কবিতার ভাষা ও ইসলামি দর্শন

কবিতার সংজ্ঞা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। কারণ আজ পর্যন্ত যারাই কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাদের কেউই নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় একমত হতে পারেননি। এখান থেকে যে বিষয়টা উপলব্ধি করা যায় তা হচ্ছে, কবিতা বিষয়টাকে মূলত কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। শব্দ থাকে কবিতার সেরা পুঁজি, শব্দের কারসাজি হয় কারেন্টের নেগেটিভ ও পজেটিভ পয়েন্টের মতো, শব্দের বুনন কিংবা গাঁথুনি হয় কবির আরাধ্য সাধনা আর বোঝানোর দুর্বোধ্যতা হয় এখানের হেঁয়ালি বা কবির শয়তানি‘শয়তানি’ বলেছি বলে আবার নেতিবাচক ধারণা নিবেন না। আমাদের পূর্ববর্তী আরবি ও ইসলামি সাহিত্য সামলোচকগণ এই শয়তানি শব্দটা বেশ প্রগলভতার সাথে উচ্চারণ করে গেছেন।


শব্দ নিয়েই কবিতার খেলা শুরু হয়। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ি, ড. আব্দুল বাসিত বদর ‘শব্দ’ সম্পর্কে আমাদের পড়াতে গিয়ে দুইটা বিষয় বলেছিলেন, একটা হলো শব্দের গন্ধ। আরেকটা হলো শব্দের তাপ। শব্দের গন্ধ আছে। তা শুঁকতে হয়। কবিরা তাই যেকোনো শব্দকে যেনতেন স্থানে বসাতে চান না। যে শব্দের গন্ধের সাথে যে স্থান-কাল-পাত্র মানানসই হয়, তারা শব্দটিকে সেখানেই বসিয়ে থাকেন। ভালোবাসার কাতরতায় শব্দের সুমিষ্টতা যেমন কাম্য, রিক্তের বেদনায় অশ্রুর বাষ্পময় শব্দের তেমনই খুব প্রয়োজন। তবে স্থূল ও মারত্মক ‘সরলতা’ কখনও কবিতায় আসে না। আসে অধরা অস্পর্শ বা অসীম অর্থের ঝিলিক নিয়ে আসা কোমল পেলব পুষ্পিত শব্দের সলীল বর্ণের ব্যাঞ্জন


আপনি সুরা রহমানের প্রথম ফাবি আয়্যি আ-লা.. পর্যন্ত পড়েন। দেখবেন শব্দের বর্ণগুলো শক্ত গাঁথুনি বর্ণের চেয়ে কিছুটা কোমলমধ্যম পর্যায়ে চেয়ে সামান্য বেশি। কিন্তু সেই একই সুরার ৩৭, ৩৯, ৪১ আয়াত তিনটা পড়ে দেখুন, অনুভব করতে পারবেন, এই একই শব্দগুলোই যেন হাতুড়ি দিয়ে আপনার অন্তরালোকে আঘাত করছে। এর কারণ হচ্ছে, সে আয়াতগুলোর আগে পরে কেয়ামতের বিভীষিকাময় সময়ের কথা আলোচিত হয়েছে। তাতে পাপী ও অপরাধীদের পাকড়াও করার কথাও আছে।


জুলায়খার সেই বিশেষ সময়ের শব্দটা ছিলো যৌন-আবেদনময়ী। ‘হাইতা লাক’। এই বিশেষ সময়ে পরিপূর্ণ শব্দ উচ্চারণ করা মেয়েদের জন্য সম্ভব হয় না। হবেই বা কেন? চিন্তা করে দেখুন! রুমের সব দরজা বন্ধ করে দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর যুবককে হাতের নাগালে পেলে তাদের বুক ফাটবে, কিন্তু মুখ ফোটার তো কথা নয়। তাই তো ‘হাইয়া’তু নাফসি লাক’ (আমি তোমার জন্য প্রস্তুত) পুরে কথাটা বলার সময় কই। দৃশ্য-অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহ তাই জুলায়খার ভাঙা ভাঙা স্বরের সংক্ষিপ্ত সেই ‘হাইতা লাক’ শব্দটাকে তুলে ধরেছেন। জুলায়খার সে সময়কার মনোদৈহিক বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার বর্ণনা দিতে সঠিক শব্দটাই এখানে আনা হয়েছে।


কবিরাও এভাবেই শব্দ শুঁকে থাকেন। কোনোটার কি গন্ধ তা বোঝার চেষ্টা করেন। ভবের পর্দায় অনুভব করেন। গভীর থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা-কোশেশ করেন।


আবার এই সুরারই একই আয়াতে ইউসুফ (আ.) এর নৈতিক উচ্চতার কাছে পরাভূত পার্থিব শব্দের পরিবর্তে অপার্থিব শব্দের ব্যবহার আমাদের শব্দ ব্যবহারের এক অনিন্দ্য সুন্দর উপমা দেখায় । ‘মাআজাল্লাহ’। আল্লাহর আশ্রয় বলে আল্লাহ আমাদের এক নিরাকার স্পর্শ অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী এক সত্তার স্নেহময় কোলে নিয়ে আসেন। ইউসুফের সেই শব্দ দুটো ছিলো ছুটে চলার প্রণোদনা, সেখানে ছিলো আশ্রয় পাওয়ার যাচনা হেতু ভিখারির ভাষা। ছিল পবিত্রতা অর্জনের জন্য শুচি ও শুদ্ধতার দিকে প্রাণান্ত পলায়নের এক জান্নাতি স্বপ্নের হাতছানি! ‘মাআজাল্লাহ’!!


একজন সাহিত্যিকের মাঝে যখন ঈমানের উদ্ভাস থাকে, তখন সে শব্দ শুঁকতে নাকের তিনটি ছিদ্র বানায়। বিশ্বসাহিত্যের উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট শব্দ শোঁকার জন্য একটা। ঈমানি শব্দের গন্ধ শোঁকার জন্য আরেকটা এবং কুফরি বা শিরকি শব্দ শোঁকার জন্য অন্যটা। প্রথমটার জন্য তাকে অনেক পড়তে হয়। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয়টার জন্য তাকে অনেক শিখতে হয়। আমি আমাদের বাংলা সাহিত্যের ইসলামি সাহিত্যিদের মাঝে হাতে গোনা অল্প কয়েকজনের মধ্যেই এই দ্বিতীয় গুণটা পেয়েছি। তবে কবি নজরুল ও ফররুখের মধ্যে ঈমানি ও কুফরি শব্দে পার্থক্য নিরূপণে প্রভূত জ্ঞান লক্ষ্য করেছি।


মুহাম্মাদ বিন আহমাদ ইবনে তাবাতিবা তার ‘ইয়ারুশ শে-র’ গ্রন্থে বলেন,

প্রতিটি শব্দের একটা উদ্দিষ্ট ভাব আছে। এই ভাবের সাথে ভাব প্রকাশকারীর মননে প্রোথিত বিশ্বাসের সম্পর্ক থাকে। কাজেই কবি সাহিত্যিক যখন কোনো ইসলামি ভাব প্রকাশ করতে চায়, তখনই সাহায্য গ্রহণ করে সেই সব ভাব বহনকারী শব্দ ভান্ডারের। এভাবেই তার ইসলামি ভাব প্রকাশের উপযুক্ত পাত্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ে শব্দগুলো। আর সেই গ্রথিত শব্দগুলোই তৈরি করে অনন্য এক আবেদন।



শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ছিল অনন্য। ইমাম বুখারী রহ. বর্ণনা করেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন না বলে ‘আমার অন্তর পুঁতিময় (খাবাসাত) হয়ে গেছে’, বরং বলবে আমার মন শক্ত (লাকিসাত) হয়ে গেছে’। দেখেন শব্দ শুঁকে ব্যবহার করা জন্য এর চেয়ে চমৎকার দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে?


একজন লোক আমাদের নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বলল, ‘আল্লাহ চেয়েছেন আর আপনি চেয়েছেন’ (দুটো বাক্যের মাঝে ‘ওয়াও’ ব্যবহার করে)। তার কথা শুনে তিনি বললেন : না, তোমরা এভাবে বলো না। বরং বলবে : ‘আল্লাহ চেয়েছেন তারপর আপনি চেয়েছেন’ (দুটো বাক্যের মাঝে ‘সুম্মা’ ব্যবহার করে)। এই হাদিস থেকে যে বিষয়টা বোঝা যায় তা হচ্ছে, ‘ওয়াও’ এবং ‘সুম্মা’-এর ব্যবহার একটা বাক্যকে শিরকের দিকে নিয়ে যায়। আবার কখনও ঈমানের দিকে।


বিশেষভাবে এদিকে লক্ষ্য করে আমাদের নবিজি মানুষের নাম পরিবর্তন করে দিতেন। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহ. বলেন, আমার দাদা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলে তিনি নাম জিজ্ঞেস করেন। আমার দাদা জবাব দেন ‘হাযন’ (শক্ত মাটি)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- না, তুমি সাহাল, (নরম মাটির সমতল ভূমি)।


শব্দের গতরে ইসলামি পোশাক পরাবার আরেকটা ভালো উপায় হলো তার উপর সুগন্ধময় আতর ছড়িয়ে দেয়া। দেখেন স্ত্রীর সাথে বৈধ মিলনের যে যৌনবিজ্ঞানীয় নাম আছে তা কুরআন একটা বায়বীয় অথচ সুন্দর ও চমৎকার শব্দ দিয়ে প্রকাশ করেছে। সুরা বাকারার ২২৩ নম্বর আয়াতে শষ্যক্ষেত্রের কাছে আসা, নিসার ২১ নম্বর আয়াতে একে অপরের সান্নিধ্যে আসা, নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতেঘুমানোর জায়গায় ত্যাগ করা এবং একই সুরার ৪৩ নম্বর আয়াতেপরস্পর স্পর্শ করা বলে দেখুন কি সুন্দর ও সংযত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।


বাংলা ভাষার শব্দগুলোর উৎপত্তি হল, শিরকবাহী সংস্কৃত ভাষা। মুসলিম কবি-সাহিত্যিকগণ প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন, এই ভাষাটাকে ইসলামি করণে। আমি যখন এই ভাষার প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের সাহিত্যিকদের পড়ি, তখন মন ভরে যায়। তাদেরকে এই আধুনিক মুসলিম ভাষা তৈরি করতে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়েছে। যবন, ম্লেচ্ছ ইত্যাদি গালাগালি সহ্য করতে হয়েছে তাদের।


আমার শায়খ আবুল হাসান আলী নদভি একবার ঢাকায় এসেছিলেন। আমি তখন তামিরুল মিল্লাতের ছাত্র। ইসলামিক ফাউন্ডেশানে তিনি এসে একটা বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি আফসোস করে দুইটা কথা বলেছিলেন। দুইটাই আমার চোখ খুলে দেয় এবং পরবর্তিতে সেই আলোকে আমি মাস্টার্সের থিসিস লিখি। তিনি বলেছিলেন উপমহাদেশের মুসলিমরা দুটো ভাষার জন্মদাতা। একটা হচ্ছে উর্দু; যা আজও মুসলিমদের হাতে থাকায় উৎকর্ষের শীর্ষে। আরকেটা হলো বাংলা ভাষা, যা আধুনিককালের পৌত্তলিকদের হাতে চলে গিয়েছে। মুসলিমরা বিশেষ করে উলামায়ে কিরাম তাকে কোলে না নেয়ায় তা থেকে ইসলামি রঙ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তিনি বিভিন্ন মাদরাসার ক্লাসগুলো উর্দু ভাষায় নেওয়াকে খুব অপছন্দ করেন। তিনি নির্দেশ দিয়ে যান এসব মাদরাসাগুলোতে যেন ব্যাপকহারে মাতৃভাষার চর্চা হয়।


আমি তাজ্জব হয়ে যাই, যখন একজন ঈমানদার ব্যক্তি অবলীলায় ব্যবহার করে যাচ্ছে নানা রকম শিরক ও কুফরিমূলক শব্দ। আমাদের জহুরি (সালাহুদ্দীন) এ সম্পর্কশব্দ সংস্কৃতির ছোবল গ্রন্থে কিছু শব্দের আলোচনা করেছেন। যেমন : আমরা প্রায়ই এই শব্দগুলো ব্যবহার করি- আলিঙ্গন, ঐশীবাণী, ঐশীশক্তি, কীর্তন, তিলোত্তমা, দৈববাণী, প্রয়াত, বেদী, বিশ্ব ব্রম্মাণ্ড, লক্ষ্মী, সতীসাধ্বী, স্নাতক, হরিল ইত্যাদি। আমরা এই শব্দগুলো যে ব্যবহার করা ঠিক না, তাও জানি না। কাজেই ভাষার গায়ে ইসলামি পোশাক পরাতে হলে আমাদের সেসব শব্দ পরিহার করতে হবে, যা আমাদের ঈমানে আঘাত করে বা কুফরির দিকে নিয়ে যায়।


শব্দে ইসলামি রঙের ঢেউ খেলাতে আমাদের শব্দের ‘তাপ’ বিভিন্নভাবে মেপে দেখতে হবে। শায়খ আবুল হাসান আলী নদভি ছিলেন এই ব্যাপারে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও থিওরিদাতা। ড. আব্দুল বাসেত বদর আমাদের যখন এই বিষয়টা পড়ান, তখন আমি এটা নিয়ে ভাবতে থাকি। পরে শায়খ আবুল হাসান আলী নদভির লেখাগুলো পড়ে আমি অভিভূত হয়ে যাই। তিনি এ সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন তা আমি একটা বইতে প্রকাশ করেছি।দারুল মানারাহ থেকে বইটার একাধিক এডিশন প্রকাশিত হয়েছে।


তিনি বলেন, শব্দ সম্ভার ও তার গাঁথুনি ছাড়া কোনো ভাষা কল্পনা করা যায় ন। আর এই শব্দসম্ভার ও তার গাঁথুনিই মূলত আমাদের চিন্তা ও কল্পনা প্রকাশে মারত্মক ভূমিকা পালন করে। যদি এই শব্দগুলো মন থেকে সলীল প্রবাহের মত বের হয়, যেখানে থাকবে না সাহিত্যশক্তি প্রকাশের ভণিতা অথবা অহংকার, শব্দের গতি যদি থাকে সহজতার পথে প্রবহমান, বোঝার ক্ষেত্রে যদি তা হয় সরল-সোজা, তাহলে তা মানব মনে দারুন প্রভাব ফেলে। তাই তিনি ভাষা-নির্মাণে যে শব্দের জয়গান গেয়েছেন তা হলো -

বেছে বেছে নেয়া অনুপম শব্দ, হালকা হালকা শব্দের বুননে এমন প্রকাশ যাতে থাকে সূক্ষ্মতার স্বাদ, ও কোমলতার স্পর্শ। যদি শব্দগুলো কোনো কবি বা সাহিত্যিকের কলিজার টুকরা হয়ে আসে, অন্তরে গভীর থেকে উৎসারিত হয়, কিংবা অশ্রুর দমকে তার উছলে পড়ে সাহিত্যে, তা হয় সাহিত্যের একেকটা মোজেজা। আর তা বরণীয়  হয়ে ওঠে কালান্তরে। মনে মনে তার প্রতিধ্বনি হয়, মুখে মুখে তা গীত হয়, কানে কানে তা হয় সতত শ্রুত।


তিনি আরও বলেছেন,

শব্দের তাপ আছে। এই তাপ তুমি বুঝে নাও। যেখানে আগুনের হাল্কা বেয়ে যাবে তার জন্য নিয়ে এসো ফুল্কির ধারা। বিদ্রোহের জায়গায় আনো ঘোড়াদের অনিরুদ্ধ দুল্কির সাওয়ার। প্রেমের বাগানো আনো পুষ্পকোমল সুরভী। আর বেদনার বুক জ্বালায় নিয়ে এসো আঁসুময় ঢেও। তোমার পাঠক যেন তোমার সাথে হাসে, তোমার শব্দে কাঁদে, তোমার ভাবনায় মিশে যেয়ে সমূদ্রের গভীরে হারাতে তোমার হাতে হাত রাখে।

এখানে কুরআন আমাদের দেখায় নতুন নতুন দিগন্ত। অপরাধীকে বেঁধে আনতে আল্লাহর যে নির্দেশ আলোচনা করা হয়েছে, তা একটু পড়ে দেখুন। বর্ণের কাঠিন্য, শব্দের মারাত্মক অমসৃনতা এবং স্বরের বিপজ্জনক ঝঙ্কার আপনাকে ভীত ও কম্পিত করে তুলবে। আপনি না বুঝেলেও কারো তিলাওয়াত শুনুন দেখবেন ভয় পাচ্ছেন।

خُذُوهُ فَغُلُّوهُ (30) ثُمَّ الْجَحِيمَ صَلُّوهُ (31) ثُمَّ فِي سِلْسِلَةٍ ذَرْعُهَا سَبْعُونَ ذِرَاعاً فَاسْلُكُوهُ (32)


তাকে ধর তারপর তার গলদেশে বেড়ি পরাও। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। তারপর তাকে বেঁধে ফেল সত্তর গজ দীর্ঘ এক শেকলে।


এরই আলোকে আপনি এখন পড়ে যান বিশ্বসাহিত্য। রচনা করেন আপনার সেরা সাহিত্যের নমুনা। দেখবেন তা কেমন মোহময় হয়ে ওঠে।


আব্দুল মান্নান সৈয়দ স্যারের সাথে আমার কয়েকবার দেখা হয়েছে। তিনি অনেক ভালো ভালো কিছু কথা আমাকে শিখিয়েছেন। তার মধ্যে একটা হল, কেন নজরুলের লেখায় এমন বিদ্রোহের ঝংকার এবং কেন রবীন্দ্রনাথের লেখায় এত মিনমিনে সুর। তিনি বলেছিলেন, নজরুলের তাওহিদি চেতনা দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া আর কারো সামনে মাথা নত করায়নি। পাহাড় দেখে মাথা নত তো হয়নি তার, বরং তা ডিঙিয়ে অথবা এই বিন্ধাচল মাড়িয়ে অথবা ভেঙে সামনে যেতে চেয়েছেন। তিনি বন্দীত্বকে ভেঙে দিতে চেয়ছেন, তিনি আকাশে উত্থিত হতে চেয়েছেন। অথচ রবীন্দ্রনাথের মাথা নত হয়েছে সর্বত্র, মিনতির গান সারা স্বরলিপিতে এবং আত্মসমর্পণ কখনও সৌন্দর্যে, কখনো বৈভবে, কখনও সমাজের শীর্ষে যাবার লিপ্সায়। ফররুখের কবিতাগুলোতে দ্রোহের গান আসেনি, এসেছে কালো অমানিশায় পথ খুঁজে পাওয়ার প্রেরণা, প্রণোদনা। এজন্যই কখনও ক্ষেদ, কখনো জাগরণী আহবান, কখনো আত্মসমালোচনা বা কখনও দুর্বলতার আঙুলি-নির্দেশ।


আরেকটা কথা এখানে আলোচনা করা দরকার; তা হচ্ছে- কবিতার ভাষা কিন্তু কখনও আইনের ভাষা নয়। কুরআনে আমরা মাদানি ও মক্কি সুরার ভাষায় অনেক পার্থক্য দেখি। মাদানি যুগের সুরায় আনা হয় বিধিবিধান। তাই সেগুলোতে বিধান সংক্রান্ত ভাষার প্রাবল্য। অথচ মক্কি জীবনের সুরাগুলোতে পাবেন দুনিয়ার সেরা কবিদেরকে মূক করে দেয়া কুরআনি মোজেজা।


সরল কথা আপনি বলতে পারেন স্টেইজে উঠে। বলেন মিম্বরে দাঁড়িয়ে। বলেন বাচ্চাদের নানান নির্দেশ দিতে। কিন্তু আপনি যখন আবেগ নাড়া দেবেন, ভালোবাসার উৎসার ঘটাবেন, দ্রোহের গান শোনাবেন, প্রেমের মালা পরাবেন, বিরহের ফুল ফোটাবেন; সেখানে আপনি অতো সোজা কেন? কুহেলিকা তৈরি করুন, কুঞ্জটিকার আস্তরণের আপনার ভাষার সূর্যকে ঢেকে ফেলুন এবং হেঁয়ালিতে ভরে দিন আপনার মূল কথাগুলো।


আপনার শব্দরা নানান রঙ ধরুক, নানান অর্থের পথ দেখাক, সন্দিহান করে তুলুন পাঠককে। কখনো সে ভাবুক আপনার মত করে, কখনো সে বুঝুক তার নিজের মত করে, কখনো আপনার শব্দরা হোক আপনার যুগের প্রতিভূ, আবার কখনো সেগুলো হোক আগামি এক শত বছর পর আসা পাঠকের যুগের উপযুক্ত। এখানে কবিরা খুব ‘খেলা পাগল’। ওরা শব্দ নিয়ে খেলে। তা হয় নানা কৃত ও তদ্ধিত প্রত্যয়ে যুক্ত, নানা সমাসের দ্বারে ঢোকা আগন্তুক, কিংবা নানা প্রকার কারকের রসে জারিত। তারা নিজের মত করে তৈরি করে উপমা, আনে উৎপ্রেক্ষা, বানায় রূপকল্পতা। ঝংকারে আনে নানা সিম্ফন। কেউ কেউ কী শক্তিমান হয়, কালোত্তীর্ণ হয়, নিজ জাতির মাঝে থেকে উপরে অন্য জাতির মাঝে সাঞ্চারিত হয়, জিওগ্রাফির সীমা ছিন্ন ভিন্ন করে বিশ্ব সভায় জায়গা নেয়।


একে আগেকার মুসলিম সাহিত্য সমালোচকগণ ‘শায়তানাতুশ শে’র’ বা কবিতার শয়তান বলেছেন। শয়তান বলার কারণ এর প্রভাব মারাত্মকভাবে মানুষের মধ্যে পড়ে। আমাদের প্রিয় নবিজি অবশ্য এটাকে ‘যাদু’ বলেছেন। তিনি বলেছেন,

ইন্না মিনাল বায়ানি লাসিহর অর্থাৎ কিছু কিছু বলার ভঙ্গিমায় আছে যাদু। তিনি এইটাকে যাদু বলেছেন। কারণ এই ধরণের সাহিত্যই অন্তর কেড়ে নেয়।


.................

তাজবিদের পরিভাষায় যাকে বলা হয়—শাদীদ।      

তাজবিদের পরিভাষায় যাকে বলা হয়—রিখওয়া।

তাজবিদের পরিভাষায় যাকে বলা হয়—তাওয়াসসুত।

৪ বুখারী, কিতাবুল আদাব।

আল মাদখাল ইলা আদ দিরাসাত আল কুরআনিয়্যাহ : ১৩

নাযরাত ফীল আদাব, ২৮

শাখসিয়্যাত ওয়া কুতুব : ৭

সুরা হাক্কাহ : ৩০-৩২

৪০৭ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

ড. আব্দুস সালাম আজাদী। রিয়াদের কিং সাঊদ বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ইসলমি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে বিএ, এমএ ও পিএইচডি ও পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি করেছেন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকেও হাদিস ও তাফসিরে ডবল কামিল করা। দাওয়াহ ও লেখনিতে কাজ করে চলছেন। একাধিক বই আরব বিশ্ব থেকে পাবলিশ হয়েছে। লিখে চলছেন আলমুজতামা, রাবিতাহ, আল বা’থ আল ইসলামিসহ বিভিন্ন আরবি ম্যাগাজিন ও দৈনিকে। চট্টগ্রাম ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন, দীর্ঘ দিন খেদমত করেছেন লন্ডনের জামেয়াতুল উম্মাহ স্কুল এন্ড কলেজে, পার্ট টাইম কাজ করেন ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমান সোয়ান্সি ইসলামিক...

মন্তব্য

৬ টি মন্তব্য করা হয়েছে
মোহাম্মদ সুমন

মোহাম্মদ সুমন

০৭ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৬:৩১ অপরাহ্ন

মাশাআল্লাহ অসাধারণ লিখনি জাজাকাল্লাহ খাইরান

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
Marium Banu

Marium Banu

০৭ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৮:৩৭ অপরাহ্ন

Unique mashallah

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
তারিক

তারিক

০৭ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৮:৩৩ অপরাহ্ন

উস্তাযের হাতে একটা মাস্টারপিস পেলাম। যাযাকাল্লাহ।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
সাদমান শাকিব

সাদমান শাকিব

০৭ নভেম্বর, ২০১৯ - ২০:১৩ অপরাহ্ন

আলহামদুলিল্লাহ, অনেক গভীর লেখা। অনবদ্য লেগেছে। বাংলাভাষার ইসলামী সংশোধন সময়ের চাহিদা। আল্লাহ রহমত দিন, আমিন।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন
আবুনছর

আবুনছর

০৭ নভেম্বর, ২০১৯ - ২১:০২ অপরাহ্ন

উস্তাদের লেখা বই আকারে পেতে চা।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

০৯ নভেম্বর, ২০১৯ - ১৯:২৪ অপরাহ্ন

এক কথায় অসাধারণ অনুকরণীয় লেখনী।

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...