গুড প্যারেন্টিং: দশটি করণীয়

আমরা সবাই চাই আমাদের সন্তানদের জন্য ‘গুড প্যারেন্টিং’ উপহার দিতে। দেশের চলমান অস্থিরতায় এ কথার গুরুত্ব সবাই আরও বেশি করে বোধ করছি। কিন্তু গোল বাঁধে তখনই, যখন আমরা সংজ্ঞায়িত করতে যাই, কোনটা আসলে গুড প্যারেন্টিং আর কোনটা নয়। আমরা ‘কমন সেন্স’ থেকে যা যা করি, হয়তো তার অনেক কিছুই গুড প্যারেন্টিংএর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সব কিছুই কি?

আসুন দেখে নিই, বিশেষজ্ঞদের চিহ্নিত গুড প্যারেন্টিং-এ অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিৎ কিছু অনুষঙ্গ–

১) জেনে রাখুন, শিশুরা ছোটদের মতোই আচরণ করবে

শিশুদের মস্তিষ্ক পুরোপুরি বিকশিত হতে কুড়ি বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এর আগে তারা নানা বিষয়ে অপরিণত বুদ্ধি-বিবেচনা নিয়ে কাজকর্ম করবে। এটাই স্বাভাবিক। রেগে গিয়ে বা ধৈর্য হারিয়ে নয় বরং ভেবে-চিন্তে, ধীরে-সুস্থে এই বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে হবে, তাদের বুঝাতে হবে, বুঝতে সাহায্য করতে হবে।

২) দোষারোপ করে নয়, মর্জাদা বজায় রেখে সীমা নির্ধারণ করুন

গতের প্রায় সবকিছু সম্পর্কেই শিশু আমাদের কাছ থেকে জানতে ও শিখতে চাইবে। একবারেই তো আর সবটা জানানো যাবে না, জানাতে হবে ধাপে ধাপে। এই ধাপগুলো নির্ধারণের সময় কোনোক্রমেই তাকে দোষারোপ করে বা লজ্জা দিয়ে তা করা যাবে না। এটা করতে হবে শক্তভাবেই, তবে তার মর্যাদা রক্ষা করে।

এর মানে হল, “ছি ছি, এতটুকু মানুষ, এসব কি কথা বল?”– এ ধরনের সুর কোনো কথায় আনা যাবে না। বরং বলতে হবে, “বুঝেছি, এটা তুমি জানতে চাও বা করতে চাও। অবশ্যই তুমি তা জানবে ও করবে। কিন্তু এ জন্য তোমাকে আরেকটু ধৈর্য ধরে ওটা করার বয়সে পৌঁছুতে হবে। ততদিন পর্যন্ত যা যা তোমার আছে, সেটুকুর ভেতরেই থেকো, কেমন?”– সুরটি রাখতে হবে যথাসম্ভব এ রকম।

৩) বেড়ে ওঠার ধাপগুলো সম্পর্কে সচেতন হোন

আপনার যে শিশুটি এই সেদিনও কিছুক্ষণ আপনাকে না দেখলে চিৎকার করে কাঁদত, এখন সে আপনার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতেও অস্থির হয় না। কখনও ভেবে দেখেছেন, এমনটা কেন হয়? এটা হয়, কারণ ওদের বেড়ে ওঠাটা ঘটে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে করে। এই ধাপগুলো সম্পর্কে জানুন ও তাদের সঙ্গে সবসময় একই আচরণ না করে ওই ধাপগুলো অনুযায়ী আচরণে পরিবর্তন আনুন।

৪) আপনার শিশুর ব্যক্তিত্ব ও মেজাজ-মর্জি সম্পর্কে জানুন

শিশুদের বাড়তি যত্নের দরকার, সেটা সবাই জানি। কিন্তু সেই বাড়তি যত্নটা সবসময়ই দরকার হবে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাবে বাড়তি কোনো মনযোগ বা সহায়তা না দেওয়াই শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার পক্ষে অনেক বেশি অনুকূল। তবে, কীসে তার বাড়তি যত্ন দরকার আর কীসে দরকার নেই– সেটা বুঝতে তার ব্যক্তিত্ব ও মেজাজ-মর্জি বোঝা জরুরি। হোঁচট বা আছাড় খেয়ে তা সামলে নিতে সচেষ্ট শিশুকে বাড়তি মনোযোগ (অ্যাটেনশন) দেওয়াটা জরুরি নয়। এটা তাৎক্ষণিকভাবে অবহেলা করাই যায়। কিন্তু সেই একই শিশু যদি বিদ্যুৎ চমকানি বা তেলাপোকা দেখে ভয় পায়, তখন সেটা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া জরুরি। এটা অবহেলা করা অনুচিত।

৫) শিশুকে নিজের ইচ্ছামতো খেলাধুলা করার জন্য প্রচুর সময় দিন

শিশুদের কিছু নিয়মতান্ত্রিক খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু এর বাইরেও তাদের নিজের ইচ্ছামতো কোনো খেলা যদি তারা খেলতে চায়, সে জন্যও তাদের প্রচুর সময় দেওয়া উচিত। এটা তাদের সৃষ্টিশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস বাড়াতেও ভুমিকা রাখবে।

৬) কখন আপনি কথা বলবেন আর কখন তাকে কথা বলতে দেবেন, সেটা জেনে রাখুন

শিশুরা চায়, বড়রা তাদের কথাগুলো আগে শুনুক। আপনি যদি মনযোগ দিয়ে তাদের কথা শোনেন, তাহলে দেখবেন, তারা সমস্যা না বরং নানা সমাধানই দিচ্ছে নিজেদের চাহিদা মেটানোর জন্য। এটা হয়, কারণ শিশুরাও তাদের সমস্যা নিয়ে ভাবে, সমাধান খোঁজে। কিন্তু সেটা করার জন্য বড়দের কাছ থেকে উৎসাহ না পেলে তারা নিজ থেকে খুব বেশি এগোয় না। জটিল পরিস্থিতিতে আপনাকে অবশ্যই এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সরল পরিস্থিতিগুলো তাকেই সমাধান করতে দিন।

৭) সন্তানের মা বা বাবা ছাড়াও আপনার যে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় আছে, তা তাকে বুঝতে দিন

যদিও এটা ঠিক যে আপনার অন্যসব পরিচয়ের চেয়ে সন্তানের মা বা বাবার পরিচয়টি আপনার কাছে অনেক বেশি আবেগময় অথবা সবচেয়ে পছন্দের। কিন্তু এটা বয়ে বেড়ানো তার ও আপনার উভয়ের জন্যই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। আপনি যদি আপনার অন্য পরিচয়গুলোও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, সেটা আপনাদের উভয়ের জন্যেই অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যের হবে।

৮) মনে রাখবেন, কিছু বলার চেয়ে করে দেখানোটা শিশুর কাছে অনেক বেশি গুরুত্ববহ

আমরা শিশুদের যতটা মনোযোগী বা কল্পনাশক্তিসম্পন্ন বলে ধারণা করি, তারা তার চেয়েও ঢের ক্ষমতা রাখে। তাই আপনি কী বলছেন, তা থেকে তারা বেশি লক্ষ্য করে আপনি সেসব নিজে কতটা মানছেন– সেদিকে।


আপনি তার সামনে প্রধানতম ‘রোল মডেল’। তাই তার প্রাথমিক ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে আপনার দেখানো উদাহরণগুলো থেকে, কথা শুনে নয়। শিশু আপনার সব কর্মকাণ্ড অনুসরণ করছে– এটা জানলে সে-ই শুধু নয়, আপনিও সঠিক আচরণ করবেন এবং এর মাধ্যমে উপকৃত হবেন।

৯) মনে রাখবেন, শিশুর মধ্যে ইতিবাচক আচরণ ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে ওঠার জন্য দরকার সঠিক যোগাযোগ, আনন্দময় পরিবেশ এবং সৃষ্টিশীলতা

ভয় দেখিয়ে, কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখে শিশুকে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অনেক সঠিক কাজ করিয়ে নেওয়া যায় সত্য, কিন্তু এগুলোর অসারতা বুঝতে তার খুব একটা সময় লাগে না। আর তখন সে নিজ থেকে সঠিক পথে থাকতে আর উদ্বুদ্ধ হয় না। বরং তাকে সঠিক বিষয়টি বুঝতে সময় দিলে এবং কোনো চাপ না দিলে যে শিক্ষাগুলো তার হয়, সেগুলোর ফল হয় সুদূরপ্রসারী।

১০) শিশুর সঠিক আচরণ নয়, সঠিক হৃদয়বৃত্তি গড়ে তোলার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভাবুন

পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে আমরা এমন একটা ধারণা নিয়ে থাকি যে সঠিক প্যারেন্টিং মানেই হল এমন এক শিশুকে বড় করে তোলা, যে শান্ত, সুবোধ ও নিয়মানুবর্তী।

এগুলোর প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। কিন্তু তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল এমন এক মানুষ হিসেবে তাকে গড়ে উঠতে সহায়তা করা; যে হবে সুখী ও স্বাস্থ্যবান। আর তা করতে গেলে ওগুলো কিন্তু মূল গুণাবলী নয়। বরং মূল যে গুণাবলী তার অর্জন করা প্রয়োজন, সেগুলো হল: চিন্তাভাবনা ও আবেগের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা, সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা, সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝা ও সেগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দক্ষ হয়ে ওঠা; সর্বোপরি, এমন সব দক্ষতা অর্জন করা যা তাকে ও তার পরিপার্শ্বিক অবস্থা সারা জীবনের জন্য নিরাপত্তা দেবে, পথ দেখাবে।

এতক্ষণ যা যা বললাম, এর কোনোটাই খুব সহজে অর্জন করা যাবে না। তবে এগুলো করা যত কঠিনই হোক, আমাদের ভাবতে হবে, শিশুর বেড়ে ওঠার সহায়ক এসব ভূমিকা কি আমরা ঠিকঠাক রাখতে পারছি?

৬৫৯ বার পঠিত

মন্তব্য

২ টি মন্তব্য করা হয়েছে

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

জাযাকাল্লাহ

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
নকীব বিন মুজীব

নকীব বিন মুজীব

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২৩:৩৮ অপরাহ্ন

লেখাটি ভাল ৷ এমন আরো লেখা চাই ৷

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...