ঠাট্টা-কৌতুক আপনাকে কাফির বানিয়ে দিতে পারে

একঃ

কয়েক বছর আগের ঘটনা। সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ফতোয়া দিলেন দাবা খেলা হারাম। এই বিষয়ে হাসি তামাশা ও ট্রল দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া গরম করে তোলা হলো। যারা এই কাজগুলো করল, তাদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা অগনিত। আমার এক বন্ধু এমনই একটি ট্রল শেয়ার করেছিল। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছিল সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি তার সামনে দাবার বোর্ড নিয়ে চিন্তিত মুখে বসে আছেন। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন "Only one queen!! Let's ban this stupid game." ছবির ক্যাপশনে আমার বন্ধুটি লিখেছিল, 'এটা বেস্ট'।


হানাফি মাযহাব, হাম্বলি মাযহাব ও মালিকি মাযহাবের আলিমদের মতে দাবা খেলা হারাম। শাফি মাযহাবে হারাম না বলা হলেও অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দাবা খেলা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে আলিমদের মতামত নতুন কোনো বিষয় না। এ ব্যাপারে ফতোয়াগুলো বিস্তারিত পড়লে দেখতে পাবেন সালফে সালেহিনরা দাবা খেলার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছেন এবং এর কুফল সম্বন্ধেও আলোচনা করেছেন। [১]


দুইঃ

একটি ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। যে ভিডিওতে আহলে হাদিস মানহাজের অনুসারীদের নামাজ পড়ার পদ্ধতি নিয়ে ট্রল করা হয়েছিল। ভিডিওতে সম্পূর্ণ নামাজ পড়া হয় বাংলা তরজমায়; ইকামাত, সূরা, তাকবির সবকিছু। নামাজের শুরুতে সবাইকে বলা হয় (ব্যঙ্গাত্মক ভাবে) আপনারা পায়ে পা মিলিয়ে দাঁড়ান, দুই পায়ের মাঝখানে যেন কোনো ফাঁকা না থাকে, যেন কোনোভাবেই শয়তান আমাদের মাঝখানে প্রবেশ করতে না পারে।


আল্লাহু আকবার। ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির একটি নামাজকে এখানে হাসিঠাট্টার বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। নবিজির সহিহ হাদিস নিয়ে তামাশা করা হয়েছে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সহিহ হাদিসে বলেছেন পায়ে পা মিলিয়ে দাড়াতে [২], দুই পায়ের মাঝখানের ফাঁকা বন্ধ করতে যাতে করে শয়তান প্রবেশ করতে না পারে [৩]। যারা এই কাজটি করেছিল তারা আমাদেরই মুসলমান ভাই।


তিনঃ

'আরে ভাই আপনারতো ছাগলদাড়ি উঠেছে, ভালো দেখাচ্ছে না।'

কিংবা

'ভাই কি দাড়ি রেখে দিলেন নাকি?'

চাপ দাড়ি উঠলে রাখবো ভাই ইনশাল্লাহ। ছাগলদাড়ি উঠলে আর রাখব না।"


এমন বাক্যালাপ অহরহই শোনা যায়।


প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান পুরুষের দাড়ি রাখা ওয়াজিব। এই দাড়ি নিয়ে হাসি ঠাট্টা করা, তামাশা করা, উপহাস করা, কটাক্ষ করা, দাড়ি রাখার কারণে হেনস্থা করা আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত একটি বিষয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশকৃত এই মহান সুন্নাহ দাড়িকে ছাগলের থুতনিতে জন্মানো পশম গুচ্ছের সাথে তুলনা করা সমাজের একটি বহুল প্রচলিত কৌতুক।


চারঃ

কৌতুকটি কোথায় শুনেছিলাম মনে নেই। মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়তে এসেছে এলাকার দুই গণ্যমান্য ব্যক্তি। দুই ব্যক্তির একজন কানা (অন্ধ), আরেকজন ল্যাংড়া (পঙ্গু)। নামাজের মাঝখানে ইমাম সাহেব তিলাওয়াত করলেন, ইয়্যা "কানা'বুদু" ওয়া ইয়্যা "কানাস" তাঈন। পঙ্গু (ল্যাংড়া) ব্যক্তি মনে করলেন নামাজের মধ্যে তার প্রতিদ্বন্দ্বি অন্ধ ব্যক্তি সম্বন্ধে বলায় অন্ধ ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার অসম্মান হয়েছে। অতঃপর নামাজ শেষে ওই পঙ্গু ব্যক্তি ইমাম সাহেবকে ঘুষ দিয়ে বললেন পরবর্তী নামাজে যেন সূরা পড়ার সময় তার সম্বন্ধে বলা হয়। পরবর্তী নামাজের জামায়াতে ইমাম সাহেব উপরিউক্ত আয়াত পরিবর্তন করে দেন। আয়াতের মাঝখানে "ল্যাংড়া" শব্দ ঢুকিয়ে দেন। আস্তাগফিরুল্লাহ। নাউজুবিল্লাহ। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা।আমাদের কমন সেন্স হাটুতে নেমেছে, মূর্খতা সীমা অতিক্রম করেছে, আর স্পর্ধা আকাশ ছুঁয়েছে।


পাঁচঃ

অসংখ্য কৌতুক বিদ্যমান যেখানে ঈশ্বরের সাথে কথোপকথন নিয়ে হাসি ঠাট্টা করা হয়। সে কৌতুকগুলো আমরা অহরহ বলে বেড়াই। এ ব্যাপারে কিছু বলা হলে আমরা বলি, আরে ভাই, হাসি তামাশাও বোঝেন না। আমি তো সিরিয়াসলি বলি নাই, মজা করে বললাম। কিংবা মনে করি, আমিতো আল্লাহকে নিয়ে কিছু বলছিনা, আমি অন্য ধর্মের ঈশ্বরকে নিয়ে বলছি। ভাই আপনি কি তাহলে বিশ্বাস করেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ঈশ্বর রয়েছে? আপনি যদি বিশ্বাস করে থাকেন আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, তবে সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধে কোনো কৌতুক বলার সময় আপনি কার দিকে ইংগিত করছেন?


ভাই, আমরা যে এই কু-যুক্তি দাঁড় করাব, সেটা আল্লাহ খুব ভালভাবেই জানতেন। পবিত্র কুরআনে তিনি তা আগেই বলে দিয়েছেন, "আর আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করলে অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেলা-তামাশা করছিলাম।‘ বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে?" [৪


জেনে না জেনে, বুঝে না বুঝে, অজ্ঞতাবশত কিংবা অবহেলা করে ইসলামের কোনো বিধান নিয়ে, কুরআডঃ-হাদিসের কোনো বিষয় নিয়ে কৌতুক করা, হাসি ঠাট্টা করা, উপহাস করা কিংবা কটাক্ষ করা আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি বিষয়। আমাদের সাহিত্যের গল্প, উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধে প্রায়শই এমনটা দেখা যায়। কিন্তু আমরা কি জানি এই হাসি তামাশা, কৌতুক, উপহাস করা আমাদেরকে ইসলাম থেকে বের করে কাফির বানিয়ে দিতে পারে?


"তোমরা এখন (বাজে) ওজর পেশ করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরি করেছ, যদিও আমি তোমাদের মধ্য হতে কতককে ক্ষমা করে দিই, তবুও কতককে শাস্তি দিব, কারণ তারা অপরাধী।" [৫]


আচ্ছা, এই কাজগুলো কি আমরা আসলেই না বুঝে করে থাকি? নাকি আমাদের অন্তরে লুক্কায়িত আছে মুনাফেকি? হয়তোবা ক্রমাগত অবাধ্যতায় আমাদের অন্তরে মরিচা পড়ে যাচ্ছে। আর বুঝতেও পারছি না যে, আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছি জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরের দিকে।


নোটস ও রেফারেন্স


[১] ইসলাম কিউএ, ইসলাম ওয়েব ওয়েবসাইটে এ ব্যাপারে একাধিক ফতোয়ায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।


[২] আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)

বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের কাতার সোজা

কর। নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে আমার পিছনথেকে দেখতে পাই। আনাস (রাঃ) বলেন,

আমাদের একজন অপরজনের কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পায়ে মিলিয়ে দাঁড়াতেন। ------(ছহীহ বুখহা/৭২৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১০০, ইফাবা হা/৬৮৯, ২/৯৫ পৃঃ)


[৩] ইবনু ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)

বলেছেন, ‘তোমরা কাতার সোজা করবে,

বাহুসমূহকে বরাবর রাখবে, ফাঁক সমূহ বন্ধ করবে এবং তোমাদের ভাইদের হাতের সাথে নম্রতা বজায় রেখে মিলিয়ে দিবে; মধ্যখানে শয়তানের জন্য ফাঁক রাখবে না। যে ব্যক্তি কাতারের মাঝে মিলিয়ে দাঁড়ায়, আল্লাহ তাকে তাঁর নিকটবর্তী করে নেন। আর যে ব্যক্তি কাতারের মাঝে পৃথক করে দেয় আল্লাহও তাকে পৃথক করে দেন। ----------(ছহীহ আবুদাঊদ হা/৬৬৬, ১ম খন্ড, পৃঃ ৯৭, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/১১০২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১০৩৪, ৩/৬১ [৪] সূরা আত-তাওবাহ আয়াত ৬৫।


[৫] সূরা আত-তাওবাহ আয়াত ৬৬।পৃঃ






৩৫৯ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

আদিল আরসালান। পড়াশোনা করছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। ভালবাসেন ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করতে। আর চেষ্টা করেন অর্জিত জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। এই উসিলায় পরম করুণাময়ের কাছে গুনাহগার বান্দা হিসেবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

মন্তব্য

১ টি মন্তব্য করা হয়েছে

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

৩০ অক্টোবর, ২০২০ - ২১:৫৭ অপরাহ্ন

আল্লাহ যেন আমাদের জিহ্বা কে সংযত রাখেন। আমিন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...