাহলে আমাদের উপর আপনার রহমত বর্ষণ করুন এবং আমাদের অন্তরকে সন্দেহমুক্ত করুন এবং আপনার সাথে আমাদের সাক্ষাতকারকে আমাদের যাপিত জীবনের সর্বোত্তম দিন হিসেবে করে দিন। এবং আপনার কুদরতি ইলমে যদি আমাদের বেচে থাকা ও আরো উত্তম কর্ম করাটাই উত্তম হয়, আমাদের ধৃঢতা দান করুন এবং আমাদের জন্য সর্বোত্তম যা তাই করার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের সেভাবে রক্ষা করুন, যেভাবে আপনি আপনার নিকটতম বান্দাদের রক্ষা করে থাকেন।

আমাদের মৃত্যু যে নির্ধারিত এটা স্বীকার করার মানে হচ্ছে, এই জীবনটাই শেষ নয়। এটি একটি পর্যায় এবং এ পর্যায় শীঘ্রই অথবা দেরিতে শেষ হবেই। সুতরাং আমরা এটি শান্তির সাথে মেনে নেই এবং প্রস্তুতি নেই। সেইসাথে আগামী চিরস্থায়ী সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। এটি আরেকটি আখিরাতকেন্দ্রিক (বারাকাহ সংস্কৃতির মানসিকতা।


যখন আমরা মারা যাই, তখন আল্লাহর কাছে ফিরে যাই। সেই সৃষ্টিকর্তা যার সুন্দর নামসমুহের মাঝে রয়েছে অতুলনীয় ক্ষমাশীল, সৌন্দর্য, আলো,শান্তি, স্নেহ, উদারতার উৎস। আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া আতংকের কোনো বিষয় নয়; বরং এটিই হচ্ছে চরম প্রশান্তির মূহুর্ত। যেমন নবিজি (সা) বলেছেন,

তোমাদের কেউই মহিমান্বিত আল্লাহর কাছে উত্তম আশা করা ছাড়া মৃত্যু বরণ করো না। [সহিহ মুসলিম]


দ্বিতীয় পাঠ

আখিরাতমূখী হও, দুনিয়া কেন্দ্রিক নয়

যখন আমরা স্মরণ করি- মৃত্যু করোনার সৃষ্টি না, বরং আল্লাহর সৃষ্টি, তখন আমরা অতিরঞ্জিতভাবে করোনাকে ভয় পাই না; কিন্তু আমরা প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাই। আমাদের যতটুকু ভালো কিছু করা সম্ভব, আমরা ততোটুকুই করি এবং তাঁর কাছে আত্বসমর্পন করি। আর তিনি আত্মসমর্পণকারীদের প্রতি পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল।

করোনা ভাইরাস সৃষ্টিকর্তার নির্ধারিত ফয়সালার বাইরে কোনো মৃত্যু ঘটাতে পারবে না। এটি না আমাদের মৃত্যুকে প্রলম্বিত করতে পারবে, না বিলম্বিত করতে পারবে।-দিনা মোহাম্মদ বাসিওনি


নিরাপত্তার মাধ্যমে আতঙ্ককে জয় করা


সূরা আল মুলকের ২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন-

 اَمَّنۡ ہٰذَا الَّذِیۡ ہُوَ جُنۡدٌ لَّکُمۡ یَنۡصُرُکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ الرَّحۡمٰنِ ؕ اِنِ الۡکٰفِرُوۡنَ اِلَّا فِیۡ غُرُوۡرٍ অথবা এমন কে আছে, যে তোমাদেরকে রিয্ক দান করবে যদি আল্লাহ তাঁর রিয্ক বন্ধ করে দেন? বরং তারা অহমিকা ও অনীহায় নিমজ্জিত হয়ে আছে" [৬৭ঃ২০]

পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের সেনা ও অস্ত্রের পিছনে সকল অর্থকড়ি ব্যয় করে দিয়েছে। কিন্তু এ সব কিছু আর তাদের কোনো কাজে আসছে না। তারা এমন এক শত্রুর সাথে যুদ্ধরত, যাকে খালি চোখে দেখা যায় না। যেন আল্লাহ তায়ালা বলছেন- ‘আর এমন কে আছে যে তোমাদের পক্ষে সৈন্যবাহিনী হবে, মহান ক্ষমাশীল আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত তোমাদের সাহায্য করবে?’


আল্লাহ যদি কাউকে কোনো রোগ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে কোনো সেনাবাহিনী, কোনো বন্দুক, কোনো ট্যাংকই কারও কাজে আসবে না। নবিজি (সা) ব্যাখ্যা করেন যে ‘আদওয়া’ সংক্রামক রোগ বলে কিছু নেই। [সহিহ আল বুখারি]। অর্থাৎ কোনো রোগের আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত নিজ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই যে, সে কাকে সংক্রমন করবে। এটি মানুষের গনণালব্ধ নিয়ন্ত্রনের বাহিরে। এই ধরনের রিমাইন্ডারগুলো মানুষের জন্য চিন্তাভাবনা করার কিছু উপলক্ষ; যাতে তারা আল্লাহর নিকট ফিরে আসতে পারে এবং নিজেদের আত্বকেন্দ্রিকতা জয় করতে পারে।


আবু আব্বাস রা. হতে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. বলেন-

‘একদিন আমি নবিজির(সা) পিছনে ছিলাম [একই ঘোড়ার পিঠে] এবং তিনি বলেন, ও হে যুবক! আমি তোমাকে কিছু উপদেশ করছি। আল্লাহর ব্যাপারে মনোযোগী হও এবং তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যদি কিছু চাও একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাও। যদি কারো কাছে সাহায্য চাও, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করো। জেনে রেখো! পুরো জাতি যদি তোমার কল্যান করতে একত্র হয়, তারা তোমার কোনো কল্যান করতে পারবে না, আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারন করে রেখেছে, তা ব্যতীত। এবং তারা যদি সকলে একত্রিত হয় তোমার ক্ষতি করার জন্য, তারা তা পারবে না আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারন করে রেখেছে, তা ব্যতীত। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং কাগজ শুকিয়ে গিয়েছে।’ [তিরমিজি]


তৃতীয় পাঠ

সঙ্কট উত্তরণে মাধ্যম গ্রহন করো; কিন্তু তার ওপর নির্ভর করো না। ফল পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ো না। আল্লাহর প্রতি তায়াক্কুল বাড়িয়ে দাও। বর্তমান আতংক আমাদের দুনিয়াবি উপায়-উপকরণ ও সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আস্থার বদলে আল্লাহর প্রতি বিনম্রতা পুনরুদ্ধারের একটা বড়ো রিমাইন্ডার। কারণ, আমরা দেখছি আল্লাহর ইচ্ছার কাছে কীভাবে শক্তিশালী মাধ্যমও অসহায় হয়ে যায়।


অপ্রতুল সম্পদ কিংবা উপায়-উপকরণ দিয়ে পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করব

সুরা মুলকের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন-

 

اَمَّنۡ ہٰذَا الَّذِیۡ یَرۡزُقُکُمۡ اِنۡ اَمۡسَکَ رِزۡقَہٗ ۚ بَلۡ لَّجُّوۡا فِیۡ عُتُوٍّ وَّ نُفُوۡرٍ এমন কে আছে, যে তোমাদেরকে রিযিক দান করবে, যদি তিনি তাঁর রিযিক বন্ধ করে দেন? বরং তারা অবাধ্যতা ও সত্য বিমুখতায় অবিচল রয়েছে" [৬৭ঃ২১]


সম্পদের অপ্রতুলতা অনেক মানুষকেই পণ্য মজুদের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং সুপার মার্কেটের তাকগুলো খালি করে দিয়েছে। মানুষের ভয় বোধগম্য। কারও কারও ঘরে ছোটো বাচ্চা এবং বৃদ্ধ মা-বাবা রয়েছে। তারা ঘর থেকে বের হতে না পারার ভয়ে ভীত! যদি এভাবেই দীর্ঘদিন তাদের নিজেদের কোয়ারেন্টাইন-এ থাকত হয়!


বিশ্বব্যাপী চলমান মন্দার কারণে একজন ব্যক্তির চাকরি হারানো বা আয়ের পথ বন্ধ যাওয়ার আশংকা রয়েছে। সম্পদ জমানো ও অনিশ্চয়তার ভয় মানবজাতির সহজাত বৈশিষ্ট্যেরই অংশ। এরপরও উপরোক্ত আয়াত আমাদের প্রাচুর্যের মানসিকতার কথা স্বরণ করিয়ে দেয় এবং এটা শিক্ষা দেয় যে জীবিকা বস্তুগত সম্পদের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে।


একবার এক ব্যক্তি নবিজির কাছে আসেন এবং রসুল (সা) তাকে ততক্ষন পর্যন্ত দিতে থাকেন, যতক্ষন না সেই লোক সন্তুষ্ট হয়ে যায়। তখন ওই লোকটি তার সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে বলেন,

হে লোকসকল! তোমরা ইসলাম গ্রহন করো। কারণ, মুহাম্মদ এমনভাবে দান করে যেন তার দারিদ্রতার কোনো ভয় নেই।

এটি হচ্ছে প্রাচুর্যের মানসিকতা। আমাদের অন্তর যেন সুপারমার্কেটের সেলফ-এ কী আছে, তা নিয়ে খুব বেশি না-ভাবে কিংবা জাগতিক সরবরাহকারীদের সাথে লেগে না থাকে। আমাদের অন্তর বরং অসীম উৎসের সাথে লেগে থাকা উচিৎ; যে সত্ত্বা আকাশ ও জমীন থেকে সরবরাহ করে থাকেন। যিনি কোনো সীমানা ও সীমার চেয়েও বিশাল এবং কোনো পরিস্থিতির দ্বারাই প্রভাবিত হন না।


এই বিষয়টাকে আরেকটু কাছাকাছি দেখার জন্য একটা শক্তিশালী হাদিস আমরা দেখতে পারি, যেখানে নবিজি (সা) আল্লাহর কথা বর্ননা করছেন-

‘আল্লাহ বলেন, হে আমার বান্দাগন! যদি তোমাদের প্রথম জন ও শেষ জন, তোমাদের মাঝে যারা মানুষ আছে এবং যারা জ্বীন আছে, সবাই একসাথে এক যায়গায় একত্র হয়ে আমার কাছে খুঁজতে থাকো। আমি তোমাদের চাওয়ার সবটুকুই দিয়ে দিতাম, তাহলেও আমার কাছে যা আছে তা ফুরাত না, একটি সূচ সমুদ্রে চুবালে যতটুকু পানি ক্ষয় হয়, ততটুকু ছাড়া।’

এজন্যই নবিজি বলেন- সাদাকা করা ঈমানের লক্ষণ। কারণ, আতঙ্ক আর জমিয়ে রাখার মাধ্যমে বুঝা যায় যে একজন ব্যক্তি শুধু বস্তুগত সরবরাহকারীকেই হিসেব করে এবং রিজিক এর অসীম সরবরাহকারীর কথা মাথায়ই রাখে না। এক ব্যক্তি আল্লাহর রসুল (সা) কে জিজ্ঞেস করে, কোন ধরনের সাদাকা উত্তম সাদাকা? তিনি(সা) বলেন,

‘যে দান তুমি সুস্থ অবস্থায় করো, কার্পন্য থাকার পরও দান করো এবং দীর্ঘ আয়ুর আশা করো এবং দারিদ্রের ভয় থাকা অবস্থায়ও দান করো। [ সুনানে নাসাঈ]


তিনি (সা) আরো বলেন,

‘সাদাকা একটি প্রমানস্বরুপ' (ঈমানের), এবং ধৈর্য হচ্ছে নূর এবং কুরআন হচ্ছে প্রমান- তোমার পক্ষে বা বিপক্ষে। প্রত্যেক ব্যক্তিই তার দিন শুরু করে তার আত্মার বিক্রেতা হিসেবে। হয় সে তাকে মুক্ত করে অথবা সে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।' [মুসলিম]


সুতরাং এখনই সঠিক সময় আল্লাহর উপর ঈমান আনার এবং সাদাকা করে ‘বিত্তশালী মানসিকতা’-কে গ্রহন করার। সাদাকা করতে গিয়ে আপনি দেখবেন কতটুকু ‘বিশালত্ব’ অপনার অন্তর ও হৃদয়ে প্রবেশ করবে। রসুল(সা) বলেন,

আপনি যদি পরিপূর্ণ রুপে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করেন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে এমনভাবে রিযক্ দান করবেন যেমনিভাবে একটি পাখিকে তিনি দান করে থাকেন। সে সকালে বের হয়ে যায় খালি পেটে আর সন্ধ্যায় ফেরত আসে ভরা পেটে।


চতুর্থ পাঠ

নিজ অন্তরকে আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করুন এবং দান-সাদাকা করুন


মহান আল্লাহ হাদিসে কুদসিতে বলেন,

‘খরচ করো (সাদাকা), হে আদম সন্তান! আমিও তোমার জন্য খরচ করব।’ [বুখারি ও মুসলিম]।

বস্তুগত সম্পদ আমাদের একমাত্র উৎস নয়; এগুলো শুধুমাত্র মাধ্যম। আমাদের জীবিকার উৎস আল্লাহ হতে আসে। আল্লাহ তায়ালা এমন জায়গা হতে রিজকের দ্বার খুলে দিতে পারেন, যা আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না। চূড়ান্ত গন্তব্যের কথা স্বরণ রেখে আমাদের ধৃঢ়তার সাথে এগিয়ে যেতে হবে।

সুরা মুলকের ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন,


 اَفَمَنۡ یَّمۡشِیۡ مُکِبًّا عَلٰی وَجۡہِہٖۤ اَہۡدٰۤی اَمَّنۡ یَّمۡشِیۡ سَوِیًّا عَلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ‘যে লোক উপুড় হয়ে মুখের ভরে চলে সেই কি অধিক সৎপথপ্রাপ্ত, না সেই লোক যে সোজা হয়ে সরল সঠিক পথে চলে?’ [কুরআন ৬৭ঃ২২]

বৈশ্বিক মহামারীর ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েছে অথবা হতাশায় ভুগছে। আমাদের সত্যিকার অর্থেই নিজেদের চ্যলেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া উচিৎ এবং মেনে নেওয়া উচিৎ যে এই দুনিয়াই শেষ নয়। আমরা এখানে চিরদিনের জন্য বসবাস করছি না। অন্যান্য সবকিছুর মতো এটাজীবনটা ঠিক ভ্রমনের মতো। আর ভ্রমনের রাস্তা রয়েছে। আর সরল রাস্তার স্পষ্ট শুরু ও শেষ রয়েছে। ইসলামি ধর্মতত্বে আল্লাহ আমাদের স্বরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে আমরা তারঁ কাছ থেকেই এসেছি এবং তাঁর কাছেই ভ্রমন শেষে আমাদের ফিরে যেতে হবে।


এই স্বরণিকা বর্তমান কঠিন সময়ে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, এটি আমাদের গন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্বরণ করে দেয় আমরা এখন চূড়ান্ত ধাপ নয়; বরং প্রথম ধাপ অতিক্রম করছি।

অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব। তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত।’ [বাকারাঃ ১৫৫-১৫৭]


এছাড়াও সরল পথ দুই প্রান্তিকতার মাঝামাঝি পথ। একজন ব্যক্তি হতাশায় প্রতিক্রিয়াশীল যেমন হয় না, তেমনি উদাসীনতা বা বিস্মৃতিতেও ভোগে না। সরল পথ হচ্ছে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে ভারসাম্য ও সংযমের পথ অবলম্বন করা।


চূড়ান্ত গন্তব্যের কথা স্বরণে রাখার আধ্যাত্মিক ফায়দা হচ্ছে এটি ব্যক্তিকে হতাশা হতে মুক্তি দেয়। পরিস্থিতির যত উন্নতি হোক অথবা পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন, এটাই শেষ নয়। ফলস্বরূপ ব্যক্তি তার অন্তর ও আত্বাকে তার সৃষ্টিকর্তার সাথে সংযুক্ত করার কারণে এবং তার ভবিষ্যৎ গন্তব্যের মুক্তির বিশালত্বের কথা মনে করে নিজের মাঝে শক্তি ও স্বস্থি অনুভব করে।

اِنَّ الَّذِیۡنَ قَالُوۡا رَبُّنَا اللّٰہُ ثُمَّ اسۡتَقَامُوۡا تَتَنَزَّلُ عَلَیۡہِمُ الۡمَلٰٓئِکَۃُ اَلَّا تَخَافُوۡا وَ لَا تَحۡزَنُوۡا وَ اَبۡشِرُوۡا بِالۡجَنَّۃِ الَّتِیۡ کُنۡتُمۡ تُوۡعَدُوۡنَ  نَحۡنُ اَوۡلِیٰٓؤُکُمۡ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَ فِی الۡاٰخِرَۃِ ۚ وَ لَکُمۡ فِیۡہَا مَا تَشۡتَہِیۡۤ اَنۡفُسُکُمۡ وَ لَکُمۡ فِیۡہَا مَا تَدَّعُوۡنَ ‘নিশ্চয় যারা বলে- আল্লাহই আমাদের রব, অতঃপর অবিচল থাকে, ফেরেশতারা তাদের কাছে নাজিল হয় (এবং বলে,) ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর তোমাদেরকে যার ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল। আমরা দুনিয়ার জীবনে তোমাদের বন্ধু এবং আখিরাতেও। সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে যা তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আরো থাকবে যা তোমরা দাবি করবে।’ [৪১ঃ ৩০-৩১]


পঞ্চম পাঠ

আল্লাহর দিকে ফিরতে থাকুন, তাঁর কাছেই আশা রাখুন


এই দুনিয়ার আশায় অতিরিক্ত সময় অপচয় না করার চেষ্টা করুন। আপনার নিয়ন্ত্রনের বাহিরের বিষয়ের ব্যাপারে হতাশা, চাপ ও দুশ্চিন্তা আপনাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। যতটুকু সম্ভব করুন, বাকিটা তাঁর ওপর ছেড়ে দিন। বিশ্বাস এবং সমর্পনের মাঝে শান্তি ও কৃপার খোজঁ করুন।

সুরা আল মুলকের ২৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলছেন-

قُلۡ ہُوَ الرَّحۡمٰنُ اٰمَنَّا بِہٖ وَ عَلَیۡہِ تَوَکَّلۡنَا ۚ فَسَتَعۡلَمُوۡنَ مَنۡ ہُوَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ ‘বলুন, তিনি পরম করুণাময়, আমরা তাঁর উপর বিশ্বাস রাখি এবং তাঁরই উপর ভরসা করি। সত্ত্বরই তোমরা জানতে পারবে, কে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় আছে।’ [৬৭ঃ২৯]


উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যে নামটি তাঁর নিজের জন্য পছন্দ করেছেন, সেটি হচ্ছে ‘আর-রহমান’, এটি ‘করুনাময়’-এর সুপারলেটিভ ডিগ্রি। এর মানে অতুলনীয়ভাবে ‘করুনাময়’। আরবিতে ‘গর্ভ’ শব্দটি আল্লাহর নাম ‘আর-রহমান’ থেকে নেওয়া হয়েছে। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) বলেন,

‘আমি রসুল(সা) কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন- মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-আমিই আল্লাহ এবং আমিই আর রহমান। আমি রহিম (গর্ভ) সৃষ্টি করেছি এবং এটিকে আমার নামেই নামকরণ করেছি.... [জামে আত তিরমিজি ]

উপরোক্ত আয়াতে আমাদের আদেশ করা হচ্ছে যে, আমরা যেন আল্লাহর ওপর ভরসা করি এবং আল্লাহর ওপর আস্থা রাখি। আমরা যদি ‘গর্ভের’ প্রাথমিক ধাপের দিকে তাকাই, দেখব- কে এই সন্তানকে তার মায়ের গর্ভে সাহায্য করছিলেন? কে তাকে খাওয়াচ্ছিলেন এবং চারদিকে চলাফেরা করাচ্ছিলেন এবং তার পুরোপুরি দেখভাল করছিলেন?

তিনি আর-রহমান। এমনকি মা, যিনি তার সন্তানের ব্যপারে সবচেয়ে করুনাময়ী, তিনিও এ ব্যপারে নিজে কোনো পরিকল্পনা করার ক্ষমতা রাখেন না। মায়ের গর্ভে এই যে সন্তানের সুখকর পরিবেশের সৃষ্টি, তার রিজিকের ব্যবস্থা ও তার বেঁচে থাকা, এসবই আল্লাহর হাতেই আমরা ছেড়ে দেই। তিনিই হচ্ছেন সেই সত্তা, যাকে আমরা বিশ্বাস করি এবং যার উপর আমরা আস্থা রাখি। তিনি নিখুঁতভাবে আমাদের দেখভাল করার ক্ষমতা রাখেন এবং তা তিনি করেন।


ষষ্ট পাঠ

তাঁর করুণার কথা স্মরণ করে ব্যক্তি আত্মসমর্পণ করতে পারে


এর মানে কি আমরা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে অবহেলা করছি? অবশ্যই না। আমাদের ‘মাধ্যম’ গ্রহনের জন্য পুরস্কৃত করা হয় এবং আল্লাহ তায়ালা যত ধরনের ‘মাধ্যম’ আমাদের দিয়েছেন, সবই তার রহমতের অংশ। নবিজি(সা) ‘কোয়ারেন্টাইন’ এর ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে একজন অসুস্থ ব্যক্তি আর একজন সুস্থ ব্যক্তিকে একত্রে না রাখা হয়। এছাড়াও প্রাত্যহিক স্বাস্থবিধিও মেনে চলার কথা বলেছেন। আরও একটি সার্বিক প্রেক্ষাপট নবিজি (সা) উদাহরণস্বরূপ আমাদের এ হাদিসে শিখাচ্ছেন। উক্ববা বিন আমির হতে বর্নিতঃ

‘আমি রসুল (সা)-কে প্রশ্ন করি, “কীভাবে মুক্তি (পরিকালীন) লাভ করা যায়?” তিনি উত্তর দেন, “তোমার জিহ্ববাকে সংযত করো, তোমার বাসায় অবস্থান করো আর তোমার কৃত পাপসমূহ নিয়ে ক্রন্দন করো।” [তিরমিজি]

এই উপদেশটি আজকের দিনে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

  • বাসায় অবস্থান করুনঃ এটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের একটি আন্তর্জাতিক আবেদন। আর এটি রসুলুল্লাহ (সা) আমাদের করতে বলেছেন সাড়ে ১৪০০ বছর আগে। বাড়িতে অবস্থান একজন ব্যক্তিকে তার চিন্তা-চেতনা ধারন করতে সাহায্য করে এবং সম্ভাব্য কোনো ক্ষতি হতে রক্ষা করে।        
  • নিজের জিহ্ববাকে সংযত করুনঃ আপনার মাথায় যত যা চিন্তা আছে, পুরোটাই অন্যদের দিকে ছুঁড়ে দিতে হবে, এমনটা না। অন্যদের সকল চিন্তা থেকেও আপাতত নিজেকে হেফাজত করুন। বাড়তি পেরেশানি নেওয়ার কোনো দরকার নাই। ফোনের প্রতি আসক্তি এবং ২৪ ঘন্টা মিডিয়ার খবরাখবর নিয়ে পরে থাকাটা আপনার মনের ওপর বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। বরং, সময়টাকে আরামদায়ক করে তুলতে ক্ষতিকর, অনর্থক বিষয় এড়িয়ে নিরবতাকে অবলম্বন করুন।        
  • নিজের কৃত পাপের জন্য অনুতপ্ত হোনঃ যেভাবে পানি দ্বারা শরীর পরিস্কার হয়, তেমনি নিজের দূর্বলতা ও ত্রুটি মেনে নিয়ে আন্তরিকতা আর নম্র চোখের পানি দ্বারাও অন্তর পরিস্কার হয়। বিনম্রতা মহা শক্তিশালী সত্তার শক্তিশালী সাহায্য নিয়ে আসে। যেমন রসুল (সা) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট বিনয়ী হবে, আল্লাহ তার মর্যাদাকে অবশ্যই বুলন্দ করবেন।’


চলমান আরোপিত অবরুদ্ধতা ও নির্জনতা আমাদের অন্তর্দৃষ্টি ও জবাবদিহিতার আদেশ দেয়। এটি ব্যক্তির জীবনের উদ্দেশ্য, ত্রুটি ও কার্যাবলির সংশোধনে দৃষ্টির দরজা খুলেখুলে দেয় এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ রুপে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য ‘মাধ্যম’ গ্রহণ করার গুরুত্বকে অস্বীকার করা নয়, বরং বস্তুগত মাধ্যম গ্রহণ এবং মহা চিকিৎসক আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাটাই মূল উদ্দেশ্য। এটি একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রক্রিয়া; যা একই সাথে শারীরিক চাহিদা পূরনের সাথে সাথে আত্মার চাহিদাও পুরণ করে।


শেষ কথা

এই বৈশ্বিক মহামারীর পূর্বে আমরা অনেক তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিলাম। আমরা অনেক বেশি দৌড়-ঝাপের মাঝে ছিলাম। আমরা বর্তমানটাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু এখন আমরা ‘লকডাউনে’ বাধা পড়েছি। পুরো বিশ্বই লকডাউনে। আল্লাহ আমাদের শরীরকে সীমাবদ্ধ করেছেন, যাতে আমাদের অন্তর চলাফেরা করতে পারে। শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সকল ক্ষেত্রেই নীড়ে ফিরে আসার এখনই সময়। শরীর নিয়ে আমাদের ঘরে ফেরার, আর আত্মাকে নিয়ে আল্লাহর নিকট ফেরার। কারণ, আমাদের আত্মারও তার বাড়ির সাথে সংযোগ স্থাপনের প্রয়োজন।

‘নিশ্চই আমরা আল্লাহরই, এবং নিশ্চই তাঁর কাছেই আমাদের প্রত্যাগমণ হবে।’
 اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ تَطۡمَئِنُّ قُلُوۡبُہُمۡ بِذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ اَلَا بِذِکۡرِ اللّٰہِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়’। [১৩ঃ২৮]


[ এই আর্টিকেল আপনার কাছে উপকারি বিবেচিত হলে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন।]


১০০৭ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

দিনা মোহাম্মদ বাসিওনি। প্রোডাকটিভ মুসলিম কোম্পানির চিফ কন্টেন্ট অফিসার। তিনি মিশরের কায়রো ভিত্তিক লেখিকা এবং প্রায়শই বিশ্ব ইসলামিক প্ল্যাটফর্মের জন্য লেখেন।

অনুবাদক পরিচিতি

তৌফিক এলাহী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকাতে। পড়াশুনা করছি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি বিভাগে। দ্বীনের খেদমতে অনেকগুলো কাজের পাশাপাশি অনুবাদের কাজ বেছে নিয়েছি। একটি ইসলামি সমাজ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখি ।

মন্তব্য

৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে
ফাতিহ সাত্তার

ফাতিহ সাত্তার

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ - ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন

ভালো লাগল। শেয়ার দিলাম। চিন্তাধারা নিয়মিত আর্টিকেল প্রকাশ করছে না কেন? এমন আর্টিকেল নিয়মিত আসা উচিৎ। আমাদের চিন্তার দ্বার উন্মুক্ত হোক। লেখক ও অনুবাদককে অনেক ধন্যবাদ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
তৌফিক এলাহী

তৌফিক এলাহী

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ - ১৭:২৪ অপরাহ্ন

জাযাকাল্লাহ খইরন

মুজাহিদুল ইসলাম

মুজাহিদুল ইসলাম

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ - ১৭:০০ অপরাহ্ন

এখন থেকে নিয়মিত হচ্ছে বোধহয়; গত এক সপ্তাহে তিনটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে।

রফিকুল ইসলাম সৌরভ

রফিকুল ইসলাম সৌরভ

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ - ১৪:৩৩ অপরাহ্ন

মাশ-আল্লাহ! অনেক অনেক ভাল লাগলো।সমকালীন প্রেক্ষাপটে খুবি গুরুত্বপূর্ন আলোচনা। আল্লাহ লেখিকা ও অনুবাদক কে উত্তম প্রতিদান দান করুক।আমিন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
তৌফিক এলাহী

তৌফিক এলাহী

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ - ১৭:৪৭ অপরাহ্ন

আমিন

একে মাসুম

একে মাসুম

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ - ০০:৪৮ পূর্বাহ্ন

অসাধারণ বিশ্লেষ! জাযাকাল্লাহ খায়ের মুহতারাম

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
তৌফিক এলাহী

তৌফিক এলাহী

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ - ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন

বারাকাল্লাহু ফী

Noor Nabi.. Cape Town

Noor Nabi.. Cape Town

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ - ১২:২০ অপরাহ্ন

মাশাআল্লাহ, আল্লাহ পাক ভাই‌য়ের মেধায় বরকত দান করুন, আমীন। ;২য় পা‌ঠে উ‌ল্লে‌খিত সূরা মূল‌কের ২০ নং আয়া‌তের অ‌নুবা‌দেঃ Al-Mulk 67:20 اَمَّنْ هٰذَا الَّذِيْ هُوَ جُنْدٌ لَّكُمْ يَنْصُرُكُمْ مِّنْ دُوْنِ الرَّحْمٰنِ ؕ اِنِ الْكٰفِرُوْنَ اِلَّا فِيْ غُرُوْرٍ ۚ দয়াময় ছাড়া কে তোমাদেরকে সাহায্য করবে তোমাদের সেনাবাহিনী হয়ে? কাফিররা তো কেবল ধোঁকার মধ্যে পড়ে আছে। বি‌শেষ ক‌রে يَنْصُرُكُمْ শ‌ব্দ দ্বারা সাহায‌্য বুঝা‌নো হ‌য়ে‌ছে। বারাকাল্লাহু ফি 💚💚

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...