সুলতান আলপ আরসালান : মহানুভব এক সেলজুক সিংহ

যে ঝড় সমুদ্রে এসেছে, পাড়ে আছড়ে না পড়ে তা থামবে না...


১০৬৩ খ্রিষ্টাব্দ। সেলজুক সাম্রাজ্যে স্থপতি এবং প্রথম স্বাধীন সুলতান তুগ্রুল বে কিছুক্ষণ আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। মাথার কাছে রাখা তার ক্ষুরধার তলোয়ার, যা দিয়ে তিনি এই কিছুদিন আগেও বুয়িদ সাম্রাজ্যের শিয়াদের হটিয়ে বাগদাদ আবার খলিফা কাইম বি-আমরিল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর উপহারস্বরূপ খলিফা থেকে পেয়েছেন সুলতান উপাধি। সুলতান একটি আরবি শব্দ। যার অর্থ হয়—রক্ষাকবচ বা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত নেতা। এই উপাধি কেবল মাত্র একজন আজমিই (যিনি আরবি নন) নিতে পারেন। তুগ্রুল বে মারা গিয়েছেন, খালি পড়ে আছে তার সিংহাসন। শিয়রে বসে আছেন তারই পালক পুত্র সুলাইমান আর বারান্দায় অস্থিরচিত্তে পায়চারি করছেন তুগ্রুল বে-র প্রধানমন্ত্রী আমিদুল-মালিক কুন্দুরি। সুলাইমান তুগ্রুল বে-র ভাই চেগরির সন্তান। নিজের সন্তান নেই বলে ভাইয়ের সন্তানকে নিজের কাছে এনে রেখে বড় করেছিলেন একজন শাহজাদা হিসেবে।


মৃত্যুর আগে তুগ্রুল বে কুন্দুরির কাছে অসিয়ত করে গিয়েছেন, তার মৃত্যুর পর মহান সেলজুক সিংহাসনে বসবেন তারই পালিত পুত্র সুলাইমান। এই নিয়েই বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে কুন্দুরিকে। কারণ তুগ্রুল বে-র চাচাতো ভাই কুলতামিশ এবং তারই আরেক ভাতিজা সুলাইমানের ভাই আলপ আরসালানও তুগ্রুল বে-র মৃত্যুর পর সিংহাসন নিজেদের অধিকারে নিতে চায়। কুন্দুরি নিজেকে সংযত করলেন এবং তুগ্রুল বে-র দাফন শেষ করে সুলাইমানকে নতুন সেলজুক সুলতান হিসেবে অভিষেক করালেন। উপর্যুপরি, তিনি যে ভুলটা করেছেন—আলপ আরসালানকে খোরাসানে একটি চিঠি পাঠিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন, যাতে সে কোনোভাবেই সুলতান-বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হয় এবং সুলাইমানকে সুলতান হিসাবে মেনে নিয়ে সাম্রাজ্যে কোনোধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টা না করে। কিন্তু তার কয়েকদিন পরই কুন্দুরি খবর পেলেন, আলপ আরসালান তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে খোরাসান থেকে যাত্রা শুরু করেছেন রাজধানী রায় নগরী অভিমুখে এবং সে সিংহাসনের দখল করে নিতেও দৃঢ় প্রত্যয়ী। কুন্দুরি ভয় পেয়ে গেলেন এবং আরসালানের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে মসজিদে মসজিদে আরসালানের নামে খুতবা দিতে আদেশ করলেন। আর সুলাইমান পালিয়ে গেলেন শিরাজ শহরের উদ্দেশ্যে। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই খবর এলো আরেকটি বাহিনী নিয়ে কুলতামিশ এগিয়ে আসছেন সেলজুক রাজধানী রায় দখল করার জন্য। কে আর থামায়? বেঁধে গেল গৃহ যুদ্ধ!


Image result for আলপ আরসালান



কে এই আলপ আরসালান :

তুগ্রুল বে-র পর সেলজুকদের মহান সুলতান হন—আলপ আরসালান। যিনি ছিলেন তুগ্রুল বে-র বড় ভাই চেগরির সন্তান। তার আসল নাম ছিল মুহাম্মাদ। তার নামের অর্থ সিংহযোদ্ধা । জন্ম ২০ জানুয়ারি ১০২৯ । প্রাথমিক জীবনে তিনি তার চাচা তুগ্রুল বে র সাথে ফাতেমীয় শিয়াদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। ১০৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তার বাবার মৃত্যুর পর খোরাসানের শাসক হিসেবে নিযুক্ত হন।


দামঘানের যুদ্ধ ও আরসালানের ক্ষমতা দখল :

কুলতামিশ তার সৈন্যদের নিয়ে কুন্দুরির রাজবাহিনীকে হারিয়ে সিংহাসন দখল করে নেন। এবার কুলতামিশ সামনে এগিয়ে দামঘান প্রান্তরে উপস্থিত হন আলপ আরসালানের যাত্রা থামিয়ে দিতে। পথে তিনি হাচিব এরদেম নামক আরসালানের জনৈক সেনাপতিকে তার ক্ষুদ্র বাহিনীসহ পরাজিত করেন। কিন্তু এরপরই ঘটে বিপত্তি... আরসালানের সেলজুক বাহিনী দেখে কুলতামিশের বেশিরভাগ সৈন্যই পালিয়ে যান। সামান্য সংখ্যক সৈন্যই তার সাথে থেকে যায়। যাদের নিয়ে আপ্রাণ লড়েও পরাজিত হন কুলতামিশ। রাজধানী রায় দখল করে ২৭ এপ্রিল ১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সেলজুকদের নতুন সুলতান হন আলপ আরসালান। ক্ষমতায় বসেই তিনি কুন্দুরিকে হত্যা করেন এবং ইবনে আলী আত-তুসি-কে প্রধানমন্ত্রী ও নিজামুল মুলক (সাম্রাজ্যের ব্যবস্থাপক) হিসেবে নিয়োগ দেন। ইনিই ইতিহাস-বিখ্যাত সেই নিজামুল মুলক তুসি।


বিদ্রোহ দমন :

সুলতান হওয়ার পর আলপ আরসালান প্রথমেই যার কাছ থেকে বাধাপ্রাপ্ত হন, তিনি হচ্ছেন খোদ আব্বাসি খলিফা। খলিফা তাকে বাগদাদ ছাড়তে চাপ দিতে থাকেন। খলিফা সুলতানের ক্রমশ বর্ধিষ্ণু শক্তিকে নিজের প্রতিযোগী ভাবতে শুরু করেন। আদতে খলিফার তখন শক্তিমত্তা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। অধিকন্তু তিনি অন্য মুসলিম সুলতানদের একযোগে সুলতান আলপ আরসালানের উপর আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেন। কিন্তু বাকিরা আরসালানের বাহিনীর ভয়ে তার বিরুদ্ধে আঙুল ওঠানো থেকে বিরত থাকে। তুগ্রুল বে-র মৃত্যুর আগে খলিফার মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আরসালান খলিফাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য খলিফার মেয়েকে আবার বাগদাদে পাঠিয়ে দেন। খলিফা এবার ভয় পেয়ে যান। আর দ্রুতই আরসালানের সালতানাত মেনে নেওয়ার ঘোষণা করেন।


খলিফার উপদ্রব থেকে মুক্তি লাভ করে এবার আরসালান তুগ্রুল বে-র মৃত্যুর সাথে সাথে হওয়া বিদ্রোহ দমাতে এগিয়ে যান। প্রথমে তিনি জর্জিয়া যান এবং তা দখল করে পূর্ব আনাতোলিয়ার দিকে এগিয়ে যান। এখানে তাকে সঙ্গ দেন তারই যোগ্য পুত্র শাহজাদা মালিক শাহ ও তার প্রধানমন্ত্রী। জর্জিয়া দখল করতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়। বাধ্য হয়ে ঘোরতর এক যুদ্ধেও জড়াতে হয়। সুলতান রেগে গিয়ে সারনিউলি, ত্রিয়ালিটির মতো শহর গুঁড়িয়ে দেন। বিদ্রোহীরা পরাস্ত হন। জর্জিয়ার বাগারাত ৪র্থ সুলতানের বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য হন। এরপর সুলতান কারস দখল করে সেখানে ইসলাম প্রচার করেন। এরপর তিনি এগিয়ে যান অ্যানি রাজ্যের দিকে। শহর দখলে নিতে তিনি শহরের প্রাচীরের বাইরে থেকে বোমার মতো করে উত্তপ্ত তেল ছুড়েন। লোকজন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সুলতান যখন একদিকে বিদ্রোহ দমন করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই তার সাম্রাজ্যের কিরামান, হাউতেল্লান আর সোগানিয়ান প্রভৃতি কয়েকটা প্রদেশ বিদ্রোহ করে বসে। সুলতান সেদিকে গিয়ে প্রদেশগুলো পুনর্দখল করে নেন। তারপর একে একে গুরগেন্স, ম্যাঙ্গিস্লাক প্রভৃতি শহরগুলো নিজের দখলে নিয়ে আসেন।


১০৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ভলগা আলফ থেকে খাওয়ারিজম এর কিছু অঞ্চল দখল করে ছেলে মালিক শাহ-কে দায়িত্ব দিয়ে নিজে জেন্দের দিকে এগিয়ে যান। ওদিকে গিয়েই খান ইব্রাহিম থেকে মাভেরাননগরের কিছু অংশ নিজের সাম্রাজ্যে অন্তুর্ভুক্ত করেন। ১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তার সেনাবাহিনী বাইজেন্টাইনে ছোট ছোটো আক্রমণ করতে শুরু করেন। তার সেনাপতি গোমস্তগিন এডেসা আক্রমণ করে তা দখল করে নেন এবং ওখানের শাসককে বন্দী করেন। পরে ২০০০০ দিনারের বিনিময়ে তাকে পুনরায় ছেড়ে দেন।


বাকি পরাশক্তিগুলোর অবস্থা :

আলপ আরসালান যখন সেলজুকদের শক্তি সামর্থ্যের পরিচয় দিয়ে নিজের রাজ্যের বিদ্রোহ দমাতে ব্যস্ত, তখন পশ্চিম রোমান সম্রাজ্যে রাজা কন্সটান্টিন ১০ম মাত্র মারা গিয়েছে। এটা ১০৬৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকের ঘটনা। রোমান সাম্রাজ্যের ভার পড়েছে কন্সটান্টিনের বিধবা স্ত্রী ইউডোকিয়া-র উপর। ইউডোকিয়াকে বিয়ে করে ১০৬৮ খ্রিষ্টাব্দে রাণীসমেত রাজ্য লাভ করেন রোমানোস ৪র্থ। তার ক্ষমতা লাভে কিছুটা হলেও রেগে যান জর্জিয়ার প্রয়াত শাসক ডুকাসের ছেলে এন্ড্রুনিকাস ডুকাস। কিন্তু এন্ড্রুনিকাস নিজেকে সংযত করে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। অন্যদিকে সেলজুকরা তখন মিশরি ফাতেমি সাম্রাজ্যের শিয়াদের সাথে লেভান্টে যুদ্ধরত। রাজা হয়েই রোমানোস এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চান। তিনি সেলজুকদের আজীবনের জন্য চুপ করিয়ে দিতে ইরান, খোরাসান, ইরাক, সিরিয়া দখল করতে উদ্যত হন। এই উপলক্ষে মার্চ ১০৬৮তে প্রায় ২০০০০০ সৈন্য নিয়ে নিয়ে তিনি কায়সেরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। এদিকে অগ্রসর হয়েই তিনি খবর পান, সেলজুকরা তার সম্রাজ্যের নিউকায়সারিয়া দখল করে নিয়েছে। তিনি তাই আবার উত্তর দিকে নিজের মোড় ঘুরান এবং তেফ্রিকে গিয়ে তার আরেক বাহিনীর সাথে মিলিত হন।


এবার তিনি তার সেনাপতি ম্যানুয়াল কমিনসকে সেলজুকদের মুখোমুখি যুদ্ধে পাঠান। ম্যানুয়াল সেলজুকদের সাথে প্রথম মুখোমুখি হন তেফ্রিকে। যুদ্ধে রোমান বাহিনী জয়লাভ করেন। ফলে তারা সিরিয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে মানবিজ শহর দখল করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং গণহত্যা চালায়। এই খবর আলপ আরসালানের কাছে গিয়ে পৌঁছায়। তিনি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রতিশোধ নিয়ে এগিয়ে আসেন। ইকুনিয়ামের কাছে কোনো এক স্থানে সেলজুকরা Feigned Retreat Tactic অনুসরণ করে রোমানদের পরাজিত করেন। ম্যানুয়াল কমেনস ধরা পড়ে। কিন্তু মহানুভব সুলতান তার সাথে শান্তিচুক্তি করে তাকে মুক্তি দিয়ে দেন।


মানজিকার্টের যুদ্ধ :

১০৭১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রোমানোস তার শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে পুনরায় সেলজুক সাম্রাজ্যের উপর চড়াও হয়। রোমানোস প্রথমত তার কিছু গুপ্তচরকে নবায়ন করার কথা বলে সেলজুকদের রাজধানীতে পাঠায়। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেলজুকদের সামরিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা। আলপ আরসালান তখন ফাতেমিদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত। রোমানিয়াস প্রায় ১০০০০০ মতান্তরে তার চেয়ে বেশি সৈন্য নিয়ে সিরিয়ার দিকে এগিয়ে আসেন। রোমানিয়াসের সেনাপতিরা তাকে দ্রুত অগ্রসর হতে বাঁধা দেন। কিন্তু রোমানিয়াস তাদের বাধাকে অগ্রাহ্য করে মানজিকার্টে গিয়ে তাবু ফেলেন এবং তার সৈন্যবাহিনীকে দুইভাগে বিভক্ত করেন। তার অগ্রসরের কথা শুনে আলপ আরসালান তার রাজধানীতে ফিরে আসেন। এখানে তার সাথে যোগ দেয় তার পুত্র মালিক শাহর অধীনে থাকা ১০০০০ সৈন্য। প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য নিয়ে আলপ আরসালান রোমানোস কে বাঁধা দিতে এগিয়ে চলেন। এদিকে রোমানোস তার বাহিনীকে দুইভাগে ভাগ করে ৩০০০০ সৈন্যের একটি দল পাঠিয়ে দেন ল্যাক ভ্যানের (lake van) পশ্চিমে। কারণ তার ধারণা ছিল—সুলতান আলপ আরসালান এদিক দিয়ে আক্রমণ করবে। কিন্তু সুলতান যে কী চিজ ছিলেন, তা বোঝার সাধ্য আসলেই বেচারার ছিল না। সুলতান ল্যাক ভ্যানের পশ্চিম পাশে না গিয়ে আপেক্ষিক খারাপ রাস্তা ধরে পূর্ব দিক দিয়ে চলে যান এবং বহু চড়াই-উৎরাই ডিঙিয়ে ল্যাক ভ্যান পার হয়ে রোমানোসের অপেক্ষাকৃত বাহিনীকে আক্রমণ করেন। এই ফাঁকে আরসালানের গুপ্তচরেরা বিপক্ষ বাহিনীর মাঝে এই গুজব ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন যে, রোমানোস মারা গেছেন এবং তার বাহিনী হেরে গেছে। এ কথা শুনে ৩০০০০ সৈন্যের বাহিনীটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়। ফলে রোমানোসের ৭০০০০(মতান্তরে ৫০০০০) সৈন্যের নিজের বাহিনী ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। এবার আরসালান তার বাহিনী নিয়ে মানজিকার্টে পৌঁছান। অনেক ঐতিহাসিকের মতে—সেখানে গিয়ে তিনি সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু অহংকারে অন্ধ রোমানোস কোনোভাবেই সন্ধিপ্রস্তাব মেনে নিলেন না; বরং যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। পরদিন ২৬ আগস্ট ১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধ শুরু হলো। সেলজুক সুলতান আরসালান সকালে সাদা কাপড় পড়ে নামাজ পড়ে ময়দানে আসেন এবং তার জিহাদি ভাষণ দিয়ে তার যোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করেন। আরসালান এই যুদ্ধে মৃত্যুপণ নিয়ে কাফনের কাপড় পরেই নেমেছিল। মানজিকার্ট রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। রোমানোসের বাহিনীতে ছিল রোমানরা, কিছু তুর্কি যোদ্ধা, সেমি নমাডিক যোদ্ধা জাতি এবং নরমানরা।


রোমানোস তার বাহিনীকে চার ভাগে বিভক্ত করলেন। রাইট ফ্ল্যাংকের দায়িত্বে ছিল রাসেল-ডি-বাইল্লুল, লেফট ফ্ল্যাংক ব্রায়েন্নিয়াস ,মাঝখানে ইনফ্যান্ট্রিতে সম্রাট নিজে এবং ডিইক অফ এন্টিয়ক আর পেছনে রিজার্ভ বাহিনীর জন্য এন্ড্রুনিকাস ডুকাস। রোমানোস প্রথমে নিজে আক্রমণ না করে তার এক সেনাপতি বাসিলাস-কে পাঠান। সেলজুকরা তাকে পরাজিত করেন। এবার রোমানোস তার পাখির ডানার শেইপের বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু সেলজুকরা চালাকি করে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে বরং Heat and Run টেকটিকে পেছনে জায়গা দিয়ে সরে যান। ফলে রোমানোসের বাহিনী তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। রাইট উইং এর ক্যাভিলারি, ল্যাফট উইং-এর ক্যাভিলারি আর সেন্ট্রাল ইনফ্যান্ট্রি। রিজার্ভ বাহিনী তখনও যুদ্ধে অংশ নেয়নি। এভাবেই রোমানোস সেলজুকদের পিছু হটাতে হটাতে তাদের তাবু পর্যন্ত নিয়ে আসেন। এদিকে ক্রমশ সন্ধ্যা হয়ে আসে এবং রোমানোস তার বাহিনীকে তাবুতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিন বাহিনী আলাদা আলাদা থাকাতে রোমানোসের কথায় একপ্রকার গোলযোগ সৃষ্টি হয়। রাইট উইং সম্রাটের কথা না শুনতে পেয়ে যুদ্ধ চালাতে থাকে। এই সুযোগে সেলজুকদের সেন্ট্রাল আরচারি বাহিনী গিয়ে ঘিরে ফেলে রোমানোসের রাইট উইং-কে। রোমানোস খবর পেয়ে সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার আগেই রাইট উইং-কে পাইকারি হারে যমালয়ে পাঠিয়ে দেয় সেলজুকরা। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে রোমানোস পরাজিত হয়েছেন। ফলে ল্যাফট উইং ময়দান ছেড়ে পালায়। এন্ড্রুনিকাস এবার তার পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এই সুযোগে ময়দান ছেড়ে চলে যায় তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে। ফলে রোমানোসকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে সেলজুক বাহিনী এবং বন্দী করে। এবার আরসালানের মহানুভবতার পালা। আরসালান আর রোমানোসের তখনকার বিখ্যাত কথোপকথনটা না দিয়ে পারছি না। যা আজো ইতিহাসের পাতায় ভাস্বর হয়ে আছে—


Alp Arslan: "What would you do if I was brought before you as a prisoner?"

Romanos: "Perhaps I'd kill you, or exhibit you in the streets of Constantinople."

lp Arslan: "My punishment is far heavier. I forgive you, and set you free."


সুলতান রোমানোসকে ক্ষমা করে দিয়ে তার কাছে ইসলামের সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য তুলে ধরেন। এবং কয়েকটা শর্তে শান্তি চুক্তি করেন। শর্তগুলো এমন ছিল—

১. এন্টিয়ক, এডেসা, হিরাপোলিস, মানজিকার্ট রাজ্যগুলো সুলতানের জন্য ছেড়ে দিতে হবে।

২. একধারে ১.৫ মিলিয়ন স্বর্ণ মুদ্রা এবং বাৎসরিক ৩ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা সুলতানকে নজরানা হিসেবে পাঠাতে হবে।

৩. সুলতানের ছেলে এবং রোমানোসের মেয়ের বিয়ে হবে।


মানজিকার্টের যুদ্ধ শুধু আনাতোলিয়াই নয় বরং পরবর্তী সময়ের উসমানি সাম্রাজ্যের জন্যও একটি অন্যতম গুরত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এর মাধ্যমে বাইজেন্টাইন সম্রাজ্য প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে এবং আনাতোলিয়ার প্রবেশ দ্বার মুসলিম তুর্কিদের জন্য খুলে যায় আজীবনের জন্য। তুর্কিরা এখানে তাদের জায়গা পাকাপোক্ত করে নেয়। বলা হয়—আলপ আরসালান এই যুদ্ধে নিজের বাহিনীকে শত্রু বাহিনী থেকে আলাদা করতে তার ঘোড়াগুলোর লেজ গুটিয়ে বেঁধে দেন।


রোমানোস এর পরিণতি :

শান্তিচুক্তির পর সুলতান রোমানোসকে অনেক উপহার সহ আবার কন্সটান্টিনিপোল এ ফেরত পাঠান। কিন্তু কন্সটান্টিনিপোল এ তখন অন্য গল্প দাঁড়িয়ে গেছে। মানজিকার্টে হারার পর ওখানের লোকেরা মাইকেল ৭ম কে তাদের নিতুন রাজা হিসেবে ঘোষণা করে। রোমানোস তার রাজ্যে পৌছালে এন্ড্রুনিকাস আর মাইকেল মিলে তাকে অন্ধ করে দেয় এবং প্রতা দ্বীপে নির্বাসিত করেন। ১০৭২ খ্রিষ্টাব্দে রোমানোস ওখানেই মারা যান।


সুলতানের মহাপ্রয়াণ :

১০৭২ খ্রিষ্টাব্দে ১৫ ডিসেম্বর ইসলামের এই মহান বীর ইহকালের মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। মার্ভ শহরে তাকে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুর পর মসনদে বসেন তার সুযোগ্য পুত্র মালিক শাহ সেলজুকি। পশ্চিমারা যাকে দ্যা গ্রেট উপাধিতে স্মরণ করে। যার শাসনামলে সেলজুক সাম্রাজ্য তার বিস্তৃতি ও উন্নতির সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়। শেষ করবো সুলতান আলপ আরসালানের রাজ্যের প্রখ্যাত কবি ওমর খৈয়ামের একটি পঙক্তি দিয়ে।


মরুভূমির মধ্যে গিয়ে একটি যদি শহর গড়ো;

একটি হৃদয় সুখী করা তার চাইতেও অনেক বড়।


সুলতানিআলপ আরসালান যতবড়ো যোদ্ধা ছিলেন ,তারচেয়ে বড় একজন মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন। শত্রুকে হাতে পেয়েও ছেড়ে দেওয়ার যে উদাহরণ তিনি রেখে গেলেন, পৃথিবীর ইতিহাস তা মনে রাখবে আজীবন। আনাতোলিয়ার দরজা খুলে দিয়ে তুর্কীদের যেই জয়রথের যাত্রা তিনি শুরু করেছিলেন, তার অনিবার্য ফলই উসমানি খিলাফত। যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ের পাতায় এবং ইতিহাসের প্রস্তরপাতায়—বাস করবেন আলপ আরসালান একজন মহানুভব সুলতান হিসেবে!


References:

1.The Seljuks- V.M.Zaporozhets

2.The Battle of Manzikert in 1071 and it’s consequences to the Byzantine empire- Monsoureh Ebrahimi, Zuryati Yasin

3.Forgotten Hero of islam: Alp Arsalan- Z A Rahman


২য় পর্ব পড়তে লিঙ্কে ক্লিক করুন https://chintadhara.com/articles/details/seljuq-dynasty

১৩৭৮ বার পঠিত

লেখক পরিচিতি

শিহাব উদ্দিন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এ পানি সম্পদ কৌশল বিষয়ে লেভেল ৩ টার্ম ১-তে অধ্যয়নরত। বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্য ও ইসলামের ইতিহাসের একজন জ্ঞানেন্বেষী পাঠক। নতুন কিছু জানতে আর ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন।

মন্তব্য

১ টি মন্তব্য করা হয়েছে
শাওন

শাওন

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ - ১৫:৫০ অপরাহ্ন

শুভ কামনা❤

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

মন্তব্য করুন

নাম প্রকাশ করতে না চাইলে এই ঘরটি ফাকা রাখুন

এ রকম আরও কিছু লিখা

এই সাইটের বেটা টেস্টিং চলছে...