সুরা ফাতিহার মহত্ত্ব

সুরা আল-ফাতিহা কুরআনের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সুরা। প্রথমত এই সুরা দিয়েই পবিত্র কুরআনের শুরু হয়েছে এবং এই সুরা দিয়েই সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত সালাত শুরু হয়। অবতরণের দিক থেকে এটি সর্বপ্রথম পূর্নাঙ্গ সুরারূপে নাযিল হয়। তবে সুরা ইকরা, সুরা মুজাম্মিল ও সুরা মুদাসসিরের কয়েক আয়াত সুরা ফাতিহার পূর্বে নাজিল হয়। কিন্তু পূর্নাঙ্গ সুরা হিসেবে সুরা ফাতিহাই প্রথম। এ জন্যেই এই সুরার নাম 'ফাতিহাতুল কিতাব বা কুরআনের উপক্রমণিকা' রাখা হয়েছে। সুরা ফাতিহার আরেকটি নাম আলহামদু শরিফ


আরেকটি নাম হচ্ছে উম্মুল কুরআন তথা কুরআনের জননী। এই সুরা দিয়ে কুরআন শুরু হয়েছে বলে সুরাটি কুরআনের মা স্বরূপ।

ইমাম বুখারি র. সহিহ বুখারির কিতাবুত তাফসিরে লিখেছেন, এই সুরাটির উম্মুল কুরআন রাখার কারণ এই যে, কুরআন মাজিদের লিখন এ সুরা হতেই শুরু হয়ে থাকে এবং সালাতের কিরাতও এ থেকে শুরু হয়। একটি অভিমত এ-ও পাওয়া যায় যে, যেহেতু পূর্ণ কুরআনের বিষয়াবলী এর মধ্যে নিহিত আছে, সেহেতু এর নাম উম্মুল কুরআন হয়েছে। ইবনে জারির র. বলেন, আরব দেশের মধ্যে এ প্রথা চালু আছে যে, তারা একটি ব্যাপক কাজ বা কাজের মূলকে ওর অধীনস্থ শাখাগুলোর 'উম্ম' বা 'মা' বলে থাকে। যেমন মক্কাকে উম্মুল কুরা বলার কারণ এই যে, ঐটাই সারা বিশ্ব জাহানের প্রথম ঘর। বলা হয়ে থাকে পৃথিবী সেখান থেকেই ব্যপ্তি ও বিস্তার লাভ করেছে।


এই সুরার আরেকটি নাম সাবউ মাসানি অর্থাৎ অনুপম বাণী সপ্তক। সর্ববাদী সম্মত মত এই যে, এই সুরায় সাতটি আয়াত রয়েছে। মাসানি বলা হয় এই কারণে যে, সুরাটি একবার মক্কা শরিফে আরেকবার মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। তবে অধিকতর বিশুদ্ধ মত এই যে, মক্কা শরিফই এই সুরার অবতরণ স্থল।


সুরাটি মাক্কি হওয়ার ব্যাপারে বিশুদ্ধতা হচ্ছে ইবনে আব্বাস রা., কাতাদাহ র. ও আবু আলিয়া র. বলেন যে, এই সুরাটি মাক্কি। কেননা এক আয়াতে আছে যে,


"আমি তো আপনাকে দিয়েছি সাত আয়াত যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয় এবং দিয়েছি মহান কুরআন। সুরা হিজর, আয়াত: ৮৭।

আর এটায় সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। সুরা হিজর সকলের ঐক্যমতে মাক্কি সুরা।  


আল-হামদু সুরার আরেকটি নাম সুরা কানজ (ভাণ্ডার)। হজরত আলি রাদিআল্লাহু তাআলা আনহু থেকে ইসহাক ইবনে রওয়াহা বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন এই সুরাটি আরশের নিম্নস্থিত ভাণ্ডার থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। সুরা ফাতিহার আরেকটি নাম'সুরা ফাতিহার মহত্ত নামক আর্টিকেলে আমরা এ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করব ইনশাআল্লাহ। 


'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' নিয়ে মতবিরোধ আছে। কেউ বলছেন এট সুরা ফাতিহার অন্তর্ভুক্ত। আবার কেউ বলছেন এটা সামগ্রিকভাবে এটি কুরআন শরিফের এমনই একটা আয়াত, প্রতিটি সুরাই এ দিয়ে শুরু হয়েছে। সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য হচ্ছে এটা সুরা ফাতিহার অন্তর্ভুক্ত। এটা নিয়েই সুরা ফাতিহার আয়াত সংখ্যা সাতে দাঁড়ায়। সুরা হিজরের ৮৭ নাম্বার আয়াতটি সর্বসম্মতিক্রমে সুরা ফাতিহাকেই বোঝানো হয়েছে।



সুরা ফাতিহার মহত্ত্ব 


আবূ সাঈদ ইবনু মুআল্লা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

আমি একদা মাসজিদে নাববীতে সলাত আদায় করছিলাম, এমন সময় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে ডাকেন। কিন্তু ডাকে আমি সাড়া দেইনি। পরে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি সলাত আদায় করছিলাম। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ কি বলেননি যে, ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা সাড়া দেবে আল্লাহ্ ও রসূলের ডাকে, যখন তিনি তোমাদেরকে ডাক দেন -সুরা আনফাল, আয়াত:২৪। তারপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার আগেই তোমাকে আমি কুরআনের এক অতি মহান সুরা শিক্ষা দিব। তারপর তিনি আমার হাত ধরেন। এরপর যখন তিনি মাসজিদ থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করেন তখন আমি তাঁকে বললাম, আপনি কি বলেননি যে আমাকে কুরআনের অতি মহান সুরা শিক্ষা দিবেন? তিনি বললেন, الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য যিনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক, এটা বারবার পঠিত সাতটি আয়াত এবং মহান কুরআন যা কেবল আমাকেই দেয়া হয়েছে৷  —সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৪৪৭৪


আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত,

একবার আমরা সফরে চলছিলাম। (পথিমধ্যে) অবতরণ করলাম। তখন একটি বালিকা এসে বলল, এখানকার গোত্রের সরদারকে সাপে কেটেছে। আমাদের পুরুষগণ বাড়িতে নেই। অতএব, আপনাদের মধ্যে এমন কেউ আছেন কি, যিনি ঝাড়-ফুঁক করতে পারেন? তখন আমাদের মধ্য থেকে একজন ঐ বালিকাটির সঙ্গে গেলেন। যদিও আমরা ভাবিনি যে সে ঝাড়-ফুঁক জানে। এরপর সে ঝাড়-ফুঁক করল এবং গোত্রের সরদার সুস্থ হয়ে উঠল। এতে সর্দার খুশী হয়ে তাকে ত্রিশটি বক্‌রী দান করলেন এবং আমাদের সকলকে দুধ পান করালেন। ফিরে আসার পথে আমারা জিজ্ঞেস করলাম, তুমি ভালভাবে ঝাড়-ফুঁক করতে জান (অথবা রাবীর সন্দেহ) তুমি কি ঝাড়-ফুঁক করতে পার? সে উত্তর করল, না, আমি তো কেবল উম্মুল কিতাব- সুরা ফাতিহা দিয়েই ঝাড়-ফুঁক করেছি। আমরা তখন বললাম, যতক্ষণ না আমরা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর কাছে পৌছে তাঁকে জিজ্ঞেস করি ততক্ষণ কেউ কিছু বলবে না। এরপর আমরা মদিনায় পৌছে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর কাছে ঘটনাটি বললাম। তিনি বললেন, সে কেমন করে জানল যে, তা (সুরা ফাতিহা) রোগ আরোগ্যের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে? তোমরা নিজেদের মধ্যে এগুলো বন্টন করে নাও এবং আমার জন্যও একটা ভাগ রেখো। আবূ মা’মার ..... আবূ সাঈদ থেকে এ রকমই বর্ণনা করেছেন।

 —সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫০০৭


উপরোক্ত হাদিসদ্বয় দ্বারা সুরা ফাতিহার মহত্ত্ব অনেকাংশে অনুধাবিত হয়। এখান থেকে সুরা ফাতিহার নাম সুরা শিফা হওয়াটা পরিপূর্ণরূপে উন্মোচিত হয়েছে। এই সুরা দিয়ে চিকিৎসাও করা যায়। কিছু আলেমগণ সুরা ফাতিহা দিয়ে চিকিৎসা করে থাকে।


সুরা ফাতিহা একদিক দিয়ে সমগ্র কুরআনের সারসংক্ষেপ। এই সুরায় সমগ্র কুরআনের সারমর্ম সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআনের অবশিষ্ট সুরাগুলো প্রকারান্তরে সুরা ফাতিহারই বিস্তৃত ব্যাখ্যা। কারণ, সমগ্র কুরআন ঈমান ও নেক আমলের আলোচনায় কেন্দ্রীভূত। আর এ দু'টি মূলনীতিই এই সুরায় সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যে ব্যক্তি কুরআন তেলাওয়াত বা অধ্যয়ন করবে তার জন্য এ মর্মে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সে যেন প্রথমে পূর্বঘোষিত সকল জাহিলি যুগে ধ্যান-ধারণা অন্তর থেকে দূরীভূত করে একমাত্র সঠিক পথের সন্ধানের উদ্দেশ্যে এ কিতাব তেলাওয়াত শুরু করে এবং মহান আল্লাহর নিকট এ দুয়া করে যে, তিনি যেন তাকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ প্রদর্শন করে।


কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ তাআলা একশো চারটি আসমানি কিতাব পাঠিয়েছেন, যার সম্পূর্ণ জ্ঞান চারটি বড়ো আসমানি কিতাবে রয়েছে। আর চারটি বড়ো আসমানি কিতাবেত সমস্ত জ্ঞান কুরআন মাজিদে রয়েছে। আর কুরআনের সমস্ত জ্ঞান সুরা ফাতিহায় রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহার ব্যাখ্যা বুঝতে পারল, সে সমস্ত আসমানি কিতাব সম্পর্কে জ্ঞানার্জনে সমর্থ হলো।


সুরা ফাতিহার সম্মানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই সুরার আয়াতগুলো সাতটি হরফ থেকে মুক্ত। সেগুলা যথাক্রমে: ث, ج, خ, ز, ش, ظ, ف। কেননা এই সাতটি অক্ষর আযাবের সাথে সম্পর্কিত। নিচে পর্যায়ক্রমে অক্ষরগুলো বর্ণনা করা হলো:

  • ১. ث অক্ষরে ثبور[ছুবূর] শব্দ গঠিত। যার অর্থ: ধ্বংস, বিনাশ, ক্ষয়, দুঃখ, কষ্ট, দূর্ভোগ ও মৃত্যু। 
  • ২.ج অক্ষরে جهنم[জাহান্নাম] শব্দ গঠিত।
  • ৩.خ অক্ষরে خزي [খাযা] শব্দ গঠিত। যার অর্থ: লাঞ্ছিত করা, অপমান করা, অসম্মান করা ও নিরাশ করা।
  • ৪. ز অক্ষরে زفير [যাফীর] শব্দ গঠিত। যার অর্থ: বিলাপ করা, গাধার ডাক, দুর্যোগ ও বিপদ।
  • ৫. ش অক্ষরে شهيق [শাহীক] শব্দ গঠিত। যার অর্থ: গাধার ডাক, কর্কশ স্বর, চিৎকার ও বিলাপ ইত্যাদি। 
  • ৬. ظ অক্ষরে ظلم [যুলম] শব্দ গঠিত। যার অর্থ: অত্যাচার, অবিচার, নির্যাতন ও অন্ধকার ইত্যাদি। 
  • ৭. ف অক্ষরে فراق [ফিরাক] শব্দ গঠিত। যার অর্থ: বিচ্ছেদ, বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কহীনতা, সংযোগহীনতা ও বিভেদ ইত্যাদি। 


মহান আল্লাহর মহানুভবতা এখানে স্পষ্টরূপে ফুটে উঠে। তিনি যেভাবে কাফিরদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যেন তারা কুরআনের একটি আয়াতের মত আয়াত লিখে দিতে। যেখানে এই মহা ঐশ্বরিক জ্যোতির্ময় কিতাবের একটি আয়াতের তাৎপর্যও মানুষের জন্য সম্পূর্ণরূপে বোঝা সম্ভব নয়; সেখানে এর অনুরূপ একটি আয়াত রচনা করা কিভাবে সম্ভব! কেউ কেউ এই সাতটি অক্ষরের অনুপস্থিতি দ্বারা সুরা ফাতিহার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন, যদি কেউ সুরা ফাতিহা তাকে মুক্তি দেবে এই বিশ্বাসে তেলাওয়াত করে তবে জাহান্নামের সাতটি দরজা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহই সর্বজ্ঞ। 



মহান রবের প্রশংসা 

ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। 


সমস্ত কিছুর প্রশংসা করা হয় কেবল মাত্র আল্লাহর। আল্লাহ সেই সত্তাকে বলা হয় যিনি অতি পবিত্র। তিনি জগতের সকল দোষ-ত্রুটি থেকে পাক ও পবিত্র। তাঁর প্রশংসা ٱلْحَمْدُ শব্দ দিয়েই করা যায়। তাই এখন ٱلْحَمْدُ থেকেই শুরু করা যাক।


কুরআনের ভাষা অত্যন্ত তাৎপর্যময়। ٱلْحَمْدُ শব্দটির মধ্যে مدح ও شكر শব্দ দু'টি বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে ٱلْحَمْدُ শব্দের বাংলা হয় না। তবে উল্লেখিত শব্দদ্বয় বিশ্লেষণ করে আমরা ٱلْحَمْدُ শব্দটির তাৎপর্য কিছুটা অনুধাবন করতে সমর্থ। مدح শব্দের অর্থ প্রশংসা,গুণগান বা তারিফ। কিন্তু এই শব্দটি উপস্থিত কোনো কিছু থাকা উপর বর্তায়। সেটা জীব বা জড়, জ্ঞানবান কিংবা জ্ঞান ছাড়া। প্রশংসা করার জন্য সত্তা থেকে যে সবসময় উপকার পেতে হবে তা নয়। মানে উপকার পাওয়ার পরই যে প্রশংসা করা হবে সেটা না। আবার مدح শব্দটি কখনো উপকার বা ভালো কিছু ঘটার পর ব্যবহৃত হয় আবার কখনো কোনো কিছু ঘটার পূর্বে ব্যবহার হয় । সুতরাং, বোঝা গেল মহান রবের প্রশংসার জন্য مدح শব্দটি যথোপযুক্ত নয়। 


অন্যদিকে شكر শব্দটির অর্থ- কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা। এই শব্দটি দ্বারা কোনো উপকার বা নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন হবার পর সত্তার প্রশংসা করা হয়। شكر শব্দটি কাজ সংঘটিত হওয়ার পর সত্তাকে ইঙ্গিত করে প্রশংসা করার জন্য নির্দিষ্ট। প্রশংসা আর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার বিষয়টি একটু পরিষ্কার করা যাক:


১.প্রশংসা مدح : কোনো বস্তুর প্রশংসা করার জন্য তার প্রশংসাযোগ্য গুণগুলো থাকা প্রয়োজন। সেটা জীব বা জড় যা-ই হোক। যেমনঃ ভালো ছাত্র ও ভালো খাবার। এই সমস্ত বিষয়ের প্রশংসা উপকার পাওয়ার পরই যে করতে হয় তা নয়। 


২. কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন شكر : মানুষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে কোনো সত্তা থেকে উপকৃত হওয়ার পর। সেটা অবশ্যই কাজ সংঘটিত হওয়ার পর। 


যখন কেউ مدح বা شكر বলে প্রশংসা বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে তখন সেটা একটা নির্দিষ্ট অবস্থার দিকে ইঙ্গিত প্রদান করে। কিন্তু যখন ٱلْحَمْدُ শব্দের ব্যবহার করবে তখন সত্তা হিসেবে কেবল মহান আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা বোঝাবে। নাহুর পরিভাষায় ٱلْحَمْدُ এর ٱلْ হচ্ছে (الاستغراقية) অর্থাৎ এই ٱلْ দ্বারা সকল দল উপদলের যাবতীয় প্রশংসাবাচক শব্দের সন্নিবেশ ঘটিয়েছে ٱلْحَمْدُ শব্দে। ٱلْحَمْدُ শব্দের দ্বারা সকল প্রশংসার মালিক আল্লাহকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। প্রশংসার সকল গুণাবলী তাঁর মধ্যে বিদ্যমান। আবার এর সাথে সাথে আমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি তাঁর নিয়ামত ভোগ করে। সুতরাং কেবল مدح বা شكر শব্দ দিয়ে এই বিস্তৃত অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়।


আমরা আল্লাহ প্রশংসা করছি কেননা প্রশংসা করার যাবতীয় গুণাবলী তাঁর মধ্যে আছে। আমরা সেটা পরিক্ষিত হই বা না হই। আবার তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি তাঁর নিয়ামত গ্রহণ করে। তাঁর নিয়ামত ভোগ করে আমরা প্রকৃতপক্ষে, কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা দুইটাই প্রকাশ করি। আমরা যদি مدح শব্দ ব্যবহার করতাম তবে এর দ্বারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হত না। আবার যদি شكر শব্দ ব্যবহার করতাম তবে সেটা প্রশংসা করা হত না।


আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ পুরো শব্দটি আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য ব্যবহৃত হয়। চমৎকার বিষয়টি হচ্ছে এই শব্দে আটটি অক্ষর রয়েছে। আর জান্নাতের সংখ্যাও আটটি।


জগতের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। মানব ও জীন তাঁর ইবাদত করে। তবে সকল সৃষ্টিই তার জগতের অন্তর্ভুক্ত। কল্পনাতীত এই মহাবিশ্ব নিয়ে পিঁপড়া থেকে ছোটো ব্যাকটেরিয়াও তাঁর জগতের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে কিছু সংঘটিত হয় না।


বান্দা যখন বলে "ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ"। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,

"আমার বান্দা আমার প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে।" বান্দা যখন বলে, "رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ"। আল্লাহ তাআলা বলেন," আমার বান্দা সাক্ষ্য দিচ্ছে জগতের প্রতিপালক আমি।মানুষ, জীন, মালাইকাসহ সকল সৃষ্টির স্রষ্টা আমি।"


আল্লাহ তাআলার জগতের ন্যূনতম ধারণা করার ক্ষমতা মানুষের নেই। আধুনিক বিজ্ঞানের মহাকাশ সম্পর্কিত গবেষণা কেবল ব্ল্যাকহোলের কোনো সমাধান আবিষ্কার করতে সমর্থ হইনি সেখানে মহান আল্লাহ তো দূরে থাক তাঁর বিশাল জগতের কি ধারনাই বা আছে তাদের। স্রষ্টা সম্পর্কিত নাস্তিকদের অহেতুক বিব্রতকর প্রশ্ন কেবল তাদের মূর্খতার বহিঃপ্রকাশ। 


আরবি শব্দ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ ইসলামি বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম বর্ণনা করছে এবং এটা বলছে যে, প্রতিপালনের যাবতীয় স্বীকৃতি ও ঘোষণা একক ও সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর জন্যে এবং এর স্বীকৃতি ইসলামি আকিদা ও বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আরবি ভাষায় রব বলতে এমন ক্ষমতাসম্পন্ন মালিককে বোঝায় যিনি তার অধীনস্থ প্রতিটি জিনিসকে নিজেই লালন পালন করেন। এর যাবতীয় দেখাশোনা ও তদারকি করা থেকে তার সংশোধন, পরিমার্জন ও রক্ষণাবেক্ষণের সব ধরনের ব্যবস্থা পাকাপাকি বন্দোবস্ত তিনিই করেন। যেহেতু আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টিকুলে ও বিশ্বচরাচরের প্রতিটি বস্তুর স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ও মালিক, তিনি যেহেতু একাই সমগ্র জাহান সৃষ্টি করেছেন, লালন করেন ও সার্বিক পরিচালনা করেন তাই তিনিই হচ্ছেন رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ— সৃষ্টিকুলের রব।


কত চমৎকার ভাষায় আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রশংসা করার ভাষা শিখিয়ে দিচ্ছেন! তিনি যেমন পবিত্র সত্তা তাঁর যথোপযুক্ত প্রশংসা করার জন্য তিনি তেমন উঁচুমানের ভাষা বান্দাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা হাদিস থেকে জানতে পারি মহান আল্লাহ তাআলা নিজের প্রশংসা শুনতে পছন্দ করেন।



তিনিই দয়ালু

ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ


যিনি পরম দয়ালু, অতিশয় করুণাময়।


এই আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর গুণ দয়া প্রসঙ্গ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ শব্দদ্বয়ের দ্বারা বর্ণনা করেছেন। উভয় শব্দই গুণের আধিক্যবোধক বিশেষ্য। এই শব্দে আল্লাহ তাআলা অসাধারণত্ব ও পূর্ণতার কথা বোঝায়।এ স্থানে এই গুণের উল্লেখ সম্ভবত এই জন্য যে, আল্লাহ তাআলা যে সমগ্র সৃষ্ট জগতের লালন-পালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং গ্রহণ করেছেন। এতে তাঁর নিজেস্ব কোনো প্রয়োজন নেই বা অন্যের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েও নয়; তাঁর রহমত বা দয়ার তাকিদেই তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। যদি সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্ব না থাকে, তাতেও তাঁর কোনো লাভ ক্ষতি নেই। আর যদি সমগ্র সৃষ্টি তাঁর অবাধ্য হয়ে যায় তবে তাতেও তাঁর কোনো লাভ ক্ষতি নেই।


এই আয়াতে ٱلرَّحْمَٰنِ শব্দ দ্বারা এমন নিয়ামত বা রহমতের কথা বলা হয়েছে যা কোনো সৃষ্টির কল্পনার মধ্যে না। আর ٱلرَّحِيمِ হচ্ছে ঐ ধরনের নিয়ামত বা রহমত যা সাধারণত আমরা তাঁর কাছে আশা করি। ٱلرَّحْمَٰنِ শব্দটা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। অর্থাৎ এমন দয়া কারও জন্য সম্ভব নয়। আর অপরদিকে ٱلرَّحِيمِ শব্দটি তাঁর এবং অন্য কোনো কিছুর সাথে ব্যবহার করা যায়। এ জাগায় আমরা বড়ো ধরণের পাণ্ডিত্যপূর্ণ কর্ম উপলব্ধি করতে পারি। মহান আল্লাহ প্রথমে ٱلرَّحْمَٰنِ শব্দ এনে তাঁর একত্ববাদ নিশ্চিত করেন। তিনি এ শব্দের দ্বারা অনন্যভাবে তাঁর বড়োত্ব প্রকাশ করছেন। আর ٱلرَّحِيمِ শব্দটি মর্যাদার স্থান থেকে ছোটো হওয়ায় সেটা পরে এনেছেন। যদি তিনি ٱلرَّحِيمِ শব্দটি আগে আনতেন তবে তাঁর দয়া সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থেকে যেত যা আল্লাহর মর্যাদার সাথে গোস্তাখি। কিন্তু যখন ٱلرَّحْمَٰنِ শব্দটি শুরুতে এনেছেন তখন আর এমন তুচ্ছ বিষয় মাথায় আসে না। কেননা কোনো বড়োত্ব ও মহত্ত্বের কাছ থেকে তুচ্ছ বিষয় কামনা করা হয় না। 


মহান আল্লাহর করুণার ধারণা পাওয়ার জন্য কয়েকটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিচ্ছি। যেমন আল্লাহ বলেন, "অতঃপর আমার আযাব যখন উপস্থিত হল, তখন আমি সালেহকে ও তদীয় সঙ্গী ঈমানদারগণকে নিজ রহমতে উদ্ধার করি, এবং সেদিনকার অপমান হতে রক্ষা করি। নিশ্চয় তোমার পালনকর্তা তিনি সর্বশক্তিমান পরাক্রমশালী।" —সুরা হুদ, আয়াত: ৬৬

 

তিনি আরও বলেন, "আর আমার হুকুম যখন এল, আমি শোয়ায়েব (আঃ) ও তাঁর সঙ্গী ঈমানদারগণকে নিজ রহমতে রক্ষা করি আর পাপিষ্ঠদের উপর বিকট গর্জন পতিত হলো। ফলে ভোর না হতেই তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।"—সুরা হুদ, আয়াত: ৯৪


এগুলো হচ্ছে আল্লাহর 'রহমান' নামের নিয়ামত। আমরা যা কল্পনাও করতে পারি না আল্লাহ তাআলা এমন নিয়ামত দ্বারা ঘিরে রেখেছেন। আমরা বিপদগ্রস্ত হলে আল্লাহকে ডাকি এবং তাঁর সাহায্যপ্রাপ্ত হই। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তাঁর নিয়ামতের কথা অস্বীকার করে বসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, "মানুষকে যখন দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করে, তখন সে আমাকে ডাকতে শুরু করে, এরপর আমি যখন তাকে আমার পক্ষ থেকে নিয়ামত দান করি, তখন সে বলে, এটা তো আমি পূর্বের জানা মতেই প্রাপ্ত হয়েছি। অথচ এটা এক পরীক্ষা, কিন্তু তাদের অধিকাংশই বোঝে না।" —সুরা আয-যুমার, আয়াত: ৪৯


কারো মতে ٱلرَّحْمَٰنِ চিন্তা, দুঃখ ও বিষণ্নতা দূরকারী। আর ٱلرَّحِيمِ হলেন পাপসমূহ মার্জনাকারী। কেউ বলেন, প্রার্থনা ছাড়া যিনি দেন তিনি হলেন ٱلرَّحْمَٰنِ আর যিনি প্রার্থনার পর দেন এবং প্রার্থনা না করলে রাগান্বিত হন তিনি হলেন ٱلرَّحْمَٰنِ। যখন কেউ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ পাঠ করে। আল্লাহ বলেন, সে আমার প্রশংসা করল। 


এই আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' সুরা ফাতিহার অংশ নয়। যদি হতো তবে এই বাক্যটি পুনরাবৃত্ত হতো না। আর অকারণে পুনরাবৃত্তি একটি অসুন্দর ব্যাপার। এরকম দুর্বল বর্ণনা ভঙ্গি ভাষাবিদগণের নিকট অনভিপ্রেত। কেউ কেউ বলেন, رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ এর কারণ স্বরূপ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ কেন তিনি জগতের প্রভু? উত্তর হচ্ছে তিনি রহমান এবং রহিম।


আল্লাহ তাআলা এই আয়াত দ্বারা কিছু বিষয় স্পষ্ট করেন। এই আয়াত দ্বারা এ-ই আয়াত দ্বারা সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে উঠে। এমন সম্পর্ক যা রহমত ও অনুগ্রহের, যা প্রশংসা ও তারিফের যোগ্য। এমন সম্পর্ক যা প্রশান্তি ও ভালোবাসার উপর স্থাপিত, কেননা অশেষ দয়া ও রহমতের প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে হামদ (আল্লাহর প্রশংসা)।


ইসলামে মাবুদ তাঁর বান্দাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন না, যেমন গ্রীক পুরাণে দেবতা তাদের বান্দাদের ধমক দেয় এবং প্রতিশোধমূলক প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে।




বিচার দিনের মালিক

مَٰلِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ


যিনি বিচার দিনের মালিক।


মহান আল্লাহ তাআলার এই উক্তি অনুসারে কিয়ামত দিবসের সাথে তাঁর অধিকার নির্দিষ্ট করার অর্থ এই নয় যে, কিয়ামত ছাড়া অন্যান্য জিনিসের অধিকার হতে তিনি অস্বীকার করছেন। কেননা, তিনি ইতোপূর্বে 'রাব্বুল আলামীন' রূপে বর্ণনা করেছেন এবং ওর মধ্যেই দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই জড়িত আছে। কিয়ামত দিবসের সাথে অধিকারকে নির্দিষ্টকরণের কারণ এই যে, সেই দিন তো আর কেউ সার্বিক অধিকারের দাবীদারই হবে না। বরং এই প্রকৃত অধিকারী আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ মুখ খুলতে পারবে না। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, "যেদিন রূহ ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। দয়াময় আল্লাহ যাকে অনুমতি দিবেন, সে ব্যতিত কেউ কথা বলতে পারবে না এবং সে সত্যকথা বলবে।"—সুরা আন নাবা, আয়াত: ৩৮



আরবি مالك শব্দটি ملك ধাতু হতে গঠিত। এর অর্থ কোনো বস্তুর উপর এমন অধিকার থাকা যাকে ব্যবহার, রদবদল, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনসহ সব কিছু করার একক অধিকার থাকবে। এখানে دين শব্দের অর্থ প্রতিদান দেওয়া।مَٰلِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ এর শাব্দিক অর্থ— প্রতিদান দিবসের মালিক বা অধিপতি। যেদিন আল্লাহ তাআলা ভালো-মন্দ সকল কাজের প্রতিদান দিবেন তাকে প্রতিদান দিবস বলা হয়। এতে এ কথাও বোঝা যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে কারও অর্থ সম্পদ আধিক্য ও সুখ-শান্তির ব্যাপকতা দেখে বলা যাবে না যে, এই ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছেন বা তিনি আল্লাহর প্রিয় পাত্র। অন্যদিকে কাউকে বিপদাপদে পতিত হওয়া দেখেও বলা যাবে না যে, তিনি আল্লাহর অভিশপ্ত। যেমনি করে কর্মস্থলে বা কারখানায় কোনো কোনো লোককে তার দায়িত্ব বা কর্তব্য পালনে ব্যস্ত দেখে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি তাকে বিপদগ্রস্ত বলতে পারে না এবং সে নিজেও দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত বলে নিজেকে বিপদগ্রস্ত মনে করে না; বরং সে এই ব্যস্ততাকে জীবনের সাফল্য বলেই গণ্য করে এবং যদি কেউ অনুগ্রহ করে এই ব্যস্ততা থেকে রেহাই দিতে চায়, তবে তাকে সে সবচেয়ে ক্ষতিকর বলে মনে করে। সে তার এই ত্রিশ দিনের পরিশ্রমের অন্তরালে এমন এক আরাম দেখতে পায়, যা তার বেতন স্বরূপ সে লাভ করে।


এই জন্যই নবীগণ দুনিয়ার জীবনে সর্বাপেক্ষা বেশি বিপদে পড়েছেন এবং তারপর ওলী-আউলিয়াগণ বেশি বিপদে পড়েছেন। কিন্তু দেখা গেছে বিপদের তীব্রতা যত কঠিনই হোক না কেন, দৃঢ় পদে তারা তা সহ্য করেছেন। এমনকি আনন্দচিত্তেই তাঁরা তা মেনে নিয়েছেন। মোটকথা দুনিয়ার আরম আয়েশকে সত্যবাদিতা ও সঠিকতা এবং বিপদাপদকে খারপ কাজের নিদর্শন বলা যাবে না। 


উল্লেখিত আয়াতে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, বুদ্ধিমান ব্যক্তিমাত্রই এ কথা জানেন যে, যিনি সমগ্র জগতকে সৃষ্টি করেছেন এবং এর লালন-পালন ও বর্ধনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং যার মালিকানা পূর্ণরূপে প্রত্যেক বস্তুর মধ্যেই সর্বাবস্থায় পরিব্যাপ্ত। অর্থাৎ, প্রকাশ্যে গোপনে, জীবিতাবস্থায় ও মৃতাবস্থায় তিনিই একমাত্র মালিক এবং তার মালিকানার শুরু বা শেষ নেই। এই মালিকানার সাথে মানুষের মালিকানার কোনো তুলনা চলে না। কেননা মানুষের মালিকানা শুরু ও শেষের চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ। অপর দিকে মানুষের মালিকানা হস্তান্তরযোগ্য। বস্তুর বাহ্যিক দিকের উপরই তা বর্তায়, গোপন দিকের উপর নয়। এজন্যই প্রকৃত প্রস্তাবে আল্লাহর মালিকানা কেবলমাত্র প্রতিদান দিবসেই নয়, সৃষ্ট জগতের একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা।


তবে এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার বিশেষভাবে প্রতিদান দিবসের মালিক বলার তাৎপর্য হলো যে, যদিও দুনিয়ার প্রকৃত মালিকানা আল্লাহ; কিন্তু তিনি দয়াপরবশ হয়ে আংশিক বা ক্ষণস্থায়ী মালিকানা মানবজাতিকেও দান করেছেন এবং জাগতিক আইনে এই মালিকানার প্রতি সম্মানও প্রদর্শন করা হয়েছে। বিশ্বচরাচরে মানুষ ধন-সম্পদ, বাড়ি-গাড়ি ও আসবাবপত্রের ক্ষণস্থায়ী মালিক হয়েও এতে একেবারে ডুবে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা مَٰلِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ এ কথা ঘোষণা করে এই অহংকারী নির্বোধ মানব সমাজকে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তোমাদের এই মালিকানা কয়েকদিনের জন্যই। এমন দিন অতি সত্বরই আসছে, যে দিন কেউ জাহেরী মালিকানা থাকবে না, কেউ কারও দাস বা কেউ কারও সেবা পাওয়ার উপযোগীও থাকবে না। সমগ্র বস্তুর মালিকানা এক ও একক সত্তার হয়ে যাবে।


আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, একদা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে লোকজন অনাবৃষ্টির অভিযোগ পেশ করলে তিনি একটি মিম্বার স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। সেটি তাঁর ঈদগাহে রাখা হলো এবং তিনি লোকদেরকে ওয়াদা দিলেন যে, তিনি তাদেরকে নিয়ে একদিন সেখানে যাবেন। আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, একদা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূর্য উদিত হওয়ার পর বের হয়ে মিম্বারের উপর বসে তাকবীর বলে মহা মহীয়ান আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং বলেনঃ তোমরা তোমাদের অনাবৃষ্টির অভিযোগ করেছ। অথচ মহান আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন তোমরা তাকে ডাকো, তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিতে ওয়াদাবদ্ধ। অতঃপর তিনি বলেনঃ "সকল প্রশংসা বিশ্ব জগতের রব আল্লাহর জন্য, যিনি দয়ালু ও অতিশয় মেহেরবান, শেষ বিচারের দিনের মালিক।"[— সুরা ফাতিহার আয়াত] আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই। তিনি যা ইচ্ছা করেন তাই করেন। হে আল্লাহ! আপনিই আল্লাহ, আপনি ছাড়া কোন ইলাহ নাই, আপনি সম্পদশালী আর আমরা ফকীর ও মুখাপেক্ষী। কাজেই আমাদের প্রতি বৃষ্টি বর্ষণ করুন এবং আপনি যা কিছু বর্ষণ করবেন, তদ্‌দ্বারা আমাদের জন্য প্রবল শক্তি ও প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌছার ব্যবস্থা করে দিন। 

—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১১৭৩

এই হাদিস দ্বারা মহান আল্লাহর নিকটে সুরা ফাতিহার মাধ্যমে কিছু চাওয়ার ব্যাপারে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলার প্রশংসার করার পদ্ধতি তিনি নিজেই আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদের উচিৎ তা সবসময় আমল করা।


উল্লেখিত আয়াতটি আখিরাতে বিশ্বাসের সেই মহান আকিদার কথা বলে দেয়। বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস করা ইসলামি আকিদার এমন একটি মৌলিক বিশ্বাস যার মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টি আখিরাতের জগৎ পর্যন্ত বুলন্দ হয়ে যায়। তখন সে আর শুধু বৈষয়িক দুনিয়ার প্রয়োজনসমূহের গোলাম হয়ে বসে থাকে না, বরং সে নিজে এই প্রয়োজনসমূহের উপর বিজয় লাভে সমর্থ হয় এবং এই দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনে নিজের চেষ্টা সাধনার বিনিময় ও ফলাফলের চিন্তায় লেগে থাকার বদলে আল্লাহ তাআলার উপর পুরোপুরি বিশ্বাস স্থাপন করে যে, তিনি দুনিয়া ও আখিরাতের যেখানেই চাইবেন তার কর্মের ফলাফল দান করবেন। আর এই বিশ্বাস একবার প্রতিষ্টিত হওয়ার সাথে সাথেই মানুষ নিজের ইচ্ছা ও আগ্রহের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং দুনিয়াবী পরিমাপক যন্ত্র ও চিন্তা ছেড়ে মহান আসমানি মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে, যা সত্যিকার অর্থে একটি মহা মর্যাদার ব্যাপার।



একমাত্র আপনারই ইবাদত করি

 إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ


আমরা আপনার ইবাদত করি এবং আপনার নিকটই সাহায্য চাই।



'ইবাদত' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সার্বিক অপমান ও নীচতা। শরিয়তের পরিভাষায় প্রেম, বিনয়, নম্রতা ও ভয়ের সমষ্টি হচ্ছে 'ইবাদাত'। উল্লেখিত আয়াতের অর্থ দাঁড়ায়, 'আমরা আপনার ছাড়া আর কারো ইবাদত করি না এবং আপনার ছাড়া আর কারো উপর নির্ভর করি না।' আর এটাই হচ্ছে পূর্ণ আনুগত্য ও বিশ্বাস। সালাফে সালেহীন ও বয়োবৃদ্ধ বিজ্ঞজনের কেউ কেউ এই মত পোষণ করেন যে, সম্পূর্ণ কুরআনের গোপন তথ্য রয়েছে সুরা ফাতিহার মধ্যে এবং সুরা ফাতিহার গোপন তথ্য রয়েছে এই আয়াতের মধ্যে।


আয়াতের প্রথমাংশের রয়েছে শিরকের প্রতি অসন্তুষ্টি এবং দ্বিতীয়াংশে রয়েছে স্বীয় ক্ষমতার উপর অনস্থা এবং মহাশক্তিশালী আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা। এ সম্পর্কিত আরও আয়াত রয়েছে, তবে এই আয়াতে আল্লাহ তাআলাকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং এতে বেশ সুন্দর পারস্পরিক সম্বন্ধ রয়েছে। কেননা বান্দা যখন আল্লাহর গুণাবলী বর্ণনা করল তখন সে যেন মহাপ্রতাপান্বিত আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়ে গেল। এখন সে মালিককে সম্বন্ধ করে স্বীয় দীনতা, হীনতা ও দারিদ্রতা প্রকাশ করল এবং বলতে লাগল, হে আল্লাহ! আমরা তো আপনার হীন ও দূর্বল দাস মাত্র এবং আমরা সব কাজে, সর্বাবস্থায় ও সাধনায় একমাত্র আপনারই মুখাপেক্ষী। 


আল্লাহ তাআলা স্বীয় উত্তম গুণাবলীর জন্য নিজের প্রশংসা নিজেই করেছেন এবং বান্দাদের ঐ শব্দগুলো দিয়ে তাঁর প্রশংসা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এজন্য যে ব্যক্তি এই সুরাটি জানা সত্ত্বেও সালাতে পাঠ করে না তার সালাত হয় না।


‘উবাদাহ ইব্‌নু সমিত (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি সালাতে সুরা আল-ফাতিহা পড়ল না তার সালাত হলো না।' — সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৭৫৬


বান্দা যখন বলে  إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِي তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এটা আমার ও বান্দার মধ্যকার কথা এবং আমার বান্দার জন্য তাই রয়েছে যা সে চাইবে।


তাওহিদ আল-উলুহিয়া


ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন যে, إِيَّاكَ نَعْبُدُ এর অর্থ হচ্ছে, হে আমার রব! আমরা বিশেষভাবে একত্ববাদে বিশ্বাসী, আমরা আপনাকে ভয় করি এবং মহান সত্ত্বায় সব সময় ভরসা রাখি।আমরা আপনি ছাড়া আর কারো ইবাদত করিনা, কাউকে ভয় করি না এবং কারো উপর আশাও রাখি না। এবং وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ এর তাৎপর্য ও ভাবার্থ হচ্ছে যে, আমরা আপনার পূর্ণ আনুগত্য বরণ করি এবং আমাদের সকল কাজে কেবল আপনার নিকটেই সহায়তা প্রার্থনা করি।


তাওহির আল-রুবুবিয়াহ


কাতাদাহ র. বলেন, 'এর ভাবার্থ হচ্ছে এই যে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছে, 'তোমরা একমাত্র তাঁরই উপাসনা কর এবং তোমাদের সকল কাজে তাঁর নিকট সহায়তা কামনা কর। إِيَّاكَ نَعْبُدُ কে পূর্বে আনার কারণ এই যে ইবাদতই হচ্ছে মূল ঈস্পিত বিষয়, আর সাহায্য চাওয়া ইবাদতেরই মাধ্যম ও ব্যবস্থা। আর সাধারণ নিয়ম হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আগে বর্ণনা করা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে পরে বর্ণনা করা। আল্লাহ তাআলাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানেন।


এই আয়াতে এ বিষয় চিন্তা করা উচিৎ যে, 'আমরা আপনার নিকট সাহায্য চাই'। কিন্তু কোন কাজের সাহায্য চাই তার কোনো উল্লেখ নেই। জমহুর মুফাসসিরীগণের অভিমত এই যে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যাপারে সাহায্যের কথা উল্লেখ না করে 'আম বা সাধারণ সাহায্যের প্রতি ইশারা করা হয়েছে যে, আমি আপনার ইবাদত করি প্রত্যকে ধর্মীয় ও পার্থিব কাজে এবং অন্তরে পোষিত প্রতিটি আশা আকাঙ্ক্ষায় কেবল আপনার সাহায্য প্রার্থনা করি। 


ইবাদত শুধু সালাত-সিয়ামের নামই নয়। ইমাম গাযালী রহ. স্বীয় গ্রন্থে দশ প্রকার ইবাদতের কথা উল্লেখ করেন। যথা:- 

  • ১.সালাত
  • ২. যাকাত
  • ৩.সিয়াম
  • ৪ কুরআন তেলাওয়াত
  • ৫.সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্বরণ
  • ৬. হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা
  • ৭ প্রতিবেশী এবং সাথীদের প্রাপ্য পরিশোধ করা
  • ৮. মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করা
  • ৯. অসৎ কাজের প্রতি নিষেধ করা
  • ১০. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত পালন করা 


উল্লেখিত আয়াতটি একটা বিশ্বাসের অংশ যা এই সুরায় বর্ণিত আগের অংশসমূহের অপরিহার্য পরিণাম। এই বাক্যটি দুনিয়ার সব ধরনের গোলামী থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা এবং মানুষের সার্বিক ইবাদতের রাস্তাসমূহকে আলাদা আলাদা করে মানবতার পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা দেয় যে, আজ মানুষ আর কারও অধীন নয়। অন্ধ বিশ্বাস থেকে সে স্বাধীন, পঁচা দুর্গন্ধময় ব্যবস্থাপনার বন্দীদশা থেকে স্বাধীন, আজ সে স্বাধীন যাবতীয় তথাকথিত সামাজিক রীতিনীতির বন্ধন থেকে। এখন সে শুধু আল্লাহর গোলামী করে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চায়। এখন আর মানবতাকে মানুষের তৈরি বিধি-নিষেধ, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান এবং ব্যক্তি বিশেষদের আনুগত্যের প্রয়োজন নেই। এখন মানুষের অন্ধ বিশ্বাসের পূজা করারও কোনো দরকার নেই। 


এ পর্যায়ে মানবীয় এবং প্রাকৃতিক শক্তিসমূহের ব্যাপারে একজন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গিটা পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন। মানবীয় শক্তিসমূহ দু'ধরনের:

১. হিদায়তপ্রাপ্ত শক্তি যা— আল্লাহর উপর ঈমান আনে এবং তাঁরই নির্দেশিত পথে চলে। এই শক্তির সাথে একজন মুমিন সহযোগিতা করে সংশোধন ও কল্যাণের যাবতীয় কাজে তাঁর সাহায্যের হাত প্রসারিত করে।


২. পথভ্রষ্ট শক্তি যা— আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখে না, না তাঁর প্রদর্শিত পথে চলে। একজন মুসলিম এই শক্তি বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।মুসলিমগণ কখনো পথভ্রষ্ট শক্তি আধিক্য ও প্রভাব দেখে ভয় পায় না। কারণ, সে জানে প্রতিটি শক্তির উৎস ও মূল হচ্ছে আল্লাহ তাআলার নিজেস্ব সত্তা। যখনই কোনো শক্তি তার মূল উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, দূরে সরে যায়, তখন আস্তে আস্তে তার শক্তি সামর্থ হারিয়ে ফেলে।


ইসলামি আদর্শের এই উপরোক্ত মৌলিক নিয়মগুলো আলোচনা এবং এটুকু প্রমাণ করে দেওয়ার পর যে ইবাদতের প্রতিটি স্তরে অটল অনড় থাকা কেবল আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট হতে হবে। প্রতিটি কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মানসে হতে হবে।




সরল পথ প্রদর্শন করুন

ٱهْدِنَا ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ


আমাদের সরল পথ প্রদর্শন করুন।


প্রশংসামূলক বাক্য আগে উল্লেখ করার কারণ: যেহেতু বান্দা প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করেছে এবং তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করেছে, সেহেতু এখন তার কর্তব্য হবে স্বীয় প্রয়োজন পূরণের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা। একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে এই বাক্যের মধ্যে কি পরিমাণ সুক্ষ্মতা ও প্রকৃষ্টতা রয়েছে! প্রথমে মহান আল্লাহ তাআলা প্রশংসা ও গুণগান, অতঃপর নিজের এবং মুসলিম ভাইদের প্রয়োজন পূরণের জন্য আকুল প্রার্থনা। প্রার্থিত বস্তু লাভের এটাই উৎকৃষ্ট পন্থা। এই উত্তম পন্থা নিজে পছন্দ করেই মহান আল্লাহ তাআলা এই পন্থা স্বীয় বান্দাদের বাতলে দিয়েছেন। কখনো কখনো প্রার্থনার সময় প্রার্থী স্বীয় অবস্থা ও প্রয়োজন প্রকাশ করে থাকে। যেমন মূসা আ. বলেছিলেন, 'হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন আমি তার কাঙাল।' — সুরা কাসাস, আয়াত: ২৪

হজরত ইউনুস আ. দুআ করার সময় বলেছিলেন, 'আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আপনি পবিত্র ও মহান; আমি তো সীমা লঙ্ঘনকারী।'— সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭


সুরায় হিদায়াত শব্দের বিশ্লেষণ: এখানে হিদায়াত অর্থ ইরশাদ ও তাওফিক অর্থাৎ সুপথ প্রদর্শন ও সক্ষমতা প্রদান। অন্যত্র বলা হয়েছে, 


'এবং তাদেরকে দুইটি পথ দেখিয়েছি।'—সুরা বালাদ, আয়াত: ১০


'আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছিলেন এবং তাকে পরিচালিত করেছিলেন সরল পথে।' —সুরা নাহল, আয়াত: ১২১


'তুমি তো প্রদর্শন কর শুধু সরল পথ।'— সুরা শুরা, আয়াত: ৫২


'সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন।' —সুরা আরাফ, আয়াত: ৪৩


এই আয়াতে ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ এর কয়েকটি অর্থ আছে। ইমাম আবু জাফর ইবনে তাবারী বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে সুস্পষ্ট, সরল ও পরিষ্কার পথ যাঁর কোনো জায়গা বা কোনো অংশই বাঁকা নয়। এই বিষয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একমত যে ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ হলো ঐ সরল সঠিক পথ যার কোনো শাখা প্রশাখা নেই।


যদি প্রশ্ন করা হয় যে, মুমিনগণের তো পূর্বেই আল্লাহর পক্ষ হতে হিদায়াত লাভ করেছে, তবে সালাতে বা বাইরে হিদায়াত চাওয়ার আর প্রয়োজন কি? তাহলে এই প্রশ্নের উত্তর এই যে, এতে উদ্দেশ্য হচ্ছে হিদায়াতের উপর সদা প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফিক চাওয়া। কেননা বান্দা প্রতিটি মূহুর্তে ও সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর নিকট মুখাপেক্ষী ও আশাবাদী। সে নিজে স্বীয় জীবনের লাভ ক্ষতির মালিক নয়। বরং নিশিদিন সে আল্লাহরই প্রত্যাশী ও মুখাপেক্ষী। এ জন্য আল্লাহ তাআলা বান্দাকে শিখিয়েছেন যে, সে যেন সর্বদা হিদায়াত প্রার্থনা করে এবং তার উপর সদা প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফিক কামনা করে। ভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ তাঁর দরজায় ভিক্ষুক করে নিয়েছেন। 



যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন তাদের পথ প্রদর্শন করুন


صِرَٰطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا ٱلضَّآلِّينَ


আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন যে, এই আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে: হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ঐসব ফেরেশতা, নবি, সিদ্দিক, শহিদ ও সৎলোকের পথে পরিচালিত করুন, যাদেরকে আপনি আপনার আনুগত্য ও ইবাদতের কারণে পুরষ্কৃত করেছেন, যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত এবং অটল অবিচল ছিলেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুগত ছিলেন। যারা আল্লাহর নির্দেশ পালনকারী এবং নিষেধ থেকে দূরে বহুদূরে ছিলেন। আর ঐসব লোকের পথ হতে রক্ষা করুন যাদের উপর আপনার ক্রোধ ও অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে। যারা সত্যকে জেনে শুনেও তার থেকে দূরে সরে গেছে এবং পথভ্রষ্ট লোক হতেও আমাদের বাঁচিয়ে রাখুন যাদের সঠিক পথ সম্বন্ধে কোনো ধারণা বা জ্ঞান নেই, যারা পথভ্রষ্ট হয়ে লক্ষ্যহীনভাবে ইতস্তত ঘুরে বেড়ায় এবং তাদেরকের সরল সঠিক সওয়াবের পথ দেখানো হয় না।


এই আয়াতের প্রথম অংশে হ্যাঁ সূচক বাক্য ব্যবহার করে সরল পথের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ বলতে ঐ সমস্ত লোকদের বোঝানো হয়েছে, যারা ধর্মের হুকুম আহকামকে জানে বুঝে, তবে স্বীয় অহমিকা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের বশবর্তী হয়ে এর বিরুদ্ধাচারণ করেছে। অন্য শব্দে বলা যায়, যারা আল্লাহ তাআলার আদেশ মান্য করতে গাফলতি করেছে। যেমন: সাধারণভাবে ইহুদিদের নিয়ম ছিল, সামান্য স্বার্থের জন্য তারা দীনের নিয়ম-নীতি বিসর্জন দিয়ে তারা নবী রাসুলগণের অবমাননা করতে দ্বিধা বোধ করত না। ٱلضَّآلِّينَ তাদেরকে বলা হয়, যারা না বুঝে অজ্ঞতার দরুন ধর্মীয় ব্যাপার ভুল পথের অনুসারী হয়েছে এবং ধর্মের সীমালঙ্ঘন করে অতিরঞ্জনের পথে অগ্রসর হয়েছে। যেমন: খ্রিস্টানগণ। তারা নবীর শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নামে বাড়াবাড়ি করেছে; যেমন: নবীদেরকে আল্লাহর পর্যায় পৌঁছিয়েছে। 


আয়াতের সারমর্ম হচ্ছে— আমরা সে পথ চাই না, যা নাফসানী উদ্দেশ্যের অনুগত হয় এবং মন্দ কাজে উদ্বুদ্ধ করে ও ধর্মের মধ্যে সীমালঙ্ঘনের প্রতি প্ররোচিত করে। সে পথও চাই না, যে পথ অজ্ঞতা ও মূর্খতার দরুন ধর্মের সীমারেখা অতিক্রম করে। বরং দুইয়ের মধ্যবর্তী সোজা-সরল পথ চাই। যার মধ্যে অতিরঞ্জন নেই এবং নাফসানী প্রভাব ও সংশয়ের উর্ধ্বে। 


সুরা ফাতিহার আয়াত সাতটির সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ হল। এখান সমগ্র সুরার সারমর্ম হচ্ছে এই দুআ— হে আল্লাহ! আমাদেরকে সরল পথ দান করুন। কেননা, সরল পথের সন্ধান লাভ করাই সবচেয়ে বড়ো জ্ঞান ও সর্বাপেক্ষা বড়ো অর্জন। বস্তুত সরল পথের সন্ধানে ব্যর্থ হয়েই দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি ধ্বংস হয়েছে। অন্যথায় অমুসলিমদের মধ্যেও সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভ করা এবং তার সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করার আগ্রহ আকুতির অভাব নেই। এজন্যই কুরআনে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় পদ্ধতিতেই সিরাতুল মুস্তাকিমের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।


সুরা ফাতিহার সার সংক্ষেপ

এই কল্যাণময় ও বরকতপূর্ণ সুরাটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর সমষ্টি। এই সাতটি আয়াতে আল্লাহ তাআলার যোগ্য প্রশংসা, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব, পবিত্র নামসমূহ এবং উচ্চতর বিশেষণের সুন্দর বর্ণনা রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই রোজ কিয়ামতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এবং বান্দাদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন সেই মহান প্রভুর নিকট অত্যন্ত বিনীত ভাবে যাঞ্চা করে, তাঁকে সব সময় অংশীবিহীন এবং তুলনাবিহীন মনে করে, খাঁটি অন্তরে তাঁর ইবাদত; তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস করে, তাঁর কাছে সরল সোজা পথ এবং তার উপর সুদৃঢ় ও অটল থাকার জন্য নিশিদিন আকুল প্রার্থনা জানায়। এই অবিসম্বাদিত পথই একদিন তাকে রোজ কিয়ামত দিবসে পুলসিরাত পার করাবে এবং নবী, সিদ্দিক, শহিদ ও সৎলোকদের পাশে জান্নাতুল ফিরদাউসের নন্দন কাননে স্থান দিবে। সাথে সাথে আলোচ্য সুরাটির মধ্যে যাবতীয় সৎকার্য সম্পাদদের প্রতি নিরন্তর উৎসাহ দেওয়া হয়েছে যাতে কিয়ামতের দিন বান্দা আত্মকৃত সওয়াবসমূহ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। এছাড়া মিথ্যা ও অন্যায় পথে চলার ব্যাপারে ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছে, যাতে কিয়ামত দিবসেও সে বাতিলপন্থীদের দল থেকে দূরে থাকতে পারে।



সূত্র:

-তাফসিরে ইবনে কাসির

-তাফসিরে মা'রিফুল কুরআন 

-তাফসিরে তাবারী

-তাফসিরে কুরতুবি

-তাফসিরে মাযহারী

-জিলালিল কুরআন 

-তাফসিরে জালাইন

-মাউসুয়াতুত তাফসির আল-মাসুর

-তাফসিরে ফাখরির রাযি


[ এই আর্টিকেল আপনার কাছে উপকারি বিবেচিত হলে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন।]

২৩২ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

যুবায়ের বিন আখতারুজ্জামান। জন্ম ও বেড়ে ওঠা টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা মোহাম্মদপুর এক মাদ্রাসায়। বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বে আটকে থাকা হাজারো বন্দীর মুক্তির কামনায় ব্যতিব্যস্ত। স্বপ্ন দেখেন এক মুক্ত, স্বাধীন ইসলামি সালতানাতের।

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...