পৃথিবীতে আপনার সন্তান আসছে; আপনি কি প্রস্তুত?

দাম্পত্য জীবনে সন্তানের অবস্থান অবিচ্ছেদ্য-অনিবার্য। বিবাহ বন্ধনের মধ্য দিয়ে সন্তান আগমনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পৃথিবীতে মানুষের সিলসিলা ও আবাদ জারি আছে, থাকবে। রাব্বুল আলামিন নির্ধারিত মানবচক্রের এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

আমরা এখন সন্তান আগমনের প্রস্তুতির কথা বলতে চাই। সে প্রস্তুতিটা অবশ্যই স্বামী-স্ত্রী উভয়কে নিতে হবে। অর্থাৎ সম্ভাব্য সন্তানের আগমনের পূর্বে ভাবী পিতামাতাকে নিজেদের ও সন্তানের সুস্থতা এবং উন্নত চরিত্র গঠনের জন্য ২৪ ঘন্টার রুটিনে পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে আমল আখলাকেও। অন্তত তিন ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন।

শারীরিক সুস্থতা


প্রস্তুতি শুরু হবে সুস্থতা দিয়ে। জানা কথা হলো মা-বাবা সুস্থ হলে আশা করা যায় সন্তান সুস্থ হবে। অসুস্থতা নিয়ে একাডেমিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলতে চাই। যেমন ধরুন এলার্জি ও ডায়বেটিকস সমস্যা। স্বাম- স্ত্রী যখন সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে চাইবেন ঠিক সেই সময়গুলোর অন্তত ৬-৩ মাস পূর্বেই প্রোপার চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। উচ্চমাত্রার এন্টিবায়োটিক গ্রহণের মিনিমাম ৬-৩ মাসের কম সময়ের মধ্যে সন্তান পেটে আসলে ক্ষতির আশংকা থাকে। যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তারাও কেমিক্যাল মেশানো খাবার (ফলমূল, পাস্তুরিত দুধ, সার/প্রিজারভেটিব যুক্ত সবজি, মাছ, ফিড খাওয়ানো মুরগী, বেশি বেশি গরুর গোশত খাওয়া) খাওয়ার অভ্যাস সন্তান গ্রহণের চিন্তা মাথায় আনার অন্তত ৬-৩ মাস আগে থেকে বাদ দিবেন। সকল রোগ থেকে যথাসম্ভব সুস্থ থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। এরপর সন্তানের ব্যাপারে আল্লাহ কে বলা শুরু করবেন।

যাদের সকালে ঘুমসহ দিনে ৮-১০ ঘন্টা ঘুমের সুখ (!) অভ্যাস আছে, তাদেরকে ঘুমের লাগাম টেনে ধরতে হবে। বেশি ঘুমালে শরীর খারাপ ও দূর্বল হয়ে পড়ে। শরীরে বাড়তি মেদ হয় আর এই অবস্থায় সন্তান আসলে তার ভিত্তি দূর্বল থাকে। এক্ষেত্রে বাচ্চা দেখতে নাদুসনুদুস ও দৃষ্টিনন্দন হলেও বাস্তব কর্মজীবনে তাদের পারফরম্যান্স কম থাকে। তাই ঘুম ছয় ঘন্টায় আনার পাশাপাশি সপ্তাহে কমপক্ষে ২-৩ দিন ব্যায়াম করার অভ্যাস করতে পারলে শরীর ও মন প্রফুল্ল থাকবে। এমতাবস্থায় সন্তান আসলে তা সক্ষম ও সুস্থ হবে বলে আশা করা যায়। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।


মানসিক প্রস্তুতি


সন্তান আল্লাহর কাছে চাওয়ার পূর্বে স্বামী-স্ত্রীর কিছু মানসিক প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। বিশেষত স্ত্রীকে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম হচ্ছে সুস্থতা। শরীর ভালো তো মন ভালো। পাশাপাশি দুশ্চিন্তা দূর করা। আর্থিক অনটন মনসিক দুশ্চিন্তার সবচেয়ে বড়ো কারণ। এক্ষেত্রে অভিভাবক ও বন্ধু বান্ধবগণ আর্থিক সংকট নিরসনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। এ সময়গুলো হবে দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। মধুর সম্পর্ক বিরাজমান থাকবে। কারও পক্ষ থেকে এমন কোন সিন ক্রিয়েট করা যাবে না, যার দরুন মানসিক অশান্তি তৈরি হয়।

আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি

ইসলাম পরিবার গঠনের উপর বর্ণনাতীত গুরুত্বারোপ করেছে। তাই একটি শিশুর আধ্যাত্মিক গঠন ও বিকাশ শুরু হবে তার জন্মের আগে থেকেই। সম্ভাব্য মা-বাবার ইবাদাত-বন্দেগী, খোদাভীরুতা, মার্জিত ও নমণীয় আচরণ, পর্দানশীলতা, লজ্জাশীলতা ইত্যাদি গর্ভের সন্তানের উপর সম্যক প্রভাব ফেলে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে।

সন্তানের পিতা-মাতা যদি বদমেজাজী, চরিত্রহীন, লম্পট, ধর্ষক, দূর্নীতিবাজ শ্রেণির হয়, তবে এসবের একটা বড়ো প্রভাব গর্ভস্থ সন্তানের উপর পড়তে পারে। বিশেষত মাকে বাচ্চা পেটে নিয়ে অতিরিক্ত হাসিঠাট্টা, বেহুদা কথাবার্তা, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা, ঝগড়াঝাটি ইত্যাদি সবকিছু সচেতনতার সাথে পরিহার করতে হবে। বেশি বেশি সিরিয়াল না দেখে বেশি বেশি কুরআন-হাদিস অধ্যয়ন করতে হবে। নামাজ ঠিকঠাক আদায় করতে হবে।

যে সমাজে আমরা বসবাস করছি, সেখানে এই শেষের প্রস্তুতিটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এত্ত অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নোংরামি ও পাপাচারের মধ্যে আদরের সন্তানের সুন্দর বেড়ে ওঠার জন্য পিতা-মাতাকে আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির ব্যাপারে সিরিয়াস হতে হবে। মনে রাখবেন ইনপুটের আলোকেই কিন্তু আউটপুট আসে।


সন্তান যখন মায়ের পেটে

মায়ের পেটে সন্তান আসার পর থেকে শুরু হয় দাম্পত্য জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অবস্থা। আচার-আচরণ, চাওয়া-পাওয়ার মাত্রা ও পরিধি সবকিছুতেই ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বিশেষত গর্ভবতী স্ত্রী, যিনি এই প্রথম মা হতে চলেছেন, তার পরিবর্তনটা এ সময় দু’ভাবে হয়ে থাকে।

মানসিক পরিবর্তন

এক অজানা আতঙ্ক পেয়ে বসে তাকে। আমাদের সমাজব্যবস্থাও এর জন্য কম দায়ি নয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন অনেক মহিলা সন্তানসম্ভবা মহিলার সাথে গর্ভকালীন সংকট, এ সময়ে মহিলাদের কষ্ট, কোথায় কবে একজন মারা গিয়েছিল ইত্যাদি গল্প বেশি বেশি শেয়ার করে। যার ফলে সন্তানসম্ভাবা মা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

ঠিক এ মুহূর্তগুলোতে স্বামী হিসেবে কয়েকটি কাজ আন্তরিকতা, ধৈর্য ও সহমর্মিতা নিয়ে অন্তত ৮-৯ মাস করে যেতে হবে। নতুন সংসারে, নতুন আন্ডারস্ট্যান্ডিং পিরিয়ডে এটা মেনে নেওয়া নিঃসন্দেহে কঠিন। তবে অনাগত ভবিষ্যত এবং আপনার কাঙ্খিত সন্তানের কল্যাণের কথা চিন্তা করে তা মেনে নিতেই হবে। এ সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খুব ভালো বোঝাপড়া থাকতে হবে। সঙ্গী সর্বদা সঙ্গিনীর আরাম আয়েশ, ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ খেয়াল রাখবেন। কয়েকদিন পূর্বেও যা হয়তো উল্টো ছিল। সদা মনে রাখতে হবে যে আপনি ঠিক এমন একজনের পাশে আছেন, যিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত ভীত ও দূর্বল। তাকে আপনার সাহায্য সহায়তা করা দরকার। সাহস দেওয়া দরকার।

এ সময় শারীরিক পরিবর্তন খুব দ্রুত শিফট হয়। এ সময়টা খুব সেনসেটিভ। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত সময়টাকে মেডিকেল সাইন্স তিন ভাগে ভাগ করেছে। যাকে ট্রাইমিস্টারস (trimester) বলে। প্রতি ট্রাইমেস্টারে আপনার ও আপনার শিশুর দেহে কী পরিবর্তন ঘটে, এটা আগে থেকেই জানা থাকলে আপনার আচরন সহজেই ঠিক করে নিতে পারবেন এবং পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে পারবেন।

তাহলে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে যে, এ সময়টা একজন নারীর জন্য কতটা কষ্টের, কতটা আতঙ্কের। আপনি চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন- একজন মানুষের পেটের মধ্যে আরেকজন মানুষ ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে। পেটের বাচ্চা তার মায়ের রক্ত টেনে নিয়ে নিজের শরীর গঠন করছে। সে পেটের ভেতর নাড়াচড়া করছে, লাথি মারছে।

কল্পনা করুন তো, এ অবস্থায় স্বামীকে কতটা ধৈর্যশীল হতে হবে! নিজের কাজ নিজে করার পাশাপাশি স্ত্রীরও অনেক কাজ তাকে করতে হবে। কাজের লোক না থাকলে কাপড় কাঁচা, কলস থেকে পানি ভরা, ঘর-দোর পরিস্কার করা ইত্যাদি কাজ করা কোনো পুরুষের জন্য স্বাভাবিক নয়। আপনি যদি সত্যিই আপনার স্ত্রীকে ভালবাসেন, তার কল্যাণ চান, আপনার ভবিষ্যত প্রজন্মের কল্যাণ চান, তবে আপনাকে তা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে হাসিমুখে করতে হবে। অন্যথায় সংসারে অশান্তির আগুন লাগানোর জন্য আপনি দুনিয়া ও আখেরাতে দায়ি থাকবেন। এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া সন্তানসম্ভবা মাকে আপনি ন্যূনতম কোনো কষ্ট দিতে পারেন না। কেবল স্ত্রী হিসেবে নয়; মানুষ হিসেবেও আপনাকে উত্তম আচরণ করতে হবে।

২১৭ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

এইচ এম জোবায়ের। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার ও রাজনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এমফিল গবেষণা করছেন সেখানেই। স্বপ্ন দেখেন আলোকিত সমাজের এবং সেই সমাজ নির্মাণের অংশীদার ভাবেন নিজেকে। মানুষের আত্মিক ও নৈতিক সংশোধনের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে চান। পেশাদার জীবনে তিনি গ্লোরিয়াস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও কলেজ, সাভার, ঢাকাতে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করছেন।

মন্তব্য

১ টি মন্তব্য করা হয়েছে
রফিক

রফিক

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ - ২৩:৫০ অপরাহ্ন

খুব ভাল লাগলো নতুন আরো পোস্ট চাই

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...