ইসরাইল নিয়ে প্রফেসর নাজিমুদ্দিন আরবাকানের কিছু কথা

জায়নবাদ ঠিক কুমিরের মতো। এই কুমিরের উপরের চোয়াল আমেরিকা আর নিচের চোয়াল ইউরোপিয় ইউনিয়ন। এর জিহ্বা আর দাঁত ইসরাইল। এর শরীসহ অন্যান্য অঙ্গ হলো মুসলিম দেশসমূহ, অধিনস্ত রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী, মিডিয়া, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং নানান সংগঠন।

আমি এভাবে বলছি কেন? কারন, আমরা জায়নবাদ বলতে শুধু ইয়াহুদী জাতি আর ইসরাইলকেই বুঝে থাকি। এটা ভুল বোঝাপড়া। জায়নিজম নামের বৃহৎ কুমিরটি আজ বিশ্বকে গ্রাস করে শান্তি-শৃঙ্খলাকে হজম করে ফিলিস্তিনের গাজাতে নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করছে। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আজ সবচেয়ে বড়ো বাধা হলো এই জায়নবাদ।

আমরা সমগ্র মানবজাতিকে কীভাবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ, 'Great Mddle East Project' জায়নবাদীদের আকিদার সাথে সম্পর্কিত; এই প্রজেক্টকে তারা তাদের দ্বীনে অংশ বলে মনে করে থাকে। ইজরাইলের প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীই একটি কথা বলে থাকে-

আমাদের দুটি মানচিত্র রয়েছে। একটি দেওয়ালে খচিত, অপরটি আমাদের অন্তরে খচিত মানচিত্র।

ঠিক এটাই হলো ইজরাইলের গোপন পরিকল্পনা। মুসলিম হিসাবে আমরা আদতে কী করি? ওআইসিসহ অন্যান্য সংগঠনের নামে নানান সময়ে নানা ধরণের সম্মেলনের আয়োজন করে থাকি। সেখানে সারাদিন শুধু ফাঁকা বুলি আওড়িয়ে থাকি। সভা শেষে আমরা একটা সিধান্তে উপনীত হয়ে সারা দুনিয়ায় প্রচার করতে বলি- 'অনতিবিলম্বে ইরাক থেকে আমেরিকার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে।' টেলিভিশন অথবা পত্র পত্রিকায় এই খবর দেখে জায়নিস্টরা কফির কাপে আয়েশি টান দিয়ে ব্যঙ্গাত্মক অট্টহাসি দিয়ে বলে-

'তোমরা এই সকল অবাস্তব পরিকল্পনা নিয়েই বসে থাকো। আর তোমরা জেনে রাখো যে আমরা আমাদের প্রত্যেকটি পরিকল্পনা পদে পদে বাস্তবায়ন করছি ।'

এমনকি ইরানীরাও মনে করে, তারা নিজেরা পারমানবিক বোমা বানাচ্ছে, তারা আধুনিক অস্ত্র বানাচ্ছে। সাবধান! এই সকল চিন্তার মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতারিত করবেন না । আপনারা যদি এভাবে চলতে থাকেন, তাহলে শত বছরেও ইসরাইলিদের কিছুই করতে পারবেন না । তাহলে আমরা কী করব ? এর থেকে উত্তরণের একটাই পথ হচ্ছে আমাদেরকে কোরআনের আলোকে নতুন দুনিয়া সৃষ্টি করতে হবে । কারণ, ইসলাম ছাড়া বিশ্ব শান্তি অসম্ভব।

আমরা কীভাবে এই নতুন দুনিয়া প্রতিষ্ঠা করব? আমি ২৪ জুন ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলাম এবং প্রধানমন্ত্রী হয়ে পার্লামেন্ট থেকে শপথ নেওয়ার পর আমি আমার অফিসে আসি। এরপর সর্বপ্রথম আমেরিকার রাষ্ট্রদূত আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে । সে আমাকে বলে যে আমরা জানি যে আপনাদের দাওয়াত হচ্ছে ইসলাম আর আপনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন; অবশ্যই আমরা এটা পছন্দ করিনি । কিন্তু আপনাদের সাথে আমাদের কাজ করতে হবে । তবে ৬ টি শর্তে আপনার সাথে কাজ করতে পারি ।

  • ইরানের সাথে আপনাদের বানিজ্য পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলারের বেশি করতে পারবেন না।
  • ইরানে যেতে পারবেন না।
  • মুসলিম দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে পারবেন না।
  • তুরস্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত আমেরিকা আর ইসরাইলের অংগ সংগঠনগুলোর কাজে বাধা দিতে পারবেন না ।
  • তুরস্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত অ্যামেরিকান সামরিক ঘাঁটিসমূহকে বন্ধ করতে পারবেন না ।
  • ইরাকের পাইপ লাইন গুলো উন্মুক্ত করতে পারবেন না ।

আমাদের ইতিহাসে আলী পাশার একটি বিখ্যাত প্রবাদ আছে । সেটা হল,

আমি যে রাষ্ট্রীয় কাজ করতে যাই না কেন প্রথমে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সাথে পরামর্শ করি এবং সে যা বলে, আমি ঠিক তার বিপরীতটাই করি ।

আমিও ঠিক একই কাজটি করেছি । সে যা বলেছে তার বিপরীত কাজগুলাই করেছি সে বলেছিল ৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য করতে পারবেন না। অথচ আমি ইরানের শুধুমাত্র গ্যাসের জন্যই ২.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করি। এমনকী আমি সিদ্ধান্ত নেই যে ইরানের সাথে তুরস্কের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ১০ বিলিয়ন ২০ বিলিয়ন ৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই সীমিত থাকবে না। বরং ইরানের সাথে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক জার্মানি এবং ফ্রান্সের সাথে যতটুকু রয়েছে, তার চাইতেও বেশি হবে ।

১৫ দিন পর আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ারেম .এম ক্রিস্টিফার এবং আঙ্কারার রাষ্ট্রদূত ক্রসমানার শলাপরামর্শ করে, আর যাই হোক, রেফা পার্টি এবং এরবাকানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে । তাদের সেই ষড়যন্ত্রের দলিলগুলো আমার কাছে আছে ।

আমি এসব কথা কেন বলছি ? আমরা দুআ করি যে ইরানের ইসলামী বিপ্লব তার পূর্ণতায় পৌঁছাতে পারে । কিন্তু আমরা এটা জানি যে আমাদেরকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য ওরা যে ষড়যন্ত্র করছে, আর ইরানের বিপ্লবও যাতে লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে এই জন্য তারা সকল ধরনের ষড়যন্ত্র করে যাবে এবং আপনারা এদেরকে সুযোগ না দেওয়ার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকবেন । কারণ, যায়নবাদীরা ৫৭০০ বছরের একটি পুরাতন সংগঠন ।

আমেরিকার চল্লিশটি রণতরী রয়েছে এবং তারা হুমকি দিয়ে বলে যে ইরানকে ভালভাবে শায়েস্তা করবে । এমতাবস্থায় আমরা কি খালি বসে থাকব? নাকি ৪১ টি রণতরী বানাব? আর এগুলো বানাতে যে সময় লাগবে, সেই সময়টুকুতেই ওরা আমাদের নিঃশ্বেষ করে দিবে আর এই রণতরীগুলো বানানোর জন্য আমরা এত আর্থিক যোগানইবা কোথা থেকে দেবো ? আমারা ৪১টি বানাতে বানাতে ওরা আরও ৮০টি বানিয়ে ফেলবে । তাহলে আমরা যায়নবাদকে কীভাবে পরাজিত করব ?

আল্লাহ মহান রাব্বুল আলামিন দয়াবান ও দয়ালু । প্রযুক্তির উন্নয়ন ইসলামের জন্য একটি অনেক বড়ো একটি নিয়ামত । আমরা এমন প্রযুক্তি আবিষ্কার করব, আমাদেরকে আক্রমণ করার সময় তাদের ক্ষেপনাস্ত্র দিয়েই তাদের রণতরীগুলো ধ্বংস করে দেবো। এটা কি সম্ভব নয়? হ্যাঁ, এটা ইলেক্ট্রিক্যাল ইলেকট্রনিক্সে সম্ভব ।

আমরা ওজন ছাড়া বিমান তেহরান থেকে তেলআবিবে পাঠাব আর এখানে বসে দেখব । এরপর এটি ইসরাইলে অবস্থিত পরমাণু স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানবে । এগুলো কি সম্ভব ? হ্যাঁ, সম্ভব আমি এগুলোর প্রটোটাইপ তৈরি করে নিয়ে এসেছি ।

কারণ, টেকনোলজির কোনো শেষ নেই । ইরানের ইসলামি বিপ্লব নতুন দুনিয়া সূচনার একটি দরজা । তুরস্ক ও ইরানের সম্পর্ক হচ্ছে একটি বীজের মত । এর চারপাশে রয়েছে D-8 । D-8 এর চারপাশে রয়েছে D-60 । ৬০টি মুসলিম দেশ এবং নিপীড়িত ১০০টি দেশ । এরপর রাশিয়া-চীন-আফ্রিকা-ভারতসহ ৬০০ কোটি মানুষকে নিয়ে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে চাই ।

আমরা কমন মুদ্রা হিসেবে ইসলামি দিনার চালু করব । ইসলামী জাতিসংঘ এবং নিজস্ব ন্যাটো প্রতিষ্ঠা করব। আর এভাবে আমরা একটি নতুন দুনিয়া গড়ব ।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সুরা ইব্রাহিমের ৪৬ আয়াতে বলেছেন-

وَقَدْ مَكَرُوا مَكْرَهُمْ وَعِندَ اللَّهِ مَكْرُهُمْ وَإِن كَانَ مَكْرُهُمْ لِتَزُولَ مِنْهُ الْجِبَالُ 'তারা তাদের সব রকমের চক্রান্ত করে দেখেছে, কিন্তু তাদের প্রত্যেকটি চক্রান্তের জবাব আল্লাহর কাছে ছিল, যদিও তাদের চক্রান্তগুলো এমন পর্যায়ের ছিল যাতে পাহাড় টলে যেত৷'


আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আরও বলেন

إِنْ يَنْصُرْكُمُ اللَّهُ فَلَا غَالِبَ لَكُمْ- যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন কেও তোমাদের পরাজিত করতে পারবে না।

আমি এর আগে ইরানে D-8 খুলেছিলাম । এখন আমি আসছি দুটি লক্ষ্য নিয়ে ।

[ এই আর্টিকেল ২০০৯ সালে ইরান সফরে দেওয়া উস্তাদ নাজিমুদ্দিন আরবাকের বক্তব্যের আংশিক অনুবাদ।]

 

৯৩১ বার পঠিত

অনুবাদক পরিচিতি

বুরহান উদ্দিন আজাদ। পড়ালেখা করছেন অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে তুরস্কে। রিসার্চ এসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ করছেন Institute of Islamic Thought এবং Economic and Social Researches Centre-এ। অবসর সময়ে অনুবাদ ও লেখালেখি করেন। বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত বইয়ের সংখ্যা.০৮। বর্তমানে অবস্থান করছেন তুরস্কের আংকারা শহরে।

মন্তব্য

৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে
Mohammad mohsin

Mohammad mohsin

০৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০১:২৫ পূর্বাহ্ন

Want to read this kind of articles more.

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
মুহাম্মদ আবু সালেহ

মুহাম্মদ আবু সালেহ

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২১:১৩ অপরাহ্ন

কিভাবে সব সময় আপনাদের লিখা পাবো?

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
ফাতেহ

ফাতেহ

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২১:২২ অপরাহ্ন

সত্যিই অসাধারণ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আহমাদ ইসমাইল

আহমাদ ইসমাইল

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২২:৪২ অপরাহ্ন

চমৎকার লেখা, আমরা পারবো এই সাহস পেলাম, জাজাকাললাহ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
এইচ এম জসিমুদ্দীন

এইচ এম জসিমুদ্দীন

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ০৩:৩৮ পূর্বাহ্ন

খুব ভালো একটি চিন্তাধারা, তবে তার বাস্তবায়ন অদৌ সম্ভব হবে কিনা জানিনা

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
এস এম ইব্রাহীম সোহাগ

এস এম ইব্রাহীম সোহাগ

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১২:৫২ অপরাহ্ন

সত্যিই অসাধারণ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...